Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!
Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!

Goutam Nayak

Drama Romance Others


3  

Goutam Nayak

Drama Romance Others


প্রমীলা (চতুর্থ অধ্যায়)

প্রমীলা (চতুর্থ অধ্যায়)

13 mins 248 13 mins 248

সমস্ত কাজের জটিলতার জট কাটিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি, এমন সময় টুকি বাবু এবং রুক্মিণী দেবী আমার ঘরে প্রবেশ করলেন।রাত্রি অবশ্য খুব বেশি হয়নি; তখন সবে 10 টা বেজেছে। অন্য দিনের মত আজও দুজনে' আমার সঙ্গে গল্প করতে এসেছেন।আজ দুজনকেই বেশ খুশি খুশি লাগছে। টুকি বাবু বললেন―

―অনন্ত বাবু তাহলে কিছুদিন ছুটি পাচ্ছি তাইতো―

―কেন? ছুটি কেন টুকি বাবু?

―আপনি সেদিন বেড়াতে যাবার কথা বলছিলেন ?

―ওহ! টুকি বাবু ছুটি থাকছে না । তাছাড়া আপনিও তো যাচ্ছেন আমার সঙ্গে।


কিছুক্ষণ থেমে রুক্মিণী দেবীর দিকে তাকিয়ে, মুচকি হেসে আবার বললাম,


―আপনিও তৈরি থাকুন রুক্মিণী দেবী -

রুক্মিণী দেবী কৌতূহলী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল―

-কি!!!!!!

―আপনি তৈরি থাকুন বেড়াতে যাবার জন্য। প্রমিলা আগামীকাল সকালেই আসছে। আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে'।

টুকি বাবু বেড়াতে যাবার কথা ভেবেই যে, কিন্তু' বোধ করছে তা তার চোখেমুখে স্পষ্ট বোঝা যায়।আমি টুকি বাবুকে বললাম―

―টুকি বাবু আপনি বোধহয় খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন?

―তা তো সামান্য হচ্ছেই,বুঝতেই পারছেন―

টুকি বাবু কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম―

―আপনাকে কোনো কিছু চিন্তা করতে হবে না, আমি সব ব্যবস্থা করেই রেখেছি।

টুকি বাবু আমার কথা শুনে বেশ খুশি হলেন।রুক্মিণী দেবীকেও তখন বেশ উৎফুল্ল লাগছিলো। সময় সময়ের মধ্যে শুরু হলো, চরম দারিদ্রতার লড়াই করে রুক্মিণী দেবীর বিয়ের ও জীবনকে সচ্ছল করে তোলার গল্প। তাছাড়া সন্তান হীনের হৃদয়পূর্ণ দুঃখের কথা গুলোও বাদ গেল না।

গল্প করতে করতে প্রায় রাত্রি 11 টা বেজে গেল। প্রমিলার সহিত সাক্ষাতের অপেক্ষায় ডিনার ভালো করে হলোনা।রুক্মিণী দেবী ডিনারের আয়োজন করতে করতে আমায় বারবার দেখছিল আর কৌতুক হাসি হাসছিলো। রুক্মিণী দেবীর কৌতুক আমার কাছে সেই মুহূর্তটাকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।কেননা মনটা তখন ভবিষ্যতের রোমাঞ্চকর প্রেম নিবেদনের চিত্রাঙ্কন করছিল।

ডিনার শেষ করে টেবিলের সামনে এসে কিছুক্ষণ বসলাম।প্রমিলা আসার অন্তিম মুহূর্তে ডাইরিটা পুনরায় মুখরিত হয়ে উঠলো ভালোবাসার প্রতিবন্দকতায়। নিজের এলোথেলো কক্ষটা কিছুটা গোছগাছ করতে চাইলাম। কিন্তু জিনিসগুলো ঠিক ভাবে সাজানো যাচ্ছে না। সেগুলো যেন আমার পছন্দমত জায়গায় থাকতে চাইনা।বারবার পরিবর্তন করেও যখন ঠিক হচ্ছিল না তখন ওই রকমই রেখে দিলাম। তবে টেবিলের দুপাশে ফুলের বাকেট গুলো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলাম।

মনমোহিনী,আনন্দের আশায় রাত্রে ভালো ঘুম হলো না। প্রমীলার, ভোরের দিকে বলেঙ্গে নামার কথা হয়েছে। ভোর চারটার সময় আমি তৈরী হয়ে গেলাম, ও টুকি বাবুকে গাড়িটা বের করতে বললাম। আধো ঢুলু ঢুলু চোখে টুকি বাবু গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। আমি তার অবস্থা দেখে ড্রাইভিং সিট থেকে তাকে সরিয়ে যেতে বললাম ও আমি গাড়িতে ড্রাইভিং করার জন্য তৈরি হলাম।


বলেঙ্গে আমরা প্রায় পৌনে পাঁচটার সময় পৌছালাম। সবে তখন ভোর হয়েছে। দু একটা চা দোকান খুলেছে মাত্র। তাছাড়া অন্য কোন দোকানপাট তখনো খুলেনি। গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে টুকি বাবুকে দু'কাপ কফি আনতে বললাম। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আমি চারিদিকটা লক্ষ্য করলাম একবার, দূরে কোথাও বোলেরো দেখা যাচ্ছে কিনা।কিন্তু কোনো গাড়িই দেখা যায়নি―

মনটা ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠলো।গাড়ির চার পাশে চক্কর দিতে লাগলাম। টুকি বাবু আমার মনের অবস্থাটা অনেকটাই অনুভব করতে পারত। সে কফি নিয়ে এসে বলল―

―অনন্ত বাবু আপনি খামোখা অস্থির হয়ে উঠছেন। দেবীরানী(প্রমিলা) এসে যাবে নেন, চিন্তা করতে হবে না। এই নিন কফি পান করুন।

এই বলে আমার দিকে কফি কাপটা বাড়িয়ে দিল।আমি কফি নিয়ে গাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলাম ও গতকালের পেপারটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। দু চুমুক মেরেছি তখনিই টুকিবাবু বলে উঠলেন―

―বাবু একটা বোলারো ঢুক-ছে। আমি তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলাম গাড়ি থেকে প্রমিলাকে স্বাগত জানাবো বলে।কিন্তু গাড়ি থেকে অন্য কেউ নামছে দেখে মনটা বেশ হতাশ হয়ে গেল।পুনরায় গাড়িতে উঠে গেলাম।মিনিট দুয়েক বাদে টুকিবাবু আবার বললেন―

অনন্ত বাবু বোধহয় দেবীরানী নেমেছে―

আমি হতাশার সহিত বললাম, টুকিবাবু কেন আমাকে হতাশ করছেন??? আপনার যদি মনে হচ্ছে তাহলে আপনি গিয়ে কথা বলে দেখুন।

টুকি বাবু যাবোনা যাবোনা করে এগিয়ে গেলো। গাড়ির সামনে গিয়ে মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে মহিলাটির উদ্দেশ্যে বলল―

-এই যে শুনছেন???

মহিলাটি টুকিবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল―

-কি ভালো আছেন তো???

কথাটি শুনে টুকিবাবু যেন চমকে উঠলো। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে।মহিলাটি পুনরায় বলল―

-কি টুকি বাবু ভালো আছেন তো???

টুকিবাবু এবার হালকা হাসতে হাসতে বলল―

-প্রমিলা দেবী !

-হ্যাঁ, আমিই।ভালো আছেন তো?

-হ্যাঁ। আর কি, অনন্ত বাবুর ভালোবাসায় বেশ ভালো আছি।

-বাহ! তো আপনার বাবু কি আসেননি…..?

—বলছি বলছি, তার আগে বলুন, আপনি আমায় চিনলেন কি করে??

―অনন্তবাবুর মুখে আমি, আপনার বহিরাকৃতির অনেক কথা শুনেছি। সেই হিসাবেই।তাছাড়া এই ভোরবেলায় আপনার মত আর অন্য কেউ নেই তো আমাকে নিতে আসার জন্য!! তবে সামান্য কিছুটা অনুমানও বলতে পারেন।


হ্যাঁ উদ্দেশ্যে টুকি বাবু হাসি মুখে ঘাড় নাড়তে লাগলো।তার উত্তেজনা এবার কিছুটা কমলো। প্রমিলা গাড়ির ডিকি থেকে ব্যাগপত্র গুলো নামাতে যাচ্ছিল কিন্তু টুকিবাবু প্রমিলাকে সরিয়ে নিজেই নামাতে লাগলো আর বলল―

-আপনি ভালো আছেন???

-হ্যাঁ ভালো আছি। তবে গত রাতে সেরকম ঘুম হয়নি। জার্নি করে শরীরটা এখন খুব অসুস্থ লাগছে।

―ওহ!

―আপনি কখন এসেছিলেন??? আর আপনার বাবু কি আসেননি???

দুজনের মনের এক অতৃপ্ত টানাপোড়েন টুকিবাবুকে বেশ আনন্দ দিতে লাগলো। আসার পর থেকে এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রমিলা আমার আসার খবর দুবার নিয়ে নিয়েছে। অনুসন্ধিৎসু মন কি অবস্থায় তা প্রমিলার কথাবার্তায় টুকি বাবু বুঝে গিয়েছিলেন। তাই বললেন---

-আপনি অধৈর্য হচ্ছেন কেন এত ―

―না না অধৈর্য হবো কেন। উনি তো আসবেন বলেছিলেন তাই বলছি।

-ওহঃ।

―গাড়ি কোথায় রেখেছেন টুকিবাবু???

―ঐতো ঐখানে।

টুকি বাবু আঙ্গুল বাড়িয়ে গাড়ির দিকে দেখিয়ে দিল। ব্যাগপত্র বলতে সেরকম কিছু ছিল না। দুটো বড়ো ব্যাগ আর একটা ছোট ব্যাগ। টুকি বাবু সব ব্যাগগুলো ও প্রমিলা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ির কাছে হাজির হলো।

মেয়েটিই যে আমার প্রিয়তমা প্ৰণয়িনী প্রমিলা তা বুঝতে টুকি বাবুর কোনো অসুবিধা হয়নি।কেননা আমার অসংখ্য বার সৌন্দর্যের মুখরায়ন যে তার কানকে ঝালাপালা করে দিয়েছিল তাহা আর বোধহয় বলতে হয় না। অভ্যন্তরীণ মনবিলাপে আমি তখন ডাইরি নিয়েই এতটাই মশগুল ছিলাম যে জানালার পাশে প্রমিলার নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা আমার কাছে জানার অবকাশ হয়ে উঠেনি। মননিবেশ অবস্থায় মাথায় একটা স্পর্শ অনুভব করলাম। হাতটা মাথার দিকে বাড়িয়ে অনুভব করলাম কারো হাত আমার মাথার চুলে বিলি কাটছে। পিছন ফিরে দেখি প্রমিলা― অতর্কিতে যখন কোনো বোকা লোক হতভম্ব হয়ে যাবার কিছু দেখে তখন তাহার যেমন অবস্থা হয় তখন আমার সেই রকমই অবস্থা। হাঁ করে তাকিয়েছিলাম প্রমিলার দিকে।কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকার পর গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম ―

মনে মনে প্রমিলাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আনন্দের প্রকাশ করবো বলে ভাবলাম কিন্তু পরক্ষনেই তার অন্তঃতুষ্টি করে দিয়ে হালকা হেসে প্রমিলার দিকে তাকালাম।

প্রমিলা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

―আপনি গাড়িতে ছিলেন তবুও এলেন না?

―না , তা নয় প্রমিলা। ডাইরিতে খুবই মশগুল হয়ে পড়েছিলাম তাই আপনাকে লক্ষ্য করা হইনি। আশা করি আপনি ভালোই আছেন। আর আপনার যাত্রা পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো?

প্রমিলা আমার কথার কোন উত্তর দিল না।সেই মুহূর্তের উত্তরটা বোধহয় আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। কেননা সে এমনই অদ্ভুতভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল যে ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর যেন প্রমীলার চোখের ভাষাতেই লিপ্ত হয়ে রয়েছে।


প্রথমে আমি অতটা বুঝে উঠতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম অনেক দিন হয়তো আমায় দেখেনি তাই বোধ হয় কাজল নয়ন চোখে আমায় তৃপ্তি ভরে দেখছে। পরে বুঝলাম সে দেখছিল ঠিকই কিন্তু তার চোখ অন্য কথা বলছিল।সেইসময়ই পিছন থেকে এক গাড়ির হর্ন আমাদের নির্বাক চোখের বক্তৃতায় দাড়ি টেনে দিল। প্রমিলা ইতস্তত করছিল। আমি আবার বললাম,

―চলুন ব্রেকফাস্ট করে নিই

প্রমিলা বলল―

―আমি এখন ব্রেকফাস্ট করব না ভোরের দিকে কিছু খাবার খেয়ে নিয়েছি।

ও! ঠিক আছে তাহলে গাড়িতে উঠুন।

প্রমিলা গাড়িতে উঠলো।আমি ব্রেকফাস্ট গাড়িতেই সেরে নেব ভেবেই সামনের একটি দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। টুকি বাবু আগের থেকে ড্রাইভিং সিটেই বসেছিল। সে আমাদের দুজনের মধ্যেই যাতে সমস্যা না তৈরি হয় সেই জন্য গাড়ি চালানোর দিকেই মনস্থির করলো।টুকি বাবুকে গাড়িটি ছাড়তে বললাম।সিটেই ডাইরিটা,গতকালের পত্রিকা ও কিছু অফিসের কাগজপত্রও এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। সেগুলো সব গোছ করে সিটের এক পাশে রাখলাম।

হালকা কমলা রঙের শাড়ি ও হলুদ রঙের পাড় দেওয়া, একদম সাধারণ শাড়িতে প্রমিলা দেবীর মধ্যে সম্পূর্ণ বাঙালিয়ানা ফুটে উঠেছে। আধো ঢুলু কামুক চোখ তার মুখমন্ডলের আকৃতি ও প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন করেছে।তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ প্রমিলাকে খুব লাস্যময়ী লাগছে। বৈচিত্র্যময় পোশাক ছাড়াই বাঙালি মেয়েদের যে রূপের বর্ণছটা তা এই পোশাকে ফুটে উঠেছে।

প্রমিলা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুখটা ঘুরিয়ে যখন আমি চোখে চোখ রাখলাম প্রমিলা বলল—

আপনাকে দেখার জন্য গতকাল রাত্রে আমি বেশ অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। তাই রাত্রে সেরকম একটা ঘুম হয়নি। শরীরটা খুবই ক্লান্ত লাগছে—

প্রমিলার মুখের দিকে দেখলেই তার ক্লান্তি লক্ষ্য হয়। প্রমিলার তখন বেশ ঢুলু ঢুলু ভাব। আমি প্রমিলাকে বললাম―

এখন আপনি একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন। আপনাকে দেখে ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছে। বিশ্রাম নিয়ে শরীরটাকে একটু সুস্থ করে তুলুন। আমাদের এখন বাড়িতে যেতে প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে।

প্রমিলা আর কোন কথা না বলে গাড়ির সিটে হেলান দিল বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।নিমজ্জিত চোখে তার মুখের বাহারটা আমার কল্পনার বাইরে হয়ে উঠেছিল সেই মুহূর্তে। কি সুন্দরই না দেখাচ্ছিল তার মুখটা।

নির্জন রাস্তায় পাখির কলতান ও গাছের পাতার মর্মর শব্দ প্রমীলার প্রতি ভালোবাসা আরো দৃঢ় করে তুলেছিল। দু'চারটে কথা টুকি বাবুর সাথে হওয়ার পর সে বললো― বাবু সুন্দর সুন্দর গানের কালেকশন আছে আমার; কিছু গান চালিয়ে দিই ―


সেই মুহূর্তের পরিপেক্ষিতে আমি আর বাধা না দিয়ে চালানোর আদেশ দিলাম।টুকি বাবু 70-80 দশকের ক্লাসিক গানের রিমিক্স করা গানগুলি চালিয়ে দিল।ভালোবাসার গানে মুহূর্তটা তখন এমনই লাগছিলো― যে মনে হয়েছিল প্রমীলাকে জড়িয়ে ধরে ভালবাসার একটা গভীর চুম্বন দিই । কিন্তু প্রমিলা ঘুমে এতটাই নিমজ্জিত ছিল যে সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠলো না।

বাড়িতে আসতে আসতে আমাদের প্রায় ১০ টা বেজে গেল। প্রমিলার সঙ্গে গাড়িতে আর সেরকম কিছু কথা হলো না। কতদিন বাদে, তাকে আজ দেখলাম। চিঠিতে যেভাবে কথা বলত আজ সামনে তাকে দেখে খুব একটা খুশি হয়েছে বলে মনে হল না । কেমন একটা সংকীর্ণতার ছাপ ফুটে উঠছে তার কথাবার্তা আর বহিরাকৃতির মধ্যে। মনটা বেশ পিছুটান অনুভব করলো---তাহলে কি প্রমিলার আসার ইচ্ছা থাকেনি?? নাকি আমার মন রাখার জন্য এসেছে। আমি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম, সেই মুহুর্তে হয়ত সমস্যা সমন্ধে প্রশ্ন করা যেত কিন্তু প্রমিলাকে আমি ডিস্টার্ব করতে চাইছিলাম না।

বাড়ির সামনে যখন গাড়ি এসে দাড়ালো রুক্মিণী দেবী বেশ উৎফুল্লতার সহিত বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, প্রমিলা কে দেখার জন্য। আমার মুখে যার এত রূপের গল্প শুনেছে তাকে দেখার আনন্দ যে কি হতে পারে তা কল্পনার বাইরে।গাড়ির সামনে এসে জানালায় উঁকি মারতে শুরু করল। প্রমিলার তখনও নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। রুক্মিণী দেবী প্রমিলা কে দেখে এতটাই উৎসাহিত হয়েছিল যে সে আহ!!! করে চিৎকার করে উঠেছিল। প্রমিলা চিৎকার শুনে তৎক্ষণাৎ সিট থেকে হেলান ছেড়ে ভালোভাবে বসলো। সে প্রথমে আমার মুখের দিকে তাকালো ভেবেছিল আমিই ডেকেছি তাকে কিন্তু আমি তাকে যখন আঙুল বাড়িয়ে রুক্মিণী দেবীর দিকে দেখিয়ে দিলাম তখন অবাক হলেও হালকা ঠোঁটের আগায় প্রমীলার হাসি ফুটে উঠেছিল। প্রমিলা গাড়ি থেকে বেরিয়ে রুক্মিণী দেবী কে জরিয়ে ধরল এবং উষ্ণ আলিঙ্গন শেষ করে বলল

ভালো আছেন তো রুক্মিণী দেবী????

ওরে বাপরে তুমি আমায় চিনে ফেলেছো।― কি করে???

কেন, অনন্ত বাবুর চিঠিতে আপনার রূপের এবং চরিত্রের অনেক গুণাবলী শুনেছিলাম যে। আর আপনার বহিরাকৃতির সম্বন্ধে যেটুকু শুনেছিলাম সেটুকুই তো বেশ ভালোভাবেই মিলে যাচ্ছে। তাহলে আপনাকে চিনতে পারব না কেন।

রুক্মিণী দেবী আর এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রমীলার হাতটা ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। গাড়ি থেকে নামতে নামতে প্রমীলা ও রুক্মিণী দেবীর কতোই না গল্প করার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি গাড়ি থেকে নেমে আমার রুমে গেলাম এবং টুকি বাবুকে বলে দিলাম ব্যাগ পত্র গুলো নামিয়ে যেন আমার রুমে রেখে দিয়ে আসে।

রুক্মিণী দেবীর সঙ্গে আসার সময় তাদের বাড়িটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল। রুক্মিণী দেবী বারান্দা ঘরটাতে প্রমিলা কে চেয়ারে বসতে বলল।রুক্মিণী দেবী আপ্পায়ন স্বরূপ কাচের গ্লাসে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত এনে দিল প্রমীলাকে। প্রমিলা শরবত পান করতে করতে রুক্মিণী দেবীকে পাশের চেহারটা দেখিয়ে বলল,

বসুন এখানে আপনার সঙ্গে অনেক কথা রয়েছে; আসুন অনেক কথা--

রুক্মিণী দেবী ইতস্তত করতে করতে, চেয়ারটিতে এসে বসলো। প্রমিলা বলল,

রাস্তায় আসার সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই বলেঙ্গ থেকে আপনার জন্য কিছুই নিয়ে আসা হয়নি এবং এখান পর্যন্ত কেমন পরিবেশ সেটাও আমার লক্ষ্য করা হয়নি।

―ঠিক আছে। একদিন তোমাকে আমাদের এখানটা ঘুরিয়ে দেখাবো।খুব ভালো লাগবে।

―রুক্মিনী দেবী আপনার বাড়িটা খুব সুন্দর।

হ্যাঁ, ওই আর কি। তারপর তোমার মা কেমন আছে?

―ভালো আছে।তবে মাঝে মধ্যে আমার জন্য খুব চিন্তা করে।

―প্রমিলা, তোমায় দেখে তো মনে হয় অনন্ত বাবু যেটুকু বলেছে সেটুকু অনেক কম।

―কি বলেছে অনন্ত বাবু?

―ওই আপনার সমন্ধে;আর কি কেমন দেখতে ব্যবহার কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অনেক কিছু—

―তাই বুঝি

হ্যাঁ।

―খুব ভালো মনের মানুষ জানেন আপনি যে জীবনে এত সুন্দর মানুষ পেয়েছেন সেটা আপনার ভাগ্য। আজকাল যুগে কে এরকম মানুষ পায়।।

রুক্মিণী দেবীর মুখে আমার সম্বন্ধে প্রশংসা শুনে প্রমীলার চোখগুলি জ্বলজ্বল করে উঠল খুশিতে। মনে মনে সে ভাবতে লাগল তার পছন্দ করা জিনিসটা বেশ প্রশংসিত।ভাগ্যিস সেদিন পরিচয়টা হয়েছিল আর বাড়িতে আগে নিজেই আলোচনা করতে গিয়েছিল।যদি না যেত তাহলে হয়তো অনন্ত বাবুকে জীবনে পেতেই না।তবে তার মনে ভয়ও কিছুটা ছিল। মনকে কিছুটা শান্ত করে রুক্মিণী দেবী কে বললেন―

―অনন্ত বাবুর মত বড় মনের মানুষ কখনো হয় না ঠিকই কিন্তু আমি পেয়েছি বলাটা ভুল কেননা তিনি যে আমাকে পছন্দ করেন সেটা আমি আজও জানি না আর তাছাড়া অত বড় মনের মানুষ আমাকে কেনই বা পছন্দ করবে?

রুক্মিণী দেবী হা হা করে হেসে উঠলো ও বলল সত্যিই তুমি এখনো ছোট আছো প্রমিলা। তোমার কি একটুকুও বোঝার ক্ষমতা নেই, তুমি কি কিছুই বুঝতে পারছ না―

রুক্মিণী দেবী আপনি কি বলতে চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলুন আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আর তাছাড়া কি বোঝার কথা আপনি আমাকে বলছেন―

―ঠিক আছে বলছি বলছি; কিন্তু তার আগে তুমি এ কথা বল― অনন্ত বাবু তোমায় এখানে ডেকেছিল ছিল নাকি তুমি নিজেই আসবো বলেছিলে।

―পত্রে একবার অনন্ত বাবু বলেছিলেন যে এখানে অনেক কিছু দেখার আছে আর সঙ্গী না থাকলে নাকি সেগুলো দেখার মজাই পাওয়া যায় না। তাই ভাবলাম প্রত্যক্ষভাবে আমাকে না বললেও পরোক্ষভাবে আমাকে বলতে চাইছেন যে আমি যদি এখানে আসি তাহলে সঙ্গী হিসাবে তার হয়তো ভ্রমণ পিপাসা মিটবে। আর তাছাড়া আমার এই জায়গাটা দেখার খুব ইচ্ছা ছিল সেই জন্যই আমি অনন্তবাবুকে আসবো বলেছিলাম।

―ও বুঝেছি। তাহলে তুমি এরপরও কিছু বুঝতে পারছ না,,,

―না, আপনি কোন পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলছেন আমি সেটা বুঝতে পারছি না।

―অনন্ত বাবু তোমাকে খুব ভালোবাসে।আর সেই জন্যই তোমাকে এখানে আসতে বলেছে। একসাথে জায়গাগুলো ভ্রমণ করবে বলেই।

ওহ! তুমি এই অনুভবটা বোঝার কথা বলছো।তা তো চিঠিপত্র পড়ে আমি কিছুটা অনুভব করেছি। কিন্তু মনে মনে অনেকটাই অস্থিরতার আবেগ অনুভূত হচ্ছে।কারণ এখনো সে তো আমায় ভালোবাসার কোনো বার্তালাপ করেনি।

―তুমি অনুভব করেছ সে বার্তালাপ করেনি বলে, তোমায় ভালোবাসে না।কি বোকা তুমি। তুমি একবারও কি ভেবে দেখেছো তুমি এই ধরনের মনের মানুষ কোথায় পাবে। সে এগিয়ে আসেনি তো কি হয়েছে তোমার আগেই বার্তালাপ করে দেওয়া দরকার কেননা এরকম মনের মানুষ সহজে পাওয়া যায় না।

রুক্মিণী দেবীর কথা শুনে প্রমিলা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো রুক্মিণী দেবী কথাটা তো ঠিকই বলেছে।যে ব্যাক্তি টা না চেনা সত্ত্বেও তাকে এতদূর এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সাহায্য করেছে এবং পাশে থেকেছে তার মত মনের মানুষ পাওয়া সত্যিই অসম্ভব যদি সে ভালোবেসে থাকে।

রুক্মিণী দেবী প্রমীলার সাথে গল্প করতে করতেই সকালের খাবারের ব্যবস্থা করছিল।প্রমিলা এতটাই অস্থির হয়ে উঠেছিল যে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো এবং রুক্মিণী দেবীর নিকট গিয়ে বলল

―আপনি কথাটি ঠিকই বলেছেন কিন্তু আমার কি করা দরকার তা আমি ঠিক করতে পারছি না।

―এই সবেমাত্র আমার বাড়িতে পা রেখেছো,কিছুদিন থাকো এখানে; তারপর যেদিন বেড়াতে যাবে ভালো জায়গা ও সুন্দর মনোরম পরিবেশ দেখে অনন্ত বাবুকে বলে দিও যে তাঁকে ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না।

―কিন্তু রুক্মিণী দেবী আমার যতদূর ধারণা ওই কথাটি অনন্ত বাবুর আগে বলা দরকার।আমি কোন সাহসে আগে বলতে পারি বলুন।

―কেন তোমার কি অনন্ত বাবুকে ভালো লাগে না? তুমি ভালোবাসো না??

―ভালোবাসি না মানে,যেদিন প্রথম আমি দেখেছিলাম অনন্ত বাবুকে সেদিনি ওই একমুহূর্তের দেখাতেই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। সেদিন কি শান্তভাবে আমার সাথে কথা বলেছিল।তবে তখন মনে হয়েছিল যদি আরেকটুখন আমার সাথে কথা বলতো আমার পাশে থাকতো তাহলে আরো ভালো লাগতো কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। আমি তখন প্রায় একরকম শোকাচ্ছন্ন ছিলাম।

রুক্মিণী দেবী বললেন, তোমার আর কোনো কথা না ভেবে অনন্ত বাবুকে, 'অনন্ত বাবু ― বলার আগেই বলে দেওয়া দরকার যে তুমি তাকে খুব ভালবাসো।প্রমিলা, আমি যতটুকু জানি কোনো মেয়ে,তার মনের মানুষকে যদি আগে ভালোবাসার কথা বলে তাহলে তাদের সংসারে খুব ভাল সুখ হয় এবং মনোমালিন্য হয় না বললেই চলে তবে একটু আধটু ভালবাসার খুনসুটি হতেই পারে।

কথাটা শেষ হতে না হতেই প্রমিলা, রুক্মিণী দেবীকে জড়িয়ে ধরল এবং এক গভীর অন্তরঙ্গ ভালোবাসার আলিঙ্গন করলো ও বলল

—অনন্তবাবু কলকাতা থেকে এত দূরে এসে এরকম একটা পরিবারে ঠাঁই পাবে তা সত্যিই অকল্পনীয় এরকম মানুষদের ছোঁয়া পেলে জীবনে কখনো কোন দুঃখ পাশে এসে দাঁড়াবে না।

রুক্মিণী দেবী অন্তরে অন্তরে বেশ খুশি অনুভব করলেন। ও বললেন

তাই নাকি—

প্রমিলা দেবী হাঁ বলে— বললেন, আপনার প্রতি আমার একটি অনুরোধ আছে আপনি রাখবেন তো—

খুশির সহিত রুক্মিণী দেবী বললেন— বলো অবশ্যই রাখবো

—অনন্ত বাবু আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন,_আপনারা নাকি আমাদের সাথে বেড়াতে যাবেন না বলছেন—

_হ্যাঁ ভাবছিলাম; কিছুটা তাই—

_তা তো ভাবলে হবে না। আমার অনুরোধ এটাই আপনাদের দুজনকে আমাদের সঙ্গে বেড়াতে যেতে হবে।

রুক্মিণী দেবী বোধ হয় নিজের আর্থিক অবস্থার কথা ভাবছিলেন। তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন

—সবই তো বুঝতে পারছো প্রমিলা। এরকম অবস্থা নিয়ে কি করে যাওয়া যায় বলো?

—কেন অনন্ত বাবু আপনাদের কিছু বলেনি????

—জানিনা ওনার (টুকি বাবু) সঙ্গে কিছু আলোচনা হয়েছে কিনা।

_সে যাই হোক আপনাকে আমার অনুরোধ রাখতেই হবে। আপনাদেরকে আমাদের সাথে যেতেই হবে।

রুক্মিণী দেবী, প্রমীলার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল তারপর এক গাল হেসে বলল—

ঠিক আছে সে পরে ভাবা যাবে। তোমার জিনিসপত্রগুলো অনন্ত বাবুর ঘরে রাখা আছে।

―ওহ। ঠিক আছে ।

—প্রমিলা,অনন্ত বাবুর সঙ্গে গল্প আছে তো এখনই করে নাও। বিকালে আশেপাশেই বেড়াতে যাবো আর সন্ধ্যায় জমিয়ে আড্ডা দেবো।

-ঠিক আছে রুক্মিণী দেবী তাই হবে



Rate this content
Log in

More bengali story from Goutam Nayak

Similar bengali story from Drama