Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Suravi Roy

Crime Tragedy


5.0  

Suravi Roy

Crime Tragedy


একফোঁটা বৃষ্টির দেওয়া জীবন

একফোঁটা বৃষ্টির দেওয়া জীবন

20 mins 1.3K 20 mins 1.3K

মনিশা আর আয়ুষের বিয়েটা হয়েছিল শুধুমাত্র তাদের বাবাদের দুটো আলাদা আলাদা বিজনেসকে একটা ফেমাস বিজনেস এ পরিণত করার জন্য এবং প্রচুর টাকা রোজগারের জন্য। অন্যদিকে মনিশা আর আয়ুষও, এর অন্যথা ছিল না। ওরাও সবসময়ই টাকার পিছনে ছুটে চলত আর একে অপরকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করত। ওরা ছিল বিবাহিত বিজনেস পার্টনার। সব সময়ই বারে পার্টি আর টাকা ওড়ানো... এই সব নিয়েই চলছিল তাদের বিবাহিত জীবন।

   এর মধ্যে একদিন আয়ুষ বাড়িতে নেই দেখে, একা বাড়িতে থেকেই বা কি করবে এই ভেবে , মনিশার আজ সন্ধ্যায় একটা পার্টিতে যাওয়ার প্ল্যান করল। তাই মনিশা ভাবল স্নান সেরে, বিউটিপার্লারে গিয়ে একবারে রেডি হয়ে পার্টিতে চলে যাবে। এই ভেবে মনিশা স্নান করতে বাথরুমের দিকে গেল কিন্তু রুম থেকে বাথরুমের দরজার কাছে যেতেই মনিশা শরীরে কেমন একটা অস্থিরতা অনুভব করল, কিন্তু কি হল সেটা বোঝার আগেই মনিশার মাথাটা ঘুরে উঠল তারপর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল।

  এরপর প্রায় দেড় ঘন্টা পর মনিশার জ্ঞান ফিরল, ধীরে ধীরে চোখ খুলে উঠে বসল। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, অনেক দেরী হয়ে গেছে ভেবে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গেল কিন্তু মনিশা ঠিক ভাবে দাঁড়াতে পারছিল না, অনুভব করতে পারছিল যে হঠাৎই তার শরীরটা ভারি হয়ে গেছে। এর কারন হিসাবে মনিশা ভাবল, কাল রাতের পার্টিতে কি তার ড্রিঙ্ক করাটা বেশি হয়ে গেছে, যার জন্য কিনা তার এই রকম হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কিন্তু,... এরকম কিছু হলে তো সে সকালেই বুঝতে পারত, কিন্তু সকালে তো সে বেশ সুস্থ ই ছিল।


  যাইহোক, মনিশা আর যায়ই করুক না কেন, নিজের সুন্দরতা বজায় রাখতে শরীরের খেয়াল ঠিকই রাখে। তাই সে আর কিছু না ভেবে ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসল তারপর জল খেয়ে, পাশেই টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে মনিশা তার এক পরিচিত ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে তার সাথে ঘটা সমস্ত কিছু জানালো। মনিশার কথা শুনে ওর ডাক্তার বন্ধু তাকে কোনো গাইনেকোলজিস্টস্ এর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এটা শুনে মনিশা আর দেরি না করে, একজন নামী গাইনেকোলজিস্টস্ এর কাছে বিকালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়। তারপর মনিশা স্নান করে রেডি হয়ে ডক্টরের কাছে চলে যায়। ডক্টর, মনিশার চেকআপ করে যা বলে তাতে মনিশার মুখে অমাবস্যা নেমে আসে। এরপর মনিশা চুপচাপ বাড়ি ফিরে আসে এবং এসেই দেখে আয়ুষ বাড়ি অন্যদিকে, মনিশাকে বাড়িতে দেখে আর তার ওপর মনিশার থমথমে মুখ দেখে, আয়ুষ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, " তুমি এখন বাড়িতে?....তোমার পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল না? ?


আয়ুষের কথা শুনে মনিশা কাঁদতে শুরু করে এবং সকালের ঘটনা আয়ুষকে সমস্তটা খুলে বলে এবং শেষে যেকথাটা বলে তাতে আয়ুষের মাথায় যেন বাজ পড়ে । কারণ, শেষের কথাটা ছিল মনিশা অন্তঃস্বত্তা। হ্যা, ওই ডাক্তার এটাই বলার পর মনিশার মুখটা অমাবস্যা হয়ে গেলো।

যেকোনো বিবাহিত দম্পতিকে যে কথাটা বললে তাদের মা-বাবা হওয়ার আনন্দে মন খুশিতে ভরে ওঠে.... কিন্তু মনিশা আর আয়ুষের ক্ষেত্রে ঘটল ঠিক উল্টোটা।

আয়ুষ কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, " মনিশা, এখন আমাদের এনজয় আর পার্টি করার এবং অনেক টাকা ইনকাম করার সময়। আর তুমি কি ভাবছো, এই সময়ে আমরা সবকিছু ছেড়ে বাচ্চা মানুষ করবো?.... কালই কোনো নার্সিংহোমে গিয়ে অ্যাবরসন্ করিয়ে নেবে।" 

আয়ুশের কথা শুনে মনিশা চিৎকার করে উঠলো এবং বলল," তুমি কি ভাবছো আয়ুষ, আমি আমার অফিস আর লেট নাইট পার্টি ছেড়ে, রাত জেগে বাচ্চা সামলাবো?... আমি এসব পারবো না...আর তুমিতো জানোই আমি একদম বাচ্চাদের সহ্য করতে পারি না।..  আর অ্যাবরসন্ এর কথা বলছো.... সেটা সম্ভব হলে আমি এই ভাবে বাড়ি ফিরে আসতাম না।...." বলেই মনিশা হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলো। আয়ুষ কিছুটা থতমত খেয়ে বলল," কেন কি হয়েছে? "

এরপর মনিশা কাঁদতে কাঁদতে বলে যে, ডক্টর বলেছেন বাচ্চাটাকে মারতে গেলে সেও বাঁচবে না। পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থাতেই অ্যালকোহল খাওয়ার জন্য, বাচ্চার সাথে সাথে সেও আজ মরে যেতে পারত। তাই অ্যালকোহল খাওয়া তার একেবারেই নিষিদ্ধ।অর্থাৎ মনিশাকে বাচ্চাটার জন্ম দিতেই হবে। এছাড়া আর কোনো উপাই নেই।

একথা শুনে আয়ুষের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। অনেক ভেবে চিন্তে দুজনে মিলে ঠিক করল যে, যতদিন পর্যন্ত বাচ্চা ডেলিভারি না হচ্ছে ততদিন মনিশা বাড়ির মধ্যেই থাকবে, বাইরে যাবে না। যাতে কেউ জানতে না পারে, তার পরে যে কোনো একটা ছোটো নার্সিংহোমে গিয়ে বাচ্চা ডেলিভারি করিয়ে, বাচ্চাটা সেখানেই ফেলে রেখে চলে আসবে।  

এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা মাস, মনিশার ডেলিভারি দিন চলে এল.... কিন্তু ওদের অফিসের একজন কলিগ, মনিশাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া সময় দেখে ফেলল। আর আয়ুষ আর মনিশার বাচ্চা ফেলে আসার সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। ....সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো। আর অফিসের সব কলিগরা এসে নার্সিংহোমে এসে উপস্থিত হয়েছিল, ওদের বাচ্চাকে দেখার জন্য। এইসব দেখে আয়ুষ রাগে ফেটে পড়ছিল কিন্তু কি আর করবে অগত্যা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হল।

মনিশা একটা ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দিয়েছিল তাই কলিগরা সবাই মিলে ওর নাম রাখলো 'টিয়ারা'।

   

   টিয়ারার দেড়বছর বছর বয়স পর্যন্ত সবাই আসতো মিষ্টি টিয়ারাকে দেখতে। আর এই জন্যই আয়ুষ আর মনিশা, টিয়ারাকে কোথাও বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে পারেনি। এর পর থেকে ওরা ওইটুকু ছোট্ট টিয়ারাকে একটা ঘরে বন্দি করে রাখতো, কাঁদলেও বাইরে বের করে আনতো না।আর একজন আয়া রেখেছিল টিয়ারার জন্য, কিন্তু সেও ছিল খুব বদমাস। কোনো সময় টিয়ারার খিদে পেয়ে কাঁদলে, ওই আয়া টিয়ারাকে খাওয়ানো তো দুরের কথা, ওকে আরো মারধর করে ঘুম পারিয়ে রাখতো। এমনি করে বন্দি থেকেই টিয়ারার জীবনের এগারো বছর কেটে যায়। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে-টাকে দেখার ইচ্ছায় টিয়ারা পাগল হয়ে উঠেছিল।

আর অন্যদিকে, আয়ুষ আর মনিশা সব সময়ই পার্টি আর টাকা নিয়ে মেতে থাকতো..... ভুলেই গেছিলো যে তাদের একটা মেয়ে আছে বা তাদের বাড়িতে টিয়ারা নামে কেউ একটা থাকে। কলিগরা টিয়ারার কথা জিজ্ঞাসা করলে ওরা বলতো, টিয়ারাকে ওরা বিদেশের কোনো একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করেছে ...তাই ও ওখানেই থাকে।


   এই ভাবেই চলছিল, একদিন রাতে আয়ুষদের বাড়িতে পার্টি চলছিল। হই হট্টগোল আর গানের আওয়াজ পেয়ে, ঘরের মধ্যে বন্দি থাকা টিয়ারা ঠিক করে আজ সে যেভাবেই হোক বাইরে বের হবে। এই ভেবে সে একটা কাঁটা ক্লিপ দিয়ে ঘরের লক্ টা কাটার চেষ্টা করতে লাগল। কিছু সময় পর টিয়ারা লক টা কেটে ফেলল এবং ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু মনিশা আর আয়ুষ, ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য টিয়ারাকে প্রচন্ড মারতে শুরু করলো। এরপর ওই আয়া টা যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা, মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকা টিয়ারাকে একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। এরপর, মনিশা আর আয়ুষ ওই পার্টিতে উপস্থিত সবাইকেই এটা বোঝাতে সক্ষম হল যে, তাদের একমাত্র মেয়ে টিয়ারা একজন মানসিক রোগী।

এরপর পাঁচদিন ওই অন্ধকার ঘরের দরজা কেউ খোলেনি। টিয়ারা চিৎকার করে কাঁদলেও, কেউ দরজাটা খুলে একফোটা জলও কেউ দেয়নি। এমনকি ঘরের আলোটাও কেউ জ্বেলে দেয় নি। টানা পাঁচ দিন এই ভাবে থাকার পর, অবশেষে টিয়ারা, সত্যি সত্যিই মানসিক রোগীতে পরিনত হয়েছিল।

    এরপর আয়ুষ আর মনিশা টিয়ারাকে একটা মেন্টাল অ্যসাইলেমে ফেলে রেখে এসে হাফ্ ছেড়ে বাঁচে। কাঁধ থেকে বোঝা নেমে যাওয়ার আনন্দে ওরা বাড়ি ফিরে অনেক খরচা করে পার্টি দিয়েছিল।


দশ বছর হতে চলল, বিখ্যাত বিজনেসম্যান মিঃ আয়ুষ এন্ড মিসেস মনিশার একমাত্র মেয়ে টিয়ারা মেন্টাল অ্যাসাইলেম্ এ আছে। টিয়ারাকে একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে কারণ সে একদমই আলো সহ্য করতে পারে না। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। একটু আলোর রশ্মি ওর চোখে পড়লেই উন্মাদ হয়ে ওঠে, সামনে থাকা যে কাউকে আচঁড়ে কাঁমড়ে দেয়। এতোটাই পাগল হয়ে ওঠে যে, চেতনা নাশক ইনজেকশনেরও কোনো প্রভাব পড়ে না। অবশেষে হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক শক দিয়ে ওকে শান্ত করে, ঘুম পাড়াতে হয়। এইসব কারনে, প্রথম থেকেই টিয়ারাকে চোখ বেঁধে রাখা হয়, একটা কালো মোটা কাপড় দিয়ে .... যাতে ওর চোখে আলোক রশ্মি প্রবেশ করতে না পারে। আর এতেই টিয়ারাও বেশ সাচ্ছন্দ বোধ করে।

  ওখানকার অন্য পেসেন্টরাও টিয়ারাকে কেমন ভয়াল দৃষ্টিতে দেখে আর অন্যান্য ডাক্তার আর নার্সদের মতে, টিয়ারার থেকে ক্ষতরনাক্ মেন্টাল পেসেন্ট আর একটাও এই মেন্টাল অ্যসাইলেমে নেই। এই জন্য কোনো নার্সই টিয়ারার দেখাশোনার জন্য ওই রুমে যেতে চাই না, কারণ গেলেই তো টিয়ারার সব রাগ এসে পড়ে ওই নার্সের ওপরে, আর তার পর ওই নার্সকে ওই ভয়ংকর টিয়ারার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু, একমাত্র ডাঃ সেনকে দেখলেই, টিয়ারা কিছুটা শান্ত থাকে। আর এটা হসপিটালের সকলকে অবাক করে দেয়।

এরকম যে কেন হয় কেউ জানে না শুধুমাত্র ডঃ সেন ছাড়া। কারণ, মাত্র এগারো বছর বয়সে যখন টিয়ারার মা-বাবা এসে , ওকে এখানে রেখে গিয়েছিল, তখন টিয়ারার এমন রোগের কারন হিসেবে তারা কিছুই বলেনি, তাই তখনই ডাঃ সেন অর্থাৎ মেন্টাল অ্যাসাইলেমের ডাক্তার মিসেস মোহিনী সেন, টিয়ারার চেকআপ করে বলেছিলেন, একমাত্র মা-বাবার ভালোবাসা ও স্নেহ পেলেই টিয়ারার সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। আর তা না হলে, দিনের পর দিন টিয়ারার অবস্থার আরো অবনতি হতে থাকবে, তখন টিয়ারাকে সুস্থ করাতো দুরের কথা তখন ওকে আর বাঁচানো যাবে না। কিন্তু , এই রকম কথা শুনেও আয়ুষ আর মনিশা বেশ বিরক্ত হয়েই বলেছিল, তারা টিয়ারাকে সময় দিতে পারবে না। আর এটাও বলেছিল যে, টিয়ারা সুস্থ হোক বা না হোক, ও আমৃত্যু এখানেই থাকবে। তারা টিয়ারাকে আর বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না। বছরে ওর যাবতীয় খরচের টাকা পাঠিয়ে দেয়া হবে। কথাগুলো বলেই ওনারা টিয়ারাকে রেখে, হনহন করে বেরিয়ে গেছিলো।


আর চোখের নীচে কালি পরা, টিয়ারা স্থির দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে ছিল।..... ওনারা চলে যাওয়ার পর কথাগুলো ভেবে ডাঃ সেনের চোখ জলে ভরে উঠল, তিনি ভাবলেন এই সদ্য নিজের একমাত্র মেয়ে নীদ্রিতার বিয়ে দিয়েছেন , এই কয়েক দিনে মেয়ে ছেড়ে থাকা তাঁর কাছে দুর্বিষহ মনে হচ্ছে আর ওরা তাদের একমাত্র সন্তান, এগারো বছরের একটা বাচ্চাকে এখানে ফেলে রেখে চলে গেল। এরা কি রকম মা-বাবা.... ছিঃ!.....

যদিও একবছর টাকা পাঠানোর পর, তার কোনও টাকা পাঠাই নি, টিয়ারার বড়োলোক মা-বাবা। ডাঃ সেন তার নিজের খরচেই টিয়ারাকে সুস্থ করার চেষ্টা করে গেছেন। পরে একবার টিয়ারার অবস্থা নিয়ে টিয়ারার বাবা মিঃ আয়ুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু তিনি কোনো কথাই বলেন নি।   

   যাইহোক, এর পর তিনি ওই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা টিয়ারাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। আর টিয়ারাও পরম সুখে চোখ বুঁজে ছিল। আর তার পরেই টিয়ারা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন জ্ঞান ফিরল তখন সে ছিল এক অন্য রকম টিয়ারা... চোখ খুলেই বিছানা থেকে উঠেই বিকট চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে থাকা একজন নার্সের উপরে, আর খামচে তার শরীরের মাংস তুলে নিল.... টিয়ারার এই রকম হিংস্র স্বভাবে সব নার্স গুলো ভয় পেয়ে ঘাবড়ে গেল। আর দেখতে দেখতেই টিয়ারা মাটিতে পড়ে থাকা একটা লোহার রড তুলে নিয়ে অন্য একজন নার্সকে মারতে থাকে, অন্যরা আটকাতে গেলে, টিয়ারা তাদেরকে মারতে শুরু করে। হঠাৎই এই সময়ে কোথাই থেকে দুই জন নার্স এসে ঘরে ঢোকে, তাদের মধ্যে একজন টিয়ারাকে চেপে ধরে ওর হাত থেকে রডটা কেড়ে নেয়। আর অন্য একজন টিয়ারাকে ঘুমের ইনজেকশন দেয়। কিন্তু ইনজেকশনেরও কোনো প্রভাব পরে না, সে ওই নার্সটি ধাক্কা মেরে ফেলে, আবার লোহার রডটা তুলে নেয় কিন্তু টিয়ারা এবার কাউকে মারে না, শুধুমাত্র ঘরের মধ্যে থাকা লাইটগুলোকে একটার পর একটা ভাঙতে থাকে ..... আর এর মধ্যেই ডঃ মোহিনী সেন ঘরে ঢোকেন আর টিয়ারা তাকে দেখে স্থির হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য তার পর লোহার রডটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, দৌড়ে বেডের তলায় ঢুকে পড়ে তারপর অন্ধকার জায়গাটায় বসে ঝিমিয়ে পড়ে..... ধীরে ধীরে ঘুমে ঢলে পড়ে এগারো বছরের ছোট্ট টিয়ারা।


   এরপর ওই আহত নার্সদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর এই ঘটনার পর আর কোনো নার্স টিয়ারার দায়িত্ব নিতে চাই নি। কিন্তু যে দুই জন নার্স কিছু সময়ের জন্যে হলেও টিয়ারাকে শান্ত করতে পেরেছিল তারাই টিয়ারার দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়। তাদের মধ্যে একজন হল রেবা আর অন্যজন নীলা। এরা এই অ্যসাইলেমের পুরোনো নার্স ।

যখন টিয়ারার হিংস্রতা কোনো ইনজেকশনেও শান্ত হত না, তখন দিনে প্রায় দুবার করে হাই ভোল্টেজ শক্ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হত। কিন্তু যখন টিয়ারাকে চার পাঁচ জন মিলে ধরে শক্ রুমে নিয়ে যাওয়া হত আর যখন টিয়ারাকে শক্ দেওয়া হত তখন সে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিৎকার করে কাঁদত..... ওর মুখ দিয়ে লালা ঝড়ে পড়ত..... ওর কান্না জড়ানো কাতর চিৎকারে অ্যসাইলেমে মৃতের আত্মারাও যেন কেঁদে উঠতো, সমস্ত হাসপাতাল যেন সেই সময় স্তব্ধ হয়ে যেত। শক্ রুমে উপস্থিত সব ডাক্তার ও নার্সদের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসত টিয়ারার কষ্ট দেখে। যন্ত্রণায় জর্জরিত, শীর্ণকায় শরীর, চক্ষুদ্বয় অক্ষি কোটরের বাইরে বিস্ফারিত ভাবে বেরিয়ে এসেছে.....মনে হচ্ছে যেন যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চোখ দিয়ে যেন রক্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে .... মুখ দিয়ে লালা ঝরছে.... এই অবস্থায় টিয়ারাকে দেখে ডঃ মোহিনী সেন জল ভরা চোখে ভাবতেন, "একটা এগারো-বারো বছরের শিশু, যে কিনা তার মা-বাবার একটু ভালোবাসা পেলে সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে উঠতো ..... কিন্তু সেটা টিয়ারার বড়োলোক মা-বাবার জন্য সম্ভব নয়। তাই আমরা এই হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক শক্ দিয়ে টিয়ারাকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছি।" কথাগুলো ভেবে ডঃ সেন আর শক্ রুমে থাকতে পারতেন না।  চোখের জল মুছতে মুছতে এক ছুটে বেরিয়ে যেতেন ঘর থেকে।

এটা এখন এই দশ বছরের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। অন্যদিকে টিয়ারা দশবছর পরেও এতো উন্মত্ততার মধ্যেও সেই দিনের, মিসেস সেনের স্নেহ টুকু ভুলতে পারেনি। তাই আজও মিসেস সেনকে দেখলেই কিছুটা শান্ত হয়ে আসে।কিন্তু, ডাঃ মোহিনী সেন এখন বেশ বুঝতে পারছেন যে, টিয়ারার কাছে আর বেশি সময় নেই কারন, সে আর ইলেকট্রিক শক সহ্য করতে পারছে না, আর ওকে বাঁচানো সম্ভব নয়।


    এখন টিয়ারার বয়স একুশ বছর।দুমাস হল টিয়ারাকে একটা নতুন ঘরে এনে রাখা হয়েছে। আগে অর্থাৎ এখানে আসার প্রথম দিন থেকে যে ঘরটাতে থাকত..... সেখানে ছিল শুধু অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। যেখানে সে শুধু নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আর মাঝে মাঝে নিজের চিৎকারের শব্দ শুনতে পেত যেটাও ওই অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ঢাক্কা খেয়ে ফিরে আসতো। কিন্তু তাকে ইলেকট্রিক শক্ দেওয়ার পর, সে শুধুমাত্রতার ধীরে ধীরে থামতে থাকা তার হৃৎস্পন্দন ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেত না।সে নতুন ঘরটায় আসার পরেও কারুর সঙ্গে কথা বলত না কিন্তু কখনো কখনো কেউ পাশে কথা বললে, সে সেটা শুনে বোঝার চেষ্টা করত। কারন গত দশ বছরে টিয়ারার হিংস্রতা অনেকটা কমে এসেছিল, আর ইলেকট্রিক শক সহ্য করতে পারছিল না.... এখন বেশি ইলেকট্রিক শক দিলে মাঝে মাঝে ওর মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও, টিয়ারার মনের কোনো কোণে বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা সুপ্ত অবস্থায় ছিল।


  কিন্তু দুই তিন দিন ধরে টিয়ারা সব সময়ই কিছুর শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ঠিক যেন জলের শব্দ ....... সঙ্গে কেমন যেন একটা ভয়ংকর শব্দ ....বারবার শুনতে পাই ....আর শুনলেই যেন ভিতরটা কেঁপে ওঠে, ভয় পেয়ে যায় টিয়ারা।আজ অ্যাসাইলেমের দুজন নার্স নীলা আর রেবা, যারা সবসময়ই টিয়ারার আশেপাশেই থাকে। ওদের কথা বলতে শুনে বোঝার চেষ্টা করল ওরা কি বলছে,.........


   রেবা বলছে," এই দুই দিন ধরে বৃষ্টিটা খুব বেড়েছে, মনে হচ্ছে এবার বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করবে। "  

রেবার কথা শুনে নীলা বলল," হ্যা, তুই ঠিকই বলছিস রেবা। কাল টিভিতে নিউজ দেখলাম, তাতে বলছিল আগামী নয়- দশ দিন প্রবল বৃষ্টি হবে। আর তাতে বন্যাতো হবেই। "

  এবার রেবা বলল," আরে নীলা তাহলে তো এই টিয়ারাকে এই ঘরে রাখা যাবে না। কারন এই ঘরটা সবচেয়ে নিচে তাও আবার একেবারে অন্ধকার, এখন যা বৃষ্টি হবে তাতে এই ঘরে জলও ঢুকে যেতে পারে আর এই অন্ধকারে বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের ভয়টাও তো আছে।  

নীলা বলল, " হ্যা, আর টিয়ারা তো এইসব কিছুই চেনে না। কিছু বিপদ হলে জানতেও পারবো না।.... কিন্তু ওকে তো আর ওর আগের রুমে রাখা হবে না। ম্যাডাম তো টিয়ারাকে ওই ঘরের দিকে নিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন।  

এবার রেবা কিছুটা ভেবে বলল," তাহলে ওকে তো অন্য পেসেন্টদের সঙ্গে রাখতে হবে। আর যেটা খুব ক্ষতরনাক হবে কারন, ওই ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। আর অন্য পেসেন্টরাও তো টিয়ারাকে প্রচন্ড ভয় পাই।" 

 নীলা বলল," হ্যা, সেটাও তো। কিন্তু টিয়ারা আগের থেকে অনেক শান্ত হয়ে গেছে। আগে ওর যন্ত্রণায় ভরা মুখটা দেখলে যে কি কষ্ট হত, তা আর বলে বোঝাতে পারবো না।...যাইহোক, কিছুতো করতে হবে ..... বৃষ্টি যে ভাবে বেড়েই চলেছে তাতে সম্ভবত কাল পর্যন্ত আর টিয়ারাকে এই ঘরে রাখা যাবে না।"

  এবার রেবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ওদের পিছনের দিক থেকে টিয়ারা খুব শান্ত ভাবে বলে উঠল," নীলা আন্টি..., তোমরা কি কথা বলছো ...বৃষ্টি কি জিনিস? ...." টিয়ারা চোখে না দেখলেও রেবা আর নীলার গলার আওয়াজ খুব ভালো ভাবেই চেনে ।


 নীলা আর রেবা দুজনের চমকে পিছনে তাকালো কারণ, এই রকম মধুর শব্দের কথা তারা আগে কখনও এই অ্যসাইলেমে শোনেনি। কিন্তু পিছনে তাকিয়ে দুজনেই ভয় পেয়ে গেল। ওরা কথা বলতে ওরা টিয়ারার ঘরের দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছিল আর সেই দরজা দিয়ে টিয়ারা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আর ওরা এটা ভেবেই বেশি ভয় পাচ্ছে যে ওরা যেখানে আছে সেখা একটা লাইট বাল্ব লাগানো আছে..... আর টিয়ারা যদি একবার বাল্বটা দেখে ফেলে তাহলে আর রক্ষা নেই... টিয়ারা পাগল হয়ে যাবে।

 নীলা আর রেবার কোনো উত্তর না পেয়ে আবার টিয়ারা বলল," কি হল আন্টি?... কথা বলছো না কেন?.... আমাকে ভয় পেও না। আমি জানি এখানে একটা বাল্ব লাগানো আছে.....আর ওই শক্ এর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি না ........তাই এই দেখ আমি দুই হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে রেখেছি।... তোমরাতো জানো আলো দেখলে আমার ভয় লাগে।"

 নীলা আর রেবা এতক্ষণে খেয়াল করল, টিয়ারার চোখে আজ কালো কাপড়টা বাঁধা নেই তবু নিজের হাত দিয়ে চোখ দুটোকে ঢেকে রেখেছে। আর এই দশ বছরে টিয়ারার মিষ্টি কথা কেউ শোনেনি, শুনেছে শুধু চিৎকার। আজ প্রথম টিয়ারা কথা বলল। খুশিতে রেবা আর নীলার চোখে জল চলে এল।

 রেবা বলল, " টিয়ারা তুই আজ আমাদের সাথে কথা বলছিস?.... কি যে আনন্দ হচ্ছে তোকে বলে বোঝাতে পারব না।....."

  টিয়ারা বলল," আর এই ভাবে যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না,...আন্টি... তাই আজ সাহস করে বাইরে চলে এলাম। আন্টি বলো না, বৃষ্টি কি?...."

টিয়ারার কথা শুনে নীলা অবাক হয়ে বলল," এ কি বলছিস টিয়ারা? তু-তুই কখনোই বৃষ্টি দেখিস নি? তুই তো এগারো বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতেই ছিলি টিয়ারা কাতর হয়ে বলল," না গো আন্টি .... আমি কোনো দিনই ঘরের বাইরে যাইনি। ওরা তিন জনে সব সময়ই আমাকে তালা বন্ধ করে ঘরে আটকে রাখত। আমি যখনই বাইরে যেতে চাইতাম তখনই ওরা আমাকে মারতো..... আবার ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখতো। আর ঘরের সব দরজা, জানালা বন্ধ করে রাখত আর বলত আমি যেন একটুও শব্দ না করি..... যেন কেউ জানতে না পারে এই ঘরে আমি থাকি। এভাবেই একদিন আমি গানের আওয়াজ পেয়ে, কাঁটা ক্লিপ দিয়ে লক্ কেটে, রুম থেকে বেরিয়ে বাড়ির ড্রয়িং রুমে চলে আসি আর সেখানে দেখি যারা আমাকে আটকে রাখতো তাদের মধ্যে দু’জন নাচছে আর অনেক লোকেরাও নাচছে...... বারবার সবুজ আর লাল আলো জ্বলছে। এসব দেখে আমার মাথা ঘুরতে থাকে, বমি আসছে মনে হয় আর শরীরে কেমন অস্বস্তি শুরু হয় আর আমি ওই লোকগুলোর মাঝে গিয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করি। আর ওরা দুজন অর্থাৎ সবাই যাদের দুইজন কে আমার মা-বাবা বলে, ওরা আমাকে, 'পাগলটা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে'...এইবলে প্রচন্ড মারতে শুরু করে আর তারপর আমাকে একটা ঘুটঝুটে অন্ধকার ঘরে ভরে, বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। তখন আমার খুব শরীর খারাপ করছিল.... চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল ... মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল .... শরীরের যন্ত্রণায় চোখ বুজে আসছিল ..... এই ভাবেই ধীরে ধীরে চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। সম্ভবত ওই ঘরে আমি পাঁচ -ছয় দিন ছিলাম। আর একদিন ওই ঘর খুলল, আর ওরা জোর করে আমাকে এখানে ফেলে রেখে চলে গেল। সেদিন আমি প্রথম বাড়ির বাইরে পা রেখেছিলাম। অসুস্থতার মধ্যে সবকিছুই যেন আজব আর ভয়াল মনে হচ্ছিল। আর তারপরেই আমার চোখে গভীর অন্ধকার নেমে আসে। আর তারপর কি হয়েছিল তোমরা তো জানোই........।"

  

 এই সব শুনে নীলা বলল," আগের সব কিছু ভুলে যা। তুই জানতে চাস তো বৃষ্টি কি?..... তবে শোন, বৃষ্টি হল, আকাশের ভাসমান তুলোর মতো মেঘের মধ্যে থেকে ঝরে পড়া এক পবিত্র জলবিন্দু। শহস্র জল বিন্দু রাশীকৃত হয়ে একসাথে ঝরে পড়তে থাকে ......এটাই বৃষ্টি। যা পৃথিবীর মাটিকে পবিত্র, বিশুদ্ধ ও শিক্ত করে তোলে। এই বৃষ্টির শীতল, পবিত্র জল যখন শরীর স্পর্শ করে তখন, মনে হয় এই জল শরীরের সমস্ত ময়লা, অপবিত্র কূটিল মন ....সব কিছু ধুয়ে এক শীতল পবিত্রতার সৃষ্টি করছে। শরীরে এক অদ্ভুত শক্তির অনুভূতি হয় ঠিক যেন সদ্য প্রস্ফুটিত হলুদাভ সাদা ফুল, মনের মধ্যে ফুটে উঠেছে। বৃষ্টিধারার পরশে সমস্ত প্রানীজগৎ যেন সব দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে যাই। মনে হয়, নাচি....গান করি....মনের আনন্দে মেতে উঠি। মাঝে মাঝে মেঘের গর্জনে যেন আকাশে বাতাসে বাজনা বেজে ওঠে। কখনো কখনো আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি বৃষ্টির আগমন বার্তা বহন করে আনে। এই বৃষ্টির ছোট্ট ছোট্ট জলবিন্দুরা, পৃথিবীর মাটি শিক্ত করে, উদ্ভিদ রূপী নতুন প্রানের সৃষ্টি করে। তখন সারা পৃথিবী খুশিতে মেতে ওঠে। আবার কখনো কখনো এই বৃষ্টিধারা নিজের সর্ব শক্তি নিয়ে ঝরে পড়ে, জল প্লাবিত করে বন্যা ঘটিয়ে, পৃথিবীর সমস্ত পাপ, নোংরা- আবর্জনা ধুয়ে নিয়ে গিয়ে পৃথিবীকে পবিত্র করে তোলে।"

" বৃষ্টি সত্যিই এতোটা সুন্দর? .... আমায় বৃষ্টি দেখাতে নিয়ে যাবে? " টিয়ারা উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে।


 রেবা বাধা দিয়ে বলে," না টিয়ারা সেটা সম্ভব নয়। কারণ, যেখানে বৃষ্টি হয় সেখানে অনেক আলো থাকে, আর এটা কোনো সাধারণ বাল্বের আলো নয়.... এটা সারা বিশ্বের আলো। সূর্যের আলো ..... যেটা সমগ্র পৃথিবীর আলোর স্রোত......। সে আলো অতি তিব্র.... তুমি সেই আলো সহ্য করতে পারবে না টিয়ারা....।"

"কিন্তু আন্টি আমি যে দেখতে চাই সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু,পবিত্র বৃষ্টিফোটাকে .... অনুভব করতে চাই সেই অদ্ভুত আনন্দকে....।" টিয়ারা হতাশ হয়ে বলল।

  

  হঠাৎই ওদের কথাবার্তার মধ্যে অন্য একজন নার্স এসে বলল," ডাঃ সেন, টিয়ারাকে সামনের দিকের ঘরে, অন্য পেসেন্টদের সঙ্গে রাখতে বলেছেন, কাল পর্যন্ত বৃষ্টি না থামলে, এই ঘরে টিয়ারার অসুবিধা হতে পারে। এবং এটাও বলেছেন যে, টিয়ারা হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক শক নেওয়া পেসেন্ট, আর এই অবস্থায় ও বৃষ্টির জলে ভিজলে ওর ক্ষতি হতে পারে। তাই ওর চোখে কালো কাপড় বেঁধে দাও, এখুনি ওকে ওই ঘরে নিয়ে যেতে নার্সের কথা শুনে, রেবা আর নীলা, টিয়ারার চোখ বেঁধে, তখুনি সামনে ঘরে নিয়ে গেল।  

কিন্তু সেদিন সারা রাত টিয়ারা ঘুমাতে পারল না। নীলার বলা বৃষ্টির বর্ণনা ভেবে মনে এক সুন্দর কল্পনার সৃষ্টি করল, সেখানে টিয়ারা বৃষ্টির জলবিন্দুর পরশ অনুভব করতে পারল। তাতে টিয়ারার বৃষ্টি দেখা, তাকে অনুভব করার ইচ্ছাটা আরো একশো গুন বেড়ে গেলো । 


পরদিন সকালে, টিয়ারার নতুন রুমের অন্য একজন পেসেন্টকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার সময়ে নার্স ভুলবসত ঘরের দরজাটা খোলা রেখে চলে যায়। টিয়ারার চোখ বাঁধা থাকলেও সে অনুভব করতে পারে খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে হালকা আলোক রশ্মি ঘরে মধ্যে এসে পড়েছে। টিয়ারা উঠে দাঁড়ায়, বাইরের বৃষ্টির জলধারার মধুর শব্দ, তার বাইরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। টিয়ারা চোখ বাঁধা অবস্থায় ধীরে ধীরে দরজার বাইরে বেরিয়ে আসে। টিয়ারার সামনে একটা বারান্দা আর তার পরেই মেন্টাল অ্যসাইলেমের বৃহৎ উঠোন। সেখানেই মুশলধারায় মেঘের গর্জনে টিয়ারা ভয় পেয়ে একবার থমকে যায়, তারপর কিছু না ভেবে সাহস করে নিজের চোখের কালো কাপড়টা এক টানে খুলে ফেএই সময়ে নীলা এই দিকেই আসছিল।সে টিয়ারাকে এই রকম ভাবে দেখে, শক লাগার মতো চমকে যায়। সে কিছু বলার আগেই, টিয়ারা নিজের বন্ধ চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে খুলে সামনের দিকে তাকায়..... এমন আলোর পাহাড়ের মধ্যে বৃষ্টির ঝরনা ..... প্রকৃতির এমন অভূতপূর্ণ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে যায় টিয়ারা.... শ্বাস ফুলে উঠতে থাকে তার ..... খুশিতে মেতে ওঠে তার মন... সে আর আটকাতে পারে না নিজের পা-দুটোকে.... ছুটে চলে যায় বৃষ্টির মধ্যে, পবিত্র শীতল পরশ অনুভব করে । এদিকে, হঠাৎই টিয়ারার এমন আচরণে নার্স নীলা চমকে ওঠে, দৌড়ে টিয়ারাকে আটকাতে যায়, কিন্তু পারেনা। তার আগেই টিয়ারা প্রবল বৃষ্টির জলধারায় নিজেকে শিক্ত করতে শুরু করেছে।এরপর নীলা চিৎকার করে অন্য নার্সদের ডাকতে শুরু করে। একে একে অন্যান্য পেসেন্টরা সহ সব নার্স-ডাক্তাররা এসে বারান্দাতে জমা হয়ে যায়, টিয়ারাকে দেখার জন্য।


  অন্যদিকে, নীলা আর রেবার কাছে টিয়ারার শান্ত হয়ে কথা বলা আর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার কথা শুনে ডাঃ মোহিনী সেনও খুশি হয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন যে, টিয়ারার এই ভাবে হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া, টিয়ারার মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার শুরু। হয়তো আর জীবনকালের দুই-তিন সময় আছে। তবুও তিনি ভগবানের কাছে পার্থনা করছেন, টিয়ারাকে বআজ শুধু মাত্র মা-বাবার অবহেলার জন্য টিয়ারার এই অবস্থা। এমন মা-বাবাকে ভগবান কখনো যেন সন্তান না দেন। হঠাৎই বাইরে হট্টগোল আর নীলার চিৎকার শুনে, ডাঃ সেন তাড়াতাড়ি বাইরের বারান্দায় গিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন,,,

    টিয়ারা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বৃষ্টির দিকে....আলোর দিকে....দু-দিকে হাত মেলে দিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে খুশি ঘুরে চলেছে..... টিয়ারাকে যেন পরির মতো লাগছে ..... ডাঃ সেন যেন মনের চোখে দেখতে পাচ্ছেন, এক-একটা বৃষ্টির ফোঁটা টিয়ারার শরীরের উপর পড়ে যেন ওর শরীরের সমস্ত কষ্ট, যন্ত্রণা আর যন্ত্র দিয়ে দেওয়া কারেন্টকে শরীর থেকে প্রবাহিত করে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। কিছু বৃষ্টির জলবিন্দু টিয়ারার চোখের দুঃখ, যন্ত্রণার অশ্রু ধুইয়ে, নতুন আলোর প্রবেশ ঘটাচ্ছে। যেন টিয়ারাকে নতুন জীবন টিয়ারার গলার মিষ্টি গানে, ডাঃ সেনের ঘোর কাটলো আবার তিনি টিয়ারার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, টিয়ার মেঘের গর্জনের বাজনায়....., আকাশ চেরা বিদ্যুতের আলোতে, বৃষ্টির স্নিগ্ধ জলধারার নীচে তান্ডব নৃত্য করতে শুরু করেছে। তার নৃত্যে বৃষ্টির জলধারা আনন্দে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আকাশ বাতাস খুশিতে কেঁপে উঠছে । মনে হচ্ছে যেন আকাশ থেকে বৃষ্টি ফোটার আকারে পুষ্প ঝরে পড়ছে, টিয়ারার মাথার উপরে। যেন ভগবান আশীর্বাদ করছেন।

এদিকে নীলা একটা ছাতা নিয়ে টিয়ারা আনতে বৃষ্টিতে নামতে যাচ্ছিল। ডাঃ মোহিনী সেন তাকে নিষেধ করে বললেন," না নীলা ওকে ওখানেই থাকতে দাও, আজ যে টিয়ারার জন্মদিন, আজ টিয়ারার একুশ বছর পূর্ণ হল। আজ থেকে একুশ বছর আগে আজকের দিনে এই সময়ে টিয়ারার জন্ম হয়েছিল, সেদিনও এই রকমই বৃষ্টির দিন ছিল ।

 অন্যদিকে, টিয়ারা নৃত্য করতে করতে বৃষ্টির মধ্যে, দু-দিকে হাওয়ায় হাত মেলে ধরে জোরে জোরে ঘুরতে শুরু করল। ঘুরতে ঘুরতে একসময় নিস্তেজ হয়ে চোখ বন্ধ হয়ে এল টিয়ারার। মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে একবার চোখ খুলে আকাশের দিকে বৃষ্টিতে ভরা আলোর দিকে তাকালো। তারপর মাটিতে পড়ে গেল।  

  

এদিকে ডাঃ মোহিনী সেনের একমাত্র মেয়ে নীদ্রিতা আর জামাই সমুদ্র এই সময়ই বৃষ্টির মধ্যে মোহিনী সেনকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য এসে পৌঁছেছিল। টিয়ারার মাথাটা মাটিতে পড়ার আগে নীদ্রিতা দৌড়ে এসে ধরে ফেলল। সমুদ্রও ছুটে এল বৃষ্টির মধ্যে । তারপর টিয়ারাকে কোলে করে তুলে, হসপিটালের মধ্যে নিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ডাঃ সেন ছুটে এসে, টিয়ারার চেকআপ করলেন তারপর বললেন," নাহ্ , সব কিছু ঠিকঠাক আছে, শরীর দূর্বল তাই অজ্ঞান হয়ে গেছে।"

  কেন জানি না টিয়ারাকে দেখে বারবার সমুদ্রের, দশ বছর আগের মৃত বোনকে মনে পড়ছিল। সমুদ্রের বোন সৃজা দশ বছর আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছিল। তাই সমুদ্র টিয়ারার সম্পর্কে ডাঃ সেনকে জিজ্ঞাসা করল। তিনিও নীদ্রিতা আর সমুদ্রকে, টিয়ারার সাথে ঘটা সমস্ত ঘটনা বললেন। 

এরমধ্যেই টিয়ারার জ্ঞান ফিরে এল। আর এতে সবাই অবাক হয়ে গেল কারন কোনো এক চমৎকারে টিয়ারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। যেন একফোটা বৃষ্টি বিন্দু টিয়ারাকে জীবন দান দিয়ে গেল।  

এরপর সমুদ্র, টিয়ারাকে নিজের ছোটো বোন হিসেবে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইল। এতে নীদ্রিতা আর ডাঃ সেন সহ সব নার্সরাও খুশি হল। অন্যদিকে, টিয়ারা একটা নতুন সুন্দর ফ্যামিলি পাওয়ার আনন্দে ওদের সাথে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল। সমুদ্র তার ছোটো বোন টিয়ারার নতুন নাম দিল নীলান্সী।


   অন্যদিকে, এখন মিঃ আয়ুষ আর মিসেস মনিষার চিন্তার শেষ নেই; কারন, তাদের বৃদ্ধ বয়সে তাদের এতো বড়ো বিজনেস অ্যামপায়ার কে সামলাবে। কারন, টিয়ারার জন্মের পর তাদের আর কোনো সন্তান হয়নি। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও কোনো লাভ হয়নি। আর গত দশ বছরে তারা, টিয়ারার খোঁজ খবর নেওয়া তো দুরের কথা, টিয়ারার খরচের জন্য অ্যাসাইলেমে একবছর টাকা দেওয়ার পর আর দেয়নি।   এর মধ্যে একদিন, মনিশা আয়ুষকে বলল, একদিন মেন্টাল অ্যাসাইলেমে গিয়ে, টিয়ারার খোঁজ নিয়ে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে। প্রথমে আয়ুষ রাজি না হলেও, পরে কোনো উপায় না দেখে রাজি হয় যায়।

যখন মনিশা আর আয়ুষ অ্যাসাইলেমে পৌছালো তখন টিয়ারা অর্থাৎ নীলান্সী সেখানে ছিল না। সে তার দাদা ও বৌদির সঙ্গে নতুন বাড়িতে চলে গেছিলো।

কিন্তু, যখন মনিশা, ডাঃ সেনকে টিয়ারার কথা জানতে চাইলো, তখন তিনি রেগে উঠলেন এবং জানালেন তারা টিয়ারাকে এখানে রেখে যাওয়ার একবছর পর টিয়ারা এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছে। অনেক খোঁজ করেও টিয়ারাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এবং তখন হসপিটাল থেকে মিঃ আয়ুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়ে ছিল কিন্তু উনি কোন রেসপনস করেন নি ।

সব কিছু শুনে মনিশা আর আয়ুষ সেদিন ওখান থেকে চলে গেছিল। ডাঃ মোহিনী সেন, ওদের মিথ্যে বলেছিলেন কারন, তিনি চাননি টিয়ারা অর্থাৎ আজকের নীলান্সীর জীবনে তার পাপিষ্ঠ মা-বাবার কালো ছায়া পড়ুক। 


এরপর আরো দশবছর কেটে গেছে, ডাঃ মোহিনী সেন, অ্যাসাইলেম থেকে অবসর নিয়েছেন আর বর্তমানে নীলান্সী এই মেন্টাল অ্যাসাইলেমের মালকিন এবং প্রধান ডাক্তার। আর ভাগ্যের পরিহাসে নীলান্সীর জন্মদাত্রী মা মনিশা এই অ্যাসাইলেমে চিকিৎসাধীন। একটা সন্তান না থাকার যন্ত্রণায় পাগল হয়ে গেছে মনিশা।আর জন্মদাতা বাবা আয়ুষ আজও একটা ছেঁড়া জামা পড়ে রাস্তায় রাস্তায় তাদের মেয়ে টিয়ারাকে, পাগলের মতো খুঁজে বেড়াই ............।।

------ সমাপ্ত -------


Rate this content
Log in

More bengali story from Suravi Roy

Similar bengali story from Crime