দাদামশাই এর গোয়েন্দাগিরি ১—আলু ভাজা
দাদামশাই এর গোয়েন্দাগিরি ১—আলু ভাজা
আপনারা হয়তো শিরোনামটি দেখে ভাবছেন যে আলু ভাজা দিয়ে কিরকম গোয়েন্দা গল্প হতে পারে। আসলে এটি আমার দাদামশাই এর চাকরি জীবনের একটি হাস্যকর অভিজ্ঞতা। দাদামশাই সরকারি চাকরি করতেন, এক প্রকার গোয়েন্দার চাকরি, ট্রান্সফার হলেন কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় জায়গা — শান্তিনিকেতনে। তখন মা ছোটো, তাই দিদিমা তাকে নিয়ে কলকাতার বাড়িতেই রয়ে গেলেন।
দাদামশাই ও তাঁর দুইজন সহকর্মী কে কোয়ার্টার দেওয়া হল, সকালের খাবার ব্যবস্থা অফিসের খাবার জায়গায় তবে রাতেরটি নিজেদের বানানো দরকার। দাদামশাই কোনোদিন রান্না করেননি, তাও জোর গলায় বলেছিলেন যে তিনি পারবেন। দিদিমা একটি খাতায় ওনার জন্য বেশ কিছু রেসিপি লিখে দিয়েছিলেন — যেমন ভাত, ডাল, খিচুড়ি, চচ্চরি আর আলু ভাজা! প্রথম দিন দুপুরের আহারাদি সারা হল অফিসে, রাতের বেলায় চাল-ডাল-আলু কিনে আনা হল, বাকি দুজন অফিসার কে আমন্ত্রণ জানানো হল আর দাদামশাই রান্না শুরু করলেন। চাল ও ডাল খানিকক্ষণ ভিজিয়ে রেখে সিদ্ধ করা হল — বেশ ভালো ভাবেই হয়ে গেল। সব শেষে, খাওয়ার ঠিক আগে আলু ভাজার প্রস্তুতি নেওয়া হল। ফরাসিমার্কা আলু ভাজা বানাবেন বলে সেই রকম ভাবে কাটলেন, জলে ভালো করে ধোয়া হলো। খাতায় লেখা ছিল, 'ছাঁকা তেলে আঁচ কম রেখে ভাজবে।' একটি করাই নিয়ে দাদামশাই খুব মনোযোগ-সহকারে সাদা তেল ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে-ছেঁকে ঢাললেন। তারপর আগুন জ্বালিয়ে তাতে আলুর টুকরো গুলো একসাথে ঢেলে দিলেন। খানিকক্ষণ পরে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন মচমচে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হওয়ার বদলে আলুর টুকরো সব ড্যালা পাকিয়ে গিয়ে যেন আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও তেমনই রয়ে গেল। অন্য দুজনকে ডেকে দেখালেন, তারাও এই রহস্যের কোনও কুল কিনারা করতে অক্ষম হলেন। দশ টা বেজে গেছিল, তাঁদের খিদে পেয়েছে, তাই শুধু ডাল আর ভাত খেয়েই খাওয়া-দাওয়া করতে হল।
তখন তো আর আজকের মতো সবসময়ে ফোন থাকতো না, অফিসে গিয়ে শেখান থেকে দিদিমাকে ফোন করে ঘটনা বললেন। দিদিমা শুনে তো হাসতে হাসতে বোধহয় উল্টে যান।
'ব্যাপার কী?,' দাদা মশাই জিজ্ঞেস করলেন, 'এত হাসছ কেন? '
'ও গো! ছাঁকা তেল মানে....হা হা হা....ছাঁকনি দিয়ে....হা হা হা....ছেঁকে দিয়ে....হা হা হা হা হা....নয়! তেলটিকে করাইতে আগে থেকে ঢেলে, গরম করে নিতে হবে, তারপর যখন হালকা ধোয়া বেরোতে থাকলে তাতে আলু দেবে—একেই বলে ছাঁকা তেলে ভাজা।'
ব্যাপারটি বুঝে যাওয়ার পর অবশ্য এই ধরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং দাদামশাই ভালো করেই রান্না শিখে নিয়েছিলেন।
'তাই তো বলি, দাদা, ' গল্প শেষ করে আমায় বললেন, 'সব কাজ শিখে নেওয়া খুব দরকার — অন্যের ওপর ডিপেন্ডেন্সি থাকবে না।'
আমি অবশ্য রান্নাটি দিদিমার থেকে শিখে নিয়েছি। ছেলে হয়ে রান্না করতে পারব না কে বলেছে!
