Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sayandipa সায়নদীপা

Drama Horror


1.3  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama Horror


কুহক

কুহক

14 mins 3.4K 14 mins 3.4K

শীতটা এখনও থাবা বসায়নি পুরোপুরি তবে গাছের বয়স্ক পাতারা অবসর নিতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। রাতের বেলা বাড়ির বাইরে পা রাখলেই একটা হিমেল হাওয়ার স্রোত এসে শিরশিরানী ধরিয়ে দেয় শরীরে, তাই নিদেন পক্ষে গায়ে একটা পাতলা চাদর না চড়িয়ে বেরোতে নেই বাইরে। তবে অঘোর তান্ত্রিক অন্যধাতের মানুষ; শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনোকিছুই তাকে কাবু করতে পারেনা। আজ কৃষ্ণ পক্ষের দ্বিতীয়া, আকাশে চাঁদের চিহ্ন মাত্র নেই। মেঘও করেছে বোধহয় তাই তারাগুলোও মুখ লুকিয়েছে এই রাতে। রোজকার মত চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসেছেন অঘোর তান্ত্রিক, সারা গায়ে তার বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন কেউ একটা আসছে এদিকে, ঝরা পাতাগুলো আগন্তুকের পায়ে পিষ্ট হতে হতে মড়মড় শব্দে আর্তনাদ করে চলেছে অনবরত। হঠাৎ করে একসময় সেই আর্তনাদ থেমে গেলে; অঘোর তান্ত্রিক বুঝতে পারলেন আগন্তুক তার সীমানায় প্রবেশ করেছে। এখানকার অস্বাভাবিক আবহাওয়ার সাথে যুঝতে গায়ের চাদরটা খুলে ফেলছে এই মুহূর্তে। যথারীতি মিনিট খানেকের ব্যবধানে আবার শুরু হলো শব্দ। চোখ খুললেন অঘোর তান্ত্রিক, এখন আগন্তুক তার সামনে দাঁড়িয়ে।

“একটা কাজ করতে হবে তোমায়।”

আগন্তুকের গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট। তাকে একবার আপাদমস্তক মেপে নিলেন অঘোর তান্ত্রিক, তারপরেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একটা ক্রুর হাসি। আর ঠিক তখনই একটা রাত পাখি কোথাও থেকে যেন কর্কশ স্বরে ডেকে উঠলো…

“কি ব্যাপার মোহন, কবিরাজ মশাই কি বললেন?”

“এভাবে গ্রামের কবিরাজ মশাইকে দিয়ে হবে না কাকিমা, তার চেয়ে বরং কাকাকে শহরে নিয়ে যাওয়া হোক। সেখানে অনেক ভালো চিকিৎসা হবে।”

“আমি তো একবার তোমাকে বলে দিয়েছি মোহন, তোমার কাকাকে এই বাড়ি থেকে কোথাও নিয়ে যাওয়া যাবে না।”

“কিন্তু কেন কা…” প্রশ্নটা করতে গিয়েও থমকে যায় মোহন, জমিদার গিন্নির এই দৃষ্টিটা দেখলেই কেন না জানি তার বুকের অন্তঃস্থল অবধি কেঁপে ওঠে, “আ… আচ্ছা কাকিমা কাকাকে নাহয় নিয়ে যাওয়া হলো না কিন্তু শহর থেকে ডাক্তার বাবুকে তো আনানো যেতেই পারে। আমার এক বন্ধু শহরের এক বড় ডাক্তারের কাছে কাজ করে, তাকে বললে সে…”

“এসবে কোনো লাভ হবে না আমি জানি, শহরের ডাক্তারও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয়না।”

“কিন্তু আমরা এভাবে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারিনা কাকিমা, কিছু তো একটা করতেই হবে।”

“হুমম। যা করার এবার আমি করবো, ওটাই শেষ উপায়।”

“কি উপায় কাকিমা?”

“কিছু না।”

শেষ কথাটা বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান জমিদার গিন্নি। তার চলে যাওয়ার দিকে হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকে মোহন, তখনই কবিরাজের দেওয়া ঔষধি নিয়ে ঘরে ঢোকেন মোহনের মা, বিভা দেবী।

“মা কাকিমা এমন জেদ কেন করেছেন বলোতো… একবার শহরের ডাক্তারকে ডেকে দেখালে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে?”

“ক্ষতি আবার হবে না! এই বাড়ি থেকে ঠাকুরপোকে বের করলেই যদি ওর জাদুর প্রভাব কেটে যায়!”

“জাদুর প্রভাব! মানে!”

“কিছু না। মোহন তোকে না কতবার বলেচি এদের ঘরের ব্যাপারে বেশি মাথা গলাবি না। আমরা এদের ঘরে আশ্রিত, আশ্রিতর মতোই থাক।”

“এ তোমার কেমন কথা মা! কাকা তো শুধু আমাদের আশ্রয়দাতা নন, আত্মীয়ও। তাঁর বিপদেই চিন্তা করবো না?”

“না করবি না। তোকে কেউ চিন্তা করতে বলেছে? বলেনি তো, তাহলে চিন্তা করছিস কেন?”

“মা…!”

“আমার এক কথা বাবা, যত যাই হয়ে যাক ছোটো গিন্নির মতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবি না তুই। উনি ঠিক বলুন কি ভুল বলুন সবসময় সায় দিয়ে যাবি।”

“তুমি এই কথাটা আমাকে বারবার বলো কেন বলোতো মা? আর তুমি কাকিমাকে এতো ভয়ই বা পাও কেন?”

“সে তুই বুঝবি না। শুধু আমি যা বললাম সেটাই কর। আর এটুকু জানবি যে ছোটো গিন্নি যদি চান তো ঠাকুরপো ঠিক প্রাণে বাঁচবেন আর না চাইলে স্বয়ং ভগবানেরও সাধ্যি নেই তাকে বাঁচাবার।”

“এসব কথা বলে তো তুমি আমাকে আরও কৌতূহলী করে দিচ্ছ মা। আমার বারবার মনে হয় যে তুমি অনেক কিছু জানো যা আমার থেকে গোপন রাখতে চাও।”

“ক্ক… কে বলেছে আমি কিছু জানি… আমি কিছু জানিনা। যা বললাম তাই করবি ব্যাস।” এই বলে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে চান বিভা দেবী, কিন্তু মোহন তার আঁচল টেনে ধরে,

“মা তুমি যদি আমাকে কারণটাই না বলো তাহলে কাজটা করতে কি আমার ইচ্ছে করবে?”

“তর্ক করিস না মোহন।”

“তর্ক নয় মা, জানতে চাইছি যে সে কি এমন কারণ যার জন্য কাকিমাকে তুমি এতো ভয় পাও?”

মোহন লক্ষ্য করে প্রশ্নটা শোনা মাত্রই তার মায়ের চোখে মুখে যেন এক আশ্চর্য পরিবর্তন ফুটে ওঠে, ভীতসন্ত্রস্ত চোখে আশেপাশটা দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলেন, “এখানে নয় বাবা, ঘরে চল।”

একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনি তুলে দেয় নিবৃত্তি। ধোঁয়া ধোঁয়া অস্পষ্টতার মধ্যে তাকিয়ে দেখে ধুপ, ধুনা থেকে শুরু করে আরও বিচিত্র সব সামগ্রী ছড়ানো গোটা ঘরে, অঘোর তান্ত্রিকের কোল ঘেঁষে একটা মড়ার খুলি উল্টো করে রাখা, তারমধ্যে তরল কি একটা জিনিস ভর্তি। সেসব পেরিয়ে সে দেখে হোমকুণ্ডের লেলিহান শিখায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠা অঘোর তান্ত্রিকের মুখটা, সিঁদুরে রাঙা কপাল চুঁইয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে তার নাকে, মাথার রগ দুটো দপদপ করছে উত্তেজনার, চোখদুটো রক্তবর্ণ। নিবৃত্তিকে দেখা মাত্রই তিনি বলে ওঠেন, “এনেছিস?”

“হ্যাঁ। এই যে…” এই বলে নিবৃত্তি আঁচলের তলা থেকে বের আনে একটা কচি ডাব। ডাবটা এক হাতে নিয়ে, অন্য হাতে একটা কাস্তে তুলে নেন অঘোর তান্ত্রিক; তারপর এক বিশেষ ভাবে কেটে ফেলেন ডাবের মাথা খানি।

“এই ডাবটার মতোই আমার শিকারকেও কেটে ফেলতে হবে তোমায়।”

“হুমম।”

“তুমি পারবে তো?”

“আজ যে বড় সন্দেহ করছিস আমার ক্ষমতার ওপর?”

“এ সন্দেহ নয়, উত্তেজনা, ওসব তুমি বুঝবে না।”

“হুম। কিন্তু তুই এই লোকটাকে বাঁচাতে চাইছিস কেন? এ না থাকলেই তো তোর সুবিধা।”

“এতো সহজ না সব কিছু। পথের আশেপাশে অনেক কাঁটা গজিয়ে রয়েছে চতুর্দিকে, আগে সেগুলোকে উপড়ে ফেলতে হবে আর তার জন্য এই লোকটার বেঁচে থাকা দরকার।”

“পথের কাঁটা বলতে কার কথা বলছিস?”

“বেশ কয়েকটা আছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মোহন, জমিদারের এক সম্পর্কিত ভাইপো হয়। এই মুহুর্তে জমিদারের কিছু হয়ে গেলে প্রজারা সব ওর দিকে ঝুঁকে যাবে, খুব চালাক ছেলে ও। এতোদিন আমার ন্যাওটা ছিলো বেশ কিন্তু আজকাল কেমন যেন অন্য দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে। ওর মাকে অবশ্য আমি বিশ্বাস করিনা, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি সে আমাকে তীব্র ভাবে ঘৃণা করে।”

“সে কথা তো বুঝলাম কিন্তু সে কে যার নাম তুই আমাকে দিয়েছিস?”

“এরই মধ্যে ভুলে গেলে তাকে? আমার পথের সব থেকে বড় কাঁটা, ওরা ভেবেছিল ওকে এই গ্রামেই এনে লুকিয়ে রাখবে আর আমি টেরও পাবোনা… হাঃ হাঃ নিবৃত্তিকে কি এতোই বোকা ভেবেছে ওরা! যার জন্য জমিদার নিজের এই অবস্থা করলো তার প্রাণেই বাঁচুক জমিদারের প্রাণ।”

“আর সে যদি ডাকে সাড়া না দেয়?”

“আবার চেষ্টা করবে, তাকে সাড়া দিতেই হবে।” উত্তেজনায় চোয়াল শক্ত হয় নিবৃত্তির।

“তোর কাজ হয়ে গেলে আমাকে যা কথা দিয়েছিস সেটা রাখবি তো?”

“তোমার ওপর আমার কোনো সন্দেহ নেই যখন তখন তোমারও…”

“নিবৃত্তি…”

“কি?”

“দরজার বাইরে কেউ আছে?”

“সেকি!”

ছুটে গিয়ে দরজা খোলে নিবৃত্তি। রাতের অন্ধকারে আশেপাশে কাউকে দেখতে পায়না। তবুও মনের সন্দেহ নির্মূল হয়না পুরোপুরি, দুজন পেয়াদাকে ডেকে নির্দেশ দেয় আশেপাশে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা খুঁজে দেখার।

রাতের অন্ধকার ঠেলে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে থাকে মোহন, সে ভাবতে পারেনি কাকার ঘরে আসা ওই তান্ত্রিকটা টের পেয়ে যাবে তার উপস্থিতি। ছুটতে ছুটতে এখন মোহন ভাবে ওভাবে পালিয়ে না এসে কোনো একটা অজুহাত দিলেই তো পারতো বরং! কিন্তু সেই মুহূর্তে ওর মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। আজ কাকার ঘরে গোপনে ওই তান্ত্রিককে ঢুকতে দেখেই চমকে উঠেছিল সে, তবে কি মায়ের সন্দেহই ঠিক! বাবা মারা যাওয়ার পর মোহনকে ওর এক মামা নিয়ে চলে যান নিজের কাছে, সেখানেই লেখাপড়া শেখে ও। আর এদিকে মা এসে জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নেন, জমিদার মশায় ওদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন। লেখাপড়া শেষ করে কাজের সন্ধানে বছর দুয়েক হল এখানে মায়ের কাছে এসে উপস্থিত হয় মোহন, সেই অবধি ও এখানেই আছে। এখন জমিদার বাড়ির বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করে থাকে সাধারণত। এখানে আসার পর কাকিমার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছিল মোহন, ঠিক ততটাই অবাক হয়েছিল জমিদার মশাইয়ের নিস্পৃহতায়। সব ব্যাপারেই যেন কেমন একটা গা ছাড়া ভাব তার, ঘোলাটে দুটো চোখ নিয়ে কি যেন আকাশ পাতাল ভেবে যান সারাদিন। এতোদিন এর কোনো কারণ খুঁজে পায়নি মোহন। কিন্তু সেদিন মায়ের কাছে এর কারন হিসেবে যা সব শুনেছিল তা বিশ্বাস করতে পারেনি সেই মুহূর্তে, ভেবেছিল সব মায়ের কষ্ট কল্পনামাত্র। অথচ আজ নিজের কানে… কাকিমা মোহনকেও নিজের পথের কাঁটা ভাবেন, তার মানে মায়ের আশঙ্কা নেহাতই অমূলক নয়। আচ্ছা মোহনের তো জমিদার বাড়ির ওসব ধন সম্পদের ওপর কোনো লোভ নেই, ও কোনোদিনও চায়নি ওসব। ও শুধু চায় এই গ্রামে একটা ইস্কুল তৈরি করতে, গ্রামের শিশুগুলোকে যথোপযুক্ত শিক্ষা দিতে। কিন্তু এখন মোহন স্পষ্ট বুঝতে পারছে কাকিমার হাতে জমিদারির সমস্ত ক্ষমতা চলে গেলে ওর সে স্বপ্ন কোনোদিনই পূরণ হবে না, শুধু তাই নয়, এই গ্রামের ওপরও ভয়ংকর বিপদ নেমে আসবে।

আচমকাই ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়ায় মোহন, হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চমকের মতো ওর মাথায় খেলে যায় একটা কথা। কাকিমা কি শিকারের কথা বলছিল না! ওই তান্ত্রিককে কারুর একটা নাম বলেছেন উনি… কার নাম? কে হতে পারে সে? মোহনের সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে, উত্তেজনায় বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দ ওঠে। আকাশের দিকে একবার তাকায় মোহন, সরু একফালি যা চাঁদ উঠেছিল সেটাও মেঘের আড়ালে পড়ে কেমন যেন ছায়া ছায়া দেখায়, যেন কোনো অমঙ্গলের ভয়ে মুখ লুকিয়েছে সে। গলাটা শুকিয়ে আসে মোহনের; কানের কাছে যেন জমিদার গিন্নির বলা কথাগুলো আবার বেজে ওঠে তীক্ষ্ণ স্বরে। প্রাণের বদলে প্রাণ… কাকাকে সুস্থ করতে ওরা কারুর একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি করবে, হয়তো বা তার প্রানটাই ছিনিয়ে নেবে! কিন্তু কার? তান্ত্রিকদের ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে সে এতদিন, কিন্তু আজ অভিজ্ঞতাও হতে চলেছে বোধহয়। পাশে থাকা একটা গাছের গুঁড়ি ধরে ধপ করে নীচে বসে পড়ে মোহন। সে সব জেনেও কি কিছুই করতে পারবে না! কোনো এক অসহায়কে কাকিমার লালসার শিকার হতে দেবে! উফফ… সে কথা ভেবেই শিউরে ওঠে সে, দু’হাত দিয়ে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। আর তখনই হঠাৎ করে বাবার বলা একটা কথা মনে পড়ে যায় তার, বাবা বলতেন, “সব সমস্যার সমাধান সূত্র আমাদের মধ্যেই থাকে, শুধু সমস্যার সময় মাথা ঠান্ডা রেখে চিন্তা করা দরকার, উত্তেজিত হয়ে নয়।” বাবার কথাটা মনে হতেই এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পায় মোহন, একটা জোরে নিশ্বাস নেয় সে। তারপর সব কিছু আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করে। একটাই প্রশ্ন ওর মাথায় এসে ধাক্কা দেয় বারবার, কে হতে পারে কাকিমার সবচেয়ে বড় পথের কাঁটা! আর কি যেন বলছিলেন উনি যে তাকে এই গ্রামেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে… এই রকম কিছু। হঠাৎ মোহনের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। সেদিন মা বলবে না বলবে না করেও বলে ফেলেছিল অনেক কিছুই, তখন সেগুলোকে সেভাবে আমল দেওয়ার যোগ্য মনে করেনি মোহন কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে অনেক দরকারি কথা লুকিয়ে আছে তারমধ্যে। গাছতলা থেকে উঠে দাঁড়ায় মোহন, অনেকটা দম ভরে নেয় নিজের মধ্যে, সে যদিও ঠিক জানেনা যাকে খুঁজছে সে কোন বাড়িতে থাকে কিন্তু তাকে খুঁজে পেতেই হবে যে করে হোক, নয়তো তাকে বাঁচানো যাবে না। রাতের অন্ধকার ঠেলে আবার ছুটতে শুরু করে মোহন…

গ্রামের ভেতর ঢুকে একটু দম নিয়েই আবার চরকির মত পাক খেতে থাকে মোহন। সে ঠিক জানে না কোন বাড়িটায় থাকে কাকিমার “শিকার”, কিভাবে খুঁজবে তাকে, কিভাবেই বা সাবধান করবে! অন্ধকারটা এতক্ষণে চোখে সয়ে গেছে অনেকখানি, আশেপাশের বাড়িগুলোর দিকে নজর বোলাতে বোলাতে হালকা পায়ে এগোতে থাকে মোহন, আর তখনই হঠাৎ করে ওর কানে এসে লাগে এক নারী কন্ঠ। সুমিষ্ট স্বরে কেউ যেন ডেকে ওঠে, “খোকন…” চমকে ওঠে মোহন, এতো রাতে কে কাকে ডাকে! আওয়াজের উৎস সন্ধান করে দ্রুত পদে এগোতে এগোতেই কানে আরেকবার এসে লাগে সেই ডাক। মোহন অবশেষে এসে পৌঁছায় সেই বাড়ির কাছে, নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা নির্দিষ্ট জানালার সোজাসুজি। আর সেই ছায়ামূর্তি যেই হোক না কেন কোনো মহিলা যে নয়, এ ব্যাপারে মোহন নিশ্চিত হয়। ছায়ামূর্তি আরেকবার সেই নারী কন্ঠ নকল করে ডাকে, “খোকন”, আর তৎক্ষণাৎ ঘরের ভেতর থেকে কে যেন সাড়া দিয়ে ওঠে, “মা…”

তারপর অল্পক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে মন্ত্রমুগ্ধের মত বেরিয়ে আসে একটা বছর দশ বারোর ছেলে। হাত পা গুলো শিরশির করে ওঠে মোহনের, এই কি তবে কাকার একমাত্র ছেলে! কাকার প্রকৃত উত্তরাধিকারী!

ছেলেটা বাইরে বেরিয়ে ওই অপরিচিত ছায়ামূর্তিকে দেখে খানিক ঘাবড়ে যায়, আর এদিকে ওই ছায়ামূর্তি কি যেন একটা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে দিতে যায় ছেলেটার দিকে… মোহন নিজেকে প্রস্তুত করেই রেখেছিল, মুহূর্তের ক্ষিপ্রতায় সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেটার ওপর, ছেলেটাকে নিয়ে মাটিতে পড়ে যায় সে। হাওয়ায় ভেসে যায় অঘোর তান্ত্রিকের ছোঁড়া জিনিসটা।

লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বিড়বিড় করে কিসব যেন মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুরু করেন তিনি, হাতে আবার কিছু একটা করার জন্য প্রস্তুত হন মোহন আর খোকনকে লক্ষ্য করে… কিন্তু পারেননা, হঠাৎ একটা প্রবল হওয়ার স্রোত এসে ধাক্কা দেয় তাকে আর তিনি নিজেই ছিটকে পড়েন মাটিতে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে ওঠেন, “কে… কে… সামনে আসছিস না কেন?” কোথাও থেকে কেউ উত্তর দেয়না। কিন্তু তাদের চোখের সামনে আস্তে আস্তে ফুটে ওঠে একটা নারী অবয়ব। ভয়ে, বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে যায় অঘোর বাবার চোখ, ঠোঁট দুটো বিড়বিড় করে বলে ওঠে, “রঞ্জাবতী!”

“মা…মা…” বলে খোকন ছুটে যেতে চায় ওই নারী মূর্তির দিকে, ক্ষনিকের জন্য চমকে ওঠে মোহন, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে খোকনের হাত চেপে ধরে ইশরায় বারণ করে তাকে যেতে।

অঘোর তান্ত্রিক এই টুকু সময়ের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আবার তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান, দাঁতে দাঁত চিপে বলেন, “আমার সঙ্গে পারবে না রঞ্জাবতী, তোমার মত কতকে ঘায়েল করে আমি আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি।”

ওপর প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর আসেনা। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ক্রুর হাসিটা হেসে আবার কিসব মন্ত্র জপ করতে শুরু করেন অঘোর তান্ত্রিক, সেই সাথে নিজের গলার থেকে একটা রুদ্রাক্ষের মালা টেনে নিয়ে ছুঁড়ে দিতে যান রাঞ্জাবতীর দিকে, কিন্তু সেই মালা রঞ্জাবতীকে ছোঁয়ার আগেই আবার এক দমকা বাতাস এসে সেটার গতি ঘুরিয়ে দেয়। চমকে ওঠেন অঘোর তান্ত্রিক, মোহনও চমকে উঠে দেখে হঠাৎ করে কোথার থেকে যেন একরাশ ধুলো পাক খেতে খেতে একটা ঝড়ের আকার নিচ্ছে, আশেপাশের গাছ গুলোও দুলতে শুরু করেছে প্রচন্ড ভাবে। মোহন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে চাঁদটার অস্তিত্ব মাত্র বোঝা যাচ্ছেনা আর, গোটা আকাশ জুড়ে এখন শুধু কালো মেঘের ঘনঘটা। আকাশে কালো মেঘ তো অনেক দেখেছে মোহন, কিন্তু আজকে তার এই ভয়ঙ্করী রূপ যেন অন্যরকম, যা ঠিক ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

ঝড়ের গতি ক্রমশ বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অঘোর বাবার মন্ত্রচ্চারন, মাঝে মাঝে ঝোলার থেকে কিসব জিনিস বের করে ছুঁড়ে যান সেই রঞ্জাবতীকে লক্ষ্য করে। ওই জিনিসগুলোর সংস্পর্শে এলেই কেঁপে ওঠে তার শরীর কিন্তু মোহন আশ্চর্য হয়ে দেখে রঞ্জাবতী কিছু করছেন না আর, তার অবয়বটা নিশ্চল। শুধু দুই বাহু দুই দিকে প্রশস্ত করে সে যেন কিছুতে মনোসংযোগ করতে ব্যস্ত। খোকনের মাথাটা বুকে চেপে নিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকে মোহন, ঝড়ের দাপটে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকাই দায়। ওদিকে অঘোর বাবার সঙ্গে রঞ্জাবতীর এই অসম লড়াই দেখতে দেখতে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে ওঠে মোহন, প্রতি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি শেষ; অঘোর বাবারও বোধহয় মনের ভাব খানিক সেরকমই। তার ঠোঁটের কোণে ইতিমধ্যেই ফুটে ওঠে জয়ের হাসি। তিনি আস্তে আস্তে এবার ঝোলা থেকে বের করে আনেন কিছু একটা, অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারেনা মোহন। অঘোর বাবা চেঁচিয়ে ওঠেন, “এবার তোমার খেলা শেষ রঞ্জাবতী…”

এদিকে খোকন চেঁচিয়ে ওঠে, “মা…”

সঙ্গে সঙ্গে রঞ্জাবতী নিজের হাত দুটো শিথিল করে দেয়, ধক করে জ্বলে ওঠে তার চোখ দুটো; আর তৎক্ষণাৎ বীভৎস শব্দে আকাশ থেকে নেমে আসে এক চোখ ঝলসানো আলো… সে আলোর তীব্রতায় চোখ বন্ধ করে ফেলে মোহন, সেই অবস্থায় কয়েক মুহূর্তের জন্য শুনতে পায় এক গগনভেদী আর্তনাদ। তারপর সব চুপচাপ… আস্তে আস্তে চোখ খোলে মোহন, আর চোখ খুলেই মুখ থেকে একটা বিকৃত শব্দ বের করে পিছিয়ে যায় কয়েক পা। কখন যেন রঞ্জাবতী এসে উপস্থিত হয়েছে ওদের সামনে, তার মুখটা অদ্ভুত রকমের পোড়া যেটা দেখে ভয় পেয়ে যায় মোহন। খোকন এসব দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছে খানিক আগেই। আস্তে আস্তে নিজের হাত বাড়িয়ে খোকনের মাথায় হাত ছোঁয়ায় রঞ্জাবতী, তারপর নিজের দুই হাত জোড় করে মোহনের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকায়, মোহন জানে এই অনুরোধের অর্থ। সে মাথা নেড়ে বলে, “আমি ভাইয়ের খেয়াল রাখবো কাকিমা, কথা দিলাম।”

মোহনের আশ্বাসে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে রঞ্জাবতীর, সেই সাথে চোখের কোণটাও যেন চিকচিক করে ওঠে অল্প কিন্তু ভালো করে কিছু দেখবার আগেই রঞ্জাবতীর সূক্ষ্ণ শরীরটা অসংখ্য জোনাকি পোকার আলোর মত হয়ে মিশে যায় বাতাসে।

ঝড় থেমে গিয়েছে অনেকক্ষণ। অঘোর তান্ত্রিকের পুড়ে দলা পাকিয়ে যাওয়া শরীরটাকে আবার ভালো করে সৎকারের ব্যবস্থা করছে গ্রামবাসীরা। নিবৃত্তি আর তার দাদা অঘোর তান্ত্রিক ছিলেন রঞ্জাবতীর বাপের বাড়ির গ্রামের লোক। বাপ মা মরা মেয়ে, দাদা আবার তান্ত্রিক এই ভেবে দয়া পরবশ হয়ে নিবৃত্তিকে নিজের শ্বশুরবাড়িতে এনেছিলেন রঞ্জাবতী কিন্তু তখন জানতেন না যে এই অসহায় মেয়েটাই তলে তলে নিজের তান্ত্রিক দাদার সাহায্য নিয়ে এমন ভয়ানক ষড়যন্ত্রে মেতেছে। জমিদারকে বশ করে তাকে বিয়ে করে প্রথমেই সে রঞ্জাবতীকে তাড়ায় তার নিজের বাড়ির থেকেই। রঞ্জাবতী ছোট্ট খোকনকে নিয়ে চলে যান বাপের বাড়ি। কিন্তু এতেই শান্তি হয়নি নিবৃত্তির, সে বুঝতে পারে যে জমিদারের মনের সম্পূর্ণ দখল নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না কিছুতেই, যতদিন রঞ্জাবতী আর খোকন বেঁচে থাকবে ততদিন ওদের টান জমিদার কিছুতেই কাটাতে পারবেননা। আর সেই কারণেই নিবৃত্তি অবশেষে লোক পাঠায় রঞ্জাবতী আর খোকনকে পুড়িয়ে মারার জন্য; রঞ্জাবতী মারা গেলেও বেঁচে যায় খোকন। তাকে এরপর নিয়ে চলে যায় রাঞ্জাবতীর এক নিঃসন্তান বোন। কিন্তু তাতেও রেহাই মেলেনি নিবৃত্তির হাত থেকে, সেখানেও সে লোক পাঠায় খোকনকে শেষ করতে। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে এবারেও বেঁচে যায় খোকন। এরপর খোকনের সেই মাসি ভাবে খোকনকে লুকিয়ে রাখার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হচ্ছে তার নিজেরই গ্রাম, নিবৃত্তি নিশ্চয় ভাবতেও পারবেনা যে তারই গ্রামে লুকিয়ে আছে খোকন। এদিকে এই কয়েক বছরে খোকনের শরীর অনেকটাই বেড়েছে তাই তাকে চেনা এতোও সহজ হবে না। এই অবধি সব ঠিকই চলছিল কিন্তু তারপর হঠাৎ করে জমিদারমশায় জানতে পারেন রঞ্জাবতী আর খোকন মারা গেছে। এই খবরে শোকে পাগল হয়ে যান তিনি, আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তার সেই চেষ্টা বিফল হলেও অসুস্থ হয়ে সম্পূর্ণ শয্যা নেন তিনি। আর এদিকে কিভাবে যেন নিবৃত্তির কাছে খোকনের খবর পৌঁছে যায়। তাই সে এক অভিনব উপায়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার ছক কষে।

★★★★★

টলোমলো পায়ে এগিয়ে চলছে মোহন, শরীরের ওপর অনেক ধকল গেছে তার। মায়ের কাছে ছন্নছাড়া ভাবে কিছু শুনেছিল আর আজ খোকনের মাসির কাছ থেকে পুরোটা শুনে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেছে তার। ওই মহিলা এতোটা ভয়ঙ্কর! মা সার্থক সম্বোধন করতো ওকে ডাইন বলে। তবে এখন আর ভয় নেই কোনো, নিবৃত্তির শিরদাঁড়াটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, আর সোজা হয়ে সে দাঁড়াতে পারবে না কোনদিন। সত্যিই মায়ের চিন্তাটা যে অমূলক ছিলো না তা এখন আরও ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পারছে মোহন। মায়েরা বোধহয় এমনই হন; নিজের মৃত্যুর পরেও রঞ্জাবতী ছেলের জন্য চিন্তা ছাড়তে পারেনি বলেই তো তার বিপদে আজ এভাবে এসে তাকে রক্ষা করে গেলো, হয়তো আগের বারও নিজের মায়ের অদৃশ্য রক্ষা কবচ ছিল বলেই সেবারও বেঁচে গেছিল খোকন। জ্ঞান ফিরতে খোকন বড্ড কান্নাকাটি করছিল মায়ের জন্য, অতটুকু ছেলে মাকে ছাড়া... মোহনের চোখদুটো আচমকাই জলে ঝাপসা হয়ে এলো, তাকে ঘরে না পেয়ে তার মাও এতক্ষণে কত না জানি চিন্তা করছেন। চলার গতি বাড়ালো মোহন, আজ বহুদিন পর ইচ্ছে করছে সেই ছোটবেলার মত মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে, মায়ের আঁচল টেনে আদর খেতে…

শেষ।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sayandipa সায়নদীপা

Similar bengali story from Drama