Debdutta Banerjee

Drama


3  

Debdutta Banerjee

Drama


মন নিয়ে

মন নিয়ে

11 mins 1.4K 11 mins 1.4K

'ভেবেছে টা কি ও !! আমি কি ওর কেনা বাঁদি নাকি! আর সহ্য করবো না। কেন করব ? অফিস টা কি ওর একার? আর .... আর ... রাজন সারের কথা মত আমরা দু জনেই একসাথে কাজ করছি, না হলে ..!! না: আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব। কি দোষ করেছি শুনি ? ' নিজের কাচের পার্টিশন দেওয়া ছোট্ট কামরাটায় বসে মিসুমা ফুঁসতে থাকে। দু গাল বেয়ে নেমে এসেছে অবাধ্য বারিধারা। ওয়াটার প্রুফ লাইনার না গললেও গালের মেকআপ গলে পড়ছে। একটা টিসু দিয়ে চোখ মুছে দু হাতে মাথা টিপে ধরে মিসুমা। একবার ভাবে এখনি রিজাইন দিয়ে বেরিয়ে যাবে। পরক্ষণেই মনে হয় কেন সে রিজাইন দেবে ? কি দোষ ছিল তার ? ফুল ভালো লাগে না এমন মানুষ হয় নাকি ? তাও রাঙা পলাশ ফুল !! ব‍্যাঙ্গালোরে বসন্ত আসে একটু তাড়াতাড়ি, ডিসেম্বরের শেষ থেকেই পথ ঘাট আগুন রাঙা পলাশে সেজে উঠতে শুরু করেছিল। রাস্তার দু ধারে এত পলাশ গাছ , পাতাই দেখা যায় না, আর গাছের নিচে নরম কার্পেটের মত ফুলের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি। ওদের অফিসের নিচের পলাশ গাছটাও রঙে রঙে সেজে উঠেছে বসন্তের আগমনে। 


আজ বসন্ত পঞ্চমী বলে মিসুমা বেশ কিছু টাটকা পলাশ তুলে এনেছিল গাছের নিচ থেকে। কলকাতায় রাস্তার ধারের পলাশ গাছ গুলোর কুড়ি থেকে ঐ কালচে ভেলভেটের মত আচ্ছাদন সব চেঁছেপুঁছে তুলে নেয় ফুল বিক্রেতারা। একটা পলাশের কি দাম ! আর এখানে কত টাটকা ফুল। সেই ফুল দিয়ে আজ অফিস সাজিয়েছিল মিসুমা নিজেই। ওর টেবিলে কাঁচের প্লেটে এক গোছা টাটকা পলাশ এখনো শোভা পাচ্ছে। এমনি একটা প্লেট রিসিপশনে আরেকটা তাং শুর টেবিলে রেখেছিল দোষের মধ‍্যে। আধঘন্টা আগে সেই ফুল নিয়ে যা হল ... ঝনঝন করে কাচ ভাঙার শব্দে পাশের ঘরে ছুটে গেছিল মিসুমা, ঘরে ঢুকতে গিয়েই দেখে মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে সাধের পলাশ, আর কাচের টুকরো। পিওন হরি আর রিশিপশনের মৈনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। তাংশু চিৎকার করে ইংরেজি তে বলছে -'' কে রেখেছে এসব আমার ঘরে ? কার পারমিশনে ? ''

তাংশু যে রগচটা, উদ্ধত, একটু পিক‍্যুলিয়ার টাইপ মিসুমা আজ তিনমাস ধরে দেখছে। অফিস থেকে দু জনকে মুখোমুখি ফ্ল্যাট দিয়েছে পাশেই। চারমাসে চারদিন বোধহয় তাং শুর সাথে অফিসের বাইরে কথা হয়েছে। কাজের বাইরে ছেলেটা কিছুই জানে না। তবুও আস্তে আস্তে মিসুমা মানিয়ে নিচ্ছিল। কারণ রাজন সারের কথা মত ওরা একসাথে কাজ করছিল। আর কাজটা তাংশু খুব ভালো করে। কিন্তু একটা সামান্য ফুল নিয়ে এত অপমান !!

ফুলটা মিসুমা রেখেছে জেনেও একটা সরি বলল না!! এতটা অভদ্র একটা ছেলে ? অথচ মেধা সবসময় এই তাং শুর প্রশংসা করত। তার দাদা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো দাদা। তার দাদার মত ভদ্র সভ্য সুন্দর ছেলে হয় না !! উফ। 


মিসুমা বরাবর খুব আদুরে, মা বাবার চোখের মনি। চাকরী করতে একা ব‍্যাঙ্গালোরে এসে আজ হাত পুড়িয়ে রেঁধে খেতে হচ্ছে, কারণ এদেশের রান্না মুখে রোচে না। এই কোম্পানির চাকরীটা ছিল ওর মনের মত। ও ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার। মনের মত করে ঘর, অফিস, হোটেল সাজাতে ভালোবাসে। জয়েনিং এর পর তাংশুকে দেখে একটু চমকে উঠেছিল। কলেজ লাইফে মেধার ফোনে ওর দাদার ছবি অনেকবার দেখেছিল, গল্পও শুনেছিল। সেই সূত্রে আলাপ করতে গিয়ে প্রথম দিন একটা বড় ধাক্কা খেয়েছিল তাং শুর থেকে। নিজেকে মেধার বান্ধবী বলায় তাংশু গম্ভীর গলায় বলেছিল -''মিস সেন, এখানে আমাদের একটাই পরিচয়, আমরা এই কোম্পানির কর্মচারী। একসাথে কোম্পানির স্বার্থে কাজ করতে বাধ্য। ''

সত্যি কাজের বাইরে তেমন কথা হত না দু জনের। তবে তাংশুর কাজ ছিল সত‍্যিই সুন্দর। ওর যা এক্সপিরিয়েন্স ছিল ও নিজেই একটা কোম্পানি খুলতে পারত। কিন্তু ও এখানে কাজ করেই খুশি। 

এক বিল্ডিংয়ে মুখোমুখি থাকার সুবাদে দেখা হলেও তাংশু মুখ ঘুরিয়েই চলত সব সময়। নিজে গাড়ি নিয়ে এলেও মিসুমাকে কখনো অফার করেনি একসাথে যাতায়াত করার। একদিন বৃষ্টিতে অফিস থেকে বের হতে মিসুমার বেশ রাত হয়েছিল, অটোও চলছিল না, ক্যাব পাচ্ছিল না ও। অফিসের নিচের লবিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক ক্যাব আ্যপ ট্রাই করছিল মিসুমা। ঠিক তখনি গটগট করে ওর সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেছিল তাংশু, একটু পরেই জল কেটে ওর কালো গাড়িটাকে চলে যেতে দেখে খুব রাগ হয়েছিল মিসুমার। অবশ্য রাজন সার নিজে সেদিন ওকে ড্রপ করেছিল বাড়িতে। সেদিনই রাজন সার বলেছিল তাংশু ওনার কলেজ ফ্রেন্ড। ও নাকি আগে এমন ছিল না। একটা ঘটনার পর ও বদলে গেছিল। এর বেশি কথা হয়নি আর। 

মেধাকে মিসুমা জানিয়েছিল সে আর তাংশু একই অফিসে রয়েছে ব‍্যাঙ্গালোরে। মেধা শুনেও তেমন উচ্ছ্বাস দেখায়নি। একটু যেন এড়িয়েই গেছিল ।

হঠাৎ টেবিলে রাখা ফোনটায় হোয়াটস আ্যপে মেসেজ ঢুকতেই টেনে নিলো মিসুমা, তাংশুর তিনটে মেসেজ!! তবে কি ও নিজের ভুল বুঝেছে ? নিশ্চই সরি লিখেছে? চোখে মুছে ফোনটা খোলে মিসুমা। 

দুটো প্রোজেক্টের ফটো পাঠিয়ে তাংশু লিখেছে নতুন কাজটা আজ রেডি চাই। 

রাগে ফোনটা ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছিল ওর। কাচের পার্টিশন ভেঙ্গে এখনি তাংশুর ঘরে ঢুকে ওকে বলতে ইচ্ছা করছে 'কি ভেবেছে ও ? '


*****


কাচের জানালাটা দিয়ে ব্যস্ত শহরের একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সামনের পলাশগাছটায় আগুন লেগেছে বেশ কিছুদিন। জানালার পর্দাটা টাঙিয়ে নিজের টেবিলে এসে বসে তাংশু। গাছটা ওর দু চোখের বিষ, পারলে কাটিয়ে ফেলে এক্ষুনি। ফুল দেখলেই রাগ হয় আজকাল। 

কিন্তু আজ বোধহয় একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। মিসুমা ঐ ফুল গুলো রেখেছিল বোঝেনি ও। হরিকে দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেই হত। অন্তত সিন ক্রিয়েট হত না। আসলে টেবিলের উপর কাচের প্লেটে টাটকা আগুন রাঙা ফুল গুলো দেখে মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। 


কিন্তু মিসুমাকে সরি তো আর বলা যায় না। বরঞ্চ ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে কাজ নিয়ে আলোচনা করাই ভাল। আসলে মেয়েটাকে প্রথম থেকেই এড়িয়ে চলে তাংশু। মেয়েদের আর বিশ্বাস করে না ও। এই মেয়েটা আবার বোনের বান্ধবী। একেক সময় মনে হয় কাজটা ছেড়ে হিমালয়ে চলে যাবে। কি হবে আর টাকা রোজগার করে ? টাকা দিয়ে দামি গাড়ি বাড়ি পোশাক কেনা যায়, সুখ শান্তি কেনা যায় না। একেক সময় এই জীবনটা বড্ড একঘেয়ে মনে হয় । পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে সব ছেড়ে। কিন্তু মায়ের করুন মুখটা মনে পড়লে আর জোর পায় না তাংশু। অনেক কষ্টে তাদের দুই ভাই বোনকে মানুষ করেছে মা। আর দুঃখ দিতে ইচ্ছা করে না মা কে। 


******

 আয়নার সামনে মুখে নাইট ক্রিম মাখতে মাখতে মিসুমা নিজেকে দেখছিল, মেকআপ ছাড়াও সে অসামান্য সুন্দরী। কলেজে রাস্তা ঘাটে এমনকি প্রফেসারদের দৃষ্টিতেও সে দেখেছে এর স্বীকৃতি। যে কোন পুরুষ তার রূপের ছটায় টালটামাল, কিন্তু এই একজন যে ফিরেও তাকায় না কখনো, মুখ তুলে চেয়েও দেখলও না কোনোদিন মিসুমার দিকে। পেশায় ইন্টেরিয়ার ডিজাইনার তাংশু সৌন্দর্যের মূল্যায়ন ভালোই করতে জানে। এতো যার সৌন্দর্য জ্ঞান নিজের পাশে ফিরে কখনো দেখে না কেন কে জানে!! এত গম্ভীর আর কাজ পাগল লোকের সাথে কাজ করে সুখ নেই। কাজের বাইরে একটা শব্দও সে খরচ করতে চায় না। অথচ মিসুমা অপেক্ষা করে কখন ওর মুখ থেকে একটা ভালো কথা শুনবে। ছফুটের ছিপছিপে তরুণ তাংশুর চোখ মুখ যেন কোনো শিল্পির হাতের ছোঁয়ায় তৈরি। যে কোনো মেয়ে প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু এমন রসকষ হীন কঠিন মানুষ ...


হঠাৎ বেজে ওঠা ফোনটা মিসুমার চিন্তা জাল ছিন্ন করে, মেধার ফোন। মাকে দাদার কাছে রাখতে আসছে আজ রাতেই। কলকাতা থেকেই ফোন করেছিল। পরদিন সকালে দু বছর পর দেখা হবে দুই বান্ধবীর, সেই উচ্ছ্বাস ওর গলায়। 


******


-''ভাগ্যিস তুমি ছিলে মা, না হলে সাত সকালে চা টাও পেতাম না। '' চায়ের কাপটা নামিয়ে অনিতা দেবী বলে ওঠেন।

-''দাদা যে চা খায় না জানতাম, তবে আমাদের জন্য ঘরে কিনে রাখবে না ভাবি নি। তুই উল্টোদিকে ছিলি বলে রক্ষে, নয়তো বাসি মুখে দোকান খোলা অবধি বসে থাকতে হত আমাদের। '' চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলে মেধা। 


সকালে ওদের ডোর বেলেই আজ ঘুম ভেঙেছে মিসুমার। আজ অফিস ছুটি, উইক এন্ড। টুকটাক গল্পে ভালোই কাটছিল সকালটা। মেধার মা ওকে নিমন্ত্রণ করেছে দুপুরে একসাথে খাওয়ার। এই ভরা বসন্তে উনি কলকাতার ইলিশ এনেছেন ছেলের জন্য। আর হাঁসের ডিম। দুটোই মিসুমার বড্ড প্রিয়। 


তবে দুপুরে খেতে বসেই আরেক বিপত্তি। তাংশু নাকি এই দুটো পদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। মা আর বোনের শত অনুরোধে এক চামচ মাছ ভাজার তেল ও পাতে নিলো না। ডিমের একটু ঝোল ও খেলো না। ডাল আলু ভাজা আর চাটনি দিয়ে খেয়ে উঠে গেল। আরেকজন অতিথির দিকে ফিরেও তাকালও না। এই পরিস্থিতিতে কি আর খাওয়া যায়।মিসুমা কোন রকমে খেয়ে উঠল। মেধা আর কাকিমার গম্ভীর মুখ পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তুলেছিল। কাজ আছে বলে প্রায় পালিয়ে এসেছিল ও। 


বিকেলে হঠাৎ মেধা এসে উপস্থিত। এবেলার চা টা ঐ বানিয়ে এনেছিল। বারান্দায় বসে নিচের পার্কটায় দিকে তাকিয়েছিল মিসুমা, চায়ের কাপে চিনি দিয়ে টুংটাং শব্দে তা নাড়তে নাড়তে মেধা বলল -''সরি রে ... দুপুরের জন্য। ''

-''ফর হোয়াট.... কি হয়েছে ?''

-''দাদার হয়ে আমি সরি বলছি। জানিস ও এমন ছিল না। ''

চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে মিসুমার। ওদের ফ্ল্যাটটা শহরের একটু বাইরে, বেশ ফাঁকা জায়গায়, সামনেই একটা টিলার উপর কয়েকটা বড় বিল্ডিং, রাস্তা ঘাট খুস সুন্দর সাজানো। মরশুমি ফুলের বন্যা চারদিকে। ফাঁকা রাস্তায় দু একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। নিচের পার্কে বাচ্চারা খেলছে। সূর্যটা ঐ টিলার পিছনে ঝুপ করে ডুবে যেতেই রাস্তার আলো গুলো জ্বলে উঠল। দু হাতে চায়ের কাপটা ধরে সে দিকে তাকিয়ে মেধা বলল -''দাদাও ভালোবাসতো, একটা মেয়েকে, ফুল। ওর নাম ছিল। কোটায় একসাথে পড়ত ওরা। তারপর দিল্লিতে একটা নিজেদের অফিস খুলেছিল। ফুল খুব মিষ্টি মেয়ে ছিল, দিল্লির মেয়ে। দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি পড়াশোনায় ভালো। ওদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল রে। হঠাৎ একটা রোড এক্সিডেন্ট... সব শেষ। দাদার জন্মদিন ছিল, ফুলের বোকে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল মেয়েটা। একটা বাসের নিচে .... দাদা নিজের চোখে দেখেছিল সবটা, পাগলের মত দৌড়ে গেছিল। কিন্তু স্পট...।'' গলা ভেঙে আসে মিসুমার। বলে -''একটা বছর দাদা ঘরে দরজা জালনা বন্ধ করে থাকত, ফুল সহ্য হয় না দাদার। কেমন হয়ে গেছিল ও। ডাক্তার বলেছিল ওকে কাজের মধ্যে রাখতে। রাজনদা ওর বন্ধু, সে টেনে এখানে নিয়ে এসেছে। যদি কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকে তাই। একবছর ধরে রাজনদা খুব চেষ্টা করছে। ফুল যা যা খেতে ভালোবাসতো সব ছেড়ে দিয়েছে দাদা। ও যে সব রঙ ভালোবাসতো, ওর দেওয়া জামা সেন্ট আর ব্যবহার করে না দাদা। ''

অন্ধকারে বহুক্ষণ চুপ করে বসে ছিল দু জন। রাস্তার আলোয় এক আবছা আলো আধার ছবি, মিসুমা টের পায় তার গাল দুটোও ভিজে উঠেছে। একসময় মেধা বলে -''জানি না দাদা আর স্বাভাবিক হবে কি না, মা কে রেখে যাচ্ছি কিছু দিনের জন্য। একটু দেখিস। ''


******


না, অনেক চেষ্টা করেছে মিসুমা, কিন্তু এই লোকটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। কাজের বাইরে জীবনের সব শখ আহ্লাদ বর্জন করেছে তাংশু, না কোনো অফিস পার্টিতে যায় , না কোথাও ঘুরতে যায়, তিনমাস ধরে কাকিমা থেকেও ওকে স্বাভাবিক করতে পারেনি। একাকীত্ব আর বিষণ্ণতাকেই আপন করে নিয়েছে তাংশু। কাকিমাকেও ফিরতে হবে, মেধা একা রয়েছে তিনমাস। 

 একটা নতুন রিসর্টের কাজ করছিল মিসুমা। ব‍্যাঙালোরের একটু দূরে এক পাহাড়ের মাথায় রিসর্টটা। সাজানো প্রায় শেষ। আজ সব কাজ দেখে পার্টিকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। তাংশুর গাড়িতে এই প্রথম মিসুমা কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু বড্ড বোরিং জার্নি। কথাই বলে না লোকটা। 

অনেকক্ষণ উশখুশ করে মিসুমা বলে -''গান নেই আপনার গাড়িতে ?''

-''গান শুনি না। ''

অগত্যা, আবার বাইরে তাকায় মেয়েটা। ছোট ছোট ঘাটি পার করে গাড়ি উপরে উঠছে, বর্ষা আসছে, পাহাড়ের উপর মেঘের আনাগোনা, পাহাড় বেয়ে নিত্য নতুন ঝরনা জন্ম নেয় এ সময়। একটা কালো মেঘ আস্তে আস্তে আয়তনে বাড়ছে ঈশান কোনে। বাইরে ছায়া ছায়া মেঘলা দিন। এমন দিনে মন খারাপরা ছুটি নেয়। মিসুমার ইচ্ছা করে গলা ছেড়ে গান গাইতে, কিন্তু..। 

 

রিসর্টটায় গিয়েই মন ভালো হয়ে যায় মিসুমার। খুব সুন্দর সাজিয়েছে তাদের লোকেরা, ঢুকতেই একটা কৃত্রিম ঝরনা, ছোট্ট ব্রিজ পার করে রিশিপসন। দেওয়ালে সুন্দর পোড়া মাটির কাজ, সব মিসুমার প্ল্যান। সবুজ লন পেরিয়ে কুঁড়ে ঘরের আদলে সব কটেজ। ভেতরে আধুনিক ব্যবস্থা, পাশে ফুলের বাগান। কিন্তু তাংশু একটুও প্রশংসা করল না। এর পর চিরসবুজ বন, সেখানে রয়েছে কিছু গাছ বাড়ি, এদিকটা অবশ্য তাং শুর সাজানো। কাঠের কটেজ গাছের ওপর, কাঠের সিঁড়ি ছাড়াও দড়ির সিঁড়ি রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে কৃত্রিম গুহা পথ রয়েছে। বেশ একটা আদিম অরণ্যর মত থিম, মেঘের দল লুকোচুরি খেলছে বনের মাঝে। রয়েছে দোলনা, নীল সুইমিং পুল। বিশাল জায়গা জুরে রিসর্ট।মুগ্ধ হয়ে দেখছিল মিসুমা। সব দেখতে বিকেল হয়ে গেল। 

ফেরার পথে খুব মাথা ধরেছিল মিসুমার, বাইরে তখন বৃষ্টির আগের থমথমে ভাব।তাংশু যদিও চা খায় না, মিসুমা গাড়ি দাঁড় করাতে বলেছিল একটা কফি শপে। গাড়ি থামতেই নেমে পড়ে মিসুমা, তাংশুর দিকে তাকিয়ে বলে -

-''আপনি নামবেন না ?''

-''চা খাই না। ''

-''এভাবে গাড়িতে বসে থাকবেন, বাইরে আসুন, পাহাড়ের ওপর থেকে দূরে ব‍্যাঙ্গালোর সিটি দেখা যাচ্ছে। কি সুন্দর বাইরেটা। '' 

-''বৃষ্টি নামবে, হাওয়ায় ঠাণ্ডা ঝাপটা আসছে। তাড়াতাড়ি চা খেয়ে আসুন। '' সেই একই গম্ভীর গলা। 

বৃষ্টি নামার আগে প্রকৃতির গায়ে এক সূক্ষ্ম মায়াবী চাদর জড়ানো যেন, ঠাণ্ডা হাওয়ায় এক অন্য অনুভূতি। তাই তো মিসুমা ডেকেছিল লোকটাকে। একা একা কোনো মেয়ে এভাবে চা খেতে নামে মাঝ পথে? 

-''চা না খান, কোল্ড ড্রিঙ্কস, আইসক্রিম ...'' শেষ চেষ্টা করেছিল মিসুমা। 

-''না।'' জোর এতটাই বেশি ছিল যে মিসুমার নিজেকে অপমানিত মনে হয়। চোখে জল এসে গেছিল প্রায়। লোকটা সহবৎ জানে না একদম। পা চালিয়ে কফি শপে ঢুকে পড়ে মিসুমা।

বেশ কিছু প্রাইভেট গাড়ি দাঁড়িয়ে রাস্তায়। পাহাড়ের বাকে ফাঁকা জায়গায় ছাতা টাঙ্গিয়ে টেবিল পেতে দিয়েছে দোকানদার। চা ছাড়া টুকটাক অনেককিছুই রয়েছে।কয়েকটা দল খেতে বসেছে। মিসুমা একটা কফি নিয়ে কোনের টেবিলে বসে। কিন্তু পরিস্থিতির বিপাকে কফিটা যেন বিস্বাদ লাগে। আশেপাশের সবাই ওকে দেখছে। একটি সুন্দরী মেয়ে এসব জায়গায় একা আসে না। ও লক্ষ্য করে তাংশু নেমেছে গাড়ি থেকে, তবে পাহাড়ের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

পাশের টেবিলের ছেলে গুলো মিসুমাকে নিয়েই হাসাহাসি করছিল, দু একটা আলপটকা মন্তব্য ছিটকে আসছিল। কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় সে। তাংশু এদিক ঘুরেছে, মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল মিসুমা, কিন্তু ঠিক তখনি ফোনটা বেজে ওঠায় বেখেয়াল হয়েছিল কয়েক সেকেন্ড। অত বড় বাসটা যে বাক নিয়ে ওর গায়ের উপর উঠে আসবে ভাবেনি ও। শেষ মুহূর্তে কানে গেছিল তাংশুর একটা চিৎকার, শরীরটা বোধহয় হাল্কা হয়ে হাওয়ায় ভেসেছিল.... তাংশু কি ছুটে এসেছিল ? ঐ ছেলেগুলোর চিৎকার, বাসের হর্ন, ব্রেকের আওয়াজ, তারপর...

 অন্ধকার। 


*****

হাসপাতালের বিছানায় চোখ খুলতেই তাংশুর উদ্বিগ্ন মুখটা দেখতে পেয়েছিল সবার প্রথমে। বড় কিছু হতে হতেও হয়নি, তাংশুর ধাক্কায় ও নাকি ছিটকে পড়েছিল পথের ধারে, শেষ মুহূর্তে তাংশু ও ভাবে ওকে না সরালে ... আর ভাবতে পারে না মিসুমা‌। চোখ বুজে ফেলেছিল আবার। হঠাৎ মনে হল ওর হাতটা কেউ শক্ত করে ধরে আছে। আবার ধীরে ধীরে ক্লান্ত চোখের পাতা মেলে মিসুমা, তাংশু ঝুঁকে পড়েছে মুখের কাছে। একটা হাত শক্ত করে ধরে বলছে - " আর যেতে দেবো না, বারবার এমন হতে পারে না। আমার সাথেই এমন হয় কেন ? ''

ওর হাতটা শক্ত করে ধরে হেসে ফেলে মিসুমা, বলে -''কোথাও যাচ্ছি না, ঠিক আছি। কিছুই হয়নি তেমন। '' 

তাংশু অবাক চোখে তাকিয়ে বলে -''সত্যি বলছ বলো। বলো আমায় ছেড়ে যাবে না। বলো ..''

লজ্জায় পলাশের মত রাঙিয়ে ওঠে মিসুমার গাল দুটো। বলে -''পাগল একটা। ''

ততক্ষণে অনিতা কাকিমা, রাজন সার অফিসের আরও কয়েকজন চলে এসেছে ওখানে। 

দু একটা কেটে ছড়ে যাওয়া ছাড়া তেমন কিছু হয়নি মিসুমার, শরীরে একটা বড় ঝাঁকি লেগেছে। সব পরীক্ষা করে ডাক্তাররা পরদিন ওকে ছেড়ে দেবে বলল। 

পরদিন মেধার সাথে মিসুমার বাবাও চলে এসেছিল খবর পেয়ে। তাংশু এক মুহূর্তের জন্য ওকে চোখের আড়াল করেনি। সারা রাত কেবিনে থেকেছে। এখনো আতঙ্ক ওর চোখে মুখে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে একাই ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল সেদিন ও। পুরোটাই মিসুমা শুনেছে রাজনের কাছে। আড় চোখে মিসুমা বারবার দেখছিল তাংশুকে, সেই কঠিন আবরণটা আর নেই।সারা রাত ওর একটা হাত শক্ত করে ধরে বসে ছিল ছেলেটা, এখনো গভীর উদ্বেগ দু চোখে, তার সাথে রয়েছে ... ঠিক দেখছে তো সে !! 


মিসুমার বাবা গেছিল ডাক্তারের সাথে কথা বলতে, মিসুমা আর তাং শুর দিকে তাকিয়ে মেধা বলে ওঠে -'' তাহলে আমার আর কাজ নেই এখানে থেকে।চোখ তো সরছে না দু জনের , তোরা তো আমায় দেখতেই পাচ্ছিস না। আমি বরং কাকাবাবুকেই সবটা বলি এবার। ওনারও চিন্তা কমবে এবার। ''


Rate this content
Log in