Debdutta Banerjee

Drama


3  

Debdutta Banerjee

Drama


পত্র রহস‍্য

পত্র রহস‍্য

7 mins 1.8K 7 mins 1.8K

অবসর গ্ৰহনের পর ভবেশ বাবুর জীবনটা বাড়ি আর বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সকালে বাজার করাটাই একমাত্র কাজ এখন। স্ত্রী মন্দিরা দেবীর এখনো পাঁচ বছর চাকরী আছে, ছেলেরা দু জনেই ভোরে বেরিয়ে রাতে ফেরে। সারাদিন একা বাড়িতে খবর কাগজ পড়ে আর টিভি দেখে সময় কাটতে চায় না ভবেশ বাবুর। এই দুটোর কোনো নেশাই কোনো কালে ছিল না ওঁর। ভোরে উঠে দুটো নাকে মুখে গুঁজেই ট্রেন ধরতে ছুটতেন। বাড়ি ফিরতে রাত নটা বাজত। রবিবার গুলো বাজার করে খেয়ে ঘুমিয়েই কাটত। সেই ভবেশ বাবুর এখন প্রচুর সময়, কয়েকদিন পাড়ার চায়ের দোকানে গেছিলেন, আড্ডা জমেনি ঠিক। এত পরনিন্দা পরচর্চার অভ্যাস নেই যে,কাঁচা খিস্তিও শুনতে পারছিলেন না। খগেনের মা সকাল দশটার মধ্যে কাজ সেরে চলে যায়,গিন্নিও সেই সাথেই বেরিয়ে যায়, এর পর ভবেশ বাবু পেপার নিয়ে বসেন। কিন্তু এসব খুন ধর্ষণ রাজনীতি ভোটের খবরে ওঁর মন ভরে না। বই পড়ার তেমন অভ্যাস নেই। বস্তা পচা সিরিয়াল বা সিনেমাও একা একা ভালো লাগে না।

কিছুদিন পাত্র চাই এর পাতায় মন দিয়েছিলেন। বড় ছেলে সার্থক আঠাশ ছোট সমাদৃত পঁচিশ। কিন্তু মেয়েরা বোধহয় আজকাল তিরিশের নিচে বিয়েই করে না, তাও কয়েকটা ফটো আনিয়েছিলেন। দুই ছেলেই জানতে পেরে বাবাকে নিরস্ত্র করেছিল।

আজকাল ভবেশ বাবু ঘর পরিষ্কারে মন দিয়েছেন,বসার ঘরের দুটো শোকেস ঝেরে পুঁছে অবশ্য সর্দি ধরেছিল। কয়েকদিন গ্যাপ দিয়ে অবশেষে বইয়ের আলমারিতে হাত দিয়েছিলেন। আর সেখানেই একটা বইয়ের ভেতর একটা পুরানো হলদে হয়ে যাওয়া খামে ছিল চিঠিটা।

অন্যর চিঠি পড়া ওনার স্বভাব নয়। কিন্তু সাদা খামে কারো নাম লেখা নেই দেখেই খুলেছিলেন। আর মুখ তো খোলাই ছিল। কিন্তু খুলেই ওঁর চক্ষু চড়ক গাছ।

চিঠিটিতে কাউকে সম্বোধন করা হয়নি। চিঠি না বলে চিরকুট বলা যায়। লেখা রয়েছে

 

 আমি আর পারছি না এভাবে। আর কতদিন এভাবে থাকবো বলতো ?কেন এভাবে ফেলে রেখেছ আমায়। এবার আমায় তবে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তুমি কি আমায় ভালোবাসো না আর ? একবারও মনে পড়ে না আমার কথা? কি ভাবে কাটাও একা একা গভীর রাত গুলো? এবার যদি আমায় নিয়ে না যাও .... তবে... তবে .... আমি ....।

তুমি তো জান তোমার সন্তান আসতে চলেছে। তার কথা ভেবেই

একবার এসো, আমায় নিয়ে যাও।

বেশ কবার উল্টে পাল্টে দেখলেন উনি। চিরকুটটির ভাজ বরাবর হলদেটে দাগ। খামটাও একটু পুরানো। অবশ্য কত পুরানো ওভাবে বোঝা যায় না সব সময়। বুদ্ধদেব গুহর বইয়ের ভেতর ছিল খামটা।

হাতের লেখার ধরনটা মেয়েলি। তবে কি দুই ছেলের মধ্যে কেউ সেই কালপ্রিট। কিন্তু এতো বেশ পুরানো । তবে কি ... সার্থকের কোনো ঘটনা !! ছেলেটা বরাবর মুখ চোরা। কলেজে পড়ার সময় দু একটা মেয়ে বন্ধু ছিল । তারাই কি কেউ?

আবার চিঠিটা পড়লেন ভবেশ বাবু। সন্তানের মা !! সার্থকের সন্তান !! কোথায় সে ? কত বড় হল?

 কিন্তু মেলাতে পারেন না,বরঞ্চ সমাদৃতের প্রচুর মেয়ে বন্ধু ছিল। কয়েকজন তো বাড়িতেও এসেছে। তবে কি তাদের মধ্যে কেউ!! ভবেশ বাবুর নিস্তরঙ্গ জীবনে আজ তুফান উঠেছে। এই চিরকুটের কথা যদি সত্যি হয় কোথায় ওঁর বংশধর !! সে কি পৃথিবীর আলো দেখেছে?

হঠাৎ একটা অন্যরকম সঙ্কোচ ঘিরে ধরে ভবেশ বাবুকে। মেয়েটি সুস্থ ভাবে বেঁচে আছে তো ? এ চিঠি বেশ পুরানো। অথচ ছেলেরা তার নির্বিকার। তবে কি তারা স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিল? নাকি মেয়েটা ফ্রড। নাম নেই কেন চিঠিতে?

 

বড় ঘড়ির ঢং ঢং করে দু টো ঘণ্টা বাজায় সম্বিত ফিরে পান ভবেশ বাবু। বেলা হয়ে গেছে। আজ স্নান খাওয়া কিছুই হয়নি। একগাদা বই রোদে ছড়িয়ে শোকেসের সামনে এক চিঠি নিয়ে বসে রয়েছেন তিনি।

কোন রকমে উঠে স্নান খাওয়া সেরে আসেন। আবার চিঠিটা নেড়ে চেড়ে দেখেন। হাতের লেখাটা কি চেনা ? সুন্দর ঝকঝকে লেখা, এ মেয়ে স্পষ্ট বাদী। কল্পনায় একটা মেয়ের আদল ফুটে ওঠে। কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নয়। অনেক দেরি হয়ত হয়ে গেছে। মেয়েটাকে খুঁজে বের করতেই হবে। ছেলে দুটোকে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে এ সব বেয়াদপি উনি বরদাস্ত করবেন না। ভালবেসেছে যখন দায়িত্ব নিতেই হবে।

উত্তেজনায় প্রেশারটা বোধহয় বেড়েছে। বিকেলের ফলটাও খাওয়া হয়নি। মন্দিরা এসে রাগারাগি করবে আজ। করুকগে। ছেলেদের কীর্তি শুনলে ও থ হয়ে যাবে। ওর বড় গর্ব ছেলেদের নিয়ে। অবশ্য গর্ব ভবেশ বাবুর ও আছে,মানে ছিল.. এতদিন। কিন্তু এই কাগজের টুকরোটা সব কিছু বদলে দিয়েছে আজ।


উনি চোখ বুজে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করেন, সার্থকের কলেজ লাইফের কোন ভুল হলে এ চিঠির বয়স আট থেকে দশ বছর, তার মানে সেই শিশু যদি জন্ম নেয় ... আজ সে সাত আট বছরের । সমাদৃতের ভুল হলেও পাঁচ বছরের। একটা মেয়ের পক্ষে কি এভাবে একা সন্তানকে বড় করা সম্ভব!! তবে কি ওঁর বংশধর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ... না:, আর ভাবতে পারেন না। মাথাটা কেমন করছে। গলাটা বড্ড শুকাচ্ছে। সন্তানদের কুশিক্ষা কখনো দেননি। এক ঢোক জল খেয়ে নতুন করে ভাবতে বসেন উনি। হঠাৎ মনে পড়ে সতেরো বছর আগে দীপেশ থাকত এ বাড়িতে। দীপেশ ওনার ছোট ভাই। এ চিঠি কি অত পুরানো হবে !! হতেও পারে। দীপেশের আজ ভরা সংসার, নিজে মেয়ে দেখে বারো বছর আগে ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দীপেশ তো বলেনি কখনো যে তার জীবনে কেউ ছিল। বড্ড দাদা ভক্ত ভাই। গড়িয়ায় থাকে বৌ বাচ্চা নিয়ে। না, না, দীপেশ নয়। তবে কি অলক !! অলক মন্দিরার ভাই, তেরো বছর আগে এক বছর এ বাড়িতে ছিল। এখানে চাকরী নিয়ে এসেছিল। মন্দিরা নিজের বাড়িতেই রেখেছিল ভাইকে। অলক এখন জামশেদপুরে, ওর দুই মেয়ে। সুখী সংসার।  ‌

 

মাথার দু পাশটা দপদপ করছে রাগে। কে করল মেয়েটার সর্বনাশ!! কেন করল!! ভবেশ বাবু খুব আধুনিক চিন্তাধারার মানুষ। এসব জানলে কাউকে বাঁধা দিতেন না কখনো। ছেলেরাও জানে সে কথা। তবে এত বছর পর যখন ঘটনাটা জানতে পেরেছেন উনিও শেষ দেখে ছাড়বেন। মেয়েটির প্রতি অনেক অবিচার হয়েছে, আর নয়।

আচ্ছা , হয়তো মেয়েটা লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে। হয়তো ভবেশ বাবুর বংশ প্রদীপ আজ অন্য কোনো পরিবারের আলোয় পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে.... !! দূর থেকেই না হয় একবার আশীর্বাদ করবেন সেই শিশুকে। কিন্তু খুঁজে বার করতেই হবে ।

 

-''কি গো, শরীর ঠিক আছে তো ? বারান্দায় বই ছড়ানো, বুক সেলফ খালি, লাইট জ্বালোনি !! কি হয়েছে আজ তোমার?'' মন্দিরা দেবী ঘরে ঢুকেই লাইট জ্বেলে দেয়। উনি একটু দূরে একটা স্কুলে পড়ান। ফিরতে ফিরতে ছটা হয় রোজ।

 

-'' শরীর ঠিক আছে। তুমি হাত পা ধুয়ে এসো। চা করে আনি। তারপর শুনো।'' ভবেশ বাবু রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যান। বলতে তো হবেই। মন্দিরার বুদ্ধি নিয়েই এগোতে হবে। 

ফুটন্ত জলে চা পাতা ছেড়ে হঠাৎ চমকে ওঠেন ভবেশ বাবু। আরে ... এটা তো মাথায় আসেনি!! এমনও তো হতে পারে !!

 মন্দিরা যে সব খাতা বাড়ি আনে দেখার জন্য তার মধ্যেও অনেক প্রেম পত্র পাওয়া গেছে এর আগে। ওর ছাত্রীরা হয়তো এ চিঠি খাতায় লুকিয়ে রেখেছিল। হতেই পারে, হয়ত মন্দিরা খাতা দেখতে দেখতে বইয়ের ভাজে রেখে দিয়েছে কখনো। ঈশ !! সারাটা দিন হাবিজাবি ভেবেই বরবাদ করলেন উনি। এটা মন্দিরার কোনো ছাত্রীর কাজ, কিন্তু তবুও .... ভাববার বিষয় হল মেয়েটার কি হল!! সে সুস্থ আছে তো ? সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে তো ?

 

-''চায়ের জল পোড়া গন্ধ পাচ্ছি বাথরুম থেকে আর তুমি সামনে দাঁড়িয়ে কি করছ ? কি হয়েছে তোমার ? '' আবার মন্দিরা দেবীর কথায় চমকে ওঠেন ভবেশ বাবু।   জলটা শুকিয়ে চা পাতা পুড়ে গেছে ... আবার দু কাপ জল বসান উনি।

-''যাও তো ওঘরে, আমি চা নিয়ে যাচ্ছি। তারপর শুনবো আজ কি হয়েছে।'' ভবেশ বাবুকে সরিয়ে মন্দিরা দেবী গ্যাসের সামনে দাঁড়ান। অবসরের পর থেকেই লোকটা কেমন ভাবুক হয়ে পড়েছে। চিন্তা হয় আজকাল মন্দিরা দেবীর।

 

-''তোমার কি মনে হয় ,আমাদের ছেলেরা কোনো মেয়ের সর্বনাশ করতে পারে ?'' চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দেন ভবেশ বাবু।

একটা বিষম খান মন্দিরা দেবী, এ আবার কি প্রশ্ন!! বলেন -'' ঠিক কি হয়েছে বলো তো ?''

-''বলছি দাঁড়াও, আমাদের বাড়ির কেউ মানে অলক বা দীপেশ এরা কি পারে এমন কিছু করতে ?''

-''ধূর, কি যে বলো না তুমি !!''

-''আচ্ছা, বেশ কয়েক বছরের মধ্যে তোমার কোন ছাত্রী আত্মহত‍্যা বা .... ঐ মানে কুমারী অবস্থায় সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়েছে এমন কিছু ....''  ওনার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে চায়ের কাপ নামিয়ে মন্দিরা দেবী বলে ওঠেন -''কি হয়েছে খুলে বলো তো। এমন ধাঁধাঁ বানাচ্ছ কেন ?''

-''গিন্নি, নিজেদের রক্তকেও চেনা যায় না সব সময়, এই দেখো ... এটা আজ পেয়েছি একটা বইয়ের ভেতর। ''চিঠিটা খাম সহ এগিয়ে দেন স্ত্রীর দিকে।

অবাক হয়ে কাঁপা হাতে চিঠিটা নেন মন্দিরা দেবী। তারপর খুলে এক নিমেষে পড়েই হাসতে থাকেন। সে হাসি আর থামতেই চায় না। হাসতে হাসতে সোফায় লুটিয়ে পড়েন আদর্শ বালা স্কুলের বড়দি মন্দিরা দি। তারপর বলেন -''এটা ... মানে এই চিঠিটা ... তুমি ভেবেছ তোমার ছেলেদের কেউ লিখেছে। এটার বয়স বুঝতে পারছ ?''

-''আমি তো এক্সপার্ট নই,তবে বেশ পুরানো তা জানি। ''

-''বেশ নয়, এ বহু পুরানো,আচ্ছা হাতের লেখাটাও চেনো না ?'' হাসি চাপতে পারেন না মন্দিরা দেবী।

-''চেনা, মানে ... না , ঠিক জানি না।  তবে কি তোমার কোনো ছাত্রীর লেখা ?''

-''উফ, সত্যি, তোমায় নিয়ে আর পারা গেলো না। যদি বলি এ চিঠি তোমার  জন্য লেখা ...''মিচকি মিচকি হেসেই চলেছেন মন্দিরা দি ।

-''আমায় ... বুড়ো বয়সে ফাঁসাচ্ছ কেন বল তো? এ আমায় কেউ কেন লিখবে? আমি কি এসব করতে পারি !! ছিঃ''

-''পারো নয়, পেরেছিলে,করেছিলে, এ চিঠি তোমায় লিখেছিল তোমার প্রেমিকা। ''

 -''থামবে এবার। আর গুলিয়ে দিও না। ''


-''কেন থামবো। তুমি আমায় বিয়ের পর তিনমাসের জন্য বাপের বাড়ি রেখে আসোনি ?আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না, বিএডের পরীক্ষা ছিল সে সময়। আমি লিখেছিলাম এ চিঠি। এর বয়স উনত্রিশ বছর। তবে পোষ্ট করিনি,পাঠাইনি। কারণ যে দিন লিখেছিলাম সেদিন বিকেলেই তুমি আমায় নিতে গেছিলে। বুদ্ধদেব গুহ পড়তাম তখন। সেখানেই রেখেছিলাম হয়ত। তাই বলে এই পুরানো চিরকুট  দেখে তুমি ছেলেদের সম্পর্কে .... ছি ছি, কেমন বাবা গো তুমি ?'' হাসিতে ফেটে পড়েন মন্দিরা দেবী।

কান গাল লাল হয়ে উঠেছিল ভবেশ বাবুর। সত্যিই তো, বহুদিনের জন্য সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠিয়েছিলেন তিনি। তবে মন্দিরা কখনো চিঠি লেখেনি বলে ওটা মাথায় আসেনি। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলেন সব শুনে।

-''ভাগ্যিস ছেলেদের ডাইরেক্ট বলে ফেলোনি !!''

 ভবেশ বাবুর মনটা হঠাৎ ভার হয়ে আসে। বেশ একটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা ফিল হচ্ছিল। একটা নাতি বা নাতনির কথাও ভেবে ফেলেছিলেন। অবসর কাটাবার সহজ উপায় নাতি বা নাতনির সঙ্গে সময় কাটানো। না: এবার ছেলের বিয়ে দিতেই হবে। মনে যখন একবার এসেছে এই চিন্তা এটাকেই বাস্তব রূপ দিতে হবে। আচ্ছা, একটা পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দিলে কেমন হয়। রোজ চিঠি আসবে, ফোন আসবে। সে সব বাছতেও সময় লাগবে।

কাল থেকেই লেগে পড়তে হবে । আজ রাতেই মন্দিরাকে দিয়ে বয়ানটা লিখিয়ে নেবেন নাহয়।

মন্দিরা দেবী তখনো হেসেই চলেছেন।

 

 

 


Rate this content
Log in