ডুয়ার্সের কথা
ডুয়ার্সের কথা
আমি যেই জায়গাটির কথা বলতে চলেছি, সেটি উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম রাজাভাতখাওয়া। রাজারহাট বা রাজা বাজারের কথা তো আপনারা জানবেন কিন্তু রাজাভাতখাওয়া কি রকম অদ্ভুত নাম! আসলে লোকে বলে কোচ বিহারের রাজা এখানে পিকনিক করতে আসতেন, ভাত খেতেন, শিকার করতেন, জঙ্গলে ভ্রমণ করতেন, কাজেই নামকরণ সার্থক।
আমি অবশ্য ইতিহাসে বেশি প্রবেশ না করে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা জানাবো। তিস্তা-তোরসা ট্রেনে করে আলিপুরদুয়ারে পৌঁছে একটি অটো ধরে বক্সার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সুন্দর গাছপালা ঘেরা রাস্তা দিয়ে পৌঁছলাম গ্রামটিতে। তারা বাবুর হোমস্টে, ‘Gracilipus Homestay’তে উঠলাম। ভদ্রলোক গোর্খা হলেও বেশ বাংলা বলেন, বেশ কিছু পুরুষ ধরে ডুয়ার্সে বাস তাঁদের। হোমস্টেটি দুটো তলা জুড়ে, নিচের তলা ইটের তৈরি হলেও ওপরের টি কাঠের। সামনেই রাস্তা আর তার পাশে পাশেই রেল লাইন, বারান্দায় বসে ট্রেন দেখা যায়। পেছনে গাছপালা ঘেরা একটি বাগান যেখানে কিছু মুরগি ও হাঁস দেখা যায়। মূল বাড়িটি ছাড়াও একটি একতলা বাড়ি আছে, যেখানে তারা বাবু ও তাঁর স্ত্রী থাকেন। বাগানে একটি খাবার ঘর ও লাগোয়া রান্নাঘর। গ্রাম থেকে কেউ কেউ ওখানে কাজ করতে আসেন, তাদের সাথে খেতে খেতে কিছু কথা হল। খাবার বেশ ভালো — ওই রকম সোনা মুগ এর ডাল ও মাংসের ঝোল আমি কোনোদিন খাইনি আর তার সঙ্গে কুমড়ো ফুলের বড়া—দিব্যি খাওয়া জমে উঠলো। অন্য অতিথিদের সাথে খাওয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে দেখা হলো —দুটি পরিবার তাদের দুটি দশ-বারো বছরের ছেলে।
ছোটবেলা থেকেই দুপুরে ঘুম হয়না তাই আধ ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে, গারো রঙের জামাকাপড় পড়ে, দুর্বীন, একটি ছোটো কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ও একটি লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘরের বাইরে বাকি সকলে, অর্থাৎ তারা বাবু, তাঁর স্ত্রী ও ওই দুটি পরিবার আড্ডা মারছে দেখলাম। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমি কোথায় চললাম, তাতে আমি উত্তর দিলাম, ‘জঙ্গলটি একটু ঘুরে দেখবার শখ হল।‘ তার বাবু ও তাঁর স্ত্রী আপত্তি করলেন না, বরং উৎসাহ দিলেন তবে বাকিদের রকম-সকম দেখে মনে হচ্ছিল তাঁরা ভাবছেন, ‘ছেলেটা কি রাঁচীর পাগলা-গারদ থেকে পালিয়ে এসেছে নাকি!’
আমার মতে শহরে হাঁটার চেয়ে জঙ্গলে হাঁটা কম বিপজ্জনক। জঙ্গলে গাড়ি-ঘোড়া-বাস-মানুষের সমারোহ তো এখানে নেই, এমনকি এই জঙ্গলে ইংরেজ আমলে শিকারিদের উপদ্রব হওয়ার ফলে বাঘ, চিতা বাঘ নেই বললেই চলে —যাও বা কিছু বাকি আছে, তারা আরো গভীরে থাকে। সাপ-তাপ আছে ঠিকই তবে তখন শীত কাল তাই সেই বিষয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া পশু পাখিদের তুলনায় মানুষ বেশি ভয়ানক কারণ আমরাই আসল জন্তু। সুতরাং জঙ্গলে ঘোরার ব্যাপারটি তে ভয়ের কিছু নেই। নিজেকে শংকর মনে করে প্রবেশ করলাম জঙ্গলে।
পায়ের তলায় শুকনো পাতার কচমচ শব্দ শুনতে শুনতে, চারিদিকে নয়নাভিরাম সবুজ গাছপালা দেখতে দেখতে ও জঙ্গলের নানান গন্ধ একসাথে শুকতে শুকতে আমার মন-প্রাণ ভোরে গেলো। আমার উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে উত্তর-পূর্ব দিক অনুসরণ করে যেই রাস্তা দিয়ে রাজাভাতখাওয়া এলাম, সেই রাস্তায় পৌঁছে একটি অটো ধরে সন্ধ্যার আগে ফেরার। সন্ধ্যার আগে ফেরার কারণ ভয় নয়, তারা বাবু মোমো খাওয়াবেন তাই।
যেতে যেতে চারিদিকে গাছপালা লক্ষ্য করছিলাম, অধিকাংশ আমার চেনা —সাল, শিমুল, অর্জুন, চিকরাশি, বাঁশ ইত্যাদি। হাজার হাজার পাখির ডাকে জঙ্গল ভোরে উঠেছিলো কিন্তু ওরা গাছপালার মধ্যে এমন ভাবে লুকিয়ে ছিল যে ওদের দেখতেই পেলাম না।
খানিক দূরে গাছের ফাঁকে একটি জলাশয় দেখলাম, সেখানে পাঁচটি হরিণ জল খেতে এসেছিল। পাছে কাছে গেলে ওরা পালায়, আমি দূর থেকেই দুর্বীন দিয়ে দেখতে থাকি। যেটি সবচেয়ে বড়, তার সিংগুলি বোধহয় আমার লাঠির দ্বিগুণ লম্বা, আর বেশ রাজকীয়। একটি বাচ্চা হরিণ লাফিয়ে লাফিয়ে খেলে বেড়াছিল। হঠাৎ দক্ষিণ দিক থেকে এক দল হাতি ডেকে উঠলো। চোখের পাতা ফেলার আগে হরিণগুলো হাওয়া। একটা দল-ছাড়া হাতি থাকলে ভয় লাগত বটে তবে এক দল নিয়ে বিশেষ মাথা ব্যাথা নেই। আমি একটি সাল গাছের ডাল বেয়ে উঠলাম আরেকটু ভালো করে ওদের আচার-ব্যবহার লক্ষ্য করব বলে।
প্রথমেই যেই হাতিটি চোখে পড়লো, সেটি যে দলের সর্বেসর্বা তাতে সন্দেহ নেই, যেমন তার চেহারা, তেমনই মানানসই দুটি ধবধবে সাদা টাস্ক। তার পেছনে এলো মোট চৌদ্দটি হাতি, যার মধ্যে তিনটি বাচ্চা। মায়ের আঁচলের আড়ালে থাকা শিশুর মতো এই বাচ্চাগুলি তাদের মায়ের সাথে সাথে বেশ হাস্যকর ভাবে সুঁর দুলিয়ে দুলিয়ে, হাঁটছিল। জলাশয় তে পৌঁছে তারা বেশ কিছুক্ষণ জল খেলো, গাছের পাতা খেলো আর খেলা করলো —একটা বাচ্চা তো উল্টে গিয়ে সোজা হতে পারছিল না বলে কান্নার ভাব করছিল। পনেরো মিনিট মতো থেকে তারা যেদিক থেকে এলো, সেদিকেই আবার ফিরে গেলো আর আমিও অনেকক্ষণ শাখামৃগের মতো গাছে বসে থাকার পর, নেমে আবার পথ হাঁটা শুরু করলাম।
খানিক হেঁটে যেই জন্তুকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, অর্থাৎ মানুষের সাথে দেখা হলো। প্রথমে চোরা শিকারী ভেবে লাঠি দিয়ে আঘাত করার কথা ভাবলেও, সাবধানে কাছে গিয়ে দেখি লোকটি নিতান্তই ভালো মানুষ মতো, হাতে আতস কাঁচ ও একটি ডায়েরি নিয়ে গাছপালা দেখছিলেন —দেখে বোঝা গেল গবেষণা করছেন। যতক্ষণ না ওনার পাঁচ ফুট দূরে এসে দাঁড়াই, ততক্ষণ উনি আমার উপস্থিতি জানতেই পারলেন না। যখন আমায় দেখলেন তখন বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। আমিই প্রথম প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি বুঝি রিসার্চ করছেন স্যার?’ তাতে খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে উনি বললেন, ‘হ্যাঁ আমি বোটানি নিয়ে রিসার্চ করি, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। আমার নাম মনোহর চট্টোপাধ্যায়।‘ আমিও আমার পরিচয় দিলাম এবং আমার জঙ্গলে ঘোরার উদ্দেশ্য জানালাম। কোনো কারণ ছাড়া এরকম ঘুরে বেড়াচ্ছি তাই ভাবছিলেন বোধহয়, তাই আমি বললাম, ‘আমি লেখালিখি করি।‘
জঙ্গলে দেখা হরিণ ও হাতির কথা বলতে উনি ‘হু হু, ওরা কিছু করেনা।‘ বললেন কিন্তু মনে হলো আমার উপস্থিতি ওনার কাজে অসুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই ওনাকে বিদায় জানিয়ে আবার হাঁটতে থাকলাম। তখন পৌনে পাঁচটা, আর আধ ঘন্টা মধ্যে সূর্য ডুবে যাবে তাই একটু ব্যস্ত ভাবেই এগিয়ে গেলাম রাস্তার দিকে।
রাস্তার ধারে পৌঁছে, একটা অটো পেলাম, দুজন গ্রামের ভদ্রমহিলা যাচ্ছিলেন, তাঁরা কোনো আপত্তি না করায় আমি উঠে পড়লাম। তাঁদের বললাম যে আমি লেখক, জঙ্গল ঘুরতে গেছিলাম, বেশ ভালো গল্প জমে উঠলো। হোমস্টের বাইরে থেমে তাঁদের বিদায় জানিয়ে আমি ঢুকলাম ভেতরে, তখন অধিকারের চাদর যেনো আলতো করে সূর্যকে ঢেকে নিচ্ছে। খাবার ঘর থেকে তখনই তারা বাবু দেখে উঠলেন, মোমো খাওয়ার জন্য। গিয়ে দেখি বাকি সবাইও আছেন এবং একটি ছেলে তার মাকে বলে উঠলো, ‘দাদাকে তো বাঘে খায়নি!’ আমি হাঁ হাঁ করে হেসে উঠলাম এবং ভদ্রমহিলা খুব লজ্জিত হলেন। অতি সুস্বাদু মোমো খেয়ে তারা বাবু ও তাঁর স্ত্রীকে প্রশংসা জানিয়ে ঘোরে গেলাম। দিনটায় অনেক ধকল গেছে তাও একটু কয়েকটা ফোন করে, আমার অভিজ্ঞতা নোট করে নিলাম।
ট্রেনের আওয়াজ শুনে বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটি মাল গাড়ি গেল, তার সব মিলিয়ে ৩৬ টি কামরা। দেখতে দেখতে মনে হলো দূরে যেন হাতি গুলি দেখে উঠল। সেদিনের অভিজ্ঞতা সত্যি একেবারে অন্যরকম ছিল এবং আমি নিশ্চিত যে সারা জীবন আমি তার কথা মনে রাখব।
।।সমাপ্তি।।
