Sanghamitra Roychowdhury

Classics


4  

Sanghamitra Roychowdhury

Classics


দায়িত্ব

দায়িত্ব

2 mins 753 2 mins 753

বাইশ বছরের আঁটোসাঁটো ভরা যৌবন, মাথায় কাঠকুটোর বোঝা আর পিঠে কাপড়ে বাঁধা সাত বছরের পোলিওয় অশক্ত মেয়ে ফুলমতিকে নিয়ে রামরতি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝোরার মত তরতরিয়ে নামছে। ঝপ করে সাঁঝ নামছে পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে, রামরতি আরও জোরে পা চালালো। অন্ধকার পুরোপুরি পাহাড়কে ঢেকে ফেলার আগেই ওকে মহল্লায় ঢুকে পড়তে হবে। এখনো অনেকগুলো চোরাবাটো পেরোনো বাকী। রামরতির একটু যেন হাঁপ ধরেছে। গলাটা একটু ভেজাতে পারলে হতো।

ওদের ঝুপড়ির সবাই যে যার কাজে চলে যায়, তাই রামরতি ভরসা করে মেয়েটাকে একলা ঘরে রেখে জ্বালানি কাঠ কুড়োতে আসতে পারে না। নিজের ওপরে ছাড়া আর কারুর ওপরই রামরতি ঠিক ভরসা করে না। সেই কারণে কষ্ট করেও রামরতি পঙ্গু মেয়েটাকে নিজের পিঠে কাপড় দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসে।

রামরতি নিজের মেয়ের দায় নিজের কাঁধেই বয়ে বেড়ায়, এই এতগুলো বছর ধরে। ঝোপের ধারে মংলু, ডমরু, লল্লন বসে গাঁজা টানছিলো, রামরতির উদ্দেশ্যে কিছু একটা কথা ছুঁড়লো। আর রামরতিও পাল্টা একটা অশ্রাব্য গালাগালি দিলো। চিতার মতো লাফিয়ে লল্লন রামরতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। বেগতিক দেখে মংলু আর ডমরু বস্তির দিকে ছুটলো। রামরতির কাঠের বোঝা ছিটকে পড়লো, টাল সামলাতে না পেরে নিজেও হুমড়ি খেয়ে পড়লো। পিঠের ওপর ফুলমতি ভয়ে গোঙাচ্ছে। রামরতি কোনোমতে কাপড়ের গিঁটটা খুলে ফুলমতিকে পিঠ থেকে নামিয়ে দিলো, রামরতির কপাল চুঁইয়ে রক্ত ঝরছে। লল্লন রামরতির চুলের মুঠি ধরে বেধড়ক মারছে আর গালাগালি দিচ্ছে। ফুলমতি দু'হাতে ভর দিয়ে ছেঁচড়ে ঝোপের আড়ালে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে।

লল্লন রামরতির শরীরটা ছেড়ে উঠে পড়ার আগেই মুখ থুবড়ে আবার রামরতির গায়ের ওপরেই পড়ে গেলো। রামরতি আধা অচৈতন্য অবস্থায় দেখলো ফুলমতি রক্তমাখা কুকড়িটা হাতে নিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। রামরতির মাথাটা এবার আস্তে আস্তে কাজ করছে।

কুকরিটা তো কাঠের বোঝাটায় গোঁজা ছিলো, রামরতি নিজেই রেখেছিলো ওখানে কুকড়িটা।

কোনওরকমে টাল খেয়ে উঠে দাঁড়ালো রামরতি, মেয়ের হাত থেকে কুকরিটা নিয়ে পাহাড়ের গায়ে দুরন্ত গতিতে তিরতির আওয়াজ করে নেমে আসা ঝোরায় ছুঁড়ে ফেললো। আট বছর আগে ঠিক এখানেই লল্লন ধর্ষণ করেছিলো চোদ্দো বছরের রামরতিকে, পনেরো বছর বয়সে রামরতি প্রসব করেছিলো, ফুলমতিকে। আজ সেই ধর্ষিতার পঙ্গু মেয়ে ফুলমতি মায়ের ধর্ষকের শাস্তি নিজ হাতে দিয়ে দিয়েছে। কুকরিটা দিয়ে লল্লনের ঘাড়ের পাশে কোপ বসিয়ে দিয়েছে। পা দুটো নড়বড়ে বলেই বোধহয় ফুলমতির হাত দুটোয় অমন বুনো জন্তুর মতো জোর। 


মেয়েকে আবার শক্ত করে পিঠে বেঁধে রামরতি অন্ধকারে মিশে গেলো, পাহাড়ি ঝোরাটা মানে ঝর্ণাটার গা বেয়ে।


মায়ের কি শুধু একার দায় সন্তানকে বয়ে নিয়ে চলার? পঙ্গু মেয়ে ফুলমতি জানে মায়ের জন্য তারও কিছু দায়িত্ব আছে, তাই মা'কে প্রাণে বাঁচানোর দায়িত্বটা ঠিক নিজের মতো করে কাঁধে তুলে নিয়েছে।

অতীত আর বর্তমানের দায়-দায়িত্ব অপরাধ শাস্তির সাক্ষী হয়ে রইলো শুধু দামাল পাহাড়ি ঝর্ণাটা, একলা।


(বিষয়: পাহাড়ি ঝরনা)


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Classics