Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

chanchal das

Tragedy


3  

chanchal das

Tragedy


নকল সোনার ঝুমকো

নকল সোনার ঝুমকো

20 mins 806 20 mins 806

আমরা ঠিক করেছি‚ তুমিই অ্যানাকে অ্যাকমপ্যানি করবে|


আমার ইমিডিয়েট বসের এ যেন নির্দেশ নয় আদেশ| এতক্ষণ গাঁইগুঁই করছিলাম| এবার যেন সত্যি করেই মাথায় ছাদ ভেঙ্গে পড়ল| মহিলা বস হলে এই এক সমস্যা‚ মুখের ওপর না বলা যায় না‚ তেড়ে কিছু বললে কপালে শনি| আর আমার কপাল এমনি যে আজ পর্যন্ত যে কটা সংস্থায় কাজ করেছি সব জায়গাতেই আমার বস ছিলেন মহিলা | কিন্তু সবাই যে বেহিসাবি হুকুম চালাতেন তা বলা অন্যায় হবে | কিন্তু কে না জানে, বস, বস ই হয় |


আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলাম‚ ‘কিন্তু জয়ন্তী‚ এই প্রজেক্টে তো কোন ফিমেল মডারেটরের যাওয়া উচিত, মানে সুদক্ষিণা গেলে ভালো হয় না?’ 


'বকওয়াস নেই করনে কা ! বললাম না তুই যাবি?' বলে জয়ন্তী অন্য কথায় চলে গেল, আমার আপত্তি কে পাত্তাও দিলো না | ও একবার যখন বলে দিয়েছে কাজটা আমাকেই করতে হবে‚ তখন সে কথার নড়চড় হবার নয়|  এর আগেও মেয়েদের স্যানিটারী ন্যাপকিনের ওপর আমাকে মডারেটরের কাজ করতে পাঠিয়েছিল জয়ন্তী খের| কপাল খারাপ ছিল‚ সেই প্রজেক্টটা দুর্দান্ত নেমেছিল তাই এইভাবে এবার পুরস্কৃত হলাম| মনে মনে গজগজ করেই মনের রাগ মেটানো ছাড়া উপায়ই বা কি? 


এবারের প্রজেক্টে দিল্লীর কুখ্যাত রেড লাইট এলাকাতে সেক্স ওয়ার্কারদের উপর| লাগাতার তিনদিন সকাল দশটা থেকে রাত সাড়ে নটা অবধি একজন যৌনকর্মীর স্বাস্থ্য সচেতনতার ওপর নজরদারী করতে হবে| সেই সঙ্গে তাদের কাজের ফাঁকে অবসর সময় জানতে হবে আরও টুকিটাকি নানান তথ্য| সাথে থাকবেন এক বিদেশিনী, নাম অ্যানা| অ্যানার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি | এর আগেও ওঁনার সাথে আমি কাজ করেছি | ওঁনাকে এক কথায় বোঝাতে গেলে বলা যায় উনি একজন প্রশ্নের ঝুড়ি| সব কিছুতেই প্রশ্ন থাকে ওঁনার| খেতে বসলে, কি ভাবে বানানো হয়েছে তরকারিটা? দূরের বাড়িটার বয়স কত? এই গাছে ফুল ফল কখন হয়? দিশাহীন প্রশ্ন যে কোনো বিষয়ের উপরেই হতে পারে | নিজেকে তৈরী রাখাটাই আসল কথা | ঠিক জবাব না পেলে যে ওই প্রশ্নই অন্যভাবে আবার ছুড়ে দেবে| তখন সামলাও| তবে জ্ঞানী বটে মহিলাটি | সব বিষয়ই অগাধ জ্ঞান| চার বার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু বেশি দিন টেঁকেনি কোনোটাই | আমাদের অফিসের সবার ধারণা ওই প্রশ্নের ধাক্কায় সবাই পালিয়েছে| যদিও এই তথ্য অবান্তর এখানে, গল্পের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই |   অ্যানাকে সবকিছু ভাষান্তর করে বুঝিয়ে দেবার কাজটাও ছিল আমার এই প্রজেক্টের অঙ্গ|


সবই কপালের ফের মেনে নিয়েই জয় মা বলে কাজে লেগে পড়লাম| প্রথম কাজটা হল মেটিরিয়াল রেডি করা| সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হয়েছিল আমাদের ফিল্ড টিমকে| কোনও একজন যৌনকর্মীকে রাজি করানোটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ| বললেই রাজি হয়ে যাবে এমন তো নয়| আমাদের এই প্রজেক্টে থেকে ওদের কোন ব্যবসায়িক লাভ হবে না | আরও একটা ব্যাপারও ছিল যৌন কর্মীদের রাজি করানোর আগে তাদের যিনি মাথা তাকে রাজি করানোটাও সমান কঠিন ছিল| এছাড়াও  সমাজসেবী সংস্থা আর তাদের কর্মীদের প্রতিনিয়ত উৎপাতে ওরা তিতিবিরক্ত হয়ে থাকত| সব সংস্থাই যে এ রকম উৎপাত করে তা বলব না, তবে বেশিরভাগেরই প্রধান উদ্দেশ্য থাকে বিদেশের আর্থিক সাহায্য আর আত্মপ্রচার|


প্রজেক্টটা খুবই চ্যালেঞ্জিং , সাথে যথেষ্ট খাটনির| ফিল্ড ওয়ার্ক ডিভিশনের কাজ সব কিছু ঠিক করা | মানে যাকে ইন্টারভিউ করা হবে , তার থেকে সময় নেয়া, তাকে রাজি করানো ইত্যাদি সব কিছুই সামলাতে হয় ফিল্ড ডিভিশন কে| কিন্তু যৌন কর্মীদের মাঝে গিয়ে ওদের রাজি করানোটা শুধু সমস্যাই নয় অনেক সময় অসম্ভবও হয়ে যায় | আমাদের ফিল্ড কন্ট্রোলার রঞ্জিত কালরা বয়স্ক মানুষ এবং এই কাজে চল্লিশ বছর ধরে আছেন | 'হবে না' কথাটা ওঁনার অভিধানে কোথাও লেখা নেই | যে কোনো প্রজেক্টে ওঁনার একটাই কথা থাকে 'হো জায়গা জি ! ডেডলাইন বতাও’


সে মানুষটাই কি না হঠাৎ ছুটি নিয়ে নিয়ে বাড়িতে বসে পড়লেন? কি না পাইলসের ব্যাথা প্রচণ্ড বেড়ে গিয়েছে, আপাতত তিনি অফিস আসতে পারবেন না | কলরাসাব সত্যি অসুস্থ কি না আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল | শোনা কথা, ওই এলাকায় গিয়ে কাজ করলে ওঁনার গিন্নি নাকি ওঁনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না | এই খবর ওঁনার এক জুনিয়র আমাদের বললো, সাথে 'একদম পক্কা খবর হেয় জি' র তকমাও লাগিয়ে দিল|   নির্দেশ ছিল ফিল্ড টিমের সিনিয়র মোস্টকেই এ কাজের দায়িত্ব নিতে হবে| যাতে ভুলচুক হবার কোনোও সম্ভাবনাই না থাকে| অনেক আলোচনা আর বিতর্কের পর ঠিক হলো যে ফিল্ড এক্সেকিউটিভ দীনেশ কপাহীকেই এই কাজের জন্য নেয়া হোক| ফিল্ড এক্সিকিউটিভদের মধ্যে দীনেশ সবচেয়ে চৌখস ছেলে |দীনেশ পঞ্জাবি, অধুনা পাকিস্তানের মুলতান প্রদেশের লোক | প্রত্যেক কথার আগে মা আর শেষে বোনের নাম স্মরণ করেই কথা শেষ করতো | সেটা স্থান, কাল,পাত্র হিসেব না করেই ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখতো| অভ্যাসবশতঃ মাঝে মাঝে কলকাতাবাসী বাঙালি ডিরেক্টরদের সামনেও মুখ ফস্কে ওই সব শব্দ বেরিয়ে পড়তো | ওঁনারা শুধু ' এ কি বলে রে! এ কি ভাষা রে !' ছাড়া বিশেষ কিছু বলে উঠতে পারেননি | ভয় বা ঘাবড়ে যাওয়া মতো শব্দ ওর অভিধানে নেই বললেই চলে | সে নিজেই এসে এ কাজের দায়িত্ব নিলো | ধুরন্দর ছেলে , ভালো করেই জানে যে কাজটা ঠিকঠাক নামাতে পারলে সামনের বছর ওর প্রমোশন তো পাকা | এ মৌকা সে ছাড়বে না কিছুতেই |


মুঘল আমলে এই কুখ্যাত এলাকার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পাঁচটি কোঠা| পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালে এই পাঁচটি কোঠাকে একত্রে একটি জায়গাতে নিয়ে আসা হয় এবং জায়গাটির নাম রাখা হল গারস্টিন বাস্টিন রোড‚ সংক্ষেপে জি বি রোড| স্থানীয়রা ঠাট্টা করে বলে গান্ধী বাবা রোড| অবশ্য ১৯৬৬ সালে জি বি রোডের নতুন নামকরণ হয় স্বামী শ্রদ্ধানন্দ মার্গ| জি বি রোডের এই প্রসিদ্ধ রেডলাইট অঞ্চলটি পঞ্চম বৃহ্ত্তম যৌনপল্লী ভারতে|


নির্দিষ্ট দিনে আমরা দুজন আর  দীনেশ কপাহী ঐ লোকেশনে পৌঁছালাম| মেইন রোডের ওপর অবস্থিত চারতলা বাড়িটির নিচের তলায় সারসার মেশিনারী আর মোটরপার্টসের দোকান| প্রসঙ্গত শুধু যৌনপল্লী নয় জি বি রোড, অটোমোবাইল পার্টস‚ মেশিনারী‚ টুলস প্রভৃতির জন্যও বিখ্যাত| সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠলাম| তখন ব্যবসার সময় নয়‚ তাই চারিদিকে একটা অলসভাব যেন ছড়িয়ে আছে| একজন ভদ্রগোছের লোক এসে আমাদের চারতলার কোঠার যিনি মালকিন যাকে ওরা আন্টি বলে ডাকে তার ঘরে নিয়ে গেল| সাধারণ বসার ঘর| ঘরের দেওয়ালে নানান দেব-দেবীর ফটো ঝুলছে| ঘরে আসবাব বলতে আগোছালোভাবে সাজানো দুটো সিঙ্গল সিটার ও একটা ট্রিপল সিটার সোফা‚ একটা টিভি‚ সেন্টার টেবল‚ শোকেস| ঘরে এসিও ছিল| একটু পরে একটি মেয়ে এসে আমাদের চা আর একটা প্লেটে করে মঠরি মানে নিমকি দিয়ে গেল| 


যদিও অ্যানা খুব অভিজ্ঞ এই ধরনের কাজে, তবুও আমার কাজ আমি করলাম মানে কাজটা কি ভাবে হবে, কি ভাবে প্রশ্নগুলো করতে হবে, তার বিশ্লেষণ কি ভাবে করতে হবে, এই সব আর কি | তাছাড়া এদের সাথে কিভাবে কথা বলবে‚ কি পোশাক পড়বে সব বুঝিয়ে দিয়েছিলাম| টেনশনে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছি| চায়ের কাপটা হাতে তুলতেই টের পেলাম হাত কাঁপছে| হে ভগবান আর দুমাস বাদে আমার বিয়ে| আর আমি কিনা যৌনপল্লীতে বসে আছি ? কেউ যদি দেখে ফেলে আমাকে এখানে‚ তো হয়ে গেল, এ জীবনের মত বিয়ের সাধ মিটে যাবে| যত ভাবতে লাগলাম তত যেন ভয় আর ভাবনা আমায় গ্রাস করতে শুরু করল| কল্পচোখে স্পষ্ট দেখলাম আমার বাবা-মা‚ হবু শ্বশুর-শাশুরি আমার দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আছে| তাদের কাছে তো আমার এখানে আসা অধঃপতনের নামান্তর মাত্র| পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরল| তাকিয়ে দেখি এক সুদর্শন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন| পরনে ধবধবে পাজামা পাঞ্জাবি, ব্যাকব্রাশ করা চুল, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা ‚ ইনি ম্যাডাম মানে এই কোঠার যিনি আন্টি তাঁর পতিদেব| পরিচিত ব্যক্তি| দূরদর্শনের চ্যানেলে মাঝে মাঝেই ওনাকে দেখা যায় | বেশ কিছু সমাজসেবী সংস্থা চালান উনি | দুর্জনেরা বলে দিল্লীতেই নাকি ওঁনার চার-পাঁচটা কোঠা আছে| এছাড়াও একাধিক বৈধ - অবৈধ ব্যবসাও আছে ওঁনার| 


- নমস্কার| আপনারা চা পান করেছেন তো| ভদ্রলোক এসেই আমাদের নমস্কার জানিয়ে জানতে চাইলেন|


দীনেশ ভদ্রলোকের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন| আমরা প্রতি নমস্কার জানালাম|


- আপনাদের আই কার্ড দেখাবেন? কিছু মনে করবেন না! বুঝতেই পারছেন এসব আমাদের দেখতেই হয়| তাছাড়া যারা এখানে থাকবেন তারা যেন আই কার্ড সাথেই রাখেন‚ কারণ পুলিশের ঝামেলা এখানে লেগেই আছে নিত্য |


দীনেশ উত্তর দিলেন‚ হ্যাঁ নিশ্চয়| এ ছাড়াও আমরা স্থানীয় থানায় জানিয়েছি এবং তাদের লিখিত অনুমতিপত্রও নিয়ে এসেছি আমরা| বলেই দীনেশ সব কাগজপত্র ভদ্রলোককে দেখালে|


- বাহ আপনারা তো একদম তৈরি হয়েই এসেছেন দেখছি| ভদ্রলোকের ঠোঁটে হালকা হাসির ছোঁয়া| এতক্ষণের একটা দমবন্ধ অব্স্থা থেকে যেন পরিস্থিতি কিছুটা হলেও হাল্কা হল| এ কথা ও কথার মাঝেই দীনেশ হঠাৎ করেই আমার বিয়ের প্রসঙ্গ তুলল‚ স্যারজী‚ দুমাস পরেই এঁনার বিয়ে‚ একটু খেয়াল রাখবেন|আমার পেছনে লাগবার জন্যই যে এই প্রসঙ্গের অবতারণা, সেকি আর আমি জানি না ? কোন জন্মের দুশমনির বদলা নিচ্ছে দীনেশ ঠিক বুঝতে পারলাম না | আর কোথায় যায়‚ আমার তো মনে হচ্ছিল কোথাও একটা লুকিয়ে পরতে পারলে ভালো হত| পিছনের দরজায় বুঝি বা তিন-চারজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনছিল| তারা হেসে উঠল খিলখিলিয়ে| পাক্কা আধঘন্টা চলল আমাকে নিয়ে এই ঠাট্টা- তামশা| অ্যানা ভাষা বুঝতে না পারলেও আমাকে নিয়ে যে একটা লেগ পুলিং চলছে সেট বেশ উপভোগ করছিল| তবে এটাও ঠিক যে দীনেশ এই প্রসঙ্গ ইচ্ছে করেই তুলেছে | ভদ্রলোকটি যাতে আমাদের কাজ সম্মন্ধে বেশি প্রশ্ন না করেন তাই দীনেশের এই প্রচেষ্টা | বাহবা দিতে হয় ছেলেটি কে |


আমাদের প্রায় সময় হয়ে গিয়েছিল কাজ করার| ভদ্রলোক একটি মেয়েকে ডেকে বললেন‚ এদের খুশবুর কাছে নিয়ে যাও| আর হ্যাঁ, আপনাদের আগেই জানিয়ে দি‚ এখানে এদের যে নামে ডাকা হয়‚ সেগুলো কিন্তু এদের আসল নাম নয়| আপনারাও এদের আসল নাম জানতে চাইবেন না| আমাদের দেওয়া নামেই আপনারা এদের ডাকবেন|গলার স্বরে স্পষ্ট নির্দেশ যেটা লঙ্ঘন করা উচিত হবে না| আসল নাম জানলে এদের ক্ষতিটাই বা কি? আমরা তো আর খবরের কাগজের রিপোর্টার নই| কিন্তু তর্ক করে লাভ নেই | পরিচারিকাকে অনুসরণ করে আমরা খুশবুর কামরার সামনে এসে দাঁড়ালাম | 


- নমস্তে জী‚ অন্দর আ যাইয়ে! দরজার বাইরেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো খুশবু | আমরাও প্রতিনমস্কার জানালাম |


খুশবু‚ নামটা খুব সুন্দর| বয়স আন্দাজ পঁচিশ - ছাব্বিশ হবে| বাদামি গায়ের রং, রোগা-দোহারা চেহরায় হালকা রঙের সালোয়ার কামিজ| খুব সাধারণ মুখাবয়ব| ঠোঁটের কোনে হাসি লেগেই আছে| যেটা মেয়েটাকে একটা আলগা সৌন্দর্য্য দিয়েছে| সবচেয়ে বড় কথা মেয়েটার ব্যবহার‚ কথা-বার্তা বেশ মার্জিত| তবে পোশাকটাই যা একটু গণ্ডগোলে, মানে ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে আমার বেশ অসুবিধাই হচ্ছে | 


বাইরে থেকে ঘরের ভেতর কিছুই দেখা যাচ্ছে না | আমরা খুশবু কে অনুসরণ করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লাম | ভেতরের আধা অন্ধকারে চোখ সয়ে যাবার পর বুঝলাম প্রায় ছ'ফুট বাই দশ ফুটের একটা ছোট ফালি ঘর| একটা তক্তপোশ‚ দেওয়ালে কিছু ফ্লিমস্টারের ছবি, একটা আয়না আর একটা কম ওয়াটের আলো| ঘরে কোন জানালা নেই| ঘরটাতে যেন দমবন্ধ করা পরিবেশ|


‘আপনাদের নিশ্চয় খুব অসুবিধা হবে এখানে বসে কথা বলতে‚ কিন্তু কি করবেন| এখানে বসে কথা বলা ছাড়া তো উপায় নেই|’খুশবু বিছানার চাদরটা হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে খুব কুণ্ঠার সাথে বললো|


আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম‚ ‘না না অসুবিধে কিসের? যদিও অঙ্কলজী বলেছিলেন‚ ওঁনাদের ঘরে বসে কথা বলতে‚ কিন্তু আমাদের তো তোমার সাথে থাকতে হবে আজ‚ তুমি কি কর‚ তুমি কি ...’ বলা শেষ হয় না‚ মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলে‚


- ‘মতলব?? অমি কি করি সেটা জানতে তোমরা এতদুর এসেছ?’


আমি যে বেশ ঘাবড়ে গেছি সেটা টের পাই| না হলে কি আর এত বেশি কথা বলে ফেলি| পিছনে দীনেশের খ্যাক খ্যাক হাসির আওয়াজ পেলাম |


- ‘না‚ আসলে ঠিক তা না‚ আমি আসলে বলতে চাইছি‚ তোমরা কিভাবে নিজেদের সম্পর্কে সচেতন‚ কিভাবে নিজেদের স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজটা কর এইসব আর কি|’ আমতা আমতা করে বলি |


- ‘আরে আমি বুঝেছি সব‚ হাসতে হাসতে বলে সে| কিন্তু এই অংগ্রেজ মেডাম কি আমার কথা বুঝবে?’


- ‘আমি মানে আমরা রেকর্ডার এনেছি| তোমার কথা রেকর্ড করব এবং পরে ওঁনাকে বুঝিয়ে দেব| এছাড়াও তোমার সাথে কথা বলার মাঝেও মাঝেও আমি ওঁনাকে কিছু কিছু বুঝিয়ে দেব|’


নিয়ম মত প্রশ্ন উত্তর চলতে লাগলো, তার মাঝে সে নিজের গল্পও শোনাতে লাগলো


- আমাদের গ্রামের নাম খকরঙ্গলা| রাজস্থানের ভরতপুর ডিস্ট্রিক্টের এক ছোট্ট গ্রাম| আমাদের জাতির নাম বেদিয়া| আমরা বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসছি| ‘আমিই তো এই কাজ শুরু করেছিলাম ১০-১১ বছর বয়সে| আমার বাবা আমাকে শহরের এক বনিয়ার কছে প্রথম নিয়ে গিয়েছিল| জানেন আমাদের জাতিতে সবাই ভগবানের কাছে মেয়ে প্রার্থনা করে| ছেলেরা আপনাদের কাছে যেমন বংশরক্ষার জন্য খুব প্রিয় তেমনই আমাদের জাতিতে মেয়েরা কমাই আর সংসার পালনের জন্য খুব প্রিয়|


আমরা দুই বোন আর এক ভাই| বাবার কমজোড়ি রোগ হওয়াতে ভাইকে এই ব্যবসায় হাত পাকাতে হয়| ঐ তো কাস্টমার নিয়ে আসত| আমাদের গ্রামে প্রায় বাষট্টিটা পরিবার‚ যারা এই ধন্দায় আছে| দাদীর কাছে শুনেছিলাম‚ আগেকার দিনে আমাদের জাতিতে মেয়েরা নচনিয়া হত‚ তারা শুধু জমিন্দার আর আমীর লোকেদের সেবা করত| এখন তো আর সেসব দিন নেই‚ তাই আমাদেরও অন্য রাস্তা ধরতে হয়| আমার যে বড়দিদি‚ সে তো গ্রামেরই এক ছেলেকে বিয়ে করেছে| আমরা কিন্তু বিয়ের পর আর এই কাজ করি না| শুধু আমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি‚ যেন বাড়িতে একটা মেয়ে হয়| আমরা তো আর কোন কাজ করি না‚ বা জানিও না| স্কুলে গিয়ে পড়াশুনা আমরা করতে পারি না | বেদিয়া জাতি জানতে পারলেই আর স্কুলে নেয় না | ছেলেদের ও কেউ চাকরি দেয় না, দোষ ওই এক, আমরা বেদিয়া জাত || আর পড়াই-লিখাই করার দরকার কি আমাদের| তবে হ্যাঁ‚ কিছু ফিল্মী নাচ-গানা যদি জানা যায় তাহলে টাকা একটু বেশিই কামাই হয় আর কাস্টমারদের মধ্যে কদর বাড়ে|’


‘আমাদের গ্রামে আর কেই বা আসে বা টাকা খরচ করে বলুন? তাই ভাই ‚ হাইওয়ে থেকে ট্রাক ড্রাইভার বা অন্যদের ধরে আনে| কিন্তু তাতে কি বা আয় হবে! ঐ দিনে একশ বা দুশো টাকা| তাতে কি আর সংসার চলেবে| অনেকসময় মেয়েরা টাকার লোভে ড্রাইভারদের সাথে শহরে চলে যায়| একমাস-দুমাস পর ফিরেও আসে বেশ কিছু টাকা জমিয়ে নিয়ে| অনেকে আবার ফেরেও না| আমার বুয়াও এইরকম চলে গিয়েছিল কিন্তু আর ফিরল না| কোথায় আছে কি করছে, কিছুই জানি না আমরা | আর জানলেই বা কি, যদি কোলে বাচ্চা নিয়ে ফেরে, কে দায়িত্ব নেবে ওদের? আমি কিন্তু গ্রামে ফিরে যাব‚ সাদিও করব আর খুবসুরত একটা মেয়ের মাও হব|’ লাজুক হাসে খুশবু| তার দুচোখের স্বপ্ন যেন আমাদের ছুঁয়ে যায়| তবে সে স্বপ্নের রঙ আমাদের মত নয়| 


খুশবুর কথা শুনতে শুনতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছিল| হঠাৎ লক্ষ্য করলাম অ্যানা ঢুলছে| বুঝলাম ওর যা জানার ও তা মোটামুটি জেনে নিয়েছে| আমাদের গল্পের মাথামুন্ডু না বুঝতে পেরেই ওর এই দিবানিদ্রা|


বিকেল একটু একটু করে গড়াতে শুরু করেছিল মোহিনী সন্ধ্যের দিকে| আমাদের কথার মাঝেই খুশবু উঠে গিয়ে ওর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আয়নাতে নিজেকে রূপসী করে তুলতে লাগল| নিপুন হাতে নিজের মুখের প্রসাধন শেষ করে আমার দিকে ফিরে বলল‚


'আমাকে কেমন দেখতে লাগছে?'


'খুব সুন্দর লাগছো দেখতে,' অ্যানা মিষ্টি করে হেসে বললো | 


আমি তখন দরজার বাইরে তাকিয়েছিলাম, বিনা দ্বিধায় খুশবু আমার কাছে এসে আমার গালে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো , 

' তু ভি তো বোল কুছ? আমি কেমন লাগছি?' 


আমি কোনো উত্তর দিলাম না দেখে খিল খিল করে হেসে উঠলো ও|


আমি বোকার মত হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম |

'কি এখানেই বসে থাকবে না বাইরে যাবে? আমি এখন কাপড় বদলাবো কিন্তু | ইচ্ছে থাকলে বসে থাকতে পারো' বলে আবার হাসতে লাগলো |


আমি এক মুহুর্ত দেরী না করে বাইরে এসে দাঁড়ালাম| পিছনে আবার সেই হাসির শব্দ| অ্যানাও বেরিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো| বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারছিল সে‚ খুশবুর হাসির কারণ কি! অ্যানা আমাকে বলল‚


- 'তুমি বেরলে কেন? আমাদের দেশে তো দরকার হত না|'


বেশ রাগত স্বরেই বললাম‚ ‘থাকলেই বা তোমার প্রজেক্টের কি সুবিধা হত শুনি?’ যাচ্ছেতাই!!


কিছুক্ষণ পরেই ও দরজা খুলে আমাদের ডাক দিলো, - 'অন্দর আ যাও আপলোগ‚ লেকিন কাস্টমার আসলে তোমাদের বাইরে চলে যেতে হবে, ঠিক আছে?’ মুখের উপর থেকে চুলটা সরিয়ে বললো | খুব অবাক লাগলো আমার, কি সহজ ভাবে বললো কথাটা| লক্ষ্য করলাম, আধুনিক প্রসাধন যা আছে সবই খুশবু করেছে| একদম অন্যরকম দেখতে লাগছে | আমরাই বোঝা উচিত, দিনের খুশবু আর রাতের খুশবু তো একদম আলাদা| রাতের খুশবু তো এখন পণ্য |


আবার শুরু হলো নানা প্রশ্নোত্তর, তার মাঝেই আবার চলতে লাগলো ওর নিজের গল্প| 


- 'আমাদের গ্রামে আমি থাকতেই বিজলী এসে গিয়েছিলো‚ তবে সবার বাড়িতে নয়‚ যারা রইস তাদের বাড়িতে| একটা টিভিও আছে| আমরা রইসের বাড়ির বাইরে থেকে বসে টিভি দেখতাম| ঐ টিভি দেখেই তো আমি কিছু ফিল্মি গানের সাথে নাচ শিখে নিয়েছিলাম | আমি না এক বিয়েবাড়িতে প্রথমবার ফিল্মি গানের সাথে নাচ দেখিয়ে ১০০০ টাকা কামিয়েছিলাম| তখন ১০০০ টাকা মানে অনেক টাকা| বাবা সেদিন বাড়িতে দুটো মুর্গা কেটেছিল|'


কথার মাঝেই দরজায় দস্তক পড়ল|


'এবার তোমাদের বাইরে যেতে হবে| খবর পাঠালে তারপর চলে এসো|'


আমরা খুশবুর ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এলাম মূল ঘরটাতে যেখানে প্রথমে আমরা এসে অপেক্ষা করেছিলাম| ঘরে ঢুকে দেখলাম অ্যান্টিজী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন| এঁনার চেহারাতেও বেশ আভিজাত্য আছে, বেশ ফর্সা, একটু ভারী চেহারার মহিলা | পরনে দামি পোশাক, সাথে মানানসই বড় বড় মুক্তোর গয়না| মনে একটা দন্ধ রয়েই গেল, তাহলে কি আভিজাত্য আর ব্যবসায়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই ? ঠিক মাথায় ঢুকলো না | এঁনাকে যদি এখানে না দেখতাম তাহলে ঘুনাক্ষরেও ধারণা করতে পারতাম না যে ইনিই এই ব্যবসা করেন |


' আইয়ে আইয়ে|' ঠোঁটের কোণে হাসি ছড়িয়ে বললেন‚ ' আমি একটু কাজে ব্যস্ত ছিলাম‚ তাই সকালে আপনাদের সাথে দেখা করতে পারিনি| আসলে আমার মেয়ে আজই স্টেটসে চলে যাবে‚ তাই গোছগাছের জন্য বাড়িতেই ছিলাম| উনি আপনাদের ঠিকমত দেখভাল করেছিলেন তো? লাঞ্চ কিয়া হ্যায় আপলোগ?


পেটের খিদে আমায় মিথ্যে বলতে দিলো না, নীরবে মাথা নাড়লাম - না|


ব্যস‚ এবার ওঁনার মুখ থেকে সব হাসি মিলিয়ে গেল| কাছে দাঁড়ানো পরিচারিকার গালে ঠাস করে এক চড়| অ্যানা তো ভয়ের চোটে দাঁড়িয়ে পড়ল|


' বত্তমিজ লোগ‚ তোমাদের কি কারও মাথায় আসেনি যে‚ এঁনারা না খেয়ে দেয়ে আছেন? এইসব চা - সমোসা সরাও| আর ম্যাডামের জন্য স্যান্ডউইচ আর ভইয়াকে লিয়ে মঙ্ঘারাম কে দুকান সে একদম খালিস ঘী সে তলা হুয়া ছোলে ভটুরে লে আও‚ জল্দী!!!


আবার হাসিটা ঠোঁটে ফিরে এল| ‘প্লিজ আপনারা বসুন‚ খুশবুর একটু সময় লাগবে| আজ একজন খাস মেহেমান এসেছেন কি না | আমি তো চেষ্টা করবো যাতে আজ কম খদ্দের ওর ঘরে যায়, কিন্তু কিছু বাঁধা খদ্দেরের পছন্দের মেয়ে থাকে, তাদের তো ফিরিয়ে দিতে পারি না | ও বেশি সময় লাগবে না, আপনাদের খাবার শেষ হওয়ার আগেই ওর ঘর খালি হয় যাবে |’ একটা জিনিস আমি বেশ অনুভব করলাম যে এখানকার ভাষা আমিও আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছি | আগের মত আর অস্বস্তি হচ্ছে না আমার |


'আপনাদের কাজের জন্য আমাদের অনেক ক্ষতি হয় যাবে, অনেক কাস্টমার ফেরত চলে যাবে, কিন্তু মেয়েগুলোর তাতে যদি কিছু ভালো হয়, তো হোক একটু ক্ষতি | তা যাক, আর কি বলল খুশবু| একটু বেশিই কথা বলে মেয়েটা| আপনারা তো জানেনই কি আপনাদের লিখতে হবে আর কি না?'


চোখের চাহনিতে বুঝে গেলাম কি বলতে চান অ্যান্টিজী| প্রছন্ন হুমকি| এদিকে দীনেশ কাজ নামানোর জন্য এঁনাকে কি গল্প শুনিয়েছে, কে জানে! মেয়েদের কি লাভ হবে, সে এখন দীনেশই জানে, আমি তার বিন্দুবিসর্গও জানিনা | তাই হাসি মুখে ওঁনার কথায় মাথা নেড়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই বুঝলাম | তবে দীনেশ যে ওঁনাকে কিছু দক্ষিণাও দিয়েছে সেটা জানি | না হলে তো ওঁনার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে !


'না না‚ আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন| আমরা তো আর নিউজপেপারের লোক নই যে রিপোর্ট বানাব| দীনেশজী তো বলেইছে আমাদের কি কাজ|’ বেশ সহজ ভাবেই বললাম আমি |


'তা তো নিশ্চয়‚ তা তো নিশ্চয়| আসলে বুঝতেই পারছেন‚ এই দেশী-বিদেশী নিউজ পেপারের লোকেরা এসে সব নিজেদের বানানো গল্প আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়| তারপর হয় আমাদের যত জ্বালা|  আর উনি মানে আমার হাজব্যান্ড তো পলিটিক্স এ আছেন, ওনার সম্মানটাও তো দেখতে হবে আমার, কি বলেন? আর রহি বাত ইন লড়কিও কি, ওদের তো আমি নিজের মেয়ের মতই দেখি, বিশ্বাস না হয়, ওদের একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন না?’ নিজের সাফাই গাইবার জন্য কেন উঠে পরে লেগেছেন উনি ঠিক বুঝলাম না | 


কথা বলতে বলতেই অতি কষ্টে খাবার গলা দিয়ে নামালাম| যদিও ওঁনার মধুমাখানো কথা আমাদের গলা দিয়ে নামছিল না| 


'আর এই মেয়েটা তো সবে মাস দুয়েক হল এখানে এসেছে| বড় ভাল মেয়ে| কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না| এই যে মাঝে মাঝে এখানকার মেয়েদের সিনেমা দেখতে পাঠাই‚ বা কোথায় ঘুরতে পাঠাই, ও তো যেতেই চায় না| বলে ওই টাইম এ কাজ করলে কিছু বাড়তি টাকা কামানো যাবে | মেহেমানরাও খুব খুশি ওর থেকে| তাই তো আপনাদের জন্য ওকেই ঠিক করে দিলাম| কাল- পরশু অন্য মেয়েরা থাকবে|


বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে অ্যান্টিজীর ঘরে| একজন এসে খবর দিল‚ খুশবু ডাকছে ওর ঘরে| খাওয়া তো আগেই হয়ে গিয়েছিল‚ তাই ডাকামাত্র আমরা খুশবুর ঘরে চলে এলাম|


কামরায় ঢুকে অ্যানার কাজ শুরু হল| খুশবুকে নানান প্রশ্ন করতে শুরু করল, যা আমাদের প্রজেক্টের অঙ্গ| আমি ওদের দোভাষীর কাজ করতে লাগলাম মানে অ্যানার প্রশ্নগুলো হিন্দিতে খুশবুকে জিজ্ঞাসা করা আবার খুশবুর জবাব অ্যানাকে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দেয়া, সাথে রেকর্ড ও করতে লাগলাম| 


'হ্যাঁ তো মেয় কঁহা থী?’ এসবের মাঝেই আবার খুশবু নিজের কথায় ফিরে গেল| ‘সেদিন রাতে তো খুব মুর্গা খাওয়া হল আমাদের| সবচেয়ে খুশ ছিল ভাই‚ ও খেতে ভীষন ভালোবাসে| ও মনে হয় পুরো একটা মুর্গাই খেয়ে নিয়েছিল| ওর খাওয়া নিয়ে আর বিয়েবাড়ির গল্প নিয়ে আমরা খুব হাসি-মজাক করছিলাম| হঠাৎ ঘরের দরজায় ধাক্কা| কেউ বাবার নাম ধরে ডাকলো ‚ বাবা বেড়িয়ে গেল| বাইরে যারা এসেছিল তাদের সাথে বাবার তর্কাতর্কি শুনতে পাচ্ছিলাম| একটুপরেই বাবা ঘরে এসে বলল‚ তুঝে লেনে আয়ে হ্যায় সাদিবাড়ি সে| বারাতির একজনের তোকে খুব পছন্দ হয়েছে‚ তাই মেহমান নওয়াজির জন্য তোকে নিতে এসেছে| সারা বিকেল ধরে নেচে আমি সেদিন বড্ড ক্লান্ত ছিলাম| যাবার ইচ্ছে একদমই ছিল না| তাই বাবাকে বলে দিলাম‚ যে আজ আমি যেতে পারব না|'


'কিন্তু বেটি ওরা বলেছে‚ অনেক টাকা দেবে| তাছাড়া যদি না যাস তাহলে ওরা জোর করে নিয়ে যাবে | অব তু হী বোল, আমি কি করি ?' বাপু অসহায় ভাবে আমার দিকে তাকালো |


'আমি বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম শুধু| কিছু বলতে পারলাম না‚ কিছু বলার ইচ্ছেও হল না| চুপচাপ তৈরী হয়ে ওদের সাথে চলে গেলাম| সেদিনের ভয়ঙ্কর রাত আমায় আজও তাড়া করে ফেরে| পাঁচ-ছয়জন বুঢ়ালোক যথেচ্ছ অত্যাচার চালালো| মেহমান নওয়াজির দোহাই দিয়ে আমিও সহ্য করলাম| শুধু মেহমান নওয়াজি কেন ওরা তো আমায় টাকা দেবে| অনেক টাকা‚ কটা দিনের জন্য তো ভাবতে হবে না| পতা হ্যায়‚ কি না করেনি সে দিন আমার সাথে ওরা | ভীষণ রক্ত বেরিয়ে ছিল সব জায়গা থেকে আমার| সহ্য করতে পারিনি আমি ওই অত্যাচার | আমি অজ্ঞান হয় গিয়েছিলাম |  কে আমায় বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো জানি না | আমি বোধহয় পরের দিন জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলাম |'

এতটা বলে খুশবু চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো | মনে হলো ও আজও সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা ভুলতে পারেনি | | আমিও কেন জানি না‚ ঐ ঘরে আর বসে থাকতে পারছিলাম না‚ বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম| রেলিং থেকে ঝুঁকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম| কি বিচিত্র দেশ‚ কি বিচিত্র মেহমান নওয়াজি‚ টাকা দিয়ে আস্ত একটা নারী শরীর কিনে নেওয়া যায়‚ আর তারপর ছিঁড়েখুড়ে খাওয়া‚ যেন আদিম মানুষ | মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে| মহল্লার হল্লা‚ আশেপাশে কোঠিগুলো থেকে ভেসে আসা চটুল শব্দ‚ হাসি‚ গান সবকিছু মিলেমিশে অদ্ভুত একটা আওয়াজ যেন আমার মাথার ভেতরে হাতুড়ির ঘা মারছে|


কখন যেন অ্যানাও বেড়িয়ে এসেছে টের পাইনি| আমার কাঁধে হাত রাখে সে| ' কি? খুশবুর অভিজ্ঞতার কথা শুনে আপসেট হয়েছো তো? আমি তো এদের মাঝে কম করেও ছয় বছর হল কাজ করছি | নানা জায়গায় গিয়ে ওদের নানাধরনের শারীরিক আর মানসিক অত্যাচারের গল্প শুনেছি | প্রথম প্রথম আমিও খুব কষ্ট পেতাম | রাত্রে ঘুমোতে পারতাম না, এমন ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ওরা শোনাতো | কোনোদিন সময় নিয়ে তোমায় বলবো | এখন চল, এখানকার কাজ গুলো শেষ করি, তারপর আমরা কোথাও একটা ভালো জায়গায় গিয়ে ডিনার করবো, ওকে? ব্রেভ বয় চলে এস| 'অ্যানার কথা শুনে মনে হল আসলে স্থান-কাল পেরিয়ে অত্যাচারের ভাষা সব দেশেই সমান| 


আমি অ্যানার সাথে আবার খুশবুর ঘরে গেলাম| এই প্রথম খুশবু আমায় বুঝি মনোযোগ দিয়ে দেখল| আমার চোখে চোখ রেখে বুঝি আমাকে পড়তে চাইছিল| আমার গালে হাত রেখে বলল‚ 'কেয়া হুয়া রে? এতেই ঘাবরে গেলি! এত আমাদের প্রত্যেক ঘরের গল্প|'


এতক্ষণ ও আমাকে আপ বলে সম্বোধন করছিল‚ হঠাৎই খেয়াল করলাম আমাকে তু বলে সম্বোধন করছে| ভালো লাগল আমার| এতক্ষণ নিজেকে বড় ছোট মনে হচ্ছিল| এতক্ষণের হীণমন্যতা একটু একটু করে কেটে যেতে শুরু করল খুশবুর সহজ হয়ে কথা বলার ফলে|


'আরে না না‚ এসব কিছু না‚ দম ঘুঁট রহা থা‚ ইস লিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিলাম|'


'পাগলা কহি কা! চা খাবি? দাঁড়া আনাচ্ছি|'


'খুশবু মেহমান আয়ে হ্যায়|' আবার বাঁধা| চা আনানো আর হয় না| খুশবু কিছু বলার আগেই আমরা ওর ঘর থেকে বেরিয়ে আসি| বাইরে বেরিয়ে আমরা স্থির করলাম আরও ঘন্টাখানেক আমরা এখানে থাকব| কারণ ওদের ভাষায় 'মেহমান'-রা চার-পাঁচজন না এলে আমাদের কাজ সম্পুর্ণ হবে না| খুশবুর কাছে এখনো আরও দুজন কমপক্ষে না এলে আমাদের কাজ অসমাপ্ত থেকে যাবে| রিপোর্ট বানানো যাবে না|


ঘড়িতে সময় ঠিক রাত আটটা| আমি আর অ্যানা রাস্তায় নামলাম| একটু এদিক - ওদিক চক্কর কাটলাম| অ্যানা নিজে একটা সিগারেট ধরালো, মেয়েলি ধরনের রঙিন সিগারেট | আমার পোষাবে না তাই একটা পান-বিড়ির দোকান থেকে ভালো নামি কোম্পানীর একটা সিগার কিনে টানতে লাগলাম| আমার সিগার টানা দেখে অ্যানা হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলল‚ 


'তুমি একটা আস্ত পাগল| দেখে তো মনে হয় না যে তুমি সিগার খেতে অভ্যস্ত‚ ধরানো দেখেই বুঝেছি| আচ্ছা, তাড়াতাড়ি শেষ করো দেখি এখানের কাজ শেষ করে বেরোতে হবে আমাদের |'


খুশবুর ঘরে ঢুকতেই প্রশ্ন ধেয়ে এল‚ 'কোথায় গিয়েছিলে? তোরা যাবার পর পরই তো মেহমান চলে গেল| কখন থেকে চা এসে ঠান্ডা হয়ে গেল| দাঁড়া আবার আনাচ্ছি|'


'নাহ ‚ দরকার নেই‚ চা আমাদের লাগবে না‚ তুমি বস|'


আগের মতই অ্যানা আর খুশবুর মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন-উত্তরের পালা চলল|


'এখানে থাকতে তো বাইরে ডিউটিতে যেতে হয় না| তবে কখনও কোন রইসদের বাড়িতে ফাংশন বা প্রাইভেট পার্টি থাকলে আমরা যাই| তবে একলা না‚ কমপক্ষে আটজন-নজন যাই| খুব কামাই হয় তখন| একবার না‚ আমরা প্রায় পনেরোজন একটা পার্টিতে গেছিলাম| জানিস তো কোন কাজ ছিল না আমাদের‚ শুধু ফটোতে যেমন দেখায় সেইরকম ছোট ছোট কাপড় পরে আমরা চবুতরার ওপর নানান ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে ছিলাম| এই পার্টিগুলোকে কি যেন বলে বলত? কি একটা যেন নাম ছিল‚ মনে আসছে না|'


'থিম পার্টি|'


'হাঁ হাঁ ওহি| তুঝে কেসে পতা রে?? '


'ও আমি জানি| তারপর?'


'আর বলিস না| কোনো এক সাহেবজাদার বিয়ের আগে যে পার্টি হয় তাই ছিল | সেকি দারু চলছিল সেখানে কি বলব| খানা-পিনা চলেছিল পুরো রাত| আমরাও খেয়েছিলাম প্রচুর পার্টির পরে| আমিও সেদিন দারু খেয়েছিলাম| হি হি হি!! কিন্তু ঐ পার্টির আরও একটা নাম ছিল| হাঁ, য়াদ আয়া, কামসূত্র নাইট| এখন তো শুনি সরকার ওই ধরনের পার্টি বন্ধ করে দিয়েছে | কি খারাপ বল? আমাদের রোজগার সরকারের সইলো না | তবে আমাদের সাথে কেউই মজাক করেনি ওখানে‚ মজাক মানে জানিস তো?  তবে দু একজন ঠরকি লোক তো থাকেই সব জায়গায় কি না? তা একটু আধটু গায়ে হাত দিয়েছিলো ওরা | সে কিছু না | অনেক টিপসও তো পেয়েছিলাম সে রাতে| আলাদা কামাই হলে তবেই না বাড়িতে বেশি টাকা পাঠাতে পারি| বাবা তো এখন কিছু করতে পারে না| পুরো বসে গেছে| ভাই অন্য মেয়েদের হয়ে কাজ করে‚ তাতে আর কত কামাই হয়? আচ্ছা বলতো এই থিম পার্টি আর কত রকমের হয়? মতলব আমাদের রোজগারপাতি হতে পারে সে রকম কোনো পার্টি কি হয় ?


'আরে আমি কি করে জানব?'


'তাহলে এটা জানলি কি করে? সচ বোল|' চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো |


'ধুর শুনেছি এইরকম পার্টি হয়‚ তাই তোমাকে বললাম|'


'চলো ঠিক হ্যায়| কোনদিন এইসব পার্টিতে যাবি না‚ বুঝলি?'


'আচ্ছা যাব না‚ হল?'


ঘড়ির কাঁটা গুটি গুটি পায়ে দশটার ঘর ছুঁইছুই| আমি বললাম‚' প্রায় দশটা বাজে| আমরা তো আর বসতে পারব না| তোমার ছুটি কখন হবে?'


'এই তো সবে ধন্দা শুরু হল| একটু পরেই মেহমানদের আসা শুরু হবে| রাত একটা -দুটো অবধি তো চলবেই মেহমান নওয়াজি| ' হাসে খুশবু| তা তোরা আরও একটু বস না| এখনও ওদের আসার টাইম হয়নি| 'তু তো অপনে বারে মেঁ কুছ বতায়া নহী| বাড়িতে কে কে আছে? কি কাজ করিস? মেয়েরা বললো তোর নাকি বিয়ে?'


সেরেছে, এখানেও খবর চলে এসেছে? কিন্তু আশ্চর্য হলাম যে খুশবু অন্যদের মতো আমার পেছনে লাগলো না | বরং বিয়ে হচ্ছে শোনার পর গালে হাত দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো| আমি অস্বস্তি বোধ করছি দেখে হেসে ফেললো | 'আচ্ছা, আচ্ছা, আর লজ্জা পেতে হবে না, আমি জানি তুই তোর বৌকে খুব ভালোবাসবি | কি রে তাই তো? ধোখা দিবিনা কিন্তু একদম!'


বাধ্য ছেলের মত আমি মাথা নাড়লাম| 


আধঘন্টা বয়ে গেছে| আমরা এবার সত্যি সত্যি উঠে পরি|


'খুশবু‚ আমরা এবার কিন্তু যাব| এমনিতেই তোমাদের আন্টি আমাদের সাড়ে নটার পর থাকার অনুমতি দেননি|'


কথা শেষ হবার আগেই দরজায় দস্তক পরে| একজন এসে জানায়. 'ম্যাডামজি আপলোগোকো বুলা রহি হ্যায়|'


'অ্যান্টিজী সে বোল এক মিনিট মেঁ আ রহে হ্যায়|' খুশবু বলে| 


'আচ্ছা, সত্যি করে বলতো, ওই ম্যাডাম তোদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে না? জানিস তো ও আমাদের ওই টাকা থেকে এক পয়সাও ভাগ দেবে না | পুরোটা নিজের সন্দুকে ঢোকাবে | শালীর হরাম কি কমাই খাবার অভ্যাস কিনা!' খুব নিচু স্বরে আমায় জিজ্ঞেস করলো খুশবু |


আমি কোনো জবাব দিলাম না | 


আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে সে একছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল| আমরা হতবাক‚ আবার কি হল?


একটু পরেই ফিরে এল| হাতে দুটো ছোট প্যাকেট| একটা প্যাকেট অ্যানার দিকে বাড়িয়ে বলল, ' ইয়ে আপকে লিয়ে আর আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলল ইয়ে তেরে হোনেওয়ালি বিবি কে লিয়ে| খোল কে তো দেখ|'


প্যাকেট খুলতেই হাতে এল একজোড়া ছোট কানের দুল|


'আমি নিজের জন্য কিনেছিলাম জনপথ থেকে, খুব সুন্দর না ? এটা পিতলের, কিন্তু দেখ ঠিক সোনার মত লাগছে না? ‚ হাঁ তোর বৌয়ের হাতে দিয়ে বলিস‚ এটা আমি দিয়েছিলাম| কিরে বলতে পারবি তো? এবার তোরা যা|'


আমি দুলজোড়া হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম| কিছু বলার মত শব্দ আমার ঝুলিতে নেই| 


একটা সত্যি কথা স্বীকার না করলে এ গল্পের শেষ হয় না, অনেক চেষ্টা করেও আমি ওই কানের ঝুমকো বৌ কে দিতে পারিনি | কে দিয়েছে ? কেন দিয়েছে? জবাব দেয়ার সাহস আজ আমার নেই , কিন্তু আমি তো খুশবুর ঘরে বসে ঠিক করেছিলাম যে উপহারটা ওকে বিয়ের রাতেই দেব| তাহলে?


Rate this content
Log in

More bengali story from chanchal das

Similar bengali story from Tragedy