Mausumi Pramanik

Inspirational Drama


3  

Mausumi Pramanik

Inspirational Drama


ঘুঙুরের ঋণ

ঘুঙুরের ঋণ

5 mins 9.9K 5 mins 9.9K

মাল্টিন্যাশানালে কর্মরত বছর চল্লিশের অনিমেষ রায় মিনিবাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। সাধারণত তিনি অফিসের গাড়িতেই বাড়ি ফেরেন। সেদিন গাড়িটা এয়ারপোর্টে গেছিল চেয়ারম্যানকে আনতে; তাই অগত্যা পাবলিক কনভেন্স অ্যা্যেল করতে হলো তাঁকে। অফিস-টাইম, অসম্ভব ভীড়। তারই মধ্যে সানগ্লাস পরা একজন মহিলা বারবার টাল সামলাতে না পেরে তাঁর ঘাড়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। একবার ভাবলেন নিজে উঠে ওনাকে বসতে দেন। তারপর ভাবলেন যে অনেকটা পথ; অফিসে কাজের প্রেশার, বড্ডো ক্লান্ত হয়েও পড়েছিলেন। তবুও ভদ্রতা করে বললেন, “ আপনি কি বসবেন?”

“নো থ্যাঙ্কস! ক্যান ইয়ু হোল্ড দিস, প্লিজ?” ভদ্রমহিলার হাতে একটা ভারী পার্সেল ছিল।

“সিওর...” ভদ্রমহিলা হাতের পার্সেলটা অনিমেষের কাছে রাখতে দিলেন।

অনভ্যাসের দরুন বাসের ঝাঁকুনিতে অনিমেষ ঢুলতে শুরু করলেন। ঘুম ভাঙলো টালিগঞ্জের কাছে গিয়ে। বাঁশদ্রোনীতে নামতে গিয়ে খেয়াল হল যে পার্সেলটা ফেরৎ দেওয়া হয় নি। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলেন না। মনে মনে কুণ্ঠিত বোধ করতে থাকলেন।

 বাড়ি ফিরে কৌতূূহলী হয়ে পার্সেল খুলে একজোড়া সোনালী ঘুঙুর পেলেন। কৌতূহলটা তাঁর স্ত্রী বৈশালী ও পুত্র অঙ্কুশেরই বেশি ছিল। এমন ঘটনাতো সচরাচর ঘটে না! একবার ভাবলেন থানায় যাবেন। তারপর ভাবলেন আগে সোনার দোকানে গিয়ে দেখাই যাক না। স্যাঁকরা জানাল,সোনা দিয়ে বাঁধানো,খুব দামী, সাবেকী জিনিষ। ফিরে এসে বৈশালীকে বললেন,

“ জিনিষটা খুব দামী। কাল ভাবছি থানায় গিয়ে এটা জমা করে দিয়ে আসবো।” কিন্তু বৈশালীর কাছে ঐ জিনিষটার মূল্য টাকার অঙ্কে ছিল না। সে সেটা চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে রেখে জানালো যে হারিয়ে গেছে।

 একসময়ের নৃত্যশিল্পী বৈশালী বারো বছর আগে ছেলে অঙ্কুশের জন্য নাচ ছেড়ে দিয়েছিল। তাই প্রথমদিন বাক্সটা দেখেই তার চোখ চকচক করে উঠেছিল। অতীতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। কত ফাংশান, কত প্রশংসা, অথচ বিয়ের পর সব শেষ। শ্বশুরবাড়ির লোক পুরাতন পন্থী। পাকা দেখার দিনই সে নাচ জানে শুনে নাক সিঁটকেছিল। বিয়ের পর তেমন সুযোগও ছিল না যে নাচটাকে প্রফেসান করে নেবে। অসুস্থ শাশুড়ি আর ছেলের সেবা করতেই তার সময় কিভাবে কেটে যেতে যে সে বুঝতেই পারতো না। তারপর তার স্বামী ট্যুরে গেলে তো আর কথাই নেই। সমস্ত দায়িত্ব তার ঘাড়ে এসেই চাপত। তবুও আকাশে মেঘ দেখলে কিংবা কৃষ্ণচূড়ায় রঙ লাগলে তার মনটা নেচে উঠত।

 একদিন যখন বাড়িতে কেউ ছিল না, চিলেকোঠার ঘর থেকে সেই বাক্স বের করে আনল। ঐ ঘুঙুর পায়ে পরল সে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে থাকল তার। নাচের স্টেপগুলো ভুলেই বসেছিল। কিন্তু ঘুঙুর পায়ে দিতেই একে একে বোল, তাল সব মনে পড়ে যেতে থাকল। প্রায় দুঘন্টা ধরে সে মনের সুখে নাচ করল। এইভাবেই লুকিয়ে, সুযোগ পেলেই নাচ প্র্যাকটিস করতে থাকল সে। একদিন তো মাঝরাতে ছাদে উঠে, সারা ছাদ ঘুরে ঘুরে কথ্থক পরিবেশন করতে থাকে। পাশের বাড়ির ছাদে, পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা তাস খেলছিল। তারা তো দেখে মুগ্ধ। নাচ শেষ হলে হাততালি দিয়ে ওঠে তারা । বৈশালী অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ছেলেগুলো খারাপ নয়, গুনের কদর জানে। পাড়ার সুন্দরী বৌদি যে এবার পূজোর জলসা জমিয়ে দেবেন সে বিষয়ে তারা নিঃসন্দেহ।

 বৈশালী ওদের প্রপোজালে রাজী হলেও স্বামী ও শাশুড়ীকে কিছু জানাতে সাহস পেল না। শুধু অঙ্কুশ জানল। আর সে তো স্টেজে তার মা’কে অপ্সরার রূপে নাচতে দেখে আহ্লাদে আটখানা। এর পর থেকেই বৈশালী বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে ডাক পেতে থাকে। এক বছরের মধ্যেই সে শহরের নামী সেলিব্রিটি হয়ে গেল। শাশুড়ীমা তার বৌমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আত্মীয় স্বজনের কাছে সে আজ হিরোইন। শুধু অনিমেষ খুশি হল না। গম্ভীর ভাবে বলল, “ তুমি ঘুঙুরগুলো লুকিয়ে রেখে ভাল করো নি বৈশালী? নিজের মনকে প্রশ্নটা কোরো একবার...”

শুনে বৈশালীর অনুতাপ হয়। সত্যিতো কারোর জিনিষ না বলে নিলে চুরি করা হয়। নিজের প্যাশানকে প্রফেসান করতে গিয়ে সে একি করল! সামান্য লোভটুকুও সংবরন করতে পারলো না? সেই ভদ্রমহিলার কাছে এটার মূল্য হয়তো অনেক বেশী। মরমে মরে যেতে থাকল সে। অঙ্কুশ মায়ের দুঃখ বোঝে। তাও বলে, “মাম্মাম, তোমার কি দোষ? উনি তো ভুল করে পাপার কাছে ফেলে গেছিলেন। আর তুমি তো ওটার সদ্ব্যবহার করছো, মানুষকে আনন্দ দিচ্ছো।” তবুও বৈশালীর মন মানে না। এর পর থেকে সে পাবলিক ফাংশান করা প্রায় ছেড়েই দিল। শুধু চ্যারিটি শো করতে থাকল। তার তো আর টাকা পয়সার অভাব নেই। অনিমেষ যথেষ্ট রোজগার করে। তাছাড়া এই বয়সে সে নতুন করে আর তার হারিয়ে যাওয়া অতীতকে তো ফিরে পাবে না!

কিন্তু একদিন স্টেজে পারফর্ম করতে করতে সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ডাক্তার জানালেন, অঙ্কুশের ডেলিভারির সময় তার কোমরে স্পন্ডেলাইটিস ধরা পড়েছিল। সেটাই এবার বাড়াবাড়ি আকার ধারণ করেছে। বৈশালী নাচ তো দূরের কথা হাঁটাচলাই করতে পারবেন না। কান্নায় ভেঙে পড়ে বৈশালী। নাচ সে ছাড়তে পারবে না। ঐ অবস্থাতেই প্র্যাকটিস করতে থাকে। অঙ্কুশ তখন মা’কে বাঁচানোর জন্যে মামী শকুন্তলার কাছে রেখে আসে ঘুঙুরের বাক্স। শকুন্তলা তার ননদকে নিজের বোনের মতই ভালবাসেন। তাই ব্যাঙ্কের লকারে সেগুলো রেখে দিয়ে বড়ো নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু তারপর থেকেই বৈশালী খুব মনমরা হয়ে পড়ল। তবে অচিরেই তাকে নাচতে না পারার দুঃখ ভুলতে হল। কারণ কয়েক বছরের মধ্যেই শাশুড়ি’মা গত হলেন আর তারপরেই অনিমেষ; ম্যাসিভ স্ট্রোক। বৈশালী সব কিছুর জন্যে নিজেকেই দায়ী করতে থাকে। ঘুঙুর চুরি করার অপরাধেই বুঝি তার জীবনে এমন অভিশাপ নেমে এল।

 

যাইহোক, দীর্ঘ এগারো বছর অতিক্রান্ত। অঙ্কুশ ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত। মা’কে কলকাতায় ফেলে রাখতে তার মন চায় না; যদিও মামী যথেষ্ট দেখাশোনা করেন। এই সময়ে সংঘমিত্রা এল তার জীবনে। দুজনের মা’ই নৃত্যশিল্পী, তাই বুঝি তাদের বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগল না। সংঘমিত্রা আধা বাঙালী, আধা কেরালাইট। ক্রমে তাদের বন্ধুত্ব ভালবাসায় পরিণত হয়। দুজনে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে কলকাতায় আসে। মামী তো খেপে ফায়ার। কিন্তু অঙ্কুশ বলে,

“মা,আমাদের কোন উপায় ছিল না। সংঘমিত্রার মা বাঙালী হেটার, কিছুতেই আমার সঙ্গে বিয়ে দিতেন না...” তবুও বৈশালী বড় পার্টি থ্রো করলেন ওদের অনারে। বৈশালী সহজ সরল বৌমাকে ভাল না বেসে থাকতে পারলেন না। যখন তখন সংঘমিত্রা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন নৃত্যশিল্পীর বিষয়ে গল্প করত; বৈশালী সেসব কথা শুনে মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না যে! একদিন সে তার মায়ের কথা বলতে শুরু করল,

“মীনাক্ষি মা এমনটা ছিলেন না। বাবা তো বাঙালী, ভালবেসেই ওঁরা বিয়ে করেছিলেন। বাবা মায়ের নাচ দেখে মুগ্ধ হয়েই মা’কে প্রপোজ করেছিলেন। মা আসলে এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা চাইছিলেন না। সেই নিয়ে বাবা, দাদুভাই, ঠাম্মি সকলের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। তারপরই ডিভোর্স করে কেরালায় চলে আসেন, আমার তখন তিন মাস বয়স।”

“তাই তোমার মা বাঙালী হেটার?”

“না আরো একটা কারণ আছে। কলকাতায় পারফর্ম করতে এসে মায়ের সাবেকী ঘুঙুর চুরি হয়ে যায়...।”

শুনেই বৈশালী চোখে আর জল ধরে রাখতে পারেন না। হুইল চেয়ার ঠেলে ঠাকুর ঘরে আসেন। ফুল আর চোখের জলে রাধামাধবকে অঞ্জলি দেন। “এবার সময় হয়েছে ঘুঙুরের ঋণ শোধ করার...”

 

এক মুহুর্ত দেরী না করে ওরা তিনজনে ব্যাঙ্গালোরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যেতে যেতে অঙ্কুশ সংঘমিত্রাকে সব ঘটনা খুলে বলল। বৈশালী মীনাক্ষি দেবীর পায়ের কাছে ঘুঙুর জোড়া রেখে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। সংঘমিত্রাও মা’কে সব কথা খুলে বলতিই তিনিও অনুভূতিপ্রবণ না হয়ে পারলেন না।

“ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট কোরো না বোন...”

“দিদি, এতদিনে তোমার ঘুঙুরের ঋণ যে শোধ হল...”

“কিসের ঋণ? তুমিও তো শিল্পী, শিল্প চর্চাই করেছো; তাতে দোষ নেই। কোন পাপ নেই।”

 

এখন ওরা পাকাপাকি ভাবেই ব্যাঙ্গালোরবাসী। শহর থেকে একটু দূরে সবুজ দিয়ে ঘেরা মনোরোম জায়গায় বৈশালী ও মীনাক্ষী গুরুকূল খুলেছেন; গরীব, দুস্থ মেয়েদের নৃত্য শিখিয়ে প্রফেসানালি এস্টাব্লিশড্ করাই আজ ওঁদের ব্রত।

#অনুপ্রেরণা#

 


Rate this content
Log in

More bengali story from Mausumi Pramanik

Similar bengali story from Inspirational