Debdutta Banerjee

Romance Others


3  

Debdutta Banerjee

Romance Others


ঝরে বৃষ্টি ঝরে

ঝরে বৃষ্টি ঝরে

10 mins 9.3K 10 mins 9.3K

অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে বাদল ধারা, দিয়া বড় কাচের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। এখানে বাড়ি গুলো বড্ড ফাঁকা ফাঁকা। আর মানুষ গুলোও বড্ড ফাঁপা, কেউ কারো ব্যাপারে বেশি মাথা লাগায় না। সপ্তাহের শেষে সবাই মিট করে ঠিকই, নিজেদের সংস্কৃতিকেও ধরে রাখতে চায়।

কিন্তু দিয়ার ব‍্যাপারটা বড্ড সাজানো, মেকি মনে হয়। সবাই সবার বিপদে এগিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু নিঃস্প্রাণ, বড্ড বেশি যান্ত্রিক। চার বছর ধরে এই দেশে রয়েছে সে। মাঝে একবার একমাসের জন‍্য বাড়ি গেছিল। মা এর শেষ কাজে।

ছোটবেলাটা কত সুন্দর ছিল। এমন বৃষ্টির দিনে সব বন্ধুরা মিলে কাগজের নৌকা ভাসাতো। একসাথে খিচুড়ি খেতো কারো না কারোর বাড়িতে। মন খারাপ হলে বন্ধুরা ঠিক খবর পেয়ে যেত। মন ভালো করার দায়িত্বটা ওরাই নিয়ে নিত। কিন্তু এখন আর সেই হৃদয়ের টান আর অনুভব করে না দিয়া।

এই চার বছরে সৈকতকেই ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেনি দিয়া ! সৈকত কি পেরেছে দিয়ার মনের কাছে পৌঁছাতে ? দিয়ার মনে হয় সৈকত আসলে তাকে ভালই বাসতে পারে নি। দিয়ার মধ‍্যে যে একটা চুলবুলি ছটফটে নরম মনের মেয়ে ছিল সে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।

প্রথম বৃষ্টিতে দিয়া ভিজতে ভালোবাসতো, কবিতা পড়তে ভালবাসতো, ভালোবাসতো গরম পেঁয়াজি আর লঙ্কা দিয়ে মুড়ি মাখা খেতে। আর আজকের দিয়া বন্ধ ঘরে আবদ্ধ হয়ে বৃষ্টি দেখে। সৈকতের কথায় হয়তো খিচুড়িও রাঁধে, কিন্তু সেই খিচুড়িতে ঐ স্বাদ আসে না।

আজ বহুবছর পর হঠাৎ করে একটা পুরানো স্যুটকেসের ভেতর খুঁজে পায় শুভ্রর কবিতার কয়েকটা পাতা। তাই আজ মন উথালপাথাল ঝড়ে সব এলোমেলো ?

মনের গোপনে লুকিয়ে রাখা সব দুঃখ আজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। প্রকৃতিও কি আজ খোঁজ পেয়েছে তার মনের। তাই কি আজ সব ধুয়ে ভাসিয়ে নিতে চায়!!

আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টির মতোই দিয়ার দু চোখে নেমেছে ঘন শ্রাবণধারা। আর অন্তরে চলছে রক্তক্ষরণ। বাপির কথা শুনে সেদিন দিয়া ঠিক করেছিল নাকি ভুল আজও বোঝোনি সে। বাপি আর মামাইকে খুশী করতে গিয়ে নিজের ভালবাসার আহুতি দিয়েছিল, নাকি ভালবাসার মানুষটার স্বপ্ন সত‍্যি করতে গিয়ে বাপি, মামাই এর কথা শুনেছিল, এই অঙ্কটা আজও বোঝে নি সে !আবার একেক সময় মনে হয় সে বোধহয় নিজের ভবিষ‍্যতকে সুরক্ষিত করতে ভালবাসাকে ত‍্যাগ করেছিল। তাই সৈকতের সাথেও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে নি। সৈকতের জীবনে সে শুধু একটা প্রয়োজন। একদিকে সে সৈকতের হোমমেকার, ঘর সাজিয়ে, রান্না করে সব হাতের সামনে গুছিয়ে না দিলেই সৈকতের মাথা গরম। অন‍্যদিকে বিছানার সৈকতের যাবতীয় জুলুম মেনে নিতে সে বাধ‍্য। না, তারমধ‍্যে ছিটেফোঁটাও ভালবাসার রেশ থাকে না। সৈকতের প্রবল চাহিদার চাপে একেকদিন যন্ত্রনা আর অপমানে কুঁকড়ে যেতে যেতে দিয়া ভাবে এবার প্রতিবাদ করবে। কিন্তু পারে না ঘুরে দাঁড়াতে। বাপি আর মামাই ভালো ছেলে ভেবে যে এক বিকৃত রুচির ছেলের হাতে তাকে তুলে দিয়েছে এটা খুলে তাদেরও বলতে পারেনি, তারাও চলে গেছিল একে একে। প্রতিদিন ভাবে আর নয়। এবার সে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু পারে না, আবার একেক সময় মনে হয় এটাই হয়তো তার শাস্তি, নিরীহ ছেলেটার সাথে যে অন‍্যায় ও করেছিল এই হয়তো তার উচিত পাওনা, যা ভগবান তাকে দিয়েছে। কারণ এতো মেয়ের মধ‍্যে তার কপালেই কেন এমন হল!

আজ এই বৃষ্টি মুখর দিনে শুভ্রর কবিতার পাতা গুলো হাতে পেয়ে মন পাড়ি দেয় অতীতে। চা বাগান আর পাহাড় নদীতে ঘেরা ছোট্ট জায়গায় সে বড় হয়েছে। মানুষগুলো ওখানে খুব সহজ সরল। সবাই সবার দুঃখে ঝাঁপিয়ে পড়তো। বিপদে পাশে দাঁড়াতো। কলেজেই পরিচয় হয়েছিল শুভ্রর সাথে।লাজুক, চুপচাপ ছেলেটার দু চোখে ছিল এক স্বপ্ন। যার খোঁজ পেয়েছিল দিয়া। ওর খাতার পাতায় ধরা পড়তো প্রকৃতির রূপ, শব্দের পর শব্দ বসিয়ে শুভ্র লিখে চলতো প্রেমের কবিতা। এক কল্পনার নারীকে নিয়ে ছিল তার যাবতীয় মান, অভিমান, ভালবাসা। আস্তে আস্তে কিভাবে যেন দিয়া জড়িয়ে গেছিল শুভ্রর কবিতার সঙ্গে। প্রতিটা কবিতাই তখন দিয়াকে ঘিরে আবর্তিত হতো। দিয়াই ছিল সে সব কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক। দিয়ার চোখ দিয়েই স্বপ্নকে তুলে ধরতো শুভ্র। কখনো চা বাগানের ভেতর হারিয়ে গিয়ে, কখনো কোনো উচ্ছল ঝরণার নিচে বড় পাথরে বসে কবিতা শুনতে শুনতে হারিয়ে যেতো ওরা। দেখতে দেখতে কলেজের তিনটে বছর কেটে গেছিল। পাহাড়, নদী, ঝরণা, অরণ‍্য আর চা বাগানের অলিগলিতে সৃষ্টি শুভ্রর কবিতা তখনো খাতার পাতায় বন্দী। একটা দুটো পত্রিকায় ছাপা হলেও কবি হওয়ার দৌড়ে সে তখন বহু পিছনে। প্রকাশকের দরজায় বারবার ঘুরেও ফিরে গেছে কবিতাগুলো। কোনো নবীন প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসেনি কোনো সাহসী প্রকাশক। দিয়া শক্ত হাতে ধরে রেখেছিল শুভ্রর হাত।তার স্থির বিশ্বাস ছিল একদিন সাফল‍্য আসবেই। যেদিন শুভ্র কবি হিসাবে স্বীকৃতি পাবে সেদিন সবাই দিয়াকেও চিনবে শুভ্রর কবিতার ভেতর দিয়ে।

বড়লোকের আদুরে একমাত্র মেয়ে দিয়ার চোখে শুভ্র এক নতুন প্রতিভা। অথচ ওরা জানতো না কবি হতে হলে প্রতিভার সাথে পরিচিতিও দরকার। কয়েকটা কবিতা পত্রিকায় স্থান পেলেও কবি হয়ে উঠতে এখনো অনেক দেরি শুভ্রর। ওর না ছিল অর্থের প্রাচুর্য, না ছিল সামর্থ‍্য, ছিল না কোনো খুঁটির জোর। উত্তরবঙ্গে থেকে লড়াইটা হয়েছিল আরো কঠিন।

দুজনের পাখির চোখে তখন একটাই লক্ষ‍্য, তাই খেয়াল করেনি প্রভাত চ্যাটার্জী অর্থাৎ দিয়ার বাবাও ওদের লক্ষ‍্য করছিলেন।

শুভ্রর বিধবা মা একটা চা বাগানের হাসপাতালের নার্স। আড়ম্বর বিহীন ছোট্ট সংসার ওনার সেই রোজগারে চলে যায়। ছেলের স্বপ্নে বাধা দেননি কখনো। রোজগারের জন‍্য চাপও যেমন দেননি ছেলেকে, প্রকাশকের চাহিদা মেটাবার সামর্থ‍্যও ছিল না। উনিও ভাবতেন কলমের জোরেই একদিন ছেলে স্বীকৃতি পাবে।

কিন্তু সফল ব‍্যবসায়ী প্রভাস বাবু জানতেন ব‍্যবসার নিয়মকানুন। মেয়ের ভবিষ‍্যত নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি, আবার মেয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাও পছন্দ ছিল না। মাঝে মধ‍্যে মেয়ের থেকে খোঁজ নিতেন যে শুভ্র কতটা এগোলো।হতাশা আর ব‍্যার্থতার গল্পটা মেয়ের মুখ থেকেই শুনতে চাইতেন। উৎসাহ দিতেন না তেমন, কিন্তু তবু দিয়া ভাবতো তার আদরের বাপি এই লড়াইএ সামিল বোধহয়। একমাত্র বাপিকেই সব কথা খুলে বলে হাল্কা হতো সে। বাপি বাধা দিত না কিছুতেই তবে কয়েকটা শব্দে মেয়েকে বুঝিয়ে দিতেন জীবনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা। এটাও বুঝিয়ে দিতেন যে, এ লড়াই শুভ্রকেই জিততে হবে নিজের চেষ্টায়। শক্ত খুঁটি খুঁজে নিতে হবে। উত্তরবঙ্গে বসে যা ছিল ঐ যুবকের পক্ষে অসম্ভব কাজ। আজ বোঝে দিয়া বাপি আসলে ঘুঁটি সাজাচ্ছিল। বোকা মেয়ে হয়েও সে বোঝেনি সেদিন। বাপির যা পরিচিতি ছিল তা ব‍্যবহার করে বাপি হয়তো পারতো শুভ্রকে স্বীকৃতি দিতে। তা বাপি করতে চায়নি। অবশেষে বাপি একদিন তাকে ডেকে বলেছিলেন যদি শুভ্র নিজের পায়ে না দাঁড়াতে পারে দিয়াকে সরে আসতে হবে এবার। শেষ সুযোগ একটা দিয়েছিলেন ছয় মাসের। দিয়া আর শুভ্র অনেক চেষ্টা করেও মাত্র দুটো পত্রিকায় শুভ্রর কবিতা দেখতে পেয়েছিল।

ভেঙ্গে পড়েছিল দিয়া, অবশ‍্য বুঝতে দেয়নি শুভ্রকে। ওকে উৎসাহ দিয়েই চলেছিল বেশি করে। কিন্তু নিজে টের পেয়েছিল বাস্তবে শুভ্রর প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুব শক্ত। আসলে শুভ্র শুধু লিখতো, পত্রিকা গুলোয় লেখা পাঠানো আর যোগাযোগের দায়িত্ব ছিল দিয়ার কাঁধে।

এরপর তুখোড় ব‍্যবসায়ী প্রভাত বাবু খুব কায়দা করে মেয়ের কাছে প্রস্তাব রেখেছিলেন যে, তিনি শুভ্রকে আড়াল থেকে আর্থিক সাহায‍্য দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু সেক্ষত্রে দিয়াকে বাপির কথা মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে বাপির পছন্দের পাত্রর সাথে। শুভ্র এসব কিছুই জানবে না। প্রকাশকের সাথে কথা হবে প্রভাত বাবুর। দিয়ার যেটা স্বপ্ন সেটাই সফল হবে। বই বার হবে শুভ্রর। মার্কেটিং এর দিকটাও দেখবেন উনি। তবে বারবার নয়। প্রথম দুটো বই তিনি প্রোমোট করবেন। তারপর পায়ের নিচে জমি পেয়ে গেলে এ লড়াই শুভ্র একাই করতে পারবে। বই বার হলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে ছেলেটা।

দিয়া কয়েকদিন ধরে ভেবেছিল, শুভ্রর সাফল‍্য, না শুভ্রকে নিজের করে পাওয়া কোনটা বেশি জরুরী তার কাছে?শুভ্র তাকে ঠিক কতটা ভালবাসে সেটাই দিয়া তখনো জানতো না।

গভীর ভাবে শুভ্রের সাথে মিশে বুঝতে পেরেছিল শুভ্রর প্রথম ভালবাসা কবিতা। জীবনের মুল লক্ষ‍্য কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, আর কবিতার প্রয়োজনে দিয়া তার সাথে জড়িয়ে গেছে। কবিতাই ওর জীবন। তাই অনেক ভেবে বাপির প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল।

সৈকতের সাথে কলকাতায় গিয়ে যেদিন ওর রেজিষ্ট্রি বিয়ে হয়েছিল, সেদিন প্রেসে গেছিল শুভ্রর পান্ডুলিপি। আর যেদিন সৈকতের সাথে বিয়ের পর প্লেনে চেপে উড়ে গেছিল বিদেশে, সেই দিন বাপির উদ‍্যোগে কলকাতার এক বিশেষ সভায় প্রকাশকের ব‍্যবস্থাপনায় ছিল শুভ্রর বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। না ,শুভ্র কলকাতায় এসে খুব ব‍্যস্ত হয়ে গেছিল নিজের নতুন জগতে। দিয়ার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। তবে দিয়াও বাপির কথা মতো বদলে ফেলেছিল নিজের ফোন নম্বর, ই-মেল, ফেসবুক প্রোফাইল সব কিছু। কথা দিয়েছিল আর কখনো যোগাযোগ করবে না শুভ্রর সঙ্গে। এই চার বছরে কথা রেখে এসেছে সে। তবে বেনামে শুভ্রের ফেসবুকে নজর রেখেছিল সে। কখনো মনে হয়নি শুভ্র তাকে খুঁজছে বা মিস করছে। খুব অবাক হয়েছিল দিয়া।

তবে শুভ্র বরাবর ফেসবুকে কম আসতো। বই প্রকাশের পর ব‍্যস্ততায় সে আর তেমন সময় পেতো না এটাই মনে হয়েছিল দিয়ার। পুরানো বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ ছিল না আর। নতুন দেশে, নতুন জীবনে নতুন মানুষের সাথে মানিয়ে নিতে চেয়েছিল সব ভুলে। শুধু খোঁজ রাখতো শুভ্রর সাফল‍্যের। কিন্তু তেমন বোধহয় চলে নি ওর বই । কতো নতুন কবিই তো এভাবে প্রতিনিয়ত মাথা তুলতে চাইছে আবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। আসলে শুভ্র সুযোগ পেয়েও হয়তো ধরে রাখতে পারে নি। এসব দিয়েই মনকে বোঝাতো সে।

প্রভাত বাবুও তো আসলে ঠকেই গেছিলেন। মেয়ের সুখ কিনতে গিয়ে মেয়ের ভালবাসাকেই ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, একটু হলেও তিনি এটা বুঝতেন।একমাত্র মেয়ে চোখের আড়ালে কি করছে এসব ভেবে ভেবে হঠাৎ চির বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। তার তিন মাসের মধ‍্যে মামাই ও চলে গেছিল। ঐ একবার দেশে গেছিল দিয়া, কিন্তু শুভ্রর কোনো খবর পায় নি। ওরা বাগানের পাট গুটিয়ে কোথাও চলে গেছিল।

আজ বহুদিন পর শুভ্রর কবিতা গুলো হাতে পেয়ে দিয়া ভাবে এখন তো বাপি নেই। এবার তো সে শুভ্রর খোঁজ করতেই পারে। কিন্তু কিভাবে?

শিখা আজ দীপের কবিতার খাতাটা নিয়ে আবার এসেছে প্রকাশকের দরজায়। দীপকে এই ডিপ্রেশন থেকে বের করার একটাই উপায়, যদি কেউ ওর লেখা গুলো নিয়ে একটা বই বার করে।

এক বছর ধরে প্রকাশকদের দরজায় ঘুরে ঘুরে শিখাও ক্লান্ত।দীপ আজকাল আর লেখে না। খাতা আর পেন নিয়ে বসে থাকে, হিজিবিজি আঁঁকে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল শিখা। কয়েকটা সিটিং এর পর ডাক্তার বলেছিল ওর আত্মবিশ্বাসে আঘাত লেগেছে। ওর একটা বই প্রকাশ ভীষণ জরুরী, যেটা ওকে ফিরিয়ে দেবে নিজের প্রতি বিশ্বাস।

ওকে আঁকতে দেখে শিখা রঙ, তুলি কিনে এনেছিল সেদিন। আজ আবার সেই পুরানো প্রকাশকের কাছেই গেছিল শিখা, কয়েক বছর আগে উনিই প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন দীপকে। পর পর তিনটে বই বেরিয়েছিল এই গুপ্ত প্রকাশনী থেকে। ভালই চলেছিল। চার নম্বরটাও বার করেছিল ওরা।কিন্তু তারপর আর চলেনি বলে ওরা নিতে চায় না আর দীপের লেখা। কয়েকটা পত্রিকায় মাঝে মধ‍্যে একটা দুটো ছাপে। কিন্তু এভাবে তো আর চলে না। দীপের কবিতার প্রথম বইটা পড়েই শিখা ওর প্রেমে পড়েছিল। অনেক কষ্টে ওর সাথে যোগাযোগ হয়েছিল। কিন্তু সে সময় দীপ নতুন বই নিয়ে ব‍্যস্ত। দ্বিতীয় বই প্রকাশের পর পরিচয় হয়েছিল। তৃতীয় বইটা ভাল চলে নি। চতুর্থ বইটা মুখ থুবড়ে পড়তেই সবাই ভুলতে বসেছিল তরুণ কবিকে। আর ঠিক সেই সময় শিখা দীপকে উৎসাহ দিতে শুরু করেছিল। আস্তে আস্তে জড়িয়ে পরেছিল দীপের সাথে। দীপের মধ‍্যে একটা চাপা দুঃখ ছিল। ওর সব কবিতাতেই ইদানিং সেই দুঃখ ফুটে উঠতো।

শিখা ধীরে ধীরে জেনেছিল ওর জীবনেও কেউ ছিল।যে ওর সাফ‍ল‍্যের দিনে আর ওর পাশে দাঁড়ায়নি। ওর উপর ভরসা হারিয়ে সে হাত ছেড়ে দিয়েছিল মাঝ পথে। ভেঙ্গে পড়েছিল তরুন কবি।

সেই হাত শিখা শক্ত করে ধরেছিল। বলেছিল সে কখনোই ছাড়বেনা এই হাত। এক বছর আগে অবশেষে তারা বিয়েও করেছিল এক মন্দিরে। শিখার মা বাবা গত হয়েছিল ও কলেজে থাকতেই।একটা কবিতার স্কুল ছিল ওর। ভাল কবিতা শেখাতো। টুকটাক সেলাই করতো। একা চলে যাচ্ছিল ওর। দীপের কেউ ছিল না। দু বছর আগে মা ও চলে গেছিল বন্ধন কাটিয়ে।

কিন্তু শিখা ওর জীবনে এসে বুঝেছিল দীপ কবিতা ছাড়া বাঁচবে না। কবিতার পান্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরে ক্লান্ত দীপ জানতে পেরেছিল এমন কিছু সত‍্য যা থেকে ও হয়েছিল প্রবল ডিপ্রেশনের স্বীকার। শিখা অনেক চেষ্টা করেছিল।

পান্ডুলিপি নয়, প্রকাশকের নোংরা চাওনি ছুঁয়ে যাচ্ছিল শিখার শরীরের প্রতিটি গোপনীয় অংশ। লোভী দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটটা একবার চেটে লোকটা বলেছিল-"বই ছাপাতে খরচা লাগে। ছাপানোর খরচ বহন করতে হবে"। শিখা বলেছিল ওর চারটে বই আছে বাজারে।

-" আরে ম‍্যাডাম, খোঁজ নিয়ে দেখুন, ওগুলো চলেনি বলেই না ঐ গুপ্তা আর নিতে চাইছে না।" পান চিবাতে চিবাতে চোখ মটকে বলেছিল নোংরা লোকটা।

-" কিন্তু ওগুলো ছাপতে ওরা কোনো টাকা নেয়নি। বরঞ্চ বিক্রির পর রয়‍্যালটির চেক দিয়েছিল।" শিখা বলে।

পানের পিকটা কায়দা করে পিকদানে ফেলে পঞ্চাশো্র্ধ্ব লোকটা বলে,"খরচা ছাড়া কেউ নিজের বাড়ির লোকের বই ও ছাপবে না এইখানে। খরচা তো নিয়েছিল শিওর। এবার সেটাও কেউ টাকায় দেয় কেউ অন‍্য ভাবে পুশিয়ে দেয়।" আবার চোখ মটকায় লোকটা।

শিখার আজ জেদ চেপে গেছে। বলে, -"কেন এই ব‍্যবসাকে বদনাম করছেন আপনি। আমি ওনার স্ত্রী, টাকা দিয়ে বই ছাপলে আমি জানতাম। ঠিক আছে জেনেই আসবো এরপর। " শিখা বেরিয়ে আসে। গুপ্তার অফিসে হানা দেয়।

আজ শুভ্রদীপ ঘটকের সপ্তম বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। বই এর নাম "শুধু তোমারি জন‍্য"।

আগের দুটো বই ভালোই চলেছে এবার।

অনেক নামিদামী সাহিত‍্যিকরা ছাড়াও সমাজের বিশিষ্ট ব‍্যাক্তি অনেকেই উপস্থিত এ অনুষ্ঠানে। শুভ্রদীপ বইটা উৎসর্গ করেছে অদ্বিতীয়াকে। মিডিয়া এ নিয়ে তোলপাড়। কেউ বলছে এই অদ্বিতীয়া আসলে কবির প্রথম জীবনের প্রেমিকা দিয়া, কেউ বলছে এ ওর কবিতার নায়িকা, আবার কারো মতে অদ্বিতীয়া কবির স্ত্রী। কেউ বলছে অদ্বিতীয়া নারী জাতির প্রতীক। যারা হারে না। সব পুরুষের সাফল‍্যের পিছনে থাকে এক নারী।এ সেই নারী।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি। তবু তা উপেক্ষা করে ভালোই জনসমাগম হয়েছে।কবির স্ত্রী শিখা দেবী মার্কেটিং আর পাবলিক রিলেশনটা সামলাচ্ছেন। এই বই পাবলিশ করেছে মুকেশ জৈন। অবশ‍্য নিন্দুকেরা বলছে শিখা দেবীর সাথে জৈনের একটা সম্পর্ক এই সাফল‍্যের পিছনে রয়েছে। তবু এই বই এর কবিতা গুলো সবাই মুগ্ধ হয়ে পড়ছে। সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অল্প বয়সীদের সই সহ বই সংগ্ৰহ করার ভিড় সামলে শিখা যখন জৈনের গাড়িতে গিয়ে উঠলো তখন ঘড়িতে রাত আটটা।

এই সাফ‍ল‍্যের মূল্য শেষ এক বছর ধরে এভাবেই চুকিয়ে আসছে শিখা। টাকা দিয়ে নয় নিজেকে বিক্রি করে ভালবাসার মানুষটাকে বাঁচাতে পেরেছে সে। একের পর এক বই প্রকাশিত হচ্ছে, লোকে চিনছে তরুণ কবিকে। তবে শুভ্র জানে এ সাফল‍্য তার লেখনীর।

সূদূর বিদেশে বসে ফেসবুকের দেয়ালে শুভ্রদীপ ঘটকের বই প্রকাশের খবরটা দেখে চোখের জল মুছে জানালায় এসে দাঁড়ায় দিয়া। বাইরে সেদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। আজ দিয়ার খুব ভিজতে ইচ্ছা করে। প্রতি রাতের অত‍্যাচার আর সৈকতের হাতে বৈধ ধর্ষনের ক্ষত ধুয়ে যায় ধীরে ধীরে। তার ত‍্যাগের বদলে আজ শুভ্র প্রতিষ্ঠা পেতে চলেছে এটাই আনন্দ। অবশ‍্য এখন আর বাপি নেই, এইবারের স্বীকৃতি শুভ্রর নিজের পাওয়া।

মঞ্চে কবি শুভ্রদীপ তখন আবৃত্তি করছে তার কবিতা-

“শুধু তোমারই জন‍্য

আমি হতে পারি আকাশ

তুমি আমার বুকেতে উড়ো।

যদি বলো প্রখর বৈশাখী দুপুরে

আমি হবো শীতল বৃষ্টি ধারা

তুমি আমাতেই অবগাহন করো।

যদি তুমি বলো, তুমি হবে ঐ নদী

আমি তবে হবো নীল সাগর

তুমি আমাতেই এসে পড়ো।”

হোটেলের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে নিজের পাওনা বুঝে নিচ্ছে জৈন। বাইরে তখন আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি সব ধুয়ে দিচ্ছে।

-সমাপ্ত-

#positiveindia


Rate this content
Log in