কুৎসিত
কুৎসিত
"রূপসা তুমি এত সুন্দরী কেন! তুমি কি জানো, ভগবান তোমাকে অনেক সময় নিয়ে নিখুঁত ভাবে তৈরি করেছেন" সাত্যকি একরাশ ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে অপরূপ সুন্দরী রূপসার দিকে। রূপসার ঘন বাদামি রঙের চুল, টানা টানা দু'টো কালো গভীর চোখে ও মিষ্টি হাসিতে যে কেউ নিজের মন দিয়ে বসবে।
রূপসা মুচকি হেসে সাত্যকির গালে হাত বুলিয়ে বলল, "আমাকে সত্যি খুব সুন্দর দেখতে?"
- হ্যাঁ, একদম অপ্সরী।
- আমার কোন জিনিসটা তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে সাত্যকি!!
- এই যে তোমার চাঁদপানা মুখটা।
- আচ্ছা সাত্যকি, আমি যদি চাঁদ হওয়ার বদলে চাঁদের গায়ে থাকা সেই কলঙ্ক হতাম!!
- মানে?
"মানে আমার গায়ের রঙটা কালো হতো, মুখে দাগ, ব্রণ হতো! এই যে এরকম..." বলতে বলতে রূপসার সেই সুন্দর শ্বেত বর্ণ গায়ের রঙ বদলে গেলো, অঞ্জন পর্বতের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা শুষ্ক ত্বকে পরিণত হলো। চোখ জোড়া ঘোলাটে, মুখেও এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি।
এসব দেখে সাত্যকি হতভম্ব হয়ে গেল। চেয়ার থেকে নিচে পড়ে গেল ধপ করে। একি দেখছে ও! এটা কি হচ্ছে!
রূপসার সেই মিষ্ট স্বরের বদলে ফ্যাসফ্যাসে ক্ষীণ স্বর ভেসে এলো, "আমাকে দেখে আর ভালোবাসা জাগছে না, তাই না সাত্যকি? আচ্ছা ফর্সা গায়ের রঙ, টানা টানা চোখ, দাগবিহীন ত্বক না হলে বুঝি কারোর ভালোবাসা পাওয়া যায় না?"
"ক...কে তুমি!!" সাত্যকি ভীত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
"আমি রূপসা, তোমার রূপসা। তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেছিলে, মনে আছে!!" রূপসা এগিয়ে আসতে সাত্যকি হুরমুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। ভয় ও রাগের সংমিশ্রণে চিৎকার করে উঠল, "দূরে থাকো, একদম আমার কাছে আসবে না। তুমি ঠগ, তুমি আমাকে ঠকিয়েছো। আমি তোমাকে ভালোবাসি না। তোমার মতো কুৎসিত চেহারাকে কখনো ভালোবাসা যায় না"।
সাত্যকির কথা শুনে রূপসার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেলো। চোখ দুটো আগুন ভাটার মতো লাল হয়ে উঠল। রাগে দুঃখে ব্যথিত হয়ে এক ভয়ঙ্কর হুঙ্কার দিয়ে উঠল রূপসা, রুমের প্রতিটা কোণ এই আওয়াজে কেঁপে উঠল। সাত্যকিও ভয়ে তটস্থ হয়ে ঘরের এককোনে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
"আমাকে ভালোবাসা যায় না, আমি দেখতে কুৎসিত বলে!! আর কতবার নিজের রূপ নিয়ে আমাকে খারাপ কথা শুনতে হবে? তোমাদের মতো কুৎসিত মনের মানুষ গুলোর জন্য আমার মতো মেয়েদের অবহেলা সইতে হয়। আর শেষ পরিণতি হয় অসহনীয় মৃত্যু। আমি ভুল করেছিলাম নিজেকে শেষ করে, আমার তো উচিত তোমাদের মতো কুৎসিত মনের মানুষদের কুৎসিত হৃদপিন্ড গুলোকে শরীর থেকে আলাদা করে দেওয়া" বলার সঙ্গে সঙ্গে রূপসার হাত দু'টো কয়েক গুণ লম্বা হয়ে পৌঁছে গেল সাত্যকির কাছে। মিশমিশে কালো হাত দুটো দেখে সাত্যকির চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। নিজের মৃত্যু আসন্ন তা বুঝতে পেরে সাত্যকি কাকুতি মিনতি করে উঠল, "আমাকে মেরো না, আমাকে মেরো না...."
"তোমাকে ছেড়ে দিলে তুমি আবার গিয়ে কোনো এক সুন্দরী রুপসী মেয়ে খুঁজবে। তোমার কুৎসিত মনটা বদলাবে না সাত্যকি, আর আমি নিজের কুৎসিত চেহারার থেকেও তোমাদের কুৎসিত মনকে বেশি ঘৃণা করি" রূপসা ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল সাত্যকির দিকে।
নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করলো সাত্যকি। দেওয়াল ঘেঁষে সরে যেতে যেতে ব্যালকনির দিকে ছুট দিল। পিছন ফিরে তাকাতে দেখল রূপসা শূন্যে ভাসছে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওরই দিকে। আর কিছু ভাবতে না পেরে সাত্যকি ব্যালকানি থেকে ঝাঁপ দিল, হোটেলের পাঁচ তলার ব্যালকানি থেকে নিচে পড়ে গেল সাত্যকি।
রূপসা অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে রাস্তায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত শরীরটার দিকে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক তৃপ্তির হাসি, "টাটা সাত্যকি। আমাকে এবার যেতে হবে আরেক কুৎসিত মনের কাছে। আমি এই পৃথিবী থেকে সকল কুৎসিত মনের মানুষদের মুছে দেবো। আমার মতো লাঞ্ছনা অবহেলা সইতে না পেরে কাউকে মৃত্যু বরণ করতে হবে না"।
