Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

chanchal das

Horror


4.6  

chanchal das

Horror


কবে যে কোথায়

কবে যে কোথায়

23 mins 1.0K 23 mins 1.0K

১. সব সময় যে কপাল ভালো যাবে এমনটা রঞ্জন পাত্র মনে করে না | তবুও কখনো কখনো মেঘ না চাইতেই জল পাওয়া গেলে মন্দ লাগে না | আজ কাজের চাপ অনেকটাই ছিল | একটা মেজর প্রজেক্টের রিপোর্ট শেষ করে পাঠানোর কথা | রিপোর্ট তৈরিই আছে শুধু একটু চোখ বুলিয়ে পাঠালেই শেষ | অফিসের ছেলে মেয়েগুলো প্রচুর খেটেছে গত তিন মাস ধরে | প্রজেক্ট প্ল্যানিং, ফিল্ডওয়ার্ক , ডাটা সর্টিং থেকে ফাইনাল রিপোর্ট, ধাপে ধাপে সব কাজ খুবই সুচারু রূপে শেষ হয়েছে | ক্লায়েন্ট হাজার চেষ্টা করেও কোনো খুঁত খুঁজে পায় নি | শেষে মনের দুঃখে ফাইনাল রিপোর্ট পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে | কাভারিং লেটারটা টাইপ করে, রিপোর্টটা অ্যাটাচ করে, সোজা সেন্ড বাটন টিপে দিয়ে আরামের এক নিশ্বাস ফেললো রঞ্জন | এবার ভাবছে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে আসলে হয় |

এমনটা ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠলো,

- নমস্কার পাত্রসাব , ফোনের অন্য দিকে মলহোত্রাজি | দীপক মলহোত্রা, নর্থ ইন্ডিয়ার একজন প্রথম সারির চেন অফ হোটেলসের মালিক | দেশে হেরিটেজ বাড়ি কে হেরিটেজ হোটেলে বদলে ফেলাই ওনার ব্যবসা | দেশে বিদেশে সব মিলিয়ে আটচল্লিশটা হোটেলের মালিক উনি | পড়াশুনো বিশেষ করেননি | বলতে গেলে গিন্নির দৌলতেই উনি আজ এই জায়গায় পৌঁছেছেন | কিন্তু অহংকারী না | সবার সামনেই স্বীকার করেন যে তিনি নিজের গিন্নির কাছে কৃতজ্ঞ| রঞ্জনের ক্লায়েন্ট তো বটেই আবার ভালো বন্ধুও |

- নমস্কার মালহোত্রাজি, হুকুম কিজিয়ে|

- তোমাকে আর কি হুকুম করবো, তবে একটা অনুরোধ ছিল, তুমিই পারবে আমাকে সাহায্য করতে |টাকা পয়সা দিতে পারবো না, আগের থেকেই বলে দিচ্ছি, বস, দোস্তি কে নাতে আমার এই কাজটা করে দিতে হবে |

- আরে এতো কিন্তু কিন্তু করছেন কেন, বলেই ফেলুন |

- তাহলে শুরু থেকেই বলি, আমি কিছুদিন আগে মুসৌরি তে দুটো হোটেল লিজ নেবো ঠিক করেছি |

- আরে মুবারক হো মুবারক হো

- মুবারক গয়া তেল লেনে ভাই, আগে পুরোটা তো শুনে নাও, তো যেটা অপেক্ষাকৃত ছোট হোটেল সেটা বেশ ভালোই চলছে, বাজেট হোটেল বলতে পারো , তবে প্রাইম লোকেশনে | অন্যটা শহর থেকে একটু দূরে, মানে আরও উঁচুতে, প্র্রায়ে দু কিলোমিটার হাঁটার পথ|এখানকার হিসেবে এই হোটেলটা সবচেয়ে দামি হোটেল | পিক সিসনে রুম রেন্ট কুড়ি হাজার বা তারও বেশি হয়ে যায় | কিন্তু পাত্র ভাই, একবার উপরে পৌঁছে গেলে চোখ জুড়িয়ে যাবে, চার দিকে সবুজ আর পাহাড়, দূরে দেরাদুন শহর দেখা যায়, বলতে গেলে মনে হবে স্বর্গে এসে গিয়েছ|  

- তাহলে প্রব্লেমটা কোথায় ?

- য়ার, তুমি মুখ বন্ধ রাখবে না চুপচাপ শুনবে?

- ওকে ওকে বলিয়ে আপ ,

হেসে বলল রঞ্জন, ব্যাটা খেপে আছে কোনো কারণে

- এই হোটেলের নাম রাঘব প্যালেস প্র্রায় ১২০ বছর পুরোনো | আগে আংরেজরা চালাতো তারপর হাত বদল হয়, মহারাজ রাঘব সিংহের কাছে আসে | উনি আর পারছেন না ওটা চালাতে| তবে চালু হোটেল, রুমস খালি পাওয়া যায় না | কিন্তু প্রব্লেম হলো ম্যানেজ করা, রাজাজীর বয়েস হয়েছে, সন্তানরা কেউ উৎসাহী নন এই হোটেল চালাতে| তবে ওই লোকেশন উনি হাত ছাড়াও করতে চান না, তাই লিজে দেবেন ঠিক করেছেন| রাজকুমারদেরও তাই মত| আমার সাথে কথাবার্তা হয়েই আছে যে আমিই নেব ওটা| বয়ানাও পেশ করা হয় গিয়েছে |আমার ইনভেস্টররাও খুব উৎসাহী ওখানে টাকা লাগাতে |

মুখ খুলতেই যাচ্ছিলো পাত্র খপ করে বন্ধ করে নিল, নাহলে আবার কয়েক রাউন্ড খিস্তি খেতে হবে ওনার কাছে |

- কিন্তু একটাই প্রব্লেম, মানে লোকের মুখে শোনা যে ওই হোটেলটা নাকি ভূতহা, মানে ভূত জিন আছে |

- হাঃ হাঃ হাঃ , এবার আর মুখ বন্ধ রাখতে পারল না রঞ্জন | 

-ক্যা মলহোত্রা সাব, আপনি এই সব গালগল্পতেও কান দেন? খোঁজ নিয়ে দেখুন আরও কেউ কিনবে বলে এই রকমের গল্প ছড়াচ্ছে, যা হয় থাকে সচরাচর |

- হস্ মত্ মেরে ভাই, একবার নেটেও সার্চ করে দেখো, এ রকমের কথাই লেখা আছে, আমি আর গিন্নি পড়ে দেখেছি | আর তুমি তো জানোই তোমার ভাবীজি এসব খুব বিশ্বাস করে | জানার পর থেকেই কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে, বলছে ওই কন্ট্রাক্ট বাতিল কারো | ভাই, অনেক টাকা বয়ানা দিয়ে দিয়েছি, কন্ট্রাক্ট ক্যানসেল করলে একটা টাকাও ফেরত পাবো না | ইনভেস্টররা জুতো পেটা করবে আমায় |বাজারে শেয়ারের দামের কথা তো ছেড়েই দিলাম| আরেক দিকে গিন্নি, বলেছে এই হোটেল নিলে সে নাকি বাপের বাড়ি চলে যাবে সারা জীবনের জন্য |

- সে তো বুঝলাম, কিন্তু আমায় কি করতে হবে সেটা বলুন ? আমার মার্কেট রিসার্চ এখানে কি কাজে লাগবে তা তো বুঝলাম না | আমাদের কোনো মডেলেই ভূত নিয়ে রিসার্চ হয়েছে, এমনটা শুনি নি| আর আমি যদি করতেও যাই, আমাদের মার্কেট রিসার্চ সোসাইটি আমাকে দেশ থেকেই তাড়িয়ে দেবে |

- না না , তোমাকে শুধু ওই দুই হোটেলে গিয়ে ২-৩ দিন থাকতে হবে আর ওখানকার স্টাফ আর সার্ভিসগুলোর গুণগতমান দেখতে হবে| এইটা তো পারবে? কারণ আমি পুরোনো স্টাফ সরিয়ে নতুন স্টাফ নিতে চাই না | আর দ্বিতীয় হোটেলটায়ে গিয়ে শুধু ওই ভূতের ব্যাপারটা কতটা সত্যি সেটা যাঁচাই করে নেবে, ওখানকার স্টাফদের সাথে কথা বলে | এইটা তোমার ভাবীজির স্পেশাল রিকোয়েস্ট  তোমাকে | তোমার উপর অনেক ভরসা কি না ওনার , আমার থেকেও বেশি, হুম |বলতো ওনার সাথে তোমার কথা বলিয়ে দিচ্ছি | ভগবান কি কসম |

রঞ্জন বেশ বুঝতে পারলো যে মলহোত্রাজি ব্ল্যাকমেল করছেন ভাবীজির নামে |

- ঠিক আছে আমি যাবো, হাতে একটু কাজ আছে, কাল ওটা শেষ করে পরশুর মর্নিং ফ্লাইটের টিকেট আর হোটেলের রিসরভেশন ভাউচার পাঠিয়ে দেবেন |

- আরে পাঠাবো কি ? আজ রাত্রে পার্টি আছে ভুলে গিয়েছো, আমাদের ইনভেস্টর মিস্টার ভসিনের ফার্ম হাউসে? তখনি দিয়ে দেব আমি নিজের হাতে | তোমার জন্য আমি সোনমকেও ডাকছি তোমায় সঙ্গ দেয়ার জন্য | চলবে তো ? না আরও কাউকে বলবো? আগরতলার মেয়ে মার্সিও খুব একটা খারাপ না??

অবিবাহিত ও পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া  রঞ্জন পাত্রের এ সবে কোনো অরুচি নেই | কেউ হলেই হলো |

২.

ডরোথির যখন বারো বছর বয়স তখন বাবা মার সাথে লন্ডন থেকে বিশাল জাহাজে চেপে ইন্ডিয়া চলে এসেছিলো | এসেছিলো বললে পুরো বলা হয় না, আসতে বাধ্য হয়েছিল তারা | বাবা যেখানে চাকরি করতো সেই ফ্যাক্টরি বন্ধ হয় যায় | চেষ্টা করলে বাবা অন্য চাকরি জোগাড় করতেই পারতো, কিন্তু বন্ধুরা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলো যে ইন্ডিয়া তে নাকি প্রচুর সুযোগ, যেই যাচ্ছে অনেক টাকা কামিয়ে ফিরছে তাই বড়োলোক হওয়ার এমন সুযোগ বাবা হাত ছাড়া করতে চায় না | বেশ মনে আছে ডরোথির, সে বছরের বার্থডে পার্টির কথা | তেরো বছরের পার্টি মা বেশ বড় করেই দিয়েছিলো | ডরোথির পছন্দের চকলেট আর হেজেলনাট দিয়ে বিশাল কেকও বানানো হয়েছিল | অনেক বন্ধুরা এসেছিলো সেদিন | কি আনন্দটাই না হয়েছিল, মা বাবাও খুব আনন্দ করেছিল সেদিন | তারপর সে কত মাস ধরে জাহাজে করে ইন্ডিয়ার কলকাতা হয়ে লক্ষ্নৌ পৌঁছেছিল সে তো আরেক গল্প | বাবার লক্ষ্নৌতে এক ব্যবসায়ী বন্ধু, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গ্যারিসনে রসদের কাঁচা মাল  যোগান দিতো | বাবা তার সাথেই কাজে লেগে গেল| বলতে গেলে এখানে এসে ওদের ভালোই হল, সংসারে সচ্ছলতাও এল | কিন্তু সুখ বেশি দিন ডরোথি আর ওর মার কপালে টিকলো না |পাঁচ বছর কাটবার আগেই বাবা ওর বন্ধুর মেয়ে যে ডরোথির থেকে ৫-৬ বড়, দেখতেও মোটা আর বিচ্ছিরি , তাকে বিয়ে করে আলাদা হয় গেল | বোধহয় এই আশায় যে একদিন সে বন্ধুর ব্যবসায়ের বড় অংশীদার হবে |

 মা এ ঘটনার পর একদম ভেঙে পড়েছিল | একা মহিলা, সাথে আঠারো বছরের মেয়ে, হাতে টাকাপয়সাও বিশেষ নেই কি দিয়ে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিলো না | সেই সময় পাশের বাড়ির নকুলরা না থাকলে যে কি হতো কে জানে | নকুল পাসোয়ান আর ওর মা পাশের বাড়িতেই থাকতো |ডরোথির মাকে নকুলের মা খুব ভালোবাসতো | শুরুতে কেউ কারো ভাষা বুঝতো না ঠিকই কিন্তু ধীরে ধীরে ডরোথির মা এখানকার ভাষা শিখে নিয়েছিল, ভাঙা ভাঙা ভাষায় দুজনই বেশ ভাব আদানপ্রদান করে নিত| নকুল এখানকার কোম্পানির ফৌজে কাজ করত, কিন্তু অনেক নিচুতলার সৈনিকের কাজ , মাইনেও বেশি পেতো না | বোধহয় ঘোড়াদের দেখাশোনা করতো | ডরোথি  মৌকা পেলেই পেছনে লাগতো, নকুল নাকি ধারে কাছে থাকলে টের পাওয়া যায়, কি রকম ঘোড়া ঘোড়া গন্ধ ছড়িয়ে যেত চার দিকে | ওর কথায় সবাই খুব হাসতো| নকুল কোনো দিন রাগ করতো না ডরোথির কথায়, কিন্তু ও হাসলেই নকুল ওর দিকে কি রকম ভাবে যেন তাকিয়ে থাকতো | ডরোথি কি আর ওর চোখের ভাষা বুঝতো না ? খুব বুঝতো | কিন্তু মেয়েরা কি কখনো আগ বাড়িয়ে ভালোবাসা দেখায় ? একদম না, মা ছোটবেলার থেকেই শিখিয়ে ছিল যেই একদিন এসে খবর দিলো যে মা যদি রাজি থাকে তাহলে এখানকার এক নবাব সাহেবের বাড়িতে একটা চাকরি আছে, নকুল সে ব্যবস্থা করে দিতে পারে | বিশেষ কিছুই না, শুধু নবাবের ছেলেদের অঙরেজী ভাষা আর তহজীব শেখাতে হবে | এই হলো চাকরি, আর বেগমসাহিবা কে যদি একটু আধটু অঙরেজী শিখিয়ে দিতে পারেন তাহলে সোনে পে সুগন্ধ হয় যাবে | সংসারের যা অবস্থা না করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না | মা নবাবের বাড়িতে চাকরিটা নিয়ে নিলো | মা চাকরি পেয়ে যাওয়াতেই বোধহয় ডরোথি আর নকুল কাছাকাছি আসার বেশি সুযোগ পেলো | এমনিতে নকুল বেশ সুপুরুষ, গায়ের রংটা একটু কালোর দিকে হলে কি হবে, ব্যায়াম করা স্বাস্থবান শরীর | ডরোথির সাদা আদমিদের থেকে এই কালা আদমিই বেশি পছন্দ | কি রকম যেন একটা বুনো গন্ধ সারা শরীরে, পাগল করে দিতো ডরোথি কে | দুজনই স্বপ্ন দেখতো বিভোর হয়ে | একদিন নিজেদের ঘর হবে, ডরোথি বাড়ি ঘর সামলাবে, নকুল রোজগার করে আনবে, আর সব টাকা সে ওর হাতে তুলে দেবে, শুধু বিড়ির জন্য একটু রাখবে নিজের কাছে | ডরোথির ওই একটাই অপছন্দ, বিড়ির গন্ধ | একদম সহ্য করতে পারতো না সে | সে যাকগে, ওই টুকুন না হয় সহ্য করে নেবে ডরোথি | কিন্ত মুশকিল হলো ওদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, নকুল চায় তাদের ছেলে মেয়ে ডরোথির মতো ফর্সা হবে আর ডরোথি চায় নকুলের মতো হবে | সে তর্ক সব সময়ই শেষ হত অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে |

নকুলের আজকাল নিজের কাজ নিয়ে একটা হীনমন্যতা ভাব আসছে, হবে নাই বা কেন,গোরি মেম বিয়ে করা কি চাট্টিখানি কথা ? ডরোথির ইজ্জতে লাগবে না যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে ওর আদমি কি করে ? ও কি করে বলবে যে সিপাহীদের ঘোড়ার আস্তাবলে কাজ করে ? নাহ, কিছু একটা করতেই হবে | সত্যিকারের ইচ্ছে থাকলে সুযোগ এসেই যায়, এই কথাটা মা সব সময় বলে| এক বন্ধুর মারফত সেটাও পেয়ে গেল | কোলকাত্তা থেকে রাজধানী দিল্লি হয় যাওয়াতে মেরঠ ছাওনিতে প্রচুর লোক নেয়া হচ্ছে, ভালো মাইনে আর খাওয়াদাওয়া আলাদা করে | এ রকম সুযোগ আর আসবে না | এমনটাই বোঝালো সেই বন্ধু | সত্যি তো, এ সুযোগ কি আর পাওয়া যাবে ? কিন্তু একটাই চিন্তা, ডরোথি কে নিয়ে, ও যে একলা হয় যাবে? কথাটা ওকে জানানোর পর তো ও প্রচণ্ড রেগে গেলো | এ রকম উল্লুর মতো কেউ ভাবে নাকি ? নকুল যা চাকরি করে তাতে ডরোথির কোনো অসুবিধা নেই | অনেক তর্ক আর কান্নাকাটির পর ডরোথি শেষে রাজি হলো | তবে একটাই শর্ত যে যথেষ্ট টাকাপয়সা হয় গেলে নকুল ফিরে আসবে, তারপর তারা বিয়ে করে, এখানেই ছোটোখাটো কিছু কাজ শুরু করে দেবে |

একটা ভালো দিন দেখে নকুল যাত্রা শুরু করলো মেরঠের উদ্দেশে| নকুলের মা আর ডরোথি চোখে জল নিয়ে নকুল কে বিদায় জানালো | সেই বোধহয় শুরু হলো ডরোথির খারাপ সময় | একদিন মার অভিজ্ঞ চোখ ধরে নিলো যে ডরোথি অন্তঃসত্ত্বা|

ডরোথি সব কথা মাকে জানালো | কিন্তু আশ্চর্য, মা কি করে ভুলে গেল যে নকুলই একদিন তাদের সাহায্য করেছিল বলে আজ তারা খেয়ে পরে বেঁচে আছে? সে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মার দিকে| এই কি সেই মা যে নকুলের হাত ধরে কতই না কেঁদেছিলো নবাবের বাড়ি চাকরি হবার পর ? তার উপকার কি করে শোধ করবে তার জন্য ? স্থির হয় তাকিয়ে থাকে মার দিকে |

- বাজে কথা বোলো না ডরোথি, সব হয় নিজের ভাগ্য থেকে, নকুল শুধু যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে | তারজন্য তাকে বিয়ে করতে হবে তোমাকে সে রকম কোনো যুক্তি আমি মানতে রাজি না | এখনো তোমার সব কিছু বোঝার বয়স হয় নি | তুমি জানো , ওকে যদি তুমি বিয়ে করো তাহলে আমাদের ইংরেজ সমাজ আমাদের এক ঘর করে দেবে? ক্লাবে আমাদের ঢুকতে দেবে না, চার্চে আমাদের আলাদা বসতে হবে কালা আদমিদের সাথে? এই অপমান আমি সহ্য করতে পারব না, আমি সুইসাইড করব, এই তোমাকে জানিয়ে রাখছি | আমি আর এ নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে চাই না | আমি তোমার বিয়ের জন্য বেগম সাহিবার সাথে কথা বলব, উনি নবাব সাহেবকে বলে কিছু ব্যবস্থা করে দেবেন |

ডরোথি আর কিছু ভাবতে পারছে না | মা ওকে কালা আদমিকে বিয়ে করতে আপত্তি করছে, কিন্তু সেও তো জানে নবাবের সাথে মার কি সম্পর্ক ? কিন্তু বললে কি হবে, মা তো শুনতেই চাইবে না তার কথা |

ডরোথি আর ভাবেনি কিছু, সে তো মার মতো শক্ত না | সব ভাবনা চিন্তা সে এক রাত্রে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছিলো গোমতী নদীর জলে| সে রকমই ব্যবস্তা করে দিয়েছিলেন বেগম সাহিবা, মার সাথে কথা বলে | ওনাদের অন্দরমহলে তো এ রকম ঘটনা প্রায়ই হয় | এ আর এমন কি ব্যাপার |

আজ ছেচল্লিশ বছর বয়স হলো ডরোথির, কিন্তু আজ ভুলতে পারেনি সে সব কথা সে | তারপর তার বিয়ে হয়ে গেল এক সরকারি কর্মচারী মিস্টার রিচার্ড রেনোল্ড এর সাথে | খুব ভালো মানুষ উনি | খুব সুখে রেখেছেন উনি ডরোথিকে | ডরোথির দুই ছেলে এখন স্কটল্যান্ড এ থাকে | রেনোল্ড ও ঠিক করেছে রিটায়র করে দুজনই চলে যাবে স্কটল্যান্ড এ | একটা ছোট্ট ফার্ম ও কেনা আছে ওখানে | বেশ কেটে যাবে শেষ বয়সটা | এমনটাই ইচ্ছা দুজনের | গতকালই এসে পৌঁছেছে দুজনে মুসৌরিতে | নিচে এখন গরমকাল তাই সরকারি কর্মচারীরা মুসৌরিতেই নিজেদের রাজকার্য্য অনেক কষ্ট করে সম্পন্ন করেন | ক্লাব, পার্টি, এ সব ছাড়া তো আর কোনো কাজ করতে দেখেনি ডরোথি এদের | তা নিয়েই সবাই ব্যস্ত থাকে এখানে |

নাহ, একটু পরেই সন্ধ্যে হয় যাবে | পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে নেমে আসে| রিচার্ড ফিরে আসার আগেই একটু হেঁটে আসবে মালের দিকটা | রোজই যায় সে | সারাদিন হোটেল রুমে আর কত বসে থাকা যায় | তারপর তো শুরু হবে ওদের সেই পার্টি | ভীষণ বিরক্তিকর সেগুলো | ড্রিংক করে মাতলামো ছাড়া তো আর কিছুই হয় না সেখানে | আনমনেই নিচেরদিকে হেঁটে নামছিলো ডরোথি | হঠাৎ কার ডাকে সে দাঁড়িয়ে পড়লো |বড়ই আপন আর চেনা যেন গলার আওয়াজটা ? বলতে গেলে থমকেই দাঁড়ালো সে |সামনে দাঁড়িয়ে নকুল, নকুল পাসোয়ান | মাথায় কাঁচা পাকা চুল ছাড়া আর কিছুই বদলায়নি ওর| একবারেই চিনতে পারলো সে নকুলকে |

- ডরোথি তুমি এখানে ? 

- - নকুল?

আর কিছু বলতে পারলো না ডরোথি | শরীরে কি রকম কাঁটা দিয়ে উঠলো | কতদিন পর যেন শুনলো নিজের নামটা| এতো বছর পর দেখা | দুজনেই কোনো কথা বলতে পারছে না শুধু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া |

- তুমি এখানে কি করছো? অনেক্ষন পর ডরোথীই কথা বললো |

- আমি এখানের ডিউটিতে এসেছি | যতদিন এখানে সাহেবরা থাকবে, আমাকে থাকতে হবে | চোখের থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিলো নকুল |

- চুল পেকে গিয়েছে তো তোমার? বুড়ো হয়ে গিয়েছো? ম্লান হেসে ডরোথি বললো| পরিস্থিতি হালকা করার জন্যই বোধহয়| কিন্তু তা কতটা হল বলা মুশকিল |

-তুমিও তো বুড়ি হয়ে গিয়েছো ? হেসেই নকুল বললো | যদিও নিজের আওয়াজই নিজের কাছে কি রকম অস্বাভাবিক শোনালো |

-সলাম মেমসাব , একজন পথচারীর কথায় ওদের সম্বিত ফিরে এলো | ডরোথি ওই পথচারীর দিকে তাকিয়ে হালকা করে মাথা নেড়ে অভিবাদন স্বীকার করল|

- এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না নকুল, ওই দিকের রাস্তায় যাও, আমি আসছি | ইশারা করে মালের বাঁ দিকের অপেক্ষাকৃত খালি রাস্তাটা দেখিয়ে দিলো | এতদিন পরে দেখা ওর সাথে, আজ নিজের মনের ভার না নামাতে পারলে তো চলবে না, অনেক দিন ধরে তো বয়ে বেড়াচ্ছে সে | নকুল বাধ্য ছেলের মতো নেমে চলে গেল মালের দিকে, যে দিকে ছোট রাস্তাটা গিয়েছে | ডরোথি ও নিচে নেমে একটা গরম জামা কাপড়ের দোকানের কাছে দাঁড়ালো | দরকার নেই তবুও একটা গলার স্কার্ফ কিনে নিয়ে, একটু চারদিকটা চোখ বুলিয়ে নিলো, কেউ চেনাজানা নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে নিলো সে | তারপর একটু অন্যমনস্ক ভাবেই সে ছোট রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গেল | এদিকে বিশেষ লোকজন আসে না, এমনিতেই সন্ধ্যা হয়ে আসছে| একবার রিচার্ডের কথা মনে হলো, দেরি করে ফিরলে হয়তো চিন্তা করবে | কিছু একটা বলে দিলেই হবে | ওর এমনিতেই ক্লাবে যাওয়ার তাড়া থাকবে | বেশিক্ষণ বসে থাকবে না ডরোথির অপেক্ষায় | একটু এগোতেই দেখতে পেলো নকুলকে | খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছে | দূর থেকে ভালো করে দেখলো ডরোথি | লং কোট, মাথায় হ্যাট, বেশ সুদর্শন লাগছে | চেহারায় সেই আগের গ্রাম্য ভাব নেই | দাঁড়ানোর ভঙ্গিমাতেই মনে হচ্ছে বেশ উন্নতি হয়েছে নকুলের | অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো ডরোথির |

রাস্তার থেকে একটু পাশে সরে একটা পাথরের উপর বসলো দুজনে | সূর্য্য ডুবতে যাচ্ছে, আকাশের একপাশটা লাল হয় আছে | দুজনই তাকিয়ে রইলো লাল আকাশের দিকে | | নকুলের বুকে যে ডরোথির প্রতি রাগ আর অভিমান, সেটা তো দূর করতেই হবে ডরোথিকে সেই তো অপেক্ষা করেনি নকুলের |

- কিছু বলবে না তুমি আমাকে?

- কি বলবো, বলার কি আছে আমার | বলতে গিয়ে গলাটা বুজে এলো নকুলের|

ডরোথি আর পারলো না নিজেকে আটকাতে, দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো নকুলকে | চোখের বাঁধ যেন ভেঙে পড়লো দুজনের চোখ থেকেই | আজ কোনো কথা না, শুধু অনুভব করা | কিন্তু বলতে তো হবেই ওকে | সব কিছুই বললো সে নকুল কে |  তাদের সন্তান, যে দেখলই না কে তার বাবা, কে তার মা, ভাসিয়ে দিয়ে এসেছিলো গোমতীর জলে | নিজের বিয়ে, যেখানে কোনো প্রতিবাদই টেকেনি মার জিদের কাছে |

আর নকুল? তারও তো অনেক কথা বলার আছে ডরোথি কে ? সেও তো ফিরে এসেই জানতে পারলো যে ডরোথির বিয়ে হয় গিয়েছে | দৌড়ে গিয়েছিলো ডরোথির মার কাছে, নবাবসাবের লোকেরা দেখা করতে দেয়নি ওর মার সাথে | তারপর তো সেও আর ফেরেনি লখনৌয়ে | মাকে নিয়েই চলে এসেছিলো মীরাঠে | না, সে বেইমানি করেনি তার ভালোবাসার সাথে, সে আর বিয়ে করেনি | ডরোথির স্মৃতি বুকে নিয়েই এতটা বছর কাটিয়ে দকত না বলা কথা বলার আছে দুজনের, সে কি এই এক দিনেই শেষ হবার ?

- এবার ফিরে যাও ডরোথি, রাত হয় গিয়েছে ,

নিজের হাত ডরোথির হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে বললো নকুল

- আর কি আমাদের দেখা হবে না নকুল?

আবার নকুলের হাত চেপে ধরলো ডরোথি, আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলো সে |

- সেটা কি ঠিক হবে? এটা আমাদের সমাজ পাপ মনে করে| 

ঠিক মন থেকে বোধহয় বললো না নকুল | মাথায় টুপিটা পরে উঠে দাঁড়ালো সে|

ডরোথি বসেই রইলো |

- সে যে যাই মনে করুক, কাল আমি আবার এখানে আসবো | তোমার ইচ্ছে হলে আসবে

একটু রেগেই যেন বললো সে| উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রাস্তা ধরলো|

- দাঁড়াও ডরোথি, অন্ধকার হয়ে গিয়েছে, আমি তোমায় পৌঁছে দিচ্ছি |

- না, তার দরকার নেই

নকুল শুনলো না কথা, একটু দূরত্ব বজায় রেখে নকুল ওর পেছনে হাঁটতে লাগলো |

বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে | অনেক দিন পর যেন ওরা দুজনই নিজেদের ফেলে আসা দিনগুলো ফিরে পেলো | রোজই দেখা হতে লাগলো | একই সময় একই জায়গায় | কথা আর যেন শেষ হয়না | স্থান কাল আর খেয়াল থাকে না | তাও যেন মন ভরে না দুজনের | কোনো বাধা নিষেধ না পেয়ে বোধহয় সাহসটা আরও বেড়ে গিয়েছিলো ওদের | ছোট শহর, চোখে পড়তে বা কানাঘুষো শুরু হতে তো বেশি সময় লাগে না | হয়েছিলও তাই, যখন রিচার্ডের আর্দালির মুখমুখী পরে গেল ওরা | আর্দালি মহমুদ, কিছুই বলেনি ওদের |


৩.

- এক্সকিউস মি স্যার ! আর ইউ ওকে স্যার !!

এয়ারহোস্টেসের উদ্বিঘ্ন গলা পেয়ে তন্দ্রা থেকে জেগে উঠলো রঞ্জন |

- কি হয়েছে ? বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলো সে এয়ারহোস্টেসকে | চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো একবার, সব কো-প্যাসেন্জাররা কি রকম অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে | নিজেকে সামলে নিলো সে |

- না না, আমি ঠিক আছি, একটু জল দেবেন ?

বুঝতে পেরে বেশ লজ্জিত বোধ করছিলো রঞ্জন | নিশ্চই ঘুমের ঘোরে চেঁচিয়ে উঠেছে সে | এইটা অবশ্য প্রায়ই হয় তার | যারা শুয়েছে তার সাথে তারাই জানে| আজ সকালেই তো বললো সোনম |

 - আর কতক্ষণ লাগবে জলি গ্রান্ট এ নামতে?

জলটা এক ঢোকে খেয়ে গ্লাসটা ফেরত দিতে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো |

- এনাউন্সমেন্ট হয় গিয়েছে স্যার, একটু পরেই নামবো, আপনি সিটটা সোজা করে নিন আর সিটবেল্ট পরে নিন |

মিষ্টি হেসে জবাব দিলো এয়ারহোস্টেস| 

মোবাইলের ঘড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিলো সে | এয়ারপোর্টে গাড়ি থাকবে, মুসৌরি পৌঁছুতে আরও দুই থেকে আড়াই ঘন্টা লাগবে, অবশ্য যদি ট্রাফিক ঠিকঠাক থাকে | কি স্বপ্ন দেখছিলো সে? ইশ, আজেবাজে কিছু বলে ফেলেনি তো স্বপ্নের মধ্যে? কে জানে? আর বলে ফেললেই বা কি হবে, এরা তো আর রঞ্জন পাত্রকে চেনেনা | কাঁধ ঝাকালো একবার সে, দূর, বয়েই গেল তার | মনে মনে এক চোট হেসে নিলো সে |

গাড়িতে বসে আবার চোখটা বুজে এলো তার | কাল একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল ড্রিংক্সটা| তারপর বলতে গেলে প্রায় অনেক রাত অবধি জেগে ছিল তারা | কিন্তু একটা জিনিস বেশ আশ্চর্য লাগছে তার, চোখ বন্ধ করলেই একটা মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে | সব ওই ব্যাটা মলহোত্রার দোষ| মলহোত্রার একটা বেশ ভালো গুন আছে| ও গল্প এমন ভাবে বলে যে পুরো ঘটনা একদম চোখের সামনে ভেসে উঠবে | তাই হয়েছে কাল | ব্যাটা নেট ঘেঁটে আর তার উপর রং চড়িয়ে ওই হোটেলের ভূতের গল্প যা শুনিয়েছিল তাতে সবাই বেশ ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলো | মেয়েগুলো শেষে হল্লা করাতে, মাঝ পথে মলহোত্রাকে ওই গল্প থামাতে হল| যদিও ঘোষণা করে দিলো যে বাকি গল্প পাত্র এসে শোনাবে | পাত্র এসে ঘন্টা শোনাবে | মনে মনেই হেসে উঠলো রঞ্জন | যত্তসব বুজরুকি |

নাহ, মলহোত্রা কিছু ভুল বলেনি | সত্যি অপূর্ব জায়গায় বানানো এই হোটেলটা | মাল রোডের ডান দিকে দিয়ে পাঁচশো মিটার উপরে উঠলেই বোঝা যায় কি জায়গায় | সাদা দোতালা বিল্ডিং, সবুজ রঙের ছাদগুলো তেরছা ভাবে বানানো যাতে বরফ আটকে না থাকে | ঢোকার মুখে ছুঁচলো দুই সাদা গম্বুজ | পুরোনো গথিক আর্কিটেকচার কে নকল করার অপচেষ্টা বলা যেতে পারে, তবে দেখতে মন্দ লাগছে না গম্বুজ দুটো | বিল্ডিঙের সামনের মাঠটা পুরো খোলা আর তারপরই খাদ | পুরো মাঠটায় খেলার জায়গা | এক দিকে ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার জায়গা আর এক দিকে ইংরেজদের বিশেষ করে মহিলাদের প্রিয় ক্রকে খেলার জায়গা | খেলাটার কথা অনেক শুনেছে রঞ্জন, একবার খেলতে হবে | বেলবয় এসে হাতের ব্যাগটা নিয়ে রিসেপশন হয়ে নিজের রুমে নিয়ে গেল | রঞ্জন হোটেলের ভেতরটা ভালো করে দেখে নিচ্ছিলো | বেশ ইংরেজ আমলের ছাপ পুরো হোটেলটায়ে | আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দেয়াল ছাদ সব কালো রঙের কাঠের, রঞ্জন কাঠ চেনেনা তবে সেগুন কাঠ হবে হয়তো | পেইন্টিং গুলোও বেশ পুরোনো |সব মিলিয়ে বেশ একটা পুরোনো ইউরোপিয়ান ছাপ পুরো হোটেলটায়ে ছড়িয়ে আছে | রুমটাও তাই, উঁচু খাট, মশারি লাগানোর খুঁটি থেকে শুরু করে, টুপি-রেইনকোট রাখার জায়গা সব যেন নিখুঁত ভাবে সেই ইংরেজ আমলকে ধরে রেখেছে | হোটেলটা সত্যি খুব পছন্দ হলো রঞ্জনের | খাটের পাশের টেবিলে সরু লম্বা গ্লাসে রাখা তাজা ফলের রসে একটা চুমুক দিয়ে আবার রেখে দিলো সে |

রঞ্জনের অভ্যেস, হোটেলে ঢুকেই আগে বাথরুম চেক করা | কিন্তু না, আগে বাথরুম শুরু হলো না| আগে ড্রেস চেঞ্জ করার মাঝারি আয়তনের ঘর | এখানেও সেই পুরোনো সময়ের ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, আলনা ইত্যাদি | সাবাসি দিতে হয় ম্যানেজমেন্ট কে| এরপর বাথরুম, তারপর একটা দরজা| দরজাটা খুলতে গিয়ে কেমন যেন হাতটা কেঁপে উঠলো রঞ্জনের | সব ওই রাত জাগার ফল | দরজা খুলতেই সামনে ছোট্ট একটা রেলিং দেয়া ব্যালকনি, তারপরই খাদ | ঝুঁকে দেখতে গিয়ে মাথাটা কেমন একটু ঘুরে গেল | তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে নিয়ে, লাঞ্চটা গিলে একটা ভালো ঘুম নেয়া ভীষণ দরকার তার | রঞ্জন আর সময় নষ্ট না করে ব্যাগ থেকে জামা কাপড় বার করে বাথরুমে ঢুকলো |

ডাইনিং রুমে যাবার আগে একটা ছোট হল, এইটা বার কম লাইব্রেরি | কেউ নেই এই সময় | একটা ড্রিঙ্কস নিলে বেশ হয়, ঘুমটা ভালো হবে মনে করে একটা টেবিল দখল করলো সে |

সেকালের উর্দি পড়া বেয়ারা, হ্যাঁ, ওয়েটার না বলে বেয়ারা বললেই বেশ মানানসই হয়,

- ক্যা লেঙ্গে সাব , খুব নম্র ভাবে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো | বেশ লাগলো স্যারের বদলে ‘সাব’ ডাকটা শুনে |  

- একটা লার্জ ভদকা, টনিক ওয়াটার দিয়ে দাও

- জি সাব , বেয়ারা বার কাউন্টারে চলে গেল |

ভালো করে লক্ষ্য করলো লোকটাকে |বেশ বয়স্ক, বোধহয় সত্তরের কাছাকাছি হবে| এক মুখ দাড়ি, গোঁফ নেই | মুসলিম হবে হয়তো | একটু পরেই একটা ট্রেতে গ্লাস ইত্যাদি সাজিয়ে সামনে রাখলো | তারপর পটু হাতে গ্লাস বানাতে লাগলো|

- আইস কীতনা সাব|

- দুটো দাও 

- কি নাম তোমার

একটু চমকেই গেল বেয়ারাটি | কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে না নাম, তাই |

- জি, সাদিক

মাথা নিচু করেই জবাব দিলো সে | চলে যাচ্ছিলো ও, রঞ্জন আবার ডাকলো |

- বাহ্, খুব ভালো বানিয়েছেন তো ড্রিংক্সটা| টনিক ওয়াটারের সাথে আরও কিছু দিয়েছে মনে হচ্ছে ?

- জি সাব, একটা কাঁচালঙ্কা, মাঝখান থেকে চিরে আর কালা নমক দিয়েছি | 

- আরে বাহ, তাই তো, আগে একদম লক্ষ্য করিনি লঙ্কাটাকে | ভেরি গুড |

- শুকরিয়া সাব | সলাম করে আবার নিজের কাউন্টারে ফিরে গেল সাদিক |

নাহ, এ ব্যাটা সহজে ভাঙবে না | সময় লাগবে | তাও চেষ্টা চালিয়ে গেল রঞ্জন আলাপ জমাবার জন্য |

- তোমার ডিউটি কতক্ষন এখানে ?

- জি রাত্রি বারোটা অব্দি, তারপর বার বন্ধ হয় যায় 

যাক অনেক সময় পাওয়া যাবে এর কাছ থেকে খবরাখবর জোগাড় করার | টেনশন নেহি লেনে কা! এসব তো রঞ্জনের বাঁ হাতের খেলা | এখন খাওয়াটা সেরে নিয়ে বিছানাবিছানায় শুয়ে হঠাৎ একটা খুব চেনা গন্ধ যেন নাকটা ছুঁয়ে গেল | ঠিক ধরার আগেই গায়েব হয় গেল | ভীষণ চেনা চেনা গন্ধ | চোখটা বন্ধ হয় আসছে রঞ্জনের, গভীর ঘুমের মধ্যেও বেশ কয়েকবার সে টের পেলো সেই গন্ধটা, কিসের গন্ধ পারফিউম না কারোর শরীরের বিশেষ গন্ধ ? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না |

মোবাইলের অ্যালার্ম বাজতেই ঘুম ভেঙে গেল রঞ্জনের | বিকেল ছটা, এক ঝটকায় গায়ের মোটা চাদরটা সরিয়ে সে বাথরুমে চলে গেল | কিন্তু এ কি? ব্যালকনির দিকের দরজাটা হাট করে খোলা! রঞ্জনের পরিষ্কার মনে আছে ব্যালকনির দিকের দরজা সে বন্ধ করে দিয়েছিলো স্নান করার আগে, তাহলে কি ঠিক করে বন্ধ হয় নি সেই সময়? খাদের দিক থেকে আসা জোরালো হাওয়ায় আবার খুলে গিয়েছে? হতেই পারে | নানা ঘটনার মাঝে এই যুক্তিটাই ঠিক মনে হল|

ডাইনিং হল, মোটামুটি শান্ত পরিবেশ, তিনটে বয়স্ক কপল শুধু বসে, সামনে ড্রিঙ্কস নিয়ে | তারাই মাঝারি স্বরে কথা বলছে | দিল্লিরই মনে হলো | আজ ভ্যালেনটাইন ডে , তাই নিয়ে হাসাহাসি চলছে নিজেদের মধ্যে | এ সব থেকে রঞ্জন বেঁচে গিয়েছে, বিয়েই করেনি, তাই ওসব নিয়ে তার মাথা ব্যথাও নেই | সামনের একটু উঁচু জায়গায় লাইভ ব্যান্ডের ব্যবস্থা | উইকডেস বলে হয়তো তেমন নামি দামি ব্যান্ড নেই | একজন শুধু পিয়ানোতে কিছু পুরোনো ওয়েস্টার্ন টিউন বাজাচ্ছে | ডাইনিং হলটা বেশ বড়, প্রায় পঁচিশ - তিরিশটা টেবিল আছে | পুরো দেয়ালটা কাঠের সাথে দামি দামি পেইন্টিংস টাঙানো | ছাদ থেকে তিনটে ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে, মাঝেরটা সবচেয়ে বড় | দেখেই মনে হচ্ছে খুব দামি আর পুরোনো | মোমবাতিগুলো থেকে আলো, ক্রিস্টলস থেকে ছেঁকে বেরিয়ে জায়গাটা বেশ একটা আলো আঁধারী পরিবেশ করে রেখেছে | জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য সত্যি খুব সুন্দর | বাইরে কোনার দিকে একটা ভগ্ন দোতালা বিল্ডিং | লাঞ্চের সময়ই দেখেছিলো রঞ্জন, বেয়ারা বলেছিলো ওটা ইংরেজদের পুরোনো ক্লাব হাউস, ওখানের অনেক সামানই এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন ওই পিয়ানো, বিলিয়ার্ড টেবিল, ওই লাইব্রেরির কিতাব সব | রঞ্জন ওই বেয়ারা কে জিজ্ঞেস করেছিল ঠাট্টা করে

- এখানে ভূত কখন আসে ভাই ?

বেয়ারা হেসে ফেলেছিলো

- এমনটা এখানে কিছু নেই সাব, সব ঝুট হ্যায় |

বলে আর দাঁড়ায়নি বেয়ারাটা | মনে মনে হেসেছিলো রঞ্জন, সব মার্কেটিং স্ট্রাটেজি, বলছি কিন্তু বলছি না, আর কি | বিদেশিরা এসব ভালো খায় |

- এক্সকিউস মি স্যার

অন্য টেবিলের গেস্টদের মধ্যে এক ভদ্রলোক |

- গুড ইভনিং, আপনার নাম জানতে পারি কি

খুব নম্রতার সাথেই ভদ্রলোক বললেন

- ওহ নিশ্চই, রঞ্জন, রঞ্জন পাত্র ইস মায় নেম | উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো রঞ্জন | ভদ্রলোক ও হাত বাড়ালেন |

- আমার নাম নীতিশ ভাটিয়া, আমরা তিন বন্ধু গিন্নিদের নিয়ে দিল্লি থেকে এসেছি | আসলে আমরা তিনজন রিটায়ার্ড লোক, গিন্নিরা জিদ করছেন আজ ভ্যালেনটাইন ডে, তোমরা তিনজন আমাদের এন্টারটেইন কর| বলুন দেখি এ কি আমাদের বয়েস এসব নাচানাচি করার ? তা আপনি একলা বসে আছেন দেখে সবাই বললো আপনিও আমাদের সাথে জয়েন করুন | অবশ্য যদি আপনার আপত্তি না থাকে |

হা হা করে হেসে উঠলো রঞ্জন, হাত তুলে দূরে ওদের ওয়েভ করলো সে |

- নিশ্চই জয়েন করবো, চলুন |

রঞ্জন বেয়ারা কে ইশারা করলো ওর গ্লাস আর অন্য সব জিনিস ওদিকের টেবিলে নিয়ে আসতে |

আলাপ পরিচয়ের পর ওদের সাথে আড্ডা দিতে বেশ ভালোই লাগছিলো | মাঝখানে পিয়ানোতে একটা নাচের টিউন বাজানোতে সব ছেলেরা মহিলাদের এন্টারটেইন করার জন্য নাচলো | হাসি ঠাট্টাতে বেশ সময়টা কাটছিলো | হঠাৎ দেখলো ঘড়িতে তে সাড়ে এগারোটা বাজে | এবার সময় হয়েছে সাদিক বুড়ো কে পাকড়াও করার | ওদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সে এগিয়ে গেল লাইব্রেরির দিকে | বেশি ড্রিংক হয়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে রঞ্জনের | পা একটু বেসামাল |


- সাদিক ভাই, একটা ড্রিংক বানাও, ডবল ব্ল্যাক লার্জ | রুম নম্বর মনে আছে তো ? ২০২ |

- জি সাব

- সাদিক ভাই একটু এদিকে আসবে?

- জি সাব

গ্লাসে একটা চুমুক দিলো রঞ্জন

- কত বছর হল কাজ করছো এখানে ?

- জি, কুড়ি বছর বয়সে এখানে শুরু করেছিলাম, এখন আমার বয়েস বাহাত্তর | আমার আগে আমার আব্বা হুজুর এখানে কাজ করতেন, ওনার পর আমি এই কাজ পাই | ম্যানেজমেন্ট কি মেহেরবানী যে ওনারা আমাকে এখনো রেখেছেন | |

- বাহ্, খুব ভালো তো | এরপর তোমার ছেলে নিশ্চই এখানে আসবে ?

- না সাব , ও দিল্লিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, ও এই কাজে আসবে না | আমিও আর দু মাস আছি এখানে | তারপর চলে যাবো দিল্লিতে ছেলের কাছে|

- তুমি একলাই যাবে না তোমার বিবিও যাবে তোমার সাথে |

- বিবি তো অল্লাহ কি প্যারি হয় গিয়েছেন অনেক আগেই | আমি একলাই যাবো |

একটু ম্লান হেসে জবাব দিলো সাদিক |

- সাব এবার বার বন্ধ করার সময় হয় গিয়েছে, আপনি কি আরেকটা ড্রিংক নেবেন? বলতে গিয়ে হঠাৎ উপরের দিকে তাকালো সাদিক|

রঞ্জনও ওর দেখাদেখি তাকালো, উপরের ঝাড়লণ্ঠনটা আলতো করে দুলছে যেন? হাওয়া তো নেই, দুলছে কি করে?

সাব, উঠুন এবার, বার বন্ধ করার সময় হয় গিয়েছে |

রঞ্জন এক ঢোকে গ্লাসটা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো | পা একটু কাঁপছে যেন, সাদিক এসে ওকে ধরে নিলো, না হলে হয়তো পরেই যেত সে |

- একটু দাঁড়ান সাব, আমি তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে নিচ্ছি, আপনাকে রুমে পৌঁছে দেব |

রঞ্জন কিছু বললো না | কিছু যেন চিন্তা করছে সে | গন্ধটা কি আবার পাচ্ছে সে? জোরে নিশ্বাস নিলো সে, হ্যাঁ ঠিক পাচ্ছে সে | অনেক জোরালো, অনেক স্পষ্ট |

- আইয়ে সাব

হাতটা ধরলো সাদিক |

- রুমে যাবো না সাদিক, একটু বাইরে যাবো আমি, তুমি আমাকে নিয়ে চল |

কি রকম যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে শরীরে আর মনে| ঠিক বোঝানো যাবে না কি| বাইরে খোলা জায়গায় একটা সিঁড়ির উপর বসলো সে | ইশারা করে সাদিককেও বললো বসতে |

- সাদিকভাই, তোমার তাড়া নেই তো? একটু বস না আমার কাছে |

- জরুর সাব, কোনো তাড়া নেই, আমি বসছি আপনার কাছে |

- সাদিকভাই, তুমি তো অনেক কিছুই জানো এই জায়গার সম্বন্ধে | আর ওই ঝাড়লণ্ঠন, ওটা কেন দুলছিলো?

 কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে বটে কিন্তু জ্ঞান ঠিক আছে রঞ্জনের |

- এ রকম মাঝেমাঝেই হয় সাব, ডরোথি যখন আসে তখন হয় |

চমকে উঠে দাঁড়ালো রঞ্জন, এই নামটাই তো স্বপ্নে বার বার শুনে আসছে সে |

সাদিক আবার ধরে বসালো রঞ্জন কে |

- সাব, আমি তো আর দু মাস পর রিটায়ার করবো | তাই বলতে কোনো অসুবিধা নেই এখন আমার | সাব, ডরোথি মারা যাবার পর থেকেই এরকম হয় এখানে | আমার আব্বা হুজুর ও দেখেছেন | রোজ হয় না তবে মাঝে মাঝে হয় এমনটা | তবে চিন্তা করবেন না, ডরোথি কারো ক্ষতি করে না | রঞ্জনের হাত কাঁপছে, ডরোথি ডরোথি নামটা বার বার বলতে থাকে সে | কি যেন খুঁজছে সে, দেখছে এদিক ওদিক |

- আমার আব্বা বলেছিলেন, ওই ২০১ রুমেই সে থাকতো | একদিন সকালে আব্বা চা পৌঁছুতে গিয়ে দেখে ডরোথি মেমসাব শুয়ে আছেন, ভালো করে দেখে বুঝলেন যে শরীরে প্রাণ নেই | মাথার কাছের রাখা আছে জুসের আধ খাওয়া গ্লাস | ডাক্তার বলেছিলো ওই জুসে বিষ ছিল | তার পরের দিন ওই রুমের জানলার নিচেই খাদে পাওয়া গেলো আরেকজনের লাশ, ও নাকি আংরেজি ফৌজের সিপাহী ছিল | শুধু আব্বা হুজুর জানতো ওই সিপাহী ডরোথি মেমসাবের আশিক ছিল |পুলিশ আজও কিনারা করতে পারেনি কে খুন করেছিল ডরোথি কে | কিন্তু আব্বা হুজুর জানতো কে খুনি | উনি কিন্তু কাউকে বলেননি, এমনকি আমাকেও না | মাঝে মাঝে ডরোথিকে দেখা যায় এখানে, কিছুই করে না শুধু তাকিয়ে থাকে, যেন জানতে চায় - তুমি কি জানো আমায় কে মেরেছে?

সাদিকের কথা কিছু কানে ঢুকছে, কিছু ঢুকছে না | রঞ্জন উঠে আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে এগোলো | সাদিক এগিয়ে আসছিলো সাহায্য করতে, রঞ্জন হাত তুলে মানা করলো | সে একাই যেতে পারবে |

দেয়াল ধরে একপা দুপা করে সে দোতালায় কোনো রকমে উঠলো | মুখে শুধু একটাই কথা

- ডরোথি ! ডরোথি!

পকেট হাতড়ে রুমের চাবিটা সে বের করলো | দরজাটা খুলতে গিয়ে চোখটা আটকে গেল বাঁ দিকের করিডোরের একদম শেষ দিকে | কে যেন দাঁড়িয়ে আছে? দরজাটা না খুলে এগিয়ে যায় | কালো গাউন পরা কোনো মহিলা, রেলিং থেকে ঝুঁকে গভীর খাদের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন খুঁজছে | সেই চেনা গন্ধ অনেক তীব্র এখন |

- এক্সকিউস মি ম্যাম, এক্সকিউস মি !!!

দুবার ডাক দেয়াতে মহিলা ঘুরে দাঁড়ালো, কি তীব্র চোখের দৃষ্টি তার | তাকানো যায়না সেদিকে |

- ডরোথি, ডরোথি তুমি ? রঞ্জনের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে |

দূর থেকে যেন ভেসে আসলো ডরোথির গলা

- হ্যাঁ নকুল, আমি, আমি ডরোথি ||

নকুল হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায় ডরোথির দিকে, ও যে ডরোথির কাছে যেতে চেয়ে, কাছে অনেক কাছে !!


Rate this content
Log in

More bengali story from chanchal das

Similar bengali story from Horror