Debasmita Ray Das

Romance


3  

Debasmita Ray Das

Romance


বয়ে চলে তিয়াস

বয়ে চলে তিয়াস

3 mins 9.3K 3 mins 9.3K

 গাড়ির উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো তিয়াস। রঙটা কি একটু পালটেছে? একটু কি কোনো আশার রঙ লেগেছে তাতে?? নাকি তার জীবনের মতোনই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে? না: এর উত্তর বোধহয় কারুর জানা নেই। এই ঝাঁ চকচকে গাড়ির মধ্যে প্রায় সোনার খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকা তিয়াস চ্যাটার্জীরও না! মনটা এইসময় প্রায়ই খুব খারাপ হয়ে যায় তার। গোধূলির আলো কমে আসা দেখতে দেখতে তারও মনে হয় তার জীবনের আলো বুঝি একসময় অমন করেই নিভে যাবে!

কয়েকদিন আগের কথাগুলো যত তিয়াসের মনে ঘুরপাক খায়, ততোই তার গলার কাছে কষ্টগুলো যেন দলা পাকিয়ে ওঠে। কতোদিন পর মানুষটা তার সাথে দেখা করতে এসেছিল! আর কি অবহেলায় না সে তাকে, তার জীবনের প্রথম ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিল। অনিন্দ্য, অনিন্দ্য ব্যানার্জী, তিয়াস যেখানে গান শিখত, সেই দিদির ছেলে। সুন্দর বন্ধুত্ব যে কবে গভীর ভালবাসায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল, তা বোধহয় কেউই টের পায়নি। পেল টের, যখন দিদিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। পালটি ঘর, বিয়ে দিতে কোনো অসুবিধা হবেনা. এই সব বলে খুব মজা করতেন তিনি। কোথা দিয়ে কি, কোথা থেকে একটা বড়ো ঝড় এসে সব উড়িয়ে নিয়ে গেল!

   তিয়াস থাকত এক দূরসম্পর্কের মামাবাড়িতে, বাবা মা কেউই ছিলনা। ফলে যা হবার তাই হল, এমনিই বাতিলের মতোন সে ছিল তাদের সংসারে। মামার বাড়িতে এক মধ্যবয়স্ক পাওনাদার আসত, মামার ছিল অনেক দেনা। তো সেই দেনা মকুবের সরঞ্জাম হল তিয়াস। বুঝতে পারা মাত্রই বাইশ বছর বয়সেই ঘর ছাড়ল তিয়াস। দিদিকেও কিছু বলবার সুযোগই পায়নি বেচারি। থাকত মফস্বলে। কোলকাতায় এক চেনা দিদি ছিল, বলেছিল বিপদে পড়লেই তার কাছে চলে আসতে। শুধু এটা বলে দেয়নি যে সেই ঠিকানার মূল্যও তাকে শুধতে হবে নিক্তির ওজনে! সেটা যখন বুঝল, অনেক দেরী হয়ে গেছে। ততোদিনে এইরকম বিকাশ রায়ের মতোন লোকেদের সোনার খাঁচায় সে বন্দী হয়ে গেছে.এমন ধরণের লোকেরা যখন তাকে স্পর্শ করে. তারা সারা শরীর যেন শিউরে ওঠে.মনের সব দরজা এমনিই বন্ধ হয়ে যায়.শুধু হৃদযন্ত্রটা যেন কি যাদুতে একটু একটু করে চলতে থাকে! তিয়াস মাঝে মাঝে ভাবে. ঈশ্ সেটাও যদি....

 তার চিন্তায় ছেদ ফেলে দিয়ে বিশাল গার্মেন্টস ব্যবসার মালিক বিকাশ রায় উঠে এলেন গাড়িতে। এসেই তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন....

"সরি ডার্লিং একটু দেরী হয়ে গেল। তুমি রাগ করোনি তো.?

তিয়াস খুব ভাল জানে এগুলো অভিনয়, তার শরীরটাকে ভোগ করার জন্য খুব মিষ্টি অভিনয়। যদিও সে এসবে এখন খুবই অভ্যস্ত, তাও তার কেন জানি আজ চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা হল.

"হ্যাঁ, একটু না, অনেকটা দেরী হয়ে গেছে আমার.হ্যাঁ হ্যাঁ আমার, তুমি শুনতে পাচ্ছ অনিন্দ্য.অনেক দেরী হয়ে গেছে. আর কি আমাদের পথ মিলবে?

ভিতরটা যেন গুমরে গুমরে আজ কাঁদতে চায় তিয়াসের। গত পরশু তিয়াস এখন যেখানে থাকে, বালীগঞ্জের সেই ফ্ল্যাটে এসেছিল অনিন্দ্য.. তার অনিন্দ্য, তার সাথে দেখা করতে.তার খবর নিতে। না কোনো অভিযোগ না, অভিমান না, তার বাকি পাড়ার মতোন কোনো কটূক্তিও নয়। শুধু জানতে চাইছিল.

"তুমি কেমন আছো তিয়াস, ভাল আছো তো?? যদি না থাকো তো মনে রেখো আমার কাঁধ আজো তোমার মাথা রাখার জন্যই অপেক্ষা করছে.

দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তিয়াসের গাল বেয়ে। আর সে কিনা এমন মানুষকেই ফিরিয়ে দিল.অনেক দেরী হয়ে গেছে বলে। আসলে সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছিলনা কি করবে। সমাজের পরোয়া এখন আর সে করেনা। কিন্তু তার ভালোবাসার মানুষটাই যদি কষ্ট পায় তবে.

যদিও এতো অন্ধকারের মধ্যেও যে তার জন্য কিছু আলো অপেক্ষা করে আছে তা যদি জানতো তিয়াস, তার মনটা তাহলে হয়তো একটু ভাল হত। শরীর খারাপ লাগছে বলে আজ একটু তাড়াতাড়িই নিজের ফ্ল্যাটের সামনে নেমে পড়ল তিয়াস। গাড়ি থেকে নেমেই হতবাক্. সামনে দাঁড়িয়ে তার মনের মানুষ। অন্ধকার রাস্তায় সে যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানেই রাস্তার আলো এসে পড়েছে। যেন অন্ধকার মরুভূমিতে তার একমাত্র ওয়েসিস! তার দিকে এক সুন্দর দিনের সোনালী স্বপ্নের মতোন হাত বাড়িয়ে রয়েছে. আহা কি সুন্দর সে চাউনি.কোনো পুরুষের চাউনি যে এতো সুন্দর, এতো স্নিগ্ধ, এতো ভালোবাসায় ভরা হতে পারে.... তা বোধহয় এতোদিনে প্রায় ভুলতে চলেছিল তিয়াস। আজ যেন আর এক নতুন জন্ম হল তার। অনিন্দ্যর বাহুবন্ধনে ধরা দিয়ে শুরু হল তার এবং তার মতোন এমন অনেক তিয়াসের জীবনের, আর একবার সত্যি করে বেঁচে ওঠার এক নতুন অধ্যায়।।

#love


Rate this content
Log in

More bengali story from Debasmita Ray Das

Similar bengali story from Romance