Saptak Bhatta

Abstract


3  

Saptak Bhatta

Abstract


নিশাবসান

নিশাবসান

5 mins 292 5 mins 292

               ।। বর্তমান ।।

বেলা দ্বিপ্রহর। সন্ন্যাসী উপগুপ্ত স্নান সেরে চরু গ্রহণ করে ধ্যানে বসলেন। তিনি শাক্যমুনির শিষ্য। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। জপের মাঝামাঝি তিনি যখন, তাঁর চেতনা যখন লীন হয়ে গেছে সেই পরমাত্মায়, তাঁর মানসচক্ষে ভেসে উঠল এক নারীর মুখ, অপরুপা সে নারী। কিন্তু আশ্চর্য, তাঁর চোখেমুখে কিন্তু এক উজ্জ্বল প্রভা, তিনি সব জানেন, তিনি যে অন্তর্যামী। "এতদিনে তবে সময় হল", ধ্যানভঙ্গ করে স্বগতোক্তি করলেন শ্রমণ।

চলেছেন শ্রমণ। হাতে ভিক্ষাপাত্র, মুখে প্রশান্ত হাসি, আসক্তিশূন্য এক ব্যক্তি। অনেক দূরের পথ তাঁকে যেতে হবে। বিংশতিবর্ষ পূর্বে যে কথা তিনি দিয়েছিলেন একজনকে, তা রাখার জন্যই তাঁর এই যাত্রা। এই পর্যন্ত পড়ে পাঠক হয়ত অনেক কথা ভাবছেন, তা ভাবুন, নিজের চেতনাকে রুদ্ধ করবেন না, 'ওম মনিপদ্মে হুম'।

তা চলেছেন উপগুপ্ত। দ্বারে দ্বারে গিয়ে বলেন 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি', লোকে দুহাত ভরে ভিক্ষা দেয়। তাঁর চেহারা দেখে মুগ্ধ হয় নিশ্চয়ই। আর হবে নাই বা কেন, গৌরবর্ণ, দীঘল নাসা, জোড়া ভ্রু, অর্ধনিমিলিত চক্ষু, দীর্ঘদেহী, ঋজু গড়ন। মস্তক মুন্ডিত, পরিধানে চীর বা কাষায় বস্ত্র, মুখে এক তদগত ভাব। দেখেই শ্রদ্ধার উদয় হয়।

তাঁর যাত্রাপথ সুদীর্ঘ। তিনি যাবেন মথুরা নগরীতে, একজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে। সবই অমিতাভের ইচ্ছা। দিন যায়, উপগুপ্ত চলেন। পদব্রজে অবশ্যই, রাত্রি কাটান পথিপার্শ্বে কোনো বৃক্ষতলে। একবেলা আহার করেন, ভিক্ষান্ন দ্বারা স্বহস্তে প্রস্তুত চরু। আর স্মরণ করেন ভগবান বুদ্ধকে। বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। অবশেষে পৌঁছলেন তিনি। সায়াহ্নে প্রবেশ করলেন নগরে। আপাতত শ্রমণকে নগরের প্রবেশদ্বারে রেখে চলুন আমরা যাই বিংশতিবর্ষ পূর্বে। সেই নারীর সাথে উপগুপ্তের প্রথম সাক্ষাতের লগ্নে।


।। অতীত ।।

বিংশতিবর্ষ পূর্বের কথা। সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উপগুপ্ত সদ্য প্রবজ্যা নিয়েছেন তখন। সম্রাট অশোকের গুরু ছিলেন তিনি। মহামতি, জ্ঞানী উপগুপ্ত সেই যৌবনের স্বাভাবিক নিয়মে ছিলেন আকর্ষণীয়। আকর্ষণীয় তিনি বর্তমানেও, তবে তাঁর চেহারা এখন মনে ভক্তিরই উদ্রেক করে, তখন তোলপাড় তুলে দিতে পারত রমণীর মনে। কি অদ্ভুত যোগাযোগ! সবই বুদ্ধের ইচ্ছা।

দীর্ঘ পরিক্রমা সেরে তখন মথুরায় অবস্থান করছিলেন শ্রমণ। শ্রাবণ মাস, আকাশের তারাগুলি মেঘাবৃত, ঘনঘন বিদ্যুৎকিরণ ঝলসে দিচ্ছে দৃষ্টি। মথুরার পুরবাসীগণ দুয়ার রুদ্ধ করে নিদ্রা গিয়েছেন। এমন সময় কার মধুর নুপুরনিক্কন তাঁর কর্ণে প্রবেশ করল? যেন সন্তর্পনে, ধীর গতিতে কেউ যায়। কে সে? চমকে উঠে তন্দ্রা থেকে জাগলেন উপগুপ্ত। এই ছন্দময় চলার ভঙ্গি তাঁর 'মরমে পশিয়া আকুল করিল' তাঁর প্রাণ, আর কি ভুলতে পারবেন তিনি? পারেননি। ভুলতে চাইলেই কি ভোলা যায়? যায় না! নাহলে সুদীর্ঘ কুড়িটি বছর পর আবার ফিরে আসবেন কেন তিনি! ললাটের লিখন কি কেউ খণ্ডাতে পারে?


।। বাসবদত্তার কথা ।।

আমি বাসবদত্তা। মথুরার নগরনটী। নৃত্যগীতে পটীয়সী। ছলাকলাও জানি। পুরুষকে বশীভূত করার সকল মন্ত্র আমার করায়ত্ত। কত শক্তিমান পুরুষ, কত রাজা-মহারাজা আমাকে একটিবার ছোঁবার জন্য ব্যাকুল, তা কি জানে ওই শ্রমণ? আমার প্রেম পেয়েও প্রত্যাখ্যান করল সে! বলে সময় আসেনি! আমাকে ফিরিয়ে দিল, আমাকে!

অথচ এই প্রথমবার বোধহয় আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে চেয়েছিলাম তাকে। অন্যান্য দিনের মত আমি চলেছি অভিসারে। হাঃ হাঃ, অভিসার! অভিসারই বটে। অর্থের বিনিময়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। আমি যে ভোগ্যপণ্য পুরুষের কাছে, আমার হৃদয়ের কোনো দাম নেই। মগধের যুবরাজ আমায় বায়না করেছিলেন সেদিন, তাঁর শয্যাসঙ্গিনী হবার জন্য। বহুমূল্য উপহার ও নগদ অর্থ পৌঁছে গিয়েছিল আমার গৃহে, আমার দেহের মূল্য হিসাবে! খুশি ছিলাম আমি। যুবরাজের অনুগ্রহ, সেতো কম কথা নয়। কি একটা কাজে যুবরাজ এসেছেন মথুরায়। এই মাসটি আছেন। এর মধ্যে তাঁকে খুশি করতে পারলে বিপুল প্রাপ্তিযোগ। এ সুযোগ ছাড়া যায় না, ছাড়া উচিত নয়! যখন বেচে দিতেই বাধ্য হয়েছি নিজেকে, তখন আর দ্বিধা কেন?

প্রস্তুত হলাম। নিজেকে করে তুললাম আকর্ষনীয়া। যুবরাজের পাঠানো দামি আভূষণ আর রত্নালঙ্কারে আমায় দেখতে লাগছিল অভূতপূর্ব। নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হয়ে আমি তাকিয়ে ছিলাম দর্পণের দিকে, দীর্ঘক্ষণ। তারপর হাতে নিলাম প্রদীপ, বেরোলাম অভিসারে। নগরপ্রান্তে এসে কারোর গায়ে আমার চরণ স্পর্শ করল। তখনই দেখলাম তাঁকে।

আমার হস্তধৃত প্রদীপের আলোয় তিনি তাঁর পদ্মপলাশনয়ন মেলে তাকালেন। হ্যাঁ পুরুষ বটে! আমার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। দেবতার মত রূপ তাঁর। কিন্তু একি! তিনি যে ভুমিশয্যায় শায়িত! এ তাঁর সাজে না!

আমি এক নর্তকী। নৃত্যের মত বাকচাতুর্যেও পটু। অথচ আমার কন্ঠ যেন রুদ্ধ আজ। আজ আমি লজ্জিতা। কোনোমতে নিজেকে সংযত করে মৃদুকণ্ঠে শুধালেম তাঁকে আমার গৃহে যেতে। তাঁর সৌম্য সুন্দর মুখে মধুর হাসি। নয়ন থেকে ঝরে পড়ছে করুণা। কিন্তু তা কি কেবল আমি গণিকা বলে! আমায় প্রত্যাখ্যান করে তিনি বললেন, এখনও তাঁর সময় হয়নি। বললেন তুমি যাও যেথা যেতেছ, সময় যেদিন আসবে তিনি স্বয়ং আসবেন আমার গৃহে, আমার কুঞ্জে, আমার বাগিচায়। সেই থেকে অপেক্ষায় আছি।


।। উপগুপ্তের কথা ।।

আমি শ্রমণ উপগুপ্ত। আমার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি উত্তরে হিমাচল থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। লোকে আমায় শ্রদ্ধা করে তথাগতের একনিষ্ঠ সেবক হিসাবে। কিন্তু আমারও তো হৃদয় আছে! সেই হৃদয়ে তোলপাড় তুলে দিয়েছিল সেই নারী, বাসবদত্তা।

তখন আমি বিংশতিবর্শীয় যুবক। ছিলাম রাজবংশের সন্তান। জাগতিক সুখ ও কাঙ্খিত বস্তুসামগ্রীর কোনো অভাব ছিল না। অথচ মনের মধ্যে ছিল শুন্যতা। এই শুন্যতা থেকেই মারের উৎপত্তি, মার, যা তথাগতের বোধিজ্ঞান লাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। না তিনিও ছিলেন না, ছিলেন না সম্পূর্ণ জিতেন্দ্রিয়। না হলে স্ত্রী যশোধরা দেবীকে মঠে রাখতে অস্বীকার করেছিলেন কেন তিনি!

না না উপগুপ্ত, এসব কি অবিমৃষ্যকারিতা! তুমি না এক বৌদ্ধ শ্রমণ। তোমার কি এসব চিন্তা করা সাজে! সাজে না! সিংহাসন নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে বিদ্বেষে বিতৃষ্ণ হয়ে সেই যে তুমি ছোট ভাইকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছিলে, তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। এখন তুমি এক প্রৌঢ়। মনে পড়ে মথুরা নগরীতে সেই বর্ষার রাত্রি! দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত তোমার ঘুম ভেঙে যায় নুপুরনিক্কনে। হাতের প্রদীপের আলোয় তার সে মুখখানি! তার মদমত্ত যৌবন কি তোমায় হাতছানি দেয়নি? অস্বীকার করতে পারো? তুমি চাইলেই সে তোমার বাহুপাশে ধরা দিতে পারত। সে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তথাগতের নির্দেশ! ধ্যানে তুমি যে তথাগতের স্পষ্ট নির্দেশ পেয়েছ! এখন নয় উপগুপ্ত, এখন নয়। বিংশতিবর্ষ পরে আসবে সময়, এখন নয়। হা তথাগত! বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।


।। মথুরায় দ্বিতীয় রজনী।।

চলুন পাঠক। কাহিনীতে যবনিকা টানার সময় উপস্থিত। আপনার স্মরণে থাকতে পারে, সন্ন্যাসীকে আমরা ছেড়ে এসেছি নগরীর প্রবেশদ্বারে। বিংশতিবর্ষ পরে ফিরে এসেছেন তিনি। তাঁর প্রাণের মথুরা নগরীতে। এখানেই যে রয়েছে তাঁর প্রাণভোমরা! বসন্তের সমাগম হয়েছে, চৈত্রমাস। দখিনা হাওয়ায় মাতাল করা ফুলের সৌরভ ভেসে আসছে। নগরে প্রবেশ করলেন শ্রমণ। রাজার কানন থেকে সুন্দর ফুলের সুবাস এসে মনকে জুড়িয়ে দিচ্ছে, আকাশে পূর্ণচন্দ্র নীরব সাক্ষী। আজ যে অভিসাররাত্রি।

চলেছেন শ্রমণ। একে একে নগরের পল্লীগুলি পার হয়ে চলেছেন। সব নিস্তব্ধ। পুরবাসীগণ নিদ্রা গিয়েছেন রুদ্ধদ্বার গৃহে। কোকিল এর কলকাকলি মুখরিত করছে বাতাস। উপগুপ্ত চলেছেন।

নগর ছাড়িয়ে প্রাচীরের কাছে এসে দাঁড়ালেন তিনি। চোখ বন্ধ করে কি ভাবলেন। তারপর পরিখা পার হয়ে আম্রবনের ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন। কে এক রমণী শায়িত তাঁর চরণপ্রান্তে?

তার সর্বাঙ্গ গুটিবসন্তের গুটিকায় ঢাকা। রোগে শীর্ণ ও কৃশ হয়ে গেছে সে। সংক্রমণের ভয়ে পুরবাসী তাকে নগরের বাইরে ফেলে গেছে!

শ্রমণ পদ্মাসনে বসে পরম যত্নে তার ভার মাথা তুলে নিলেন নিজের জানুর উপরে। তার শুষ্ক জিহ্বায় পানীয় জল দিলেন, তার দেহে দিলেন শ্বেতচন্দনের প্রলেপ।

দখিনা বাতাস বইছে, কোকিলের কুজন, জোৎস্নাময় রাত্রি, কি স্বর্গীয় পরিবেশ! রমণীর মাথা ক্রোড়ে নিয়ে বসে আছেন সন্ন্যাসী। সেই রমণী শুধালেন, "কে তুমি করুণাময়!" উত্তরে উপগুপ্ত বললেন,"এতদিনে সময় হল, আমি এসেছি বাসবদত্তা! আমি এসেছি!"


কাহিনীসূত্র: 'অভিসার' কবিতা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, 'কথা ও কাহিনী' কাব্যগ্রন্থ।

পাদটিকা: শ্রমণ- বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, চরু- যজ্ঞের আগুনে প্রস্তুত পরমান্ন বা পায়স, অমিতাভ, তথাগত- বুদ্ধদেবের নাম এগুলি, প্রবজ্যা: গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসগ্রহণ, পরিখা-নগরের চতুর্দিকে সুরক্ষার জন্য কাটা খাল।


।। ওম মনিপদ্মে হুম ।।



Rate this content
Log in