দাদামশাই এর গোয়েন্দাগিরি ২—টর্চ দিয়ে স্মাগলার ধরা
দাদামশাই এর গোয়েন্দাগিরি ২—টর্চ দিয়ে স্মাগলার ধরা
দাদামশাই বেশ কিছু মাস শিলিগুড়িতে ছিলেন চাকরির জন্য। একবার খবর আসে, নেপাল থেকে চোরাই মাল বোঝাই করা একটি ট্রাক ও তাকে পথ দেখাবার জন্য একটি ছোটো গাড়ি যাচ্ছিলো ভুটানের উদ্দেশ্যে। বেআইনি ভাবে এই প্রকার মাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে —তাই আটকানো দরকার। সেটি ছিল এক শেষ ডিসেম্বরের সন্ধের ঘটনা। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে দাদামশাই ও ড্রাইভার সমেত সাতজন সহকর্মী অফিসার মিলে দুটি গাড়ি বোঝাই করে সেভকে তিস্তা নদীর উপর অবস্থিত করোনেশন সেতুতে পৌঁছে গেলেন। একটি গাড়ি সেতুর এপাশে আর অন্য একটি গাড়ি ওপাশে, ভুটান যাওয়ার রাস্তায় রাখা হল। এপাশে দাদামশাই, তাঁর এক সহকর্মী অফিসার ও একজন ড্রাইভার নিয়ে থেকে গেলেন, বাকি চারজন অন্য পাশে অবস্থান নিলেন। পরিকল্পনা ছিল যে, যেই মুহূর্তে ট্রাক সেতুর এপাশে আসবে, এদিকের দল টর্চ দিয়ে অন্য দিকের দল কে সতর্ক করবেন এবং ব্রিজ পেরোলে তাদের ধরা হবে। স্মাগলাররা যদি কোনো ভাবে টের পেয়ে যায় অফিসারদের উপস্থিতির বিষয়ে, তাহলে তারা হয়তো তিস্তা বাজারের রাস্তায় এগিয়ে যাবে —তাহলে অবশ্য তাদের ধরা খুব মুশকিল হতো। যিনি খবর পাঠিয়ে ছিলেন, তাঁর কথা মতো সাতটা নাগাদ ট্রাক ও গাড়ি আসার কথা ছিল। হাতে কিছু সময় থাকার ফলে ড্রাইভার গেলেন চা খেতে —তখন আন্দাজ সাড়ে ছটা। দোকান খানিকটা দূরে, পাহাড় বেয়ে খানিকটা উঠতে হবে। এমন সময়ে তাজ্জব ব্যাপার! স্মাগলারদের ট্রাক এসে পড়েছে আর তার ঠিক পেছনে সেই ছোটো গাড়ি যেটা সেই ট্রাক কে পথ দেখাবার কথা। ‘এর তো ট্রাকের আগে থাকার কথা, পেছনে গেল কেন?’, দাদামশাই ফিসফিস করে বলে উঠলেন। তাঁদের কাছে থাকা বর্ননা ও ট্রাকের নম্বর মিলে যাওয়ায় সে বিষয়ে দাদামশাইরা নিশ্চিত হলেন, কিন্তু তাঁরা পড়লেন একটু মুস্কিলে। একদিকে ড্রাইভার কাছে নেই, তার উপর সেতুর গাড়ি চলাচল হয় ‘one way’ মানে এক দিক দিয়ে গাড়ি চললে অন্য দিক বন্ধ থাকে। তখন শিলিগুড়ির দিকের রাস্তা খোলা ছিল ও ভুটানের দিকের রাস্তা বন্ধ ছিল। তখন অন্য দলকে সতর্ক করতে গেলে তারা টের পেয়ে যেতে পারে, কাজেই তাঁদের প্রাথমিক পরিকল্পনায় একটু অসুবিধা দেখা দেয়। তাঁরা চিন্তায় পড়লেন। কী করা যায়? গাড়ি যদি তিস্তা বাজারের রাস্তায় চলে যায় তাহলে তাড়াতাড়ি একটি সিদ্ধান্ত না নিলে অভিযান যে বৃথা হবে! তখন দাদামশাই তাঁর সহকর্মী কে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে তাঁদের ট্রাকে উঠতে হবে। চট করে ট্রাকের কেবিনের দুপাশে দুজন উঠে পড়লেন —চালকের পাশে উঠলেন দাদামশাই আর খালাসির পাশে উঠলেন তাঁর সহকর্মী। দাদামশাই দ্রুত ট্রাকের চাবি কিহোল থেকে খুলে নিলেন এবং তাঁর সহকর্মী দারুণ বুদ্ধি খাটিয়ে টর্চের পেছনের দিকটা খালাসির কোমরের কাছে ঠেকিয়ে বললেন, ‘খুব সাবধান! যা বলি তাই করো নাহলে গুলি করব।‘ ইতিমধ্যেই ভুটান যাওয়ার রাস্তা খুলে গেছে ও দাদামশাই কিহোলে চাবি দিয়ে ড্রাইভারকে কড়া ভাবে বললেন, ‘ওপারে চলো।‘ ড্রাইভার হতোবুদ্ধি হয়ে ট্রাক চালু করে ব্রিজ এর উপর দিয়ে অপর পাড়ের দিকে যেতে লাগলো। পেছনের ছোটো গাড়িতে পথ দেখাবার লোকজন অন্ধকারে কিছুই টের না পেয়ে ট্রাক অনুসরণ করে চলছিল। অন্য দিকে পাঁচজন অফিসারও এই ঘটনার বিন্দুমাত্র টের পায়নি, পার হওয়ার সাথে সাথে তাঁরা বলে উঠলেন, ‘আরে! এই তো ট্রাকটি, কিন্তু ‘ক’ আর ‘খ’ ভেতরে কী করছে?’ তখন ট্রাকের দুপাশ থেকে তাঁরা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘পেছনের গাড়িটা কে ধর!’ তাঁরা চারজন বিলম্ব না করে ছুটে গিয়ে পেছনের গাড়ি আটকালেন, দুষ্কর্মকারীদের ধরা হলো। ওদিকে দাদামশাইরা ট্রাক পাশে দাঁড় করিয়ে ওই দুজন কেউ আটকালেন। ট্রাকের মধ্যে বোঝাই করা চোরাই মাল উদ্ধার হল। সব মিলিয়ে পাঁচটি স্মাগলারদের হাতে হাতকড়া পড়ানো হয়, তারপর অন্য অফিসাররা যখন শুনলেন কিভাবে ‘টর্চ-বন্দুক’ ব্যবহার করে লোকগুলো কে শায়েস্তা করা হয়েছে, তখন হেসে হেসে পেট ব্যাথা হল তাঁদের। স্মাগলারগুলি কাঁদো-কাঁদো হয়ে যায়, পরে জেলে থাকা কালে নিশ্চয়ই অনেক সময় পেয়েছে তারা কান্নার জন্য। টর্চ দিয়েও যে ক্রিমিনাল ধরা সম্ভব, তা হয়তো আপনাদের মধ্যে অনেকেই কাল্পনিক বলে মনে করছেন তবে আমি নিশ্চয়তার সাথে বলছি যে ঘটনাটি একেবারেই সত্যি।
।।সমাপ্তি।।
