Sayandipa সায়নদীপা

Drama Fantasy


3  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama Fantasy


হিনা : প্রথম অধ্যায়

হিনা : প্রথম অধ্যায়

27 mins 2.3K 27 mins 2.3K

আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ….

“উফফ নট এগেন হিনা, ডিসগাস্টিং!” আজও মাঝরাত্রিরে হিনার চিৎকারে ঘুম ভেঙে যেতে যাবতীয় শ্লেষ উগরে দিল সৌম্যক। হিনার ঘামে ভিজে যাওয়া শরীরটা কাঁপছে আজও, কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই সৌম্যকের, সে আবার শুয়ে পড়ল পাশ ফিরে। কাঁপা কাঁপা হাতে জলের বোতলটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল হিনা, এখন খানিক ধাতস্থ লাগছে তার। বিছানা থেকে নেমে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো সে। বাথরুমের সামনে মুখোমুখি হলো ননদ আত্মজার সঙ্গে, সেও চোখ মুখ কুঁচকে নিজের বিরক্তিটা হিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল হনহন করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল হিনা।

এখন কত রাত কে জানে! ঘড়ি দেখা হয়নি। হিনা এসে দাঁড়ালো ছাদে, ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগতেই শরীরের সাথে সাথে মনের ক্লান্তিটাও যেন অনেকখানি লাঘব হয়ে এলো। আচ্ছা কেমন হবে কাল থেকে যদি হিনা রাতে না ঘুমোয় কিংবা এই ছাদে চলে আসে, তাহলে তো আর ওর চিৎকারে কেউ বিরক্ত হবেনা!

হিনা আর সৌম্যকের বিয়ের আগে পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল, ব্যাঙ্গালুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে আলাপ দুজনের। এই সবে ছয়মাস বিয়ে হয়েছে ওদের, দুই বাড়ির কারুরই মত ছিলনা এই বিয়েতে কেননা দুজনের ধর্ম আলাদা; তবুও ওরা দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত বলে বাড়ির লোকের আপত্তি ধোপে টেকেনি শেষমেশ। ওরা এখন বেঙ্গালুরুতেই সংসার পেতেছে পাকাপাকিভাবে। বস্তুত সৌম্যক কোনোদিনও হিনার বাপের বাড়ি যায়না, হিনাও এর আগে কোনোদিনও এসে থাকেনি সৌম্যকের বাড়িতে। কিন্তু কিছুদিন আগেই হঠাৎ ওরা খবর পায় সৌম্যকের দাদু গুরুতর অসুস্থ, হয়তো আর বাঁচবেনও না মানুষটা তাই দুজনে তড়িঘড়ি ছুটি নিয়ে চলে এসেছে এখানে সৌম্যকদের বাড়িতে। আর এখানে আসার পরেই শুরু হয়েছে যত বিপত্তি। প্রথম দুদিন কিছুই হয়নি কিন্তু তারপর থেকে রাতে হিনা কিসব যেন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে আর স্বপ্ন দেখে এমন চিৎকার করে ওঠে যে গোটা বাড়ি সুদ্ধ লোকের ঘুম ভেঙে যায়। অথচ ঘুম ভেঙে গেলে ওর কিছুতেই আর মনে পড়তে চায়না স্বপ্নটা কি ছিল, শুধু বুঝতে পারে ভীষন ভয়ংকর কিছু একটা দেখেছে আর তাই ওর গোটা গা ঘামে ভিজে জবজব করে, কাঁপতে শুরু করে ওর শরীর। রোজ রাতের একই গল্প। এমনিতেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওকে একটুও পছন্দ করে না, তার ওপর আবার এই স্বপ্নের সমস্যা ওদের ঘৃণায় অনুঘটকের কাজ করছে, এখন তো সৌম্যকও বিরক্ত ওর ওপর। হিনা চেষ্টা করেছে সৌম্যকের সাথে এ নিয়ে কথা বলতে কিন্তু তার বিরক্তির পারদ এমনই তুঙ্গে চড়েছে যে কথা বলা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হিনা বুঝতে পারছে তার কিছু একটা শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হচ্ছে কিন্তু সেটা ঠিক কি ও কিছুতেই ধরতে পারছে না। সৌম্যককে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে সে পাত্তা তো দেয়ইনি বরং ঠোঁট উল্টে বিদ্রুপ করে বলেছে, “স্বপ্ন নিয়ে মাতামাতি!” হিনা তাই আজ ঠিক করল ও নিজেই খোঁজ খবর করে কোনো ফিজিশিয়ানকে দেখাবে আগে তারপর প্রয়োজন পড়লে সাইকোলজিস্টের সাথে পরার্মশ করবে।

কোথাও থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে আসছে… উঁহু শব্দ ঠিক নয়, একটা কোলাহল…. অনেক দূর থেকে আসছে… কি হয়েছে!

ঘুমটা ভেঙে গেল রাজন্যার, বিছানায় আস্তে করে উঠে বসলো সে। আশেপাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছেনা, আশ্চর্য তো! অন্যদিন তার ঘুম ভাঙলেই কেউ না কেউ ছুটে আসে সঙ্গে সঙ্গে অথচ আজ কেউ এলোনা! রাজন্যা প্রথমে মৃদু গলায় ডাকলো, “বৃন্দা…শিখা...”, তারপর একটু জোরে, কিন্তু নাহ কারুর সাড়া পাওয়া যাচ্ছেনা। সেই কোলাহলটা এখনো কানে আসছে; কিছু তো একটা নিশ্চয় হয়েছে আর তাই হয়তো ডেকেও কারুর সাড়া পাওয়া যাচ্ছেনা। বাইরে বেরিয়ে দেখবে কিনা স্থির করতে পারছে না রাজন্যা, কৌতূহল হচ্ছে বাইরে বেরিয়ে একবার দেখতে কিন্তু একা একা বাইরে যাওয়াটাও বোধহয় ঠিক হবেনা। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো সে, আর তখনই ঝড়ের গতিতে তার ঘরে ঢুকলো মিহিকা, রাজন্যার প্রিয় সখী।

“রাজকুমারী তুমি জেগে গিয়েছো!”

“হ্যাঁ মিহিকা, কিন্তু কি হচ্ছে বাইরে? এই কোলাহল কিসের?”

“সর্বনাশ হয়ে গেছে রাজকুমারী, আমাদের রাজ্য আক্রমণ হয়েছে।”

“কি বলছ কি! কারা আক্রমণ করেছে?”

“আমি অতশত এখনো জানিনা, শুধু শুনলাম খুব শক্তিশালী কোনো রাজা হবে।”

“সেকি! বাবা কোথায়?”

“মহারাজ সব সভাসদদের নিয়ে জরুরি আলোচনায় বসেছেন।”

“কিন্তু…”

“আর কোনো কথা নয় এখানে, তুমি চলো শিগগির। আমাদের অন্দরমহলের সেই নিরাপদ কক্ষে এক্ষুণি পৌঁছাতে হবে, সব মহিলা আর শিশুরা সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে।”

মিহিকার সঙ্গে অন্দরমহলের একটি বিশেষ কক্ষে প্রবেশ করলো রাজন্যা। ইতিমধ্যেই অনেক মহিলা ও শিশু এসে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে, রানিমাও আছেন তাদের সঙ্গে। রাজন্যাকে দেখে তিনি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন ওকে, “এসেছিস মা! আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল তোর জন্য, এই শিখা আর বৃন্দাও তো তোকে ছেড়ে চলে এসেছিল…” এই বলে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকালেন দুই পরিচারিকার দিকে।

“চিন্তা কোরোনা মা, আমি ঠিক আছি। কিন্তু এসব কি হয়ে গেল?”

“কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা রে, হঠাৎ করে মন্ত্রীমশাই এসে খবর দিলেন।”

“মা…!” আচমকা চিৎকার করে উঠলো রাজন্যা।

“কিরে কি হলো?”

“মা আমার ধ্রুপদ কোথায়?”

“সেকি ধ্রুপদ নেই এখানে!”

“নাহ মা ও নেই,

এই কেউ শিগগির গিয়ে ধ্রুপদকে খুঁজে আনো না…” কাতর গলায় অনুরোধ করলো রাজন্যা।

কাউকে যেতে হলো না তার আগেই কক্ষের দরজা খুলে ঢুকলেন প্রাক্তন সেনাপতি অঙ্গদ, বয়েস হয়েছে বলে নিজের পদ ছেড়ে দিলেও এখনো যথেষ্ট শক্ত সামর্থ্য আছেন তিনি, সেনাদের এখনো প্রশিক্ষণ দেন নিয়মিত। সেনাপতি অঙ্গদের পেছন পেছন ঢুকলো ছোট্ট ধ্রুপদ। অঙ্গদ বললেন, “সামলান রাজকুমারী আপনার শিষ্যটিকে, এই টুকু পুচকে ছেলে বেরিয়ে গিয়েছিল শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করবে বলে।”

বুকটা কেঁপে উঠলো রাজন্যার, ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন ধ্রুপদকে, “তুই কি পাগল হয়েছিলি!” ধ্রুপদ রাজকুমারীর কথার কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই রানীমা প্রাক্তন সেনাপতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি ব্যাপার সেনাপতি কোনো খবর?”

“খবর ভালো নয় রাণীমা, সিমন্তপুরের রাজা মেঘরাজের বাহিনী আমাদের রাজ্য আক্রমণ করেছেন।”

“কিন্তু কেন! আমরা তো সবসময় শান্তিপূর্ণ ভাবেই থেকেছি তাহলে…?”

“রাণীমা কথায় বলে রাজা মেঘরাজের মত শক্তিশালী আর নির্দয় মানুষ খুব কমই আছেন এ জগতে। কোনো নিয়ম নীতি ধার ধারেন না উনি, যখন যা ইচ্ছে তাই করেন। এখন তিনি রাজ্য জয়ের নেশায় মেতেছেন, একের পর এক ছোটছোটো রাজ্যগুলো ধ্বংস করতে করতে এবার আমাদের দিকে হাত বাড়িয়েছেন।”

“আমাদের সেনারা প্রস্তুত তো?

কি হলো সেনাপতি মুখ নামিয়ে নিলেন কেন?”

“কি বলি রাণীমা! আমাদের রাজ্যের সব সেনা মিলিয়েও রাজা মেঘরাজের বাহিনীর অর্ধেক হবেনা, তাছাড়া যুদ্ধ করার জন্য অনেক প্রয়োজনীয় উপকরণও আমাদের রাজ্যে নেই...”

“কি বলছেন কি!”

“আপনারা চিন্তা করবেন না রাণীমা, ভালো করে দোর লাগিয়ে ভেতরে থাকুন সবাই। আমি বাইরেই আছি, প্রয়োজনে আওয়াজ দেবেন।”

“আচ্ছা।”

“আর বলছি যে…”

“কি?”

“বলছি যে… মানে… রাজকুমারীকে একটু সাবধানে রাখবেন, দেখবেন শত্রুপক্ষের নজরে যেন না পড়েন কোনোভাবেই।”

“সেনাপতি…! তুমি কি কিছু ইঙ্গিত করছো?”

“আপনি তো সবই বোঝেন রাণীমা… আমি আসছি।”

কি বলে গেল সেনাপতি অঙ্গদ! রাজন্যার দিকে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠলো রাণীমার।

তিন চারদিনের মধ্যেই বোধহয় অমাবস্যা, চাঁদটা তাই তার মুখ লুকিয়ে ফেলেছে প্রায়। ছাদে পায়চারি করছিলো হিনা, ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। মায়ের কোলে মাথা রাখতে ইচ্ছে করছে ভীষন, কিন্তু সে উপায় তো আর নেই। বড় আশা করে আজ ও ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, মনে হয়েছিল একবার ডাক্তার দেখালে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে নিশ্চয়। কিন্তু আজ সেখানে গিয়ে হতাশা ছাড়া কিছুই মিললো না। ডাক্তার বললেন শ্বশুরবাড়ির সবার এই বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কারণেই নাকি হিনা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে দিনকে দিন আর তারই ফলশ্রুতি ওই স্বপ্ন। কিন্তু হিনার কেন না জানি মনে হচ্ছে ব্যাপারটা এতোটাও সহজ নয়; অবশ্য ডাক্তারবাবু বললেন হিনা যদি ওর স্বপ্নটা বলতে পারত তাহলে ব্যাপারটা অনেকটাই পরিষ্কার হতো। কিন্তু ওর তো ঘুম ভাঙলে কিছুতেই আর মনে পড়ে না স্বপ্নটা! কোনো সাইকোলজিস্টের সাথে একবার পরামর্শ করা যেতে পারে কি!

পায়চারি করতে করতে কখন যেন ছাদের ধারের দিকে চলে এসেছে হিনা, এই বাড়ির উত্তর দিকে পুকুর আছে একটা। হিনা নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সেটা। জ্যোৎস্না রাতে চমৎকার লাগে জলটা, মনে হয় যেন অগুন্তি আলোর মালা নিজেদের ছন্দে দুলতে দুলতে নিরুদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে। এখানের এই একটা জিনিসকেই ভালোবেসে ফেলেছে ও; আজকে জলে ওই আলোর খেলাটার খুব প্রয়োজন ছিল, ওটা দেখলে ক্ষনিকের জন্য হলেও শান্ত হতো মনটা, কিন্তু আজ তো চাঁদই নেই তাই আলোও খেলা করছেনা আজ।

হঠাৎ করে ভীষন গুমোট হয়ে গেল চারপাশটা। বাতাস তো চোখে দেখা যায়না তবুও হিনার মন কিসের সন্ধানে কে জানে ভ্রু কুঁচকে আশেপাশে একবার তাকিয়ে নিল। আর সেই ক্ষণিকের মধ্যেই পুকুরের ওপর যেন একটা উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠলো, হিনা চমকে গিয়ে নীচের দিকে তাকালো আবার। আলোর প্রবল্যে প্রথমে কিছুই দেখা গেলনা কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আলোর প্রাবল্য কমে গেল আর সেই সাথে সাথে পুকুরের জলে যেন ভেসে উঠলো একটা প্রতিচ্ছবি। এই অন্ধকার রাতেও জলের মধ্যে হিনা স্পষ্ট ভাসতে দেখলো একটা ভীষন পরিচিত মুখ। আতঙ্কে আর্তনাদ করে ছাদের নোনা ধরা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল সে…

“রাজকুমারী তুমি কি সত্যি সত্যিই…?”

“আমার কথা পরে হবে মিহিকা, আগে তোমাকে একটা কথা দিতে হবে আমায়।”

“কি কথা বলো।”

“আমি যখন থাকবো না তখন আমার ধ্রুপদের দেখভাল করতে হবে তোমায়, ওর কোনো অযত্ন হতে দেবেনা কথা দাও।”

“কিন্তু রাজকুমারী তুমি কোথায় যাবে? তুমি কি সত্যিসত্যিই ওই কদর্য শয়তানটার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে?”

“আমায় ক্ষমা করো সখী, এই বিষয়ে আমি তোমায় কিছুই বলতে পারবোনা। বাবার বারণ আছে।”

“আমি ভাবতে পারছিনা আমাদের রাজ্যের প্রজারাও এতটা অকৃতজ্ঞ যে তারাও চায় তুমি…”

“মিহিকা কেঁদো না সখী, একজনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যদি গোটা রাজ্যটা বাঁচে তাহলে সবাই চাইবে তাই হোক, এতে আর প্রজাদের দোষ কি?”

“তুমি তারমানে সত্যিই ওদের শিবিরে যাবে? ও তো তোমাকে…”

“জানি, আমি যদি নিজেকে রাজা মেঘরাজের সম্ভোগের জন্য সমর্পণ করি তাহলে উনি আমাদের রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন।”

“চুপ করো রাজকুমারী, এমন কথা শুনতেই এতো কুৎসিত লাগছে…”

মিহিকার কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন পরিচারিকা এসে জানাল রাজন্যাকে মহারাজ ডাকছেন। অশ্রুসজল চোখে নিজের প্রিয় সখীকে অন্তিম আলিঙ্গন করে নিজের অদৃষ্টকে বরণ করতে চললো রাজন্যা। এখনও কয়েকদিন আগের সেই দিনটা স্পষ্ট ভাসছে ওর চোখে। যুদ্ধ চলছে চরমে, সমস্ত মহিলা এবং শিশুরা অন্দরের কক্ষে আতঙ্কে প্রহর গুনছে; এমন সময় হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে এক বিভৎস আর্তনাদ ভেসে এলো। ওদের কারুরই চিনতে অসুবিধা হলো না যে সেই আর্তনাদ সেনাপতি অঙ্গদের। তখনই যা বোঝার অনেকখানি বুঝে গিয়েছিল ওরা; এরপর দরজা ভেঙে ঢুকলো রাজা মেঘরাজের সৈন্যরা। উফফ কি কুৎসিৎ তাদের দৃষ্টি, কি বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি! মহিলারা সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন, রাণীমা প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন রাজন্যাকে আড়াল করার কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা, একজন সৈন্যের নজর পড়েই গেল ওর দিকে। তারা সমবেত হয়ে এরপর কিছু যেন আলোচনা করলো তারপর ছেড়ে চলে গেল ওই কক্ষ। সবাই সাময়িক হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল তখন; কিন্তু তারপরেই এলো সেই ভয়ংকর সংবাদ। পরেরদিনই রাজমশাইয়ের কাছে রাজা মেঘরাজের দূত এসে জানাল যে তাদের রাজা নাকি বলেছেন যদি রাজকুমারী রাজন্যাকে তাঁর শিবিরে পাঠানো হয় তাহলে তিনি এই রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন আর তা না হলে সমগ্র রাজ্য ধ্বংস করে ছাড়বেন।

রাজমশাইয়ের কক্ষে পৌঁছতেই তিনি রাজন্যাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। রাজন্যা তার বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, “এভাবে কেঁদো না বাবা। তুমি রাজ্যের রাজা, তোমার এভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে না।”

এরপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাপতির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে রাজন্যা বললো, “মায়ের সাথে আর মিহিকার সাথে দেখা করে এসেছি, একবার ধ্রুপদকে এনে দেবেন আমার কাছে?”

সেনাপতি কিছু জবাব দেওয়ার আগেই রাজামশাই চিৎকার করে উঠলেন, “না।”

“কেন বাবা…!”

“আসলে… ও তো ছোটো তাই… তুমি ওর চিন্তা কোরোনা, ধ্রুপদ ভালো থাকবে।” এরপর রাজামশাই সেনাপতিকে ইশারা করলেন কক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য।

বাবার কথার ওপর আর কিছু বললোনা রাজন্যা, মনের ভেতরে প্রচন্ড এক ঝড় শুরু হয়েছে ওর। অনেক কষ্টে চেষ্টা করছে নিজেকে শান্ত রাখতে, মনে সাহস আনতে।

“রাজকুমারী…” রাজপুরোহিতের এই ডাকের অর্থ জানে রাজন্যা, ও বললো, “আমি প্রস্তুত। চলুন।”

রাজামশাই তাঁর কক্ষের উত্তর দিকের দেওয়াল জুড়ে আঁকা বিশাল তৈলচিত্রটার একটা নির্দিষ্ট স্থানে হাতের তালু দিয়ে সজোরে চাপ দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ঘড় শব্দ করে দেওয়ালটা একটুখানি ফাঁক হয়ে গেল। সেই ফাঁক দিয়ে অনাসায়ে একজন মানুষ গলে যেতে পারে, সেই ফাঁক দিয়ে মাথা বাড়ালেই দেখা যায় থরে থরে সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে। জায়গাটা এতটাই অন্ধকার যে সিঁড়ির শেষ কোথায় তা দেখা যায়না। রাজন্যা মায়ের কাছে আগে শুনেছিল এই গোপন পথের কথা, আজ প্রথম দেখলো। রাজামশাই ছাড়া বাকি সকলেই কিছুটা হলেও বিস্মিত হয়েছেন। রাজামশাই ইশারা করতেই রাজপুরোহিত প্রদীপ জ্বালালেন, তারপর এক এক করে ওরা পাঁচ জন নেমে এলো নীচে। দুটি কক্ষ রয়েছে এখানে, সামনেরটি অপেক্ষাকৃত ছোটো এবং ফাঁকা। রাজামশাই বাকি তিনজনকে ছোট কক্ষে রেখে শুধু রাজন্যাকে নিয়ে এবার প্রবেশ করলেন দ্বিতীয় কক্ষে। সেখানে ঢোকা মাত্রই এক উজ্জ্বল জ্যোতিতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল তাদের। নিজেকে কোনোমতে ধাতস্থ করে সামনে তাকাতেই চমকে উঠলো রাজন্যা, দেখলো সমগ্র কক্ষ জুড়ে থরে থরে সাজানো রয়েছে কত রকমের গহনা, মোহর আরও কত মণিমানিক্য। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এসব কি বাবা!”

“রাজকোষাগার থেকে সমস্ত কিছু এনে এখানে রেখেছি, নয়তো কিছুই বোধহয় রক্ষা করতে পারবো না।”

“কিন্তু বাবা তুমি যে বললে আমার মৃত্যুর খবর শুনলে ওরা ফিরে যাবে।”

“হুঁ!… হ্যাঁ… কিন্তু ফিরে যাওয়ার আগে যদি সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে যায় তখন কি হবে!”

“বাবা… তুমি সত্যি করে বলোনা আমার মৃত্যু হলেই সব ভয় কেটে যাবে?”

“মারে, আমার প্রাণ থাকতে ওই শয়তানের কাছে তোকে সমর্পণ করতে পারবোনা। এই রাজ্যের রাজা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি একজন পিতাও…”

“আমি সবই জানি বাবা। ওই শয়তানের হাতে নিজেকে সমর্পণ করার থেকে মৃত্যুবরণ করা অনেক বেশি সম্মানের।

একি বাবা তুমি কাঁদছো! দোহাই বাবা কেঁদো না, পিতার কর্তব্য পালনের পর তোমাকে রাজার কর্তব্যও করতে হবে আর দেশের রাজার দুর্বল হলে চলেনা।”

“আমি কেমন অভাগা পিতা যে নিজের একমাত্র সন্তানকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করছি…!”

“তোমার দুঃখ পাওয়ার কিছুই নেই বাবা, এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে নিজের সম্মান রক্ষার্থে রাজপরিবারের নারীরা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে।

কেঁদো না বাবা, কথা দাও আমি যাওয়ার পর তুমি নিজের আর মায়ের খেয়াল রাখবে।”

“মারে তোকে কোথাও যেতে দেবোনা আমি… কোত্থাও না...।”

“এভাবে দুর্বল হয়ো না বাবা।”

“দুর্বলতা নয় রে মা, সত্যি বলছি। তোর প্রানের বিনাশ হলেও তোর দেহটাকে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছি।”

“অর্থাৎ?”

“এই যে দুজন লোককে দেখছিস সাথে এনেছি, এরা উত্তরের এক দেশ থেকে মৃত্যুর পরে কিভাবে দেহকে সংরক্ষন করে সেই কৌশল শিখে এসেছে। ভেবেছিলাম আমার মৃত্যুর পর ওভাবে আমার দেহটা… কিন্তু তার আগেই…” দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন এক হতভাগ্য পিতা। চোখে জল চলে এলো রাজন্যারও; তাও সে নিজেকে সামলে বললো, “বাবা আসি তবে?” রাজামশাই মেয়ের কপালে অন্তিম চুম্বন করলেন; তারপর উল্টো দিকে ঘুরে দেওয়ালের গায়ে নিজের মুখ ঢাকলেন, এ দৃশ্য তার সহ্যের অতীত। নিজের কোমরবন্ধনীর একটা নির্দিষ্ট খোপ থেকে রাজন্যা বের করল একটা ধারালো ছুরি, যার তীক্ষ্ণ সাদা ফলার জ্যোতি ঠিকরে পড়লো চারিদিকে…

সেদিনের পর থেকে আর কারুর সাথে ভালো করে কথা বলেনা হিনা। খোলা চুলে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে শুধু। রাতে না ঘুমিয়ে চোখের তলায় কালি পড়েছে, কয়দিনেই শরীর শুকিয়ে অর্ধেক। সৌম্যকের বড় অসহায় লাগে নিজেকে, এখন মনে হয় হিনার সেই রাতের চিৎকারও অনেক ভালো ছিল। তবুও তো ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোতো। বেশ কয়েকজন ডাক্তার দেখানো হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই কিন্তু কেউ কিছুই ধরতে পারছেন না। নিজেকে ভীষন অপরাধী মনে হয় সৌম্যকের, ভাবে আগেই যদি ওর কথা শুনতো, ওকে ডাক্তার দেখাত তাহলে হয়তো এতটা বাড়াবাড়ি হতোনা।

সৌম্যক এসে আস্তে করে বসে হিনার পাশে। আলতো করে ওর কাঁধ স্পর্শ করতেই হিনা চমকে ওঠে, তারপর সৌম্যককে দেখে শান্ত হয় খানিকটা। ওর মাথাটা নিজের বুকে টেনে নেয় সৌম্যক, তারপর ওর চুল গুলোয় হাত বোলাতে গিয়ে দেখে জট পড়েছে তাতে। হঠাৎই হিনা থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে, অবাক হয়ে সৌম্যক দেখে হিনা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, ওর চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায় কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে প্রচন্ড। কিন্তু সামনে তাকিয়ে সৌম্যক ওয়ার্ডরোবের গায়ে লাগানো আয়নাটা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়না। ও হিনাকে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে?” উত্তর তো দেয়ইনা হিনা, উল্টে আরও যেন ভয় পেয়ে যায়, তারপর প্রচন্ড শক্তিতে জড়িয়ে ধরে ওকে। সৌম্যকের বুকের লোমগুলো ভিজে উঠতে থাকে নোনা জলে।

খোলা জানালাটা দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢুকছে, পর্দাটা উড়ে এসে লাগছে হিনার গায়ে। হিনা বসে আছে স্থবিরের মত, যেমনটা এখন ও রোজ বসে থাকে। বেশিরভাগ সময়ই একটা ভয় লেগে থাকে ওর। ভাবে স্বপ্নটা আগে যখন মনে পড়তো না সেটাই বোধহয় অনেক ভালো ছিল। এখন ওর আবছা করে হলেও মনে পড়ে কিছু, ও দেখে ঝলমলে ঘাগরা জাতীয় পোশাক পরা একটা মেয়ে কোমর থেকে একটা ছুরি বের করে আড়াআড়ি ভাবে সেটা চালিয়ে দিচ্ছে নিজের গলায়, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে পড়ছে সামনের সাজানো মোহরের ওপর, সোনালী রঙ মুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠছে লাল। এখন একটু চোখে চোখ লাগলেই এই স্বপ্নটা দেখে হিনা, তারপর চমকে জেগে ওঠে। সারারাত আর দু চোখের পাতা এক করতে পারেনা। শুধু মনে হয় কেউ যেন ডাকছে ওকে, সে যেন কিছু বলতে চায়। জলের দিকে তাকালেই দেখতে পায় সেই মেয়েটার মুখ, আয়নার সামনে গেলেই ওর নিজের পরিবর্তে দেখে সেই মেয়েটার প্রতিবিম্ব। ছিটকে দূরে সরে আসে হিনা, এই মেয়েটা কে? একে তো ও চেনেনা কিন্তু তাও কেন মাঝেমাঝে ওর মুখটা ভীষন চেনা মনে হয়!

গলাটা বোধহয় শুকিয়ে গেছে, জল খেতে হবে। জলের কথা ভাবলেও আজকাল কেমন যেন ভয় লাগে হিনার। ও উঠে দাঁড়ালো আস্তে করে আর তখনই চোখ গেল আয়নার দিকে। আবার দেখা যাচ্ছে সেই মেয়েটাকে, কেঁপে উঠলো হিনা। মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে… একি মেয়েটা তো আয়নার থেকে হাত বাড়াচ্ছে ওর দিকে, আয়না ভেদ করে ওর হাতটা বেরিয়ে এসেছে বাইরে… ও ইশারায় ডাকছে হিনাকে। ওর চোখের থেকে চোখ সরাতে পারছেনা হিনা, মেয়েটা কি সম্মোহন জানে! হিনা এগিয়ে যাচ্ছে ওর দিকে,এই সম্মোহন কাটাবার সাধ্যি ওর নেই…

রাজপুরোহিতের হাত ধরে অন্ধকারে সিঁড়ি দিয়ে নামছে ধ্রুপদ, আগে আগে চলেছেন রাজামশাই। রাজপুরোহিতের হাতে ধরা রয়েছে একটা প্রদীপ কিন্তু তার আলো অন্ধকার পুরোপুরি দূর করতে অক্ষম। পাশের পাথরের দেওয়ালে দেখা যাচ্ছে তিনটে কালো লম্বা প্রতিকৃতি, তারাও ওদের সঙ্গে সঙ্গে নেমে চলেছে। ঢোঁক গিললো ধ্রুপদ, “ও পুরোহিত মশাই ওগুলো কি দানো?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল সে।

“কোথায়?”

“ওই যে ওখানে…” আঙ্গুল তুলে দেয়ালের দিকে ইশারা করে দেখাল ধ্রুপদ।

পুরোহিত মশাই গম্ভীর গলায় বললেন, “ধুর বোকা, ওগুলো আমাদেরই ছায়া।”

“ছায়া! সে আবার কি?”

“সে পরে বলবো খন।”

“ও রাজামশাই রাজি মা কোথায় আছে বলো না, আর যে নামতে পারছিনা সিঁড়ি দিয়ে। পা দুটো খুব ব্যাথা করছে।”

“আর বেশিক্ষণ নয়, একটু গেলেই দেখা পাবি তার।” কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠলো রাজমশাইয়ের। ধ্রুপদের অবশ্য সেসব খেয়াল নেই। সে জানে বাইরে এখন খুব যুদ্ধ হচ্ছে, ওই দুস্টু রাজাটা নাকি তার রাজি মাকে ধরে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিতে চায়, তাই তো রাজি মাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। আহা মা তো তাকে একটুক্ষণ না দেখতে পেলেই খুব বিচলিত হয়ে পড়েন, এখন এই গোপন ঘরে এতক্ষণ একা একা থেকে কত নাই কাঁদছেন কে জানে! ধ্রুপদ লোকের মুখে শুনেছে সে নাকি এক ব্রাহ্মনীর সন্তান ছিল, রাজ্যের একপ্রান্তে সে থাকতো তার বিধবা মায়ের সঙ্গে। একদিন রাজকুমারী তাঁর সখিদের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে এসে দেখেন ধ্রুপদের মা সেখানে মরে পড়ে আছেন, আর ছোট্ট ধ্রুপদ মায়ের হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাওয়া কলসিটার টুকরো নিয়ে খেলায় মত্ত। সে জানেও না তার কতবড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। ধ্রুপদকে দেখে রাজকুমারীর মায়া হয়, তিনি ওকে তুলে আনেন রাজপ্রাসাদে। তারপর রাজকুমারী রাজন্যা থেকে হয়ে ওঠেন ধ্রুপদের রাজি মা। নিজের মাকে ধ্রুপদের একটুও মনে নেই, তাই তার কাছে তার রাজি মাই সব।

সিঁড়ি ভাঙা শেষ হতেই রাজমশাইয়ের সঙ্গে ধ্রুপদ প্রবেশ করলো একটা কক্ষে। এই কক্ষের দেওয়ালের গায়ে শিকে আটকানো রয়েছে বেশ অনেকগুলো মশাল, মশালের আলোয় কক্ষটা সিঁড়ির মত অতো অন্ধকার লাগছে না। ধ্রুপদ দেখলো এই কক্ষের মেঝেতে বিছানো রয়েছে একটা আসন, তার সামনে থালায় রয়েছে অনেক ফুল, সিঁদুর, আরও পূজার কিছু সামগ্রী; জ্বলছে পঞ্চপ্রদীপ, প্রস্তুত হোমকুণ্ডও। ধুপকাঠির গন্ধ ধ্রুপদের খুব প্রিয় কিন্তু এই মুহূর্তে এখানের ধুপকাঠির গন্ধটায় কেমন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো ওর।

“কিগো কোথায় আমার রাজি মা?”

“পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে।” বললেন রাজামশাই।

“তবে আমাকে সেখানেই নিয়ে চল, মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেব আমি।”

“যাবি যাবি, তার আগে এখানে কিছু কাজ আছে।” বললেন পুরোহিত মশাই।

“এখানে তো পুজো হবে দেখছি কিন্তু ঠাকুর কোথায় গো?”

“ঠাকুর তো আছে আমাদের সঙ্গে।”

“কই আমি তো দেখতে পাচ্ছিনা!”

“এই যে তুই আছিস, এখানে তোকেই পুজো করা হবে।”

“আমাকে!”

“হ্যাঁ রে তোকে। এখন শান্ত হয়ে বোস দিকি ওই আসনে। পুজো ভালোভাবে হয়ে গেলে তোকে তোর রাজি মার থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। আর ওই ঘরে অনেক ধন সম্পদ রাখা আছে, সে সবও তোর হবে বুঝলি?”

“আমার ধন চাইনা, আমার শুধু মাকে পেলেই হল।”

“আচ্ছা আচ্ছা বোস দিকি এখন ওই আসনে।”

ধ্রুপদ আসনে বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত মশাই ওর কপালে সিঁদুরটা দিয়ে একটা লম্বা তিলক কেটে দিলেন। সিঁদুরের গন্ধটা কেমন যেন আঁশটে আঁশটে ঠেকলো ধ্রুপদের, ঠিক যেমন ওর হাত কেটে রক্ত বেরোলে যেরকম গন্ধ হয় সেরকম। এরপর সামনে রাখা ফুলের ঝুড়ি থেকে একটা জবা ফুলের মালা নিয়ে ওকে পরিয়ে দিলেন পুরোহিত মশাই, তারপর একটা বড় ছুরি ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। অবাক হয়ে ছুরিটা ধরল ধ্রুপদ, আর সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকটা কেন না জানি চ্যাঁত করে উঠলো, গলাটা শুকিয়ে এলো। মনে হলো উঠে পালায় এখান থেকে, কিন্তু ও পালিয়ে গেল রাজিমার কি হবে! ধ্রুপদ উঠলো না, বসেই রইল। পুরোহিত মন্ত্র পড়া শুরু করেছেন আর ওর গায়ে কিসব ছিটিয়ে দিচ্ছেন ক্রমাগত। হোমের আলোয় ও দেখতে পাচ্ছে রাজামশাই আর পুরোহিত দুজনেরই মুখটা ঘামে ভিজে উঠেছে, চক্ষু রক্তবর্ণ। রাজমশাইয়ের কপালের শিরাদুটো দপদপ করে কাঁপছে। ওদের মুখের দিকে তাকাতেই ভয় পেয়ে গেল ধ্রুপদ, এই মুহূর্তে ওদের দানোর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর লাগছে কেন!

হোম কুণ্ডে কিছু একটা ছুঁড়ে দিলেন পুরোহিত মশাই, একরাশ কালো ধোঁয়া গিয়ে ঢুকে গেল ধ্রুপদের চোখে, মুখে। ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো, ভীষন কষ্ট হচ্ছে।

কতক্ষণ এভাবে পুজো চলছে জানেনা ধ্রুপদ, কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে ওর। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে রাজবাড়ির বাগান, সেখানে রাজিমার সঙ্গে কত খেলা করছে ও… দেখতে পাচ্ছে মিহিকা মাসি ওকে দানো সেজে ভয় দেখাচ্ছে, রাজি মা তাই বকে দিল তাকে….. ওকে কোলে নিয়ে কত্ত আদর করছে রাজিমা… ধ্রুপদ বাগান থেকে চাঁপা ফুল তুলে এলে আস্তে করে রেখে দিচ্ছে রাজিমার সজ্জার পাশে…

“মাআআ… মাআআ গো…” অস্ফুটে উচ্চারণ করল ধ্রুপদ। আর তখনই ওকে গম্ভীর গলায় হঠাৎই ডেকে উঠলেন পুরোহিত মশাই। ধ্রুপদ চমকালো না, চমকে ওঠার শক্তি হারিয়েছে ও।

“আমি যা বলবো আমার সঙ্গে সঙ্গে সেটাই বলবি তুই।”

ঘাড় নাড়লো ধ্রুপদ।

“বল... আমি অদ্য হইতে এই রাজবাড়ির যখ নিযুক্ত হইলাম। আমার কর্ম হইবে পরবর্তী কক্ষে বিশ্রামরত রাজকুমারীর দেখাশুনা করা এবং পূর্বোক্ত স্থানে গচ্ছিত রাজপরিবারের সমস্ত সম্পত্তি সংরক্ষণ করা। উপযুক্ত মনুষ্যের হস্তে ইহা সমর্পণ না করিতে পারা অবধি আমার মুক্তি নাই।”

হতবুদ্ধির মত পুরোহিতের বলা বুলিগুলো আওড়ে গেল ধ্রুপদ; একবার নয়, পরপর তিনবার, আর তারপরেই আসনের ওপর লুটিয়ে পড়ল সে...

কোথায় দাঁড়িয়ে আছে হিনা জানেনা, এক অন্ধকারের গলিপথের মত জায়গা কিন্তু তার একপাশে যেন পর্দায় চলচ্চিত্রের মত ভেসে উঠছে কিছু দৃশ্য, এক হতভাগ্য রাজকুমারীর গল্প। মন্ত্রমুগ্ধের মত সেই ছবি দেখে যাচ্ছে হিনা…

প্রাণোচ্ছল এক রাজকুমারী…. শান্তিপূর্ণ রাজ্য… আচমকা আকাশে ভেসে উঠলো অশনি সংকেত… যুদ্ধ লেগেছে… ভিন রাজ্যের রাজার রাজ্য চাই, অর্থ চাই, রক্ত চাই… না না এসব কিছুই চাইনা তার, তার শুধু চাই রাজকুমারীকে…রাজকুমারীর রূপের বর্ণনা শুনে লালায়িত হচ্ছে তার কামাতুর হৃদয়… পাগলের মত রাজকুমারীকে খুঁজছে সে…রাজকুমারীর সম্মান রক্ষায় বদ্ধপরিকর তাঁর পিতা… গুপ্তকক্ষে গেল ওরা কয়জনা... রাজকুমারী কোমর থেকে বের করলেন একটা চকচকে ধারালো ছুরি যার ঔজ্জ্বল্যে ঝলসে যায় চোখ…

নাআআআআ… আর্তনাদ করে উঠলো হিনা, এরপরের অংশ তার জানা, বহুবার সে দেখেছে স্বপ্নে। ছবি বন্ধ হলো আচমকাই, গোটা জায়গাটা ডুবে গেল অন্ধকারে। কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা হিনা। তার আবছা মনে পড়ছে আয়নার মধ্য থেকে সেই মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ডাকলো তাকে, সে সম্মোহিতের মত এগিয়ে এল, মেয়েটা তাকে টেনে নিল আয়নার ভেতরে। তারপর…?

তারপরেই তো এখানে চলে এলো সে, এই অজানা অন্ধকারে… কি হচ্ছে এসব?

হতভম্ব হিনার চিন্তার মাঝেই হঠাৎ সামনের দিকে একটা আলো জ্বলে উঠলো, দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকার ফলস্বরূপ চোখ ধাঁধিয়ে গেল ওর। চোখটা সয়ে যেতেই দেখতে পেল একটু আগেই দেখা সেই রাজকুমারী দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, তবে তার দেহটা স্বচ্ছ, খানিকটা কাচের মত… আরে এই মেয়েটার প্রতিচ্ছবিই তো সে দেখতে পেত জলে, আয়নায়… আর এই মেয়েটা….! এতো হুবহু হিনার মতো দেখতে… যেন আয়নায় ও নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখছে… নাহ এ হিনা কি করে হবে! সে তো এখানে দাঁড়িয়ে আর মেয়েটা ওখানে… দুজনে দুই বিপরীত প্রান্তে! এ কি আয়নায় নিজেরই প্রতিফলন দেখছে!

রিনরিন করে একটা গলা শোনা গেল, হিনা বুঝতে পারল অপরপ্রান্তে দাঁড়ানো মানুষটা সে নয়, অন্য কেউ। গলার স্বর সম্পূর্ণ আলাদা। মেয়েটা তাকে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু হিনা যেন ঠিক শুনতে পাচ্ছেনা, ওর মাথাটা ঘুরছে। চোখ বন্ধ করে ফেললো ও, ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে…

“সখী…শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?

মুখে কিছু বলতে হবে না, শুধু মনে মনে উত্তর দাও আমি ঠিক টের পেয়ে যাবো।”

“পাচ্ছি শুনতে… কিন্তু তুমি কে?” মনে মনে জিজ্ঞেস করল হিনা; উত্তরও এলো সঙ্গে সঙ্গে,

“আমি রাজকুমারী রাজন্যা… একটু আগেই দেখলে তো আমায়…”

“কিন্তু তুমি তো…!”

“হুবহু তোমার মত দেখতে তাই না?... কিন্তু আমি তুমি নই, তুমিও আমি নও…. আমরা দুই ভিন কালের বাসিন্দা…”

“ভিন কাল…! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে… কেন এমন করছো আমার সাথে! আমার জীবনটাই তছনছ হয়ে যাচ্ছে…”

“দোহাই তোমায়, কেঁদোনা সখী বিশ্বাস কর, কষ্ট দিতে চাইনি তোমায়। কিন্তু আমার নিজের সীমিত ক্ষমতার কারণে তোমার সাথে যোগাযোগ করে উঠতে পারছিলাম না ঠিক করে, বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলাম যোগাযোগ করতে আর পরিবর্তে তোমাকে ভয় দেখিয়ে ফেলেছি অনিচ্ছা সত্ত্বেও।”

“প্লিজ… ফর গড সেক আমায় ছেড়ে দাও… তুমি কে আমি জানিনা… কি ভিন কালের কথা বলছো তাও আমি বুঝিনা… আমাকে প্লিজ ছেড়ে দাও… আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি তবে কেন এমন করছো আমার সাথে…? ছেড়ে দাও আমায়… দয়া করো…”

“শান্ত হও সখী, আমি তোমার ক্ষতি করতে চাইনা বরং তোমার সাহায্য চাই আমার… দয়া করে সাহায্য কর আমায়।”

“সাহায্য!”

“হ্যাঁ। একটু আগে তুমি যে গল্পটুকু দেখলে তা হলো মূল গল্পের অংশ মাত্র, আমার স্মৃতিভান্ডার থেকে যেটুকু দেখানো সম্ভব ছিল ততটাই দেখিয়েছি। এরপরে আরও এক গল্প আছে যা আমি তোমাকে এভাবে দেখাতে পারবোনা কেননা তা আমার স্মৃতিতে সঞ্চিত নেই। সে গল্প আমি বললে তুমি শুনবে? দয়া করে একটিবার আমার কথাটি শোনো সখী, আমি নিশ্চিত সব শোনার পর আমায় ফেরাতে পারবেনা তুমি।”

“বলো…”

“বলছি তবে শোনো, যতদূর দেখেছ তার পরের অংশটুকু...

মান্ডবি নগর সিমন্তপুর কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর রাজকুমারী রাজন্যাকে ঘিরে দুইটি ষড়যন্ত্রের জন্ম হয়। একটি ষড়যন্ত্র করেন সিমন্ত পুরের নিষ্ঠুর রাজা মেঘরাজ। সে গল্প তো তুমি আগেই জেনেছো। আর অন্যদিকে রাজকুমারীর পেছনে আরও একটি ষড়যন্ত্রের বীজ বোনা হয়, যা করেন মান্ডবি নগরের মহারাজ স্বয়ং।”

“তোমার বাবা…!”

“হ্যাঁ আমার বাবাই। তিনি নিজের কন্যার হতভাগ্য মৃত্যুতে অশ্রুপাত করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তারপর…”

“তারপর কি…?”

“তারপর তিনি তাঁরই কন্যার পালক পুত্র ধ্রুপদকে…”

“কি?”

“বলছি সখী… বড় কষ্ট হচ্ছে সে কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে…

বাবা ধ্রুপদকে যে পছন্দ করতেন না সে কথা আমি বেশ বুঝতাম। ধ্রুপদ রাজপরিবারের আশ্রিত হয়ে থাকবে এতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিলো না কিন্তু ধ্রুপদ আমাকে মা বলে ডাকতো, আমার সাথে তার ঘনিষ্ঠতায় ছিল বাবার আপত্তি। একদিকে যখন নিজের সম্মান রক্ষার্থে আমি মৃত্যুবরণ করছি, অন্যদিকে আমার বাবার মনে চলছে এক ঘোর ষড়যন্ত্র। আমার মৃত্যুর পর, আমার নশ্বর দেহটাকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। যে দুজন এই কাজ করেছিল, কাজ শেষ হতে তাদেরকেও হত্যা করা হয়। বাবা আগে থাকতেই এক গুপ্ত কক্ষে আমাদের রাজপরিবারের সমস্ত সম্পত্তি আনিয়ে রেখেছিলেন, যাতে শত্রুপক্ষ না এ সম্পদের হদিস পায়। ওই একই কক্ষে আমার দেহটাও সংরক্ষণ করা হয়। এরপর রাজপুরোহিতের সাথে পরামর্শ করে বাবা তাঁর সম্পত্তি আর আমার ওই নশ্বর দেহটা… মৃত্যুর পর যেটার আর কোনো মূল্যই ছিলোনা, ওগুলোর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে… আমার ছোট্ট ধ্রুপদকে…”

“কি?

“আমার ছোট্ট ধ্রুপদকে আমার সাথে দেখা করানোর ছলে ওই কক্ষে এনে মন্ত্রবলে যখ বানিয়ে আটকে দেয় ওখানে…”

“যখ…! এতো গল্পকথায় শুনেছি!”

“কিন্তু এ কথা সত্যি সখী… আমার আত্মা তখন দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু মুক্তি পায়নি। আমি নিজের চোখে দেখি আমার ছোট্ট ধ্রুপদ… তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে… উফফ কি কষ্টটাই না পেয়েছিল ওই ছোট্ট শরীরটা… মৃত্যুর আগে অবধি ও শুধু আমাকেই খুঁজে যেত… আমার দেহটা জড়িয়ে কাঁদতো… আমি শুধু দেখে গেছি নীরবে, কিচ্ছু করার ক্ষমতা ছিলোনা আমার…”

“রাজকুমারী তুমি কাঁদছো?”

“রাজকুমারী নয়, কাঁদছে এক হতভাগ্য মা… সখী আমার ধ্রুপদ আজও ওখানে বন্দি… মৃত্যুর পরেও তার যন্ত্রণার অবসান হয়নি। যখ হয়ে সে আজও ওই সম্পত্তি আর আমার দেহ রক্ষার কাজে আসীন।”

“তুমি তাকে মুক্ত করোনি কেন?”

“আমার যদি সে ক্ষমতা থাকতো তাহলে তো কবেই… কিন্তু আমি তা পারিনা। মন্ত্রবলে ও আটকে আছে ওখানে। ও মুক্তি পাবেনা যতক্ষণ না যোগ্য উত্তরাধিকারীর কাছে ওই গচ্ছিত জিনিস পৌঁছায়…”

“ওকে উদ্ধার করার কি কোনো উপায় নেই?”

“আছে… আর সেই জন্যই তোমার সাহায্য চাই আমার।

তোমার এই শ্বশুর বাড়ির গোটা পাড়াটা জুড়েই একসময় ছিলো আমাদের প্রাসাদ, আর ওই গুপ্ত কক্ষ আজও তোমার শ্বশুর বাড়ির ঠিক নিচেই অবস্থান করছে সেই আগের মতোই, মাটির অনেক গভীরে থাকার জন্য এতদিন টের পায়নি কেউই।”

“কি…! এতো অবিশ্বাস্য! এ কি করে সম্ভব?” অবাক বিস্ময়ে রাজন্যার দিকে তাকালো হিনা।

“হ্যাঁ সখী এটাই সত্যি। ঈশ্বরকে ডেকেছি আজ কত বছর ধরে… এতদিন পর তিনি অবশেষে মুখ তুলে চেয়েছেন বোধহয়। তাই তো তোমায় পাঠিয়েছেন, যে কিনা হুবহু আমার মত দেখতে… তুমিই পারবে আমার ধ্রুপদকে মুক্ত করতে। ও তোমায় আমি ভেবে ভুল করবে আর তাতেই ওর মুক্তি…”

******************************************************************

এক নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে হিনা, সে আঁধারের গভীরতা এতই বেশি যে নিজের শরীরের অস্তিত্ব নিয়েও সন্দেহ হতে শুরু করে একসময়। কিন্তু এতো অন্ধকারের মধ্যেও হিনা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার দিক নির্দেশককে, রাজকুমারী রাজন্যাকে। রাজন্যার শরীর থেকে এক অদ্ভুত রুপোলি দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে তাকে দৃশ্যমান করে তুলছে। ভেসে ভেসে এগিয়ে চলেছে রাজন্যা, হিনাও অবশ্য ঠিক বুঝতে পারছেনা সে নিজে হাঁটছে না ভাসছে, পায়ের তলায় কোনো অনুভূতি হচ্ছেনা তো! শুধু এক সম্মোহনী শক্তি তাকে টেনে নিয়ে চলেছে আবার, মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু, আবার জানা অজানা মাঝে আটকে যাচ্ছে তার চেতনা…

কোনো একসময় রাজন্যার গতি রুদ্ধ হলো, থমকে দাঁড়ালো হিনাও। তার সম্পূর্ণ চেতনা যেন ফিরছে আস্তে আস্তে। একটা ভ্যাপসা গন্ধ এসে ঝাপটা মারলো নাকে, খানিকটা সোঁদা খানিকটা আঁশটে একটা গন্ধ। গাটা গুলিয়ে গেলো হিনার। এখানে অন্ধকারটা যেন ততটাও গাঢ় নয়, কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই চোখটা সয়ে গেল। খানিক অন্যমনষ্ক হয়ে একটা পা সামনের দিকে বাড়াতে যেতেই কিসে যেন জোরে লাগলো আর সেই জিনিসটা ঠং করে গিয়ে ধাক্কা খেল কোথাও, আওয়াজে মনে হলো কোনো ফাঁপা ধাতব জিনিস।

“এই ঘটটাও সেদিন সামিল ছিল আমার ধ্রুপদকে মন্ত্রবলে বাঁধার সময়…”

কথা গুলো মাথার ভেতর আঘাত করতেই চমকে উঠে রাজন্যার দিকে তাকালো হিনা; তার শরীর থেকে বেরোনো স্নিগ্ধ দ্যুতিটার চরিত্র যেন হঠাৎই পাল্টেছে, পরিবর্তে একটা লালচে দ্যুতি নির্গত হচ্ছে এখন, অনেক বেশি উজ্জ্বল, অনেক বেশি তেজি; যেন নিজের সব রাগ, কষ্ট ঐভাবে প্রকাশ করছে মেয়েটা। সেই আলোয় হিনা অস্পষ্ট ভাবে দেখলো একটা পাথরের ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা, এই ঘরটার ছবি সে আগেই দেখেছে। দেওয়ালের গায়ে আটকে এবং মেঝেতে পড়ে রয়েছে কিছু জিনিস; হিনা আন্দাজ করলো ওগুলোই সেই পরিত্যক্ত মশাল, দীর্ঘদিন এখানে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে বেশিরভাগই। হিনা যখন ঘরটার চারিদিকে চোখ ঘোরাতে ব্যস্ত তখনই আবার ওর মাথায় আঘাত করলো শব্দ তরঙ্গ, “সখী ওই যে সামনে দ্বারটা দেখতে পাচ্ছ, ওটা দিয়ে গেলেই মিলবে দ্বিতীয় কক্ষ। ওখানেই আটকে রয়েছে আমার ধ্রুপদ, আমার বিকৃত হয়ে যাওয়া দেহটাকে জড়িয়ে কাঁদছে এখনো। শুনতে পাচ্ছ সখী? শুনতে পাচ্ছ সে কান্না?”

হিনা চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো। প্রথমে কিছুই শুনতে পেলোনা কিন্তু তারপর মনে হল কোথাও যেন কেউ কাঁদছে, একটা বাচ্চার গলার আওয়াজ কিন্তু যেন মানুষের মত নয়, অন্যরকম… কিছুক্ষণ শোনার পরই যেন শব্দটা এক পৈশাচিক আর্তনাদে পরিণত হল… বিভৎস… ভয়ঙ্কর…

“নাআআআআ….” চিৎকার করে উঠে দু’কান চেপে ধরলো হিনা, ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো ওর শরীর। তখনই আবার শুনতে পেল রাজন্যার গলা, “শুনছো সখী কেমন করে কাঁদে আমার ধ্রুপদ? ওকে গিয়ে মুক্ত করো… দোহাই তোমায়…”

নিস্পলক দৃষ্টিতে এগোতে শুরু করলো হিনা, নাহ এবার কোনো সম্মোহনের বশবর্তী হয়ে নয়, নিজের মধ্যে থাকা এক অদম্য ইচ্ছে শক্তির তাড়নায় এগিয়ে গেল ও। হাত রাখলো ধুলোমাখা, ঝুল ফাঁদে ভর্তি একটা লোহার দরজায়। দরজার গায়ে মৃদু চাপ দিলো, শক্ত হয়ে আটকে আছে সেটা। হিনা ভাবলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফল হয়তো। দরজায় ধারে হাত বুলিয়ে দেখার চেষ্টা করলো কোনো হাতল আছে কিনা, কিচ্ছু নেই। ও জিজ্ঞাসাভরা দৃষ্টি নিয়ে রাজন্যার দিকে তাকালো; রাজন্যার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। হিনা এবার শুনতে পেল রাজন্যা খুব ক্ষীণ কণ্ঠে যেন হতাশ হয়ে বলছে, “এ দরজা এক বিশেষ উপায়ে খুলতে হয়, রাজপরিবারের কেউ ছাড়া খুলতে পারবে না, এমন ভাবেই তৈরি… কিন্তু…”

“তাহলে আমি ধ্রুপদের কাছে পৌঁছাবো কি করে?

কি হলো চুপ করে গেলে কেন? কিছু বলো।”

“জানিনা… আমি এতো আশা করে, এতো কষ্ট করে তোমায় টেনে আনলাম এতদূর… সবই কি ব্যর্থ হবে! এটা খোলার কথা মাথাতেই ছিলোনা আমার…”

“ব্যর্থ হবে কিনা জানিনা, কিন্তু দরজা খোলার উপায়টা বলো আমায়। সে কি এমন উপায় যা রাজপরিবারের সদস্য ছাড়া কেউ প্রয়োগ করতে পারবে না?”

“হাত… এ দরজার গায়ে একটা খোপ আছে যাতে তর্জনী আর মধ্যমা বসালে যদি সেই খোপে ঠিকঠাক আঙ্গুল বসে যায় তাহলে দরজা খুলে যাবে। কিন্তু…”

“কিন্তু কি?”

“আমাদের রাজপরিবারের সদস্যদের হাতের এক বিশেষ বৈচিত্র্য ছিল আর সেই অনুযায়ীই এই খোপ তৈরি তাই অন্য কারুর আঙ্গুল বসবে না ওখানে।”

“হাতের বৈচিত্র্য! কিরকম সেটা?”

“সাধারণত মানুষের মধ্যমা তর্জনীর থেকে লম্বা হয়, কিন্তু আমাদের উল্টোটা। আমাদের সবার বাম হাতের তর্জনী মধ্যমার থেকে লম্বা, এই যে…” এই বলে নিজের হাতটা সামনে তুলে ধরলো রাজন্যা। ওর শরীর থেকে বেরোনো হলদেটে আভায় হিনা দেখতে পেল একটা স্বচ্ছ হাত যার তর্জনী মধ্যমার তুলনায় ইঞ্চিখানেক লম্বা। সেদিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে এবার আস্তে আস্তে নিজের বাম হাতটা উঠিয়ে রাজন্যার বাড়ানো হাতটার সামনে ধরলো হিনা… রাজন্যা অবাক হয়ে দেখলো হিনার বাম হাতের তর্জনীটা মধ্যমার থেকে লম্বা…

ওর গোলাপী ঠোঁটদুটোতে খেলে গেল খুশির ছোঁয়া, চকচক করে উঠলো চোখ দুটো, নিজের হাতটাকে এগিয়ে এনে হিনার তালুতে ছোঁয়াল রাজন্যা। স্পর্শের অনুভূতি ঠিক হলোনা হিনার, তবে কি যেন একটা অন্যরকম শিহরণ লাগলো ওর শরীরে, একটা ভালোলাগার আবেশ এসে ওকে আলিঙ্গন করলো অনেকদিন পর। হিনা মনে মনে বললো, “চিন্তা কোরোনা সখী, তোমার ধ্রুপদকে আমি এই বন্দি জীবন থেকে মুক্ত করবোই, কথা দিলাম।”

******************************************************************

সোঁদা গন্ধের সাথে একটা ধাতব গন্ধও ছড়িয়ে রয়েছে এই ঘরে, আঁশটে গন্ধটাও এখানে আরও তীব্র। সামনের ঝুল ফাঁদ সরিয়ে এগোচ্ছে হিনা, আশেপাশে রাখা বেশ কয়েকটা সিন্দুক, ঘড়া। ওদের মধ্যেকার জিনিসগুলোর গায়ে লেগেছে প্রাচীনত্বের ছাপ, ছবিতে দেখা সেই ঔজ্জ্বল্যের সিকিও টের পাওয়া যাচ্ছেনা এখন। এই জিনিসগুলোর মূল্য কি হতে পারে ভেবে শিউরে উঠলো হিনা, শুধু তো এদের সাধারণ মূল্যই নয় সেই সাথে এখন যুক্ত হয়েছে ঐতিহাসিক মূল্যও… এগিয়ে গিয়ে একটা মোহর ভর্তি সিন্দুকের গায়ে হাত ছোঁয়াল হিনা; কিন্তু একি কোথায় মোহর! এতো কিলবিল করছে অজস্র সাপ। আঁ… আঁ… ছিটকে দূরে সরে এলো হিনা, ওর বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পিটছে কেউ। রাজন্যার গলা শোনা যাচ্ছেনা এখন, সে কেন কে জানে ঢোকেনি এই ঘরে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু ধাতস্থ করার চেষ্টা করল হিনা, তারপর ভাবলো যে কাজের জন্য এসেছে সেটাই আগে করে ফেলাটা সমীচীন, রাজার ধন এখানেই থাক। হিনার চাইনা এসব কিছু, তার তো শুধু তার স্বাভাবিক জীবনটা আবার ফিরে পেলেই হলো।

অন্ধকারে যেটুকু দেখা যায় সেই টুকুকেই অবলম্বন করে আবার এগোতে শুরু করল হিনা; এবার ওর নজরে পড়ল একটা পালঙ্কের মত জিনিস, যার ওপরে শোয়ানো রয়েছে সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো একটা দেহ। বুকটা কেঁপে উঠলো হিনার, যে মমির কথা বইতে পড়েছে, ছবিতে দেখেছে, আজ সেই মমি ওর চোখের সামনে। তবে মিশরীয় মমি নয়, খোদ ভারতীয় মমি। যার অশরীরী অবয়বটাকে দেখে একটু আগে অবধিও ভয় পায়নি হিনা, তারই প্রাণহীন দেহটাকে দেখে এখন কেঁপে উঠল ও। মনে হলো যেন কিছু পোকা ঘুরছে ওই মমিকৃত দেহটার ওপরে। রাজ্যের ভয় এসে এবার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে হিনাকে। ওর পা দুটো যেন আটকে যাচ্ছে মাটিতে, মনে হচ্ছে ছুটে পালায় এখান থেকে কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়…!

“সখী, আমার পালঙ্কের পাশেই দেখো আমার ধ্রুপদ বসে। ওর কাছে যাও সখী, মুক্ত করো ওকে…”

আবার রাজন্যার গলা শুনে বুকে সাহস ফিরে এলো অনেকটাই। ধীর পায়ে পালঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল হিনা, যতবারই মমিটার দিকে চোখ পড়ছে ততবারই ভয়ে শিউরে উঠছে ও। তাই যথাসম্ভব ওটার দিকে না তাকিয়ে পালঙ্কের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দেখলো, সাত আট বছরের একটা ছেলের কঙ্কাল বসানো রয়েছে মাটিতে। গুবরে পোকার মত একটা বড় পোকা ওটার চোখ থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেল পাঁজরের হাড়ে। একটা ঢোক গিললো হিনা, এই তবে ধ্রুপদ! এই কঙ্কালটার মধ্যে যখ লুকিয়ে আছে! বিশ্বাস করতে যেন কষ্ট হয়, তবু গা টা ছমছম করে ওঠে। ওটার সামনে গিয়ে আস্তে করে উবু হয়ে বসে পড়ে হিনা, মেঝেতে লেপ্টে থাকা ধুলো এসে লেগে যায় ওর সালোয়ারে। হঠাৎ একটা মাকড়শা কোথা থেকে যেন এসে সেঁধিয়ে যায় ওর গলার মধ্যে, আঁক করে একটা চিৎকার করে সেটা ঝেড়ে ফেলতে যায় হিনা, কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় নিস্পন্দ কঙ্কালটার ওপর। আর তখনই আচমকা কঙ্কালটার চোখ দুটো ধক করে জ্বলে ওঠে; আঁ… আঁ… চিৎকার করে পেছন দিকে পেছাতে যায় হিনা…কঙ্কালটা একহাত দিয়ে ধরে ফেলে ওর গলা। ওটার হাড় গুলোর ওপর গজাতে শুরু করেছে চামড়া, তীব্র পচা গন্ধ ভেসে আসে সেটার থেকে। আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলে হিনা… ধ্রুপদের হাতে ধরা একটা কালচে রকম ছুরি। সেটা সে আমূল বিদ্ধ করতে যায় হিনার শরীরে কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “ওকে আঘাত করিসনা ধ্রুপদ, ও আমাদের শত্রু নয় মিত্র।” থমকে যায় ধ্রুপদ, চোখ খুলে হিনা দেখে কাছেই দাঁড়িয়ে আছে রাজন্যা, মনে সাহস ফিরে আসে ওর। রাজন্যা ধ্রুপদকে নির্দেশ দেয়, “ছুরিটা একে দিয়ে দে বাবা।” ধ্রুপদ ছুরিটা বাড়িয়ে দেয় হিনার দিকে, হিনাও যেন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার বশে ধরে ফেলে ছুরিটা। আর সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘরটা ভয়ঙ্কর রকমের কাঁপতে শুরু করে, সিন্দুকের ওপর থেকে ঝনঝন শব্দে মোহরগুলো পড়তে থাকে নীচে, পালঙ্কটা খটখট শব্দে কাঁপতে থাকে… মনে হয় যেন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। ভয়ে বিস্ময়ে সামনে তাকিয়ে হিনা দেখে ধ্রুপদের শরীরের সদ্য গজিয়ে ওঠা চামড়াটা গলতে শুরু হয়েছে, মনে হয় যেন প্রচন্ড তাপে ঝলসানো হচ্ছে সেটা। সেই সাথে রাজন্যা হাসতে শুরু করেছে হিহি করে। হিনা এবার সেদিকে তাকাতেই চমকে ওঠে, এ কে দাঁড়িয়ে আছে! কই আর তো মনে হচ্ছেনা রাজন্যার মুখটা তার মত! কি হচ্ছে এসব! ও এভাবে হাসছে কেন!

মনে হাজার প্রশ্ন এলেও গলার স্বর ফোটেনা হিনার। কেমন যেন শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে ওর, মাটির নিচে অক্সিজেনের অভাবটা এতক্ষণে টের পাচ্ছে যেন, চোখ মুখ বিকৃত হয়ে আসে কষ্টে…

অনেক কষ্টে মনে মনে বলে, “এবার আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দাও রাজকুমারী, আমি তো আমার কথা রেখেছি।”

“বাড়ি! কিন্তু তুমি বাড়ি চলে গেলে আমার ধ্রুপদের মুক্তি যে সম্পূর্ণ হবে না সখী, তার থেকে ভালো এই সব ধন তুমি নাও আর থাকো এই কক্ষেই।”

“নাহ … কি বলছ কি তুমি! এমন তো কথা ছিলো না! এ তো ষড়যন্ত্র!”

“হাঃ হাঃ হাঃ…” হাসি থামিয়ে রাজন্যা বলে, “দেড় হাজার বছর ধরে একটু একটু করে শক্তি সঞ্চয় করেছি আমি আমার ধ্রুপদকে মুক্ত করতে। তারপর কত অপেক্ষার পর অবশেষে তুমি এলে যে কিনা এই কক্ষের দ্বার খুলে প্রবেশ করতে পারবে এখানে; মুক্তি দিতে পারবে আমার ধ্রুপদকে। কত কষ্ট করেছি তোমায় এখানে আনতে। এবার তোমার অপেক্ষার পালা সখী, দেখো কতদিন পর তোমার মুক্তির উপায় আসে তোমার কাছে কিংবা হয়তো এলোই না কোনদিন…হাঃ হাঃ হাঃ… ধ্রুপদকে সাহায্য করতে আমি ছিলাম কিন্তু তুমি তো সম্পূর্ণ একা সখী, একা পারবে তো মুক্ত করতে নিজেকে?

হাঃ হাঃ হাঃ...”

হিনা অবাক হয়ে দেখে এক পিশাচীনি যেন মেতেছে উল্লাসে, সেই আগের দেখা হতভাগ্য রাজকুমারীর সাথে একে মেলাতে ভীষন কষ্ট হয় যেন।

হিনা কিছু বলে ওঠার আগেই অন্তর্হিত হয় ওরা, গোটা কক্ষ জুড়ে নেমে আসে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। হঠাৎ হিনা অনুভব করে ওর গায়ে যেন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে কিছু, শীতল একটা অনুভূতি। ওগুলো কি আন্দাজ করতে কষ্ট হয়না হিনার, বুকের রক্ত জল হয়ে আসে ওর।

“বাঁচাও... “ চিৎকার করে ওঠে হিনা।

কিন্তু অতল গহ্বর থেকে ভেসে আসা সেই আওয়াজ শুনতে পায়না কেউই...

শেষ।


Rate this content
Log in