Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Sayandipa সায়নদীপা

Drama


3  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama


লোডশেডিং

লোডশেডিং

7 mins 1.2K 7 mins 1.2K

কল্পনার সমুদ্রে হঠাত করেই ভাটা পড়ে। কলমটা দুর্বার গতিতে গিয়ে ধাক্কা খায় মেঝের কোন এক স্থানে কিন্তু লেখিকা সেটা দেখতে পাননা, শুধু শব্দ শুনেই ক্ষান্ত থাকতে হয় তাঁকে। কারণটা আর কিছুই নয় - লোডশেডিং। আহ এ আর নতুন কি? এ তো রোজগার ব্যাপার। দুধভাতের সাথে ঠিক যেমন আলুসেদ্ধ মাস্ট তেমনই এখন প্রত্যেকটা দিনের সাথে লোডশেডিং মাস্ট। তাহলে লেখিকা বিরক্ত হয়ে ওভাবে কলমটা ছুঁড়লেন কেন? নাহ বিরক্তিটা তার অহেতুক নয়, বিরক্তির যথেষ্ট কারণ আছে বইকি। লোডশেডিং হল তো বয়েই গেল কিন্তু আজ ইনভার্টার ব্যাটা গেলো কোন চুলোয়? এখনও আলো জ্বলার নাম গন্ধ নেই। অগত্যা চেয়ার ছেড়ে উঠতেই হল; কিন্তু এগোবেন কিভাবে এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ! আন্দাজে গোটা টেবিল হাতড়ে অবশেষে মোবাইলটা পেলেন। আন্দাজ করতে পারলেন মোবাইল খুঁজতে গিয়ে কলমদানি সহ আরো বেশ কিছু জিনিষ উলটে ফেলেছেন, এই মুহুর্তে যাদের হিসেব পাওয়া অসম্ভব। তাই আপাতত তাদের নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মোবাইলে টর্চ জ্বালিয়ে সোজা গিয়ে পৌছলেন ইনভার্টারের কাছে কিন্তু সে ব্যাটা তো একদম চুপ মেরে গেছে ঠিক যেন গত পরশু ফিল্টারের পেছনে আবিষ্কার করা মরা টিকটিকিটা। যন্ত্রটাকে অযথা আর নাড়াচাড়া করলেন না - বাংলার ছাত্রী তিনি তাই যন্ত্রপাতি বিশেষ মাথায় ঢোকে না তার। লেখিকার স্বামীর বাড়ী ফিরতে অনেক দেরী, অফিসে কাজের চাপ প্রচুর। এই অসহায়তার দরুন লেখিকার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হ্যারিকেন একটা ছিল বটে বাড়িতে কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবহারে সে যে আর অক্ষত নেই তা পরীক্ষা না করেই বলে দেওয়া যায়। মোবাইলের ভরসাতেই তাই কাবার্ড হাতড়ে বহু কষ্টে একটা কোমর ভাঙা মোমবাতি আবিষ্কার করা গেল। যাক এতক্ষণে একটু স্বস্তি। এরপর খুঁজে পেতে দেশলাই এনে সযত্নে ভাঙা মোমবাতিটাকে কোমর বরাবর দু টুকরো করে মাথার দিকটা জ্বেলে ফেললেন। তারপর একটা চেয়ার টেনে বসে লেখিকা ভাবলেন কি আশ্চর্য সমাপতন, এই মুহূর্তে তিনি যে উপন্যাসটি লিখছিলেন সেটাও শুরু হচ্ছে এমন এ এক লোডশেডিংয়ের দৃশ্য দিয়ে -


গল্পের বারো বছর বয়সী কিশোর নায়ক একদিন রাত্রে আচমকাই ঘুম ভেঙে আবিষ্কার করে যে তার মাথার ওপর ফ্যান চলছে না আর নাইট বাল্বের রেখায় অন্ধকারে মিশে। তার শরীর থেকে বের হওয়া ঘামে বিছানা টা ইতিমধ্যেই ভিজে সপসপ করছে। কিশোর নায়ক বুঝতে পারে নিশ্চয়ই বহুক্ষণ লোডশেডিং হয়েছিল আর ইনভার্টারের চার্জও তাই শেষ।

এতদূর ভেবেই লেখিকা নিজের মনে হেসে ফেলেন, আজকের দিনে ইনভার্টার মহাশয় ধোঁকা দিলে মানুষ বড়ই অসহায়।বর্তমানে তাঁর অবস্থাও ঠিক তার গল্পের কিশোর নায়কটির মতো। যাই হোক গল্প এগোতে থাকে -

কিশোর নায়ক বিছানা ছেড়ে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়ায় একটু খানি বাতাসে সন্ধানে কিন্তু আজ যেন কোনো আশ্চর্য মন্ত্রবলে ঘরের মধ্যেকার আবহাওয়ার সাথে বাইরের আবহাওয়ায় কোনো পার্থক্যই টের পাওয়া যায়না। অন্ধকার টা অল্পকালের মধ্যেই চোখে সয়ে যেতে কিশোর নায়ক খেয়াল করে আপাদমস্তক কালো কাপড় পোশাকে ঢাকা একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে তাদের গেটের সামনে। সন্দেহ হয় নিশ্চয়ই চোর নয়তো এত রাতে এভাবে করছে টা কি ! স্বাভাবিক কৌতূহল বশেই কিশোর নায়ক ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে পড়ে ভালো করে দেখবার আশায়, আর তখনই লোকটা সোজা ওপরের দিকে তাকায় যেন নায়কের চোখে চোখ মেলানোই তার উদ্যেশ্য। কিশোরটি আতঙ্কে ছিটকে আসে ব্যালকনি থেকে - লোকটার চোখ গুলো চোখ নয় যেন দুজোড়া গাঢ় নীল আগুনের গোলা- এ কোনো মানুষের চোখ হওয়া অসম্ভব।


আঁ ...আঁ ...আঁ...


ব্যাপার টা বুঝতে আরো কয়েক সেকেন্ড লাগে লেখিকার তারপর অতর্কিতে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা চিৎকার টার জন্য নিজের মনেই লজ্জিত হন। গল্পটার মধ্যে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে পাশের বাড়ির পোষা বেড়ালটার চোখ জ্বলতে দেখে ভেবে বসেছিলেন তার গল্পের নীল চোখওয়ালা আগন্তুক বুঝি তার নিজের জনলাতেই এসে উপস্থিত হয়েছে। লেখিকা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেও তার হৃৎপিন্ডটি নিজের লম্ফঝম্প থামাতে আরো বেশ কিছুক্ষণ সময় নেয়।কিন্তু এসবের মধ্যেই যেটা ঘটে যায় সেটা হলো এক দমকা বাতাস এসে লেখিকার বহুকষ্টে জ্বালানো মোমবাতি টাকে নিভিয়ে দিয়ে যায়। একরাশ বিরক্তি নিয়ে মোমবাতি জ্বালানো আর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা না করে গুটিগুটি পায়ে লেখিকা এসে দাঁড়ান তার ব্যালকনিতে। মরা জ্যোৎস্নাটা এসে ভিজিয়ে দেয় তাঁকে। আর লেখিকা তাঁর বুকের মধ্যে হঠাৎ ই এক অদ্ভুত আলোড়ন অনুভব করেন। সারা শরীর জুড়ে সুড়সুড়ি দিতে দিতে নেমে আসা ঘামের ফোঁটা গুলো হঠাৎ তাঁর মনের অগোচরে চলে যায়।

আজ লোডশেডিং- সত্যিকারের লোডশেডিং। লেখিকার হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় সময় ঘড়িতে পিছলে যাওয়া কিছু মুহূর্ত - যখন সদ্য বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছেন তিনি, নতুন সংসারের সবে শুরু, প্রতিটা পদক্ষেপ তখন হিসেব করে ফেলতে হতো। ইনভার্টার কেন তো তখন স্বপ্ন। সেই সময় লোডশেডিং হলে লেখিকা কিছুতেই তাঁর স্বামীকে হ্যারিকেন জ্বালাতে দিতেন না, বলতেন অন্ধকারের সৌন্দর্যটা উপভোগ করে দেখো কত সুন্দর। লেখিকার স্বামী তখন মুচকি হেসে বলতেন, সুন্দর না ছাই; ভূত এসে ধরুক বুঝবে ঠেলা। এই বলে লেখিকাকে তিনি দু হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতেন। এই ভাবে খুনসুটি করতে করতে কেটে যেত তখন লোডশেডিং ভরা সন্ধ্যে গুলো।

আচ্ছা বিয়ের আজ বারো বছর পর লেখিকা যদি আবার সেই রকম আবদার করেন তাহলে আজও কি তাঁর স্বামী মুচকি হাসবেন নাকি বিরক্ত হবেন?

লেখিকার মনে পড়ে যায় পিছলে যাওয়া সেই সময়টার কথা যখন তিনি প্রথম জানতে পারলেন তিনি কোনোদিনও মা হতে পারবেননা; সেই সময় টাতে রোজ সন্ধ্যে হলেই ছাদে গিয়ে বসে থাকতেন অন্ধকারে - আকাশের দিকে তাকিয়ে কত কোথাই না ভেবে চলতেন। তার বাড়ির থেকে কিছুটা দূরে যে ঝুপড়ি গুলো আছে, যেখানে দুবেলা অন্নসংস্থান অবধি হয়না সেখানে থাকা মানুষ গুলোরও একেক জনের চার পাঁচটা করে সন্তান অথচ তাঁর একটাও হবে না ! এই সময় তাঁর দু চোখ বেয়ে নিঃসাড়ে নেমে আসা নোনতা জলটাও আর অনুভব করতে পারতননা।

তারপর অনেকটা সময় পেরিয়েছে, লেখিকাও সামলে নিয়েছেন নিজেকে,শূন্যতা ভুলতে তুলে নিয়েছেন কলম, নিজের অব্যক্ত যন্ত্রণা গুলোকে রূপ দিয়েছেন সাদা কাগজের বুকে। সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন বলেই হয়তো যাত্রাপথ খানিকটা হলেও সুগম হয়েছিল। এরপর আস্তে আস্তে করে চরম ব্যস্ততায় নিজেকে নিমগ্ন করে তুলেছেন। সেই মানুষটার সাথে মানসিক দূরত্বের সূত্রপাতও বোধহয় ওই সময় থেকেই।


এখন আর লেখিকার ছাদে যাওয়া হয়না, বলা ভালো যেতে আর ইচ্ছেও করে না। এখন ছাদে উঠলেই চারিদিক থেকে এসে পড়ে শুধু আলো আর আলো। মনে হয় যেন গোটা দুনিয়ার নজরবন্দি তিনি। এই কৃত্রিম আলোর ভিড়ে হয়তো আশেপাশের অন্ধকারটা হারিয়ে গেছে,কিন্তু মানুষের মনের অন্ধকারটা দূর করার ক্ষমতা কি আছে তার?

পুরোনো স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতেই হঠাৎ লেখিকার নজরে এলো রাস্তার পাশে অপেক্ষাকৃত নির্জনে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিতে চাওয়া এক প্রেমিক যুগলকে। ওরে খরগোশ তোরা জানিসও না যে আজকের এই জোৎস্না তোদের গোপনীয়তা বজায় রাখার পক্ষপাতী মোটেই নয়। মনে পড়ে যায় ,তখন ক্লাস টেন। লেখিকার জীবনে বসন্ত এসেছিল সেই প্রথম, লেখিকার মনেও লেগেছিল আবীরের রং। সে ছিল কবি। অন্ধকার ছিল তার ভীষণ প্রিয়। সে লেখিকাকে প্রায়ই বলতো যে বিয়ের পর একসাথে তারা জঙ্গলে বেড়াতে যাবে তারপর সন্ধ্যে বেলায় ফরেস্ট বাংলোর বারান্দায় বসে বসে চাঁদের আলোয় স্নান করবে আর উপভোগ করবে জঙ্গলের নিস্তব্ধতা। 

স্কুল শেষ হওয়ার পরই লেখিকারা গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে শহরে চলে এসেছিলেন, এখনকার মত তখন মোবাইলের চল হয়নি তাই সেই ছেলেটির সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হয়নি। এমনকি কোনোদিনও অকস্মাৎ দেখাও হয়নি আর।

আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে তাও কখনও কোনো সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে গেলে বা পত্রিকার পাতায় নতুন কবিতা দেখলেই লেখিকার চোরা মন যেন বহুবছর আগে গ্রামে ফেলে আসা সেই আনকোরা কবির সন্ধান করে বেড়ায়।


ওই গ্রাম থেকে শহরে চলে আসাটা লেখিকার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল,অনেক বেশি কিছু।

লেখিকার মনে পড়ে যায় তার জীবনের প্রথম আঠেরটা বছর কাটানো সেই গ্রামটার কথা যেখানে ইলেক্ট্রিসিটি ঢোকেনি তখনও। তাঁরা চার ভাই বোন সন্ধ্যে হলেই হ্যারিকেন জ্বেলে পড়তে বসতেন। পড়া শেষ হলেই হ্যারিকেনের বাতি কমিয়ে আধো আধো অন্ধকারে ঠাকুমার কোল ঘেঁষে শুয়ে চুপটি করে শুনতেন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা দাদুর রামায়ণ পাঠের সুর। জ্যোৎস্না রাত হলে অবছায়ায় বাড়ির অদূরেই তালগাছ গুলোতে ঝুলতে থাকা বাবুই পাখির বাসা গুলোকে দুলতে দেখা যেত যেন প্রকৃতির সুরের সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা। মাঝেমাঝে আবার ঠাকুমা শোনাতেন গ্রাম বাংলার ভুতের গল্প আবার কখনো গল্পের ছলে কোনো নীতিকথা। সে ছিল এক অন্য আনন্দ।

গ্রীষ্মের রাতে ওঁরা চার ভাইবোন দোতলার টানা লম্বা বারান্দাটায় মাদুর পেতে শুতেন।ফ্যান ছিল না তখন কিন্তু জানলার ফাঁক গলে আসা সেই ঠান্ডা বাতাসের কাছে এখনকার হাল ফ্যাশনের ফ্যানও নিশ্চিত লজ্জা পেয়ে যাবে। জানলার গ্রীলগুলোর ফাঁক দিয়ে তারাদের দেখতে পেতেন লেখিকা সেই সাথে দেখতে পেতেন বাড়ির সামনে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল আম গাছ টাকে। মাঝে মাঝে রাতের দিকে আচমকা ঘুম ভেঙে ওটার দিকে তাকালে মনে হতো রূপকথার পাতা থেকে কোনো বিশাল এক দৈত্য এসে দাঁড়িয়েছে তাদের উঠোনে। আবার বৈশাখের রাত্রে ওই আম গাছেরই আলাদা কদর।তাঁদের সব ভাইবোনদের কর্ণ উৎকীর্ণ হয়ে থাকতো ধুপধাপ করে আম পড়ার শব্দ শোনার জন্য।আর ভোর হলেই শুরু হয়ে যেত এম কুড়োবার ধুম।

এসব অনেক অনেক বছর আগের কথা, সে সময় জীবনে আলো র অন্ধকার দুটোই সমান উপভোগ্য ছিল। এখন জীবনে আলোর পরিমাণ অনেক বেড়েছে,তীব্র আলো - আর তাই হয়তো মাঝেমাঝে লেখিকার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।


কেউ অনেকক্ষণ থেকে এক নাগাড়ে ডোর বেলটা বাজিয়ে চলছে। বেলের শব্দের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে আগন্তুকের অসহিষ্ণুতা। লেখিকার সম্বিৎ ফেরে। অন্ধকারটা এতক্ষনে চোখে সয়ে গেছে তাই মোবাইলের আলোর আর প্রয়োজন পড়ে না। ধীর পায়ে তিনি এগোতে থাকেন দরজার দিকে। লেখিকা জানেন দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ টা তাঁর ভীষণ চেনা। তিনি মনে মনে ঠিক করে নেন মানুষ টা ঘরে ঢোকার পর আজ আবার তিনি আবদার করবেন, সেই আগের মতো। বলবেন কটা দিন অফিস থেকে ছুটি নিতে, তারপর দুজনে মিলে ছুটিটা কাটিয়ে আসবেন লেখকদের গ্রামে কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে, যেখান থেকে আজ বহু বছর ধরে আসা নিমন্ত্রণ রক্ষার সময় হয়নি এবার সেখানে যাবেন।লেখিকা নিশ্চিত সেখানে আজও চোখ ধাঁধানো তীব্র আলো অন্ধকারের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারেনি পুরোপুরি।

লেখিকা আজ আবার আবদার করবেন - দেখা যাক মানুষটা আজ বিরক্ত হন নাকি পিছলে পড়া দিনের মতোই মুচকি হাসেন ।


শেষ।



Rate this content
Log in

More bengali story from Sayandipa সায়নদীপা

Similar bengali story from Drama