Sanghamitra Roychowdhury

Classics


4.8  

Sanghamitra Roychowdhury

Classics


একমুঠো উষ্ণতা

একমুঠো উষ্ণতা

8 mins 465 8 mins 465

দুপুরে খেয়ে উঠে মোবাইলটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে করতেই অহনার চোখদুটো লেগে এলো। এই এক ভাতঘুমের অভ্যেস হয়ে গেছে আজকাল অহনার। মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। অহনার বর, একমাত্র ছেলে আর বিধবা শাশুড়ি, এই সংসার। তাও মাঝেমধ্যে শাশুড়ি ননদের বাড়িতে গিয়েও থাকেন। আবার দু-এক দিনের জন্য কখনো সখনো মাসশাশুড়ি বা খুড়শাশুড়ির বাড়িতেও গিয়ে অহনার শাশুড়ি থেকে আসেন। ওনারাও আসেন এক আধবেলার জন্য। ঐ পর্যন্তই, কিন্তু এখন এই সময়ে কে হতে পারে? খবর বার্তা ফোনাফুনি ছাড়া? কলিং বেলের কর্কশ আওয়াজে কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে তাই ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতে গেলো অহনা। যাবার পথে শাশুড়ির ঘরের দরজায় উঁকি মারলো অহনা। শাশুড়ি বেশ করে চাপাচুপি দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। ঘড়িতে দুটো দশ। ছেলে স্কুল থেকে ফিরবে প্রায় পৌনে পাঁচটায়। কে এলো এখন? পোস্টম্যান বা কোনো ডেলিভারি বয় অথবা সেলসের ছেলেমেয়েগুলোও হতে পারে। দরজার আইহোলে চোখ রাখলো অহনা।


দরজায় দাঁড়িয়ে কুন্ঠিতমুখে এক প্রৌঢ়া। হাতে একখানি প্লাস্টিকের ঝোলা আর কাঁধে ঝোলানো একটি মলিন কাপড়ের ছোট ব্যাগ। ভদ্রমহিলাকে দেখে অহনার কস্মিনকালেও কখনো দেখেছে বলে মনে পড়লো না। তবে ভদ্রমহিলার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে ওনাকে কোনো অপরিচিত সাহায্যপ্রার্থী বলেও অহনার মনে হলো না। হয়তো বিশেষ সম্পন্ন নন, তবে চোখেমুখে সমীহ জাগানো ব্যক্তিত্বের আভাস। পর্যবেক্ষণ শেষে তাই অহনা দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলো, "কাকে চান? কোথা থেকে আসছেন?" কারণ ভদ্রমহিলার মাথার উড়ুখুড়ু ধূসর চুল ইশারা করছিলো যে উনি হয়তো বেশ দূর থেকেই এসেছেন।



মুখে হাসি ফুটিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, "শান্তা বাড়িতে আছে?" শান্তা অর্থাৎ অহনার শাশুড়ি। সুতরাং এই ভদ্রমহিলা অহনার শাশুড়ির কাছে এসেছেন। অহনাও প্রত্যুত্তরে হেসে বললো, "হ্যাঁ, মা আছেন। কিন্তু মানে, আপনাকে ঠিক...", অহনাকে মাঝপথে থামিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, "তার মানে তুমি রঞ্জুর বৌ? তোমার শাশুড়িকে বলো, গীতামাসীমা এসেছে।" অহনা কখনো শাশুড়ির মুখে এই নামটা শোনে নি। তবে বুঝলো খুবই পরিচিত কেউই হতে পারেন। অহনার বর রঞ্জনকে হাতেগোনা দু-চারজন কেবল রঞ্জু এই ডাকনামে ডাকে। একটু কিন্তু কিন্তু করেই অহনা ভদ্রমহিলাকে ভেতরে আসতে বললো। আর ভদ্রমহিলা অহনার মুখ দেখে কিছু আঁচ করতে পেরেছেন হয়তোবা। তাই বললেন, "আমার একটু তাড়া আছে, তোমার শাশুড়িকেই একবার ডাকো বরং মা।"



অহনা খেয়াল করলো, শাশুড়ির চটির আওয়াজ। অর্থাৎ শাশুড়িও হয়তো কলিংবেলের আওয়াজে সতর্কই হয়েছিলেন। তারপর এতোক্ষণ ধরে অহনা কার সাথে কথা বলছে দেখতেই হয়তো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। দিনকাল তো ভালো না। দুপুরে শাশুড়ি আর অহনা বাড়িতে একলা থাকে। অহনার বর রঞ্জন পইপই করে রোজই সাবধান করে। এগিয়ে এসেছেন অহনার শাশুড়ি শান্তা, অহনার পেছনে। অহনা একটু পাশ হয়ে শাশুড়িকে সামনে এগিয়ে দিলো। পাশ থেকে অহনা দুই প্রৌঢ়ার মুখে নানারকম আলোছায়ার কারিকুরির খেলা লক্ষ্য করছে।



আজকাল তো আর কেউ না বলেকয়ে বেড়াতে আসেই না। শান্তার চোখে জিজ্ঞাসা, আর আগন্তুক গীতার মুখে সলজ্জ হাসি। তাতে মাখামাখি হয়ে যেন "এই অসময়ে এসে পড়ে তোমাদের আবার অসুবিধে করে ফেললাম তো?"

ততক্ষণে শান্তা হৈহৈ করে উঠেছেন, "আরে আয়, আয়। বাব্বা, এতদিনে তাহলে মনে পড়লো বন্ধুকে?" অহনা এই বারো বছরের বিবাহিত জীবনে কখনো শাশুড়িকে এমন উচ্ছ্বসিত রোমাঞ্চিত হতে দেখে নি।" অহনা হাঁফ ছাড়লো। যাক বাবা, শাশুড়ির চেনা মানুষ।



তারপর গীতাকে নিয়ে শান্তা নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। শাশুড়ির চোখের ইশারায় বুঝলো অহনা, একটু খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অসুবিধা নেই, রাতের রান্না করাই আছে। একটু গরম করে নিলেই হবে শুধু। তাড়াতাড়ি অহনা রান্নাঘরে গিয়ে প্লেটে বাটিতে খাবার সাজিয়ে মাইক্রো ওয়েভে গরম করে ফেলেছে। শান্তা হাত ধরে গীতাকে এনে খাবার টেবিলে বসিয়েছেন। তার আগে গরমজলে মুখ হাত পা ধোয়া, কাপড় ছাড়া এসব হয়েছে। গল্পে গুজবে খেয়ে উঠতে গীতার সাড়ে তিনটে।



ইতিমধ্যেই অহনা জেনেছে, গীতামাসীমা হলেন শাশুড়ি শান্তার বন্ধু, স্কুলবেলার। তারপর বিয়ের পরে দেখা গেলো, শান্তা ও গীতা দু'জনের বরই রেলওয়ের কর্মী, সহকর্মী, দু'জনেই একই অফিসে। কাজেই বন্ধুত্ব আত্মীয়তার জায়গা নিয়ে নিলো অচিরেই। দুই পরিবার একসাথে ঘোরা বেড়ানো, সিনেমা নাটক দেখা। তারপর হঠাৎই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় গীতার স্বামী মারা গেলেন। ছেলেটি তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছে। রঞ্জুরই বয়সী ছেলেটি। নাম মনোজ, গীতামাসীমার সবেধন নীলমণি ছেলে মনু। তারপর দু'বছর পরে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই মনু ঢুকেছে রেলওয়েতে, বাবার চাকরিতে। তারপর বদলির সুবাদে অন্য শহরে। যোগাযোগের সুতোটা ছিঁড়ে গেলো। প্রথম প্রথম চিঠি চাপাটি, ইনল্যান্ড অথবা পোস্টকার্ডের কিছু আদান প্রদান হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে কমতে বন্ধই হয়েছে একেবারে। তারও পরে স্মৃতির ঘাটেও জমাট শ্যাওলায় আর পলির তলায় চাপা পড়েছে কতশত সুখ-দুঃখের মুহূর্তেরা। তাই শাশুড়ির মুখে বা রঞ্জুর মুখেও কখনো আর অহনার শোনা হয় নি মনুর মা গীতামাসীমার গল্প, বা নিদেনপক্ষে সম্পর্কের কথাও। তবে মাসীমাকে ভালোই লাগছে অহনার।



খাওয়াদাওয়া পর্ব মিটিয়ে গীতাকে নিয়ে শান্তা বসলেন নিজের ঘরে, খাটের ওপর পা মুড়ে। শেষ মাঘের পড়ন্ত বেলায় তখন পাশের তিনতলা বাড়িটার ছায়া ঘন হয়ে নেমে আসছে শান্তার ঘরের দক্ষিণের জানালায়। অহনাও ঘড়ির দিকে একঝলক তাকিয়ে দেখে এসে বসলো শাশুড়ির ঘরেই, খাটের ঠিক উল্টোদিকে রাখা আর্মচেয়ারটায়। শাশুড়ি আর শাশুড়ির বন্ধুর গল্পে গাছায় টুকটাক অংশগ্রহণ করছে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করে অহনা, মাসীমার পানপাতার মতো মুখে জমাট ক্লান্তির ছাপ। পোশাকের মালিন্য বলে অন্তর্নিহিত অন্য কোনো কথা। সাবলীল কথাবার্তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকা চাপা ইতস্ততভাব মাঝেমধ্যেই উঁকি মারছে। অহনাকে অবাক করে গীতামসীমা কুন্ঠিতভাবে বলেন, "তোমার ছেলের জন্য তো কিছুই আনতে পারি নি মা, এইটা তুমি রাখো মা। মাসীমার সামান্য একটু আশীর্বাদী।" নিজের কাপড়ের ব‍্যাগের ভেতর থেকে বার করে এনেছেন ছোট একটা পয়সা রাখার ব‍্যাগ। তার ভেতরে ছিট কাপড়ের রুমালে বাঁধা ছোট্ট পুঁটুলি। গিঁট খুলে বের করে আনলেন সোনার একটা সরু চেন। অহনাকে সামনে ডেকে ওর হাতে চেনটা দিয়ে মাসীমা নিজের দু'হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন অহনার হাতটা। মাসীমার স্নেহের উষ্ণতা চারিয়ে যাচ্ছিলো অহনার সর্বাঙ্গে। ওর গলার কাছটা চিনচিনে ব্যথা আর চোখের কোণে জ্বালা।



 

তারপর গীতামাসীমা ছিলেন দিন পনেরো। অহনার শাশুড়ি শান্তাই যেতে দেন নি মাসীমাকে। শেষপর্যন্ত মাসীমা জোর করেই একরকম চলে গেলেন। যে ক'দিন ছিলেন জমিয়ে রাখতেন গল্পেগুজবে। তাঁদের শৈশবের কৈশোরের গল্পে, বাড়ির পুজো পার্বণের গল্পে, বাগানের ফলের গাছের ও পুকুরের মাছের গল্পে। শাপলা পদ্মের শরতের গল্পে, বিলের ধারের কাশবনের আর পাকা ধানের ক্ষেতের আলের গল্পে। তাঁদের বিয়ের বৌভাতের, প্রথম মা হওয়ার, স্বামী স্ত্রীর মান অভিমানের গল্পে। তারপর একলা হয়ে যাওয়ার মনভারী করা বেদনার গল্পে কাটছিলো সময় দুই বন্ধু শান্তা ও গীতার। সেই গল্পে যোগ দিয়েছে কাজের ফাঁকে ফাঁকে অহনা, অফিস থেকে ফিরে রঞ্জুও। আর অহনার দশ বছরের দস্যি দুষ্টু ছেলে আদিতও শান্ত ছেলে হয়ে বসে শুনেছে মাসীঠাম্মির পোষা ময়নার গল্প, ছাগলছানা আর বাছুরের গল্প, মৌমাছির চাকের গল্প আর গ্রামের শেষ প্রান্তের শ্যাওড়াগাছের পেত্নীর গল্প। 




গীতামাসীমাকে নিয়ে অহনার শাশুড়ির কোনো জড়তা নেই। বলেন, "চল না, আজ একটু সরু চাকলি গড়ি।" কখনো, "তাড়াতাড়ি স্নান করে নে, আজ একটু মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে আসি।" আবার কখনো, "নে, আজ আমার এই শাড়ীটা পরে একটু নরম করে দে।" মাসীমাও হেসে বলেন, "দেখে নাও বৌমা, দেখো দেখো তোমার শাশুড়ি চিরটা কাল আমাকে দিয়েই কাপড়টা নরম করিয়ে তবে পরবে।খুব সুন্দর কিন্তু রে শাড়ীটা।" শেষ কথাটা অবশ্য অহনার শাশুড়ি শান্তার উদ্দেশ্যে। স্নান করে এসেই গীতামাসীমা ঢুকেছেন রান্নাঘরে, "যাও বৌমা খেয়ে নাও, সেই কখন থেকে একলাই সব করছো। যাও মা, খেয়ে একটু জিরিয়ে নাও।" অহনা যৌথ পরিবারে বড়ো হয়েছে। তাও শাশুড়ির বন্ধু এই গীতামাসীমার উষ্ণ আন্তরিকতায় চমৎকৃত। নিজের শাশুড়ির কাছে মুখ দিয়ে বেরিয়েই গেছে, "মা, এই মাসীমাকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি!" অহনার কথায় শান্তা গর্বিতভাবে সায় দিয়েছেন। ভাবখানা, "দেখো, আমার বন্ধুকে!"




গীতামাসীমার চলে যাবার দিন এলে অহনা দেখেছিলো শাশুড়ির চোখজোড়া লালচে ভিজে ভিজে। গীতামাসীমার চোখজোড়াও শুকনো নয়। অহনার মনে হলো, কোনোভাবে আরো কিছুদিন মাসীমাকে রাখা যেতো যদি। রঞ্জু তো বলেই ফেললো, "মাসীমা, তুমি আসাতে ক'দিন মায়ের সুগার প্রেশার সব নর্মাল। আমাদের এখানেই থেকে যাও না। আমি মনুকে বুঝিয়ে বলবো, ও কিছু ভাববে না এতে।" আদিত তো কেঁদেই ফেলেছে মাসীঠাম্মির চলে যাওয়ার কথায়। অহনা নতুন এক উষ্ণতার সম্মোহনী স্বাদ পেয়েছে। সম্পর্কের পরতে পরতে উষ্ণতার স্পর্শকাতরতা। আরো দুটোদিন মাসীমা রইলেন অনেক উপরোধে। তারপর অহনার চিবুকে হাত রেখেই কথাটা বললেন, "আর উপায় নেই রে মা, ছুটি শেষ এবার।" বিদায় নিলেন গীতামাসীমা।




মাসীঠাম্মি চলে যাচ্ছে, তাই আদিত আর নীচে নামে নি। রঞ্জু রিক্সায় করে তুলে দিয়ে এসেছে স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে। কিছুতেই মাসীমা মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে গেলেন না। আর অহনা চেয়েছিলো মাসীমার নাতনি মানে মনুর মেয়ের জন্য একটা ফ্রক আর খেলনা কিনে দিতে। মাসীমা হেসে বলেছেন, "আমি হাতে করে নিয়ে গেলে কি ভালো দেখায় বৌমা? তোমরা যখন শান্তাকে নিয়ে আসবে, তখন নিজে হাতে মনুর মেয়েকে উপহার দিও।" গীতামাসীমা চলে গেলেন।

গত দু'সপ্তাহের দুটো রবিবার অহনাদের বাড়ি সরগরম ছিলো আদরে আব্দারে। আদিতের রাজ্যে নেমে আসতো রূপকথার নীলকমল লালকমল আর পক্ষীরাজেরা। খেতে বসে গীতামাসীমা বলতেন, "কি ভালো যে লাগছে, কতদিন পর!" অহনার শাশুড়ি শান্তা বলতেন, "ঠিক বলেছিস রে।" তারপর দুনিয়ার গল্পের ঝুড়ি থেকে হাজারো গল্পের মিছিল। অহনা, শান্তা, গীতা... তিন নারী তখন কেবল। সেখানে সম্পর্কের বেড়াজাল অন্তর্হিত। উষ্ণতা আর উষ্ণতায় ভরা স্বর্ণালী মুহূর্তের সাক্ষী তারা সব। 



তারপর মোক্ষম দিনটা এলো। গীতামাসীমা তাঁর ব‍্যাগ গুছিয়ে তৈরী। অহনার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত রাজী হয়েছিলেন অহনার কিনে আনা নতুন শাড়িখানা পরে নিতে। তারপর যখন রওনা হলেন, আর একবারও পিছু ফিরে চেয়ে দেখতে পারলেন না বোধহয়। বিদায় নিলেন ঝাপসা চোখে। অহনার শাশুড়িমা অবশ্য চোখের জল আড়াল করেন নি। টুকিটাকি নিজের হাতে গুছিয়ে পোঁটলা বেঁধে দিয়ে দিয়েছেন। খুব সামান্যই হয়তো তা। তবু বন্ধুর ভালোবাসা জড়ানো যে তাতে। ব্যাগটা বুকের কাছে জড়িয়ে যেন এক পোঁটলা উষ্ণতা নিয়ে চলে গেলেন গীতামাসীমা। রঞ্জুও ফিরেছে মাসীমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে, সামান্য কিছু বাজারহাট করে। আদিতের আজ ক্ষিদে নেই। মাসীঠাম্মি ক'দিন গল্প বলতেন যে খাওয়ার সময় রোজ। আজ যেন খাঁ খাঁ অহনাদের ঘরবাড়ী। প্রিয় বিচ্ছেদ বেদনায় ওরা। অথচ অহনা আর আদিতের সাথে ক'দিনেরই বা পরিচয় মাসীমার! তবুও ওদের গলার কাছটায় দলা পাকানো, বুকের মধ্যেটায় একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগা, কী যেন নেই, কী যেন হারিয়েছে! অতিথি আর আতিথ্যের উষ্ণতা বাড়িতে বড্ড মিসিং। 




আজ অহনাদের দুপুরের খাওয়া মিটলো নির্বাক চলচ্চিত্রের মতো। কথা বলার, গল্প করার ঝুঁকি কেউ নিতেই চাইলো না। দিনটা একরকমে পার হলো। সন্ধ্যের চা নিয়ে যখন অহনা শাশুড়ির ঘরে এসে ঢুকলো, আদিত তখন কার্টুন দেখছে, আর রঞ্জু মায়ের ঘরে। নীচু গলায় দু'জনে কিছু আলোচনা করছিলো। শান্তা হাতের ইশারায় অহনাকে পাশে বসতে বললেন। আলোচনায় ছেদ পড়লো না। অবাক হয়ে হাঁ করে শুনছে তখন অহনাও। কিছুতেই হিসেবটা মেলাতে পারছে না। গীতামাসীমার মতো একজন মানুষের ভালো করে খাওয়াপরা জোটে না একমাত্র ছেলের সংসারে! মায়ের কথা না শুনে বৌয়ের কথা শিরোধার্য করে শুনে, মনু গীতামাসীমার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে। ততদিনে কোনো এক অনুমেয় অথচ অজ্ঞাত কারণে যৎসামান্য উইডো পেনশনটুকুও আর পান না। নিজের চোখে আর নিজেকে ছোট করতে চান নি বলে, গত বছর পাঁচেক ধরেই গীতামাসীমা এক বৃদ্ধাশ্রমের রান্নাবান্নার কাজে সাহায্য করেন। নিজের খাওয়াপরার খরচটুকু উঠে যায়। বন্ধুর বাড়িতে এসেছেন দেখা করতে একবার, পনেরোদিনের ছুটি নিয়ে, অবশ্য বদলি একজন পরিচিত লোককে কাজে দিয়ে। আর বেশীদিন ছুটি করলে কাজটা হয়তো থাকবে না। বেকায়দায় পড়বেন। বন্ধুর কাছে সবই বলে হালকা হয়েছেন খানিক।  




এসব পরিপ্রেক্ষিত না জেনেই রঞ্জু মাসীমাকে থাকার অনুরোধ করেছিলো। উত্তরে ক্রমাগত মাথা নেড়ে মাসীমা রঞ্জুর মাথায় হাত রেখে চূড়ান্ত অসম্মতি জানিয়েছেন। হয়তো কায়দা করে উদ্গত কান্নার স্বরলিপিকে গলায় আটকে রেখে নীলকন্ঠ হয়েছেন। মনের অব্যক্ত ব‍্যথার দলাটাকে হালকা করতে পারেন নি। আত্মজের কুকীর্তি মাতৃত্বের উষ্ণতায় জ্বালিয়ে ছাই করে ফেলে বেদনার আগুনকে চাপা দিয়েছেন। শান্তাকে আড়ালে বলেছেন, "একটু অন্ততঃ আপনার জায়গা থাক, রঞ্জুকে পরে বুঝিয়ে বলিস। এইটুকু উষ্ণতার আশ্রয় জমা থাক। রোজকার ব্যবহারে তাকে শীতল করে কী লাভ?" শান্তা জানেন সেই ছোট্টবেলা থেকেই, বড়ো আত্মাভিমানী গীতাটা।

"থাক ও নিজে নিজের মতো, বন্ধুত্বের একমুঠো উষ্ণতা ধরে রাখুক আজীবন। অপমানিত হবে বড়ো নয়তো"... শান্তার গাল বেয়ে জলস্রোত। আর অহনা ভারাক্রান্ত মনে ওর অনেক ভারী ভারী গয়নার মাঝে মাসীমার দেওয়া সরু চেনটা ছুঁয়ে আরেকবার পরখ করে নিলো সেই আশীর্বাদী একমুঠো উষ্ণতাকে।


Rate this content
Log in