প্রেমের সরস্বতী
প্রেমের সরস্বতী


ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী, নমোহস্ততে।।
নমো ভদ্রকালৌই নমোনিত্যং সরস্বতৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ।। এষ সচন্দন পুষ্প-বিলম্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।। মহাভাসে বিদ্যেকমলোলোচনে। বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোস্তুতে।।
বিশালাক্ষি বিদ্যার দেবি নমোস্তুতে।।….
--- বিছানায় শুয়ে শুয়ে অরূপ শুনছিল পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র, বাড়ির পাশেই পাড়ার কুচোকাচাগুলো পুজোর আয়োজন করেছিল। অরূপ ওদের চেয়ে একটু বড়ো হলেও এই পুজোতে সেও যোগদান করে প্রতিবার; এই বছরটা অন্যরকম যে। অরূপের বাবা ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতেন, লকডাউনে কাজ হারিয়েছিলেন, দুর্গাপূজার সময় প্রাণটাও হারান। অনলাইনে স্কুল করার মতন সামর্থ্য তার নেই, তাই আপাতত একরকম স্কুলজীবন শেষের মুখে। স্কুল খুললেই যে সে খুব একটা যেতে পারবে তাও নয়, মা পাশের চারটে বাড়িতে কাজ করে যেটুকু রোজগার করে তাই দিয়ে ঘরে চারজনের পেট চলে। অরূপের এক ভাই, এক বোনও আছে। তারা অনেকটাই ছোট, তাই এখনও জীবনে কি হারিয়েছে বা জীবন কোনপথে এগোবে এতো ভারী প্রশ্নের ভার তারা উপলব্ধি করতে পারে না।
মি. ও মিসেস বোস ঠিক করেছেন আজ তারা আবার আগের মতন বাঙালির প্রেমদিবস উদযাপন করতে বেরোবেন। একজনের বাহাত্তর, আরেকজনের পয়ষষ্টি; তবে সাজানো জীবন বলতে আমরা যেমন বুঝি অনেকটা তেমনই। এক ছেলে, সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক; আর মেয়ে পেশাগতভাবে শিক্ষিকা। দুই সন্তানেরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, এখন নাতি-নাতনি নিয়ে বুড়োবুড়ির দিন কাটে রূপকথার মতন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, মি. ও মিসেস বোস দুজনেই ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী কর্মী আপাতত; চাকরি সূত্রেই প্রেম, তারপর বিয়ে এবং জীবনের এই পথে একসাথে হাতধরে এগোনো। আজ এতোগুলো বসন্ত পঞ্চমী পেরিয়ে আসার পর দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফিরে যাবেন নিজেদের পুরানো দিনগুলোতে, ফিরে যাবেন যৌবনের সেই প্রেমময় মুহূর্তগুলোতে। কথা যেমন, কাজও
তেমন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পাঞ্জাবী আর শাড়ী পরে দুজনেই প্রস্তুত শহরের সরস্বতী পুজো পরিক্রমার জন্যে।
ঘড়িতে তখন প্রায় একটা, বেলা অনেকটাই হয়ে এলো। এবার লাঞ্চটা সারতে যাবেন শহরের এক নামী রেস্টুরেন্টে; সেখানে যাওয়ার আগে চোখে পড়ল একটি বস্তি এলাকার ভেতরের ছোট্ট পুজোর আসর। মায়েদের শাড়ি দিয়ে তৈরী, কাঁচাহাতের থার্মোকলের কাজ দিয়ে সাজানো সেই পুজোমন্ডপ। দুজনেই এগিয়ে গেলেন, অনেকদিন তো আর এসব দেখা হয় না। এখন জাঁকজমকের মাঝে এইরকম বাচ্চাদের পুজোগুলো বরাবরই তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছে। সে যাইহোক্ এই প্রেমিকযুগলের কাছে এসব গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাচ্চাদের হাসি-আনন্দের চেয়ে বেশী তৃপ্তিদায়ক কিছুই হয় না। বাচ্চাদের সঙ্গে কিছুসময় কাটিয়ে, তাদের চকোলেট লজেন্স কিনে দিয়ে যেই দুজনে ফিরে আসছিলেন অমনি চোখ পড়ল অরূপের মায়ের উপর, অরূপের মা মি. ও মিসেস বোসের মেয়ের ঘরে নিত্যদিনের কাজ করতে যান, তাই সেইসূত্রে মুখচেনা ছিলই। তাই এখানে দেখতে পেয়ে দুজনেই দাঁড়ালেন, কথা প্রসঙ্গে সমস্ত কিছু জানলেন, অরূপের সাথেও কথা বললেন। মি. বোস বুঝতে পারলেন এই ছেলেও একদিন তার সন্তানের মতনই ভালো চিকিৎসক হয়ে উঠতে পারে যদি তার পাশে দাঁড়ানো হয়, যদি তাকে একটু পথ দেখানো হয়। যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। সেখানে দাঁড়িয়েই বোস দম্পতি অরূপের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন এবং কথা দিলেন তাকে একজন ভালো মানুষের মতন মানুষ করেই ছাড়বেন। পাশাপাশি হোটেলে খেতে যাওয়ার জন্য যে টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন সবটাই তুলে দিলেন অরূপের মায়ের হাতে। মিসেস বোস চোখের ইশারায় স্বামীকে বোঝালেন যে এরচেয়ে ভালো প্রেমের উপহার আর কখনো পাননি তিনি। হোটেল তো থাকলই, অন্যদিন যাওয়া যাবে। তবে এই দুপুরে কিছু তো খেতে হবে, কি করা যায় এখন। এসব ভাবতে ভাবতেই পাড়ার সকলে মিলে তোড়জোড় করে তাড়াতাড়ি খিচুড়ি বসিয়ে দিলেন, বেশ ঐ দিয়েই সারা হল বাঙালির ভালোবাসার উদযাপন। একদিকে যেমন অরূপের জীবনে নতুন করে পড়াশোনার ছোঁয়া লাগল, ঠিক তেমনই বৃদ্ধ দম্পতি জীবনে পেল হারানো প্রেমের পরশ।