ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-30-দেশের স্মৃতি
ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-30-দেশের স্মৃতি
ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের ওপর পা রাখতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকারে ভরে উঠল। এই তো সেই ময়মনসিংহ রেলস্টেশন। আমার আজও মনে আছে, এই স্টেশন থেকেই তো আজ থেকে কয়েক বছর আগে আমরা যখন চলে যাচ্ছিলাম এই দেশ ছেড়ে! আমার পিতৃদেবের বন্ধু তথা সহকর্মী মকবুল হোসেন পুলিশের সহায়তায় এই প্ল্যাটফর্মেই আটক করে দিয়েছিলেন আমাদেরকে। সেদিন আমরা যখন এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম, তারও অনেক আগেই বড়দি, বড়দা, ছোড়দা তাদেরকে পিতৃদেব পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভারতে। শুধু বাকি রয়ে গেছিললাম পিতৃদেব, মা, আমি আর ছোড়দি।
সেদিন রওনা হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তেই এই ময়মনসিংহ রেলস্টেশনেই পিতৃদেবকে, হিসেব বহির্ভূত অর্থ আর স্বর্ণ অলংকার নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অভিযোগে পূর্বপাকিস্তান পুলিশ গ্রেফতার করতে চলে এসেছিল।
আইনজীবী পিতৃদেব নানা কথার মারপ্যাঁচে অভিযোগ খন্ডন করতে চাইলেও সব আটঘাট বেঁধেই এসেছিল পুলিশ। তাদের হাতে ছিল পিতৃদেবের নামে গ্রেফতারির পরোয়ানা।
ওদিকে তখন স্টেশনে দাঁড়ানো বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস। প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো ছিটানো আমাদের লাগেজ ইত্যাদি। তখনও কামরায় ওঠানো হয়নি লাগেজগুলোকে। সময় আর মাত্র পাঁচ মিনিট। প্রথম ঘন্টা বাজানোও হয়ে গেছে। ট্রেন প্রায় ছাড়বে ছাড়বে। ড্রাইভার একটি দুটি ভেঁপুও বাজাচ্ছেন। আর ঠিক ওই সময়েই পিতৃদেবের মামাতো ভাই কেশব এসে হাজির।
কেশবকে দেখা মাত্রই পিতৃদেব যেন ভগবানের দেখা পেলেন।
কেশবকাকা কোনও ভূমিকার তোয়াক্কা না করেই জটলার মধ্যে দাঁড়ানো পুলিশের বড় কর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার মোমিন সাহেব, দাদা এখন যাইব আর আপনি অহন আইছেন ধরতে?
‘কি করুম কন, এসপি সাহেবের অর্ডার।’
‘আরে রাখেন তো এসপি সাহেবের অর্ডার। এসপি সাহেব মানে মজিদুল খাঁনের কথা কইতাছেন ত? মজিদুলরে আমি ভাল চিনি। আমরার হিন্দুমানুষ পাইলেই ত ছিইড়া খাইতে চায়!’
‘আরে না না, মজিদুল সাহেবের কুনও দুষ নাই। সতীশবাবুর বন্ধু মকবুল হুসেনই ত থানায় ডায়ারি করছেন। এসপি সাহেবের কাছে তদ্বির করছেন গিয়া। তার লাইগ্যাই ত আইছি সতীশবাবুরে গ্রেফতার করতে।’
মকবুল হুসেনের নাম শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন পিতৃদেব। পিতৃদেবের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে সহকর্মী বন্ধু মকবুলের স্বার্থের কী এমন হানি ঘটেছে যে পুলিশে গিয়ে তিনি মিথ্যে নালিশ জানিয়েছেন? তাহলে কি কাচারি রোডের আমাদের বাড়িটার জন্যে লালায়িত ছিলেন মকবুল হুসেনও? যদি সত্যিই তাই, সেটা তিনি মুখ ফুটে পিতৃদেবকে বললেই পারতেন।
পিতৃদেব তো মকবুল সাহেবকে জানিয়েওছিলেন ব্যাপারটা। আদালত ছুটির পরে মকবুল সাহেবকে এক সন্ধ্যেয় বাড়িতে এনে আপ্যায়ন করে পিতৃদেব বলেছিলেন, জানোই ত মকবুল পাকিস্তানে আমগো আর থাকা হইব না! তারমধ্যে মুজিবর রহমানের আওয়ামি লিগের যেরকম আন্দোলন শুরু হইছে! আওয়ামি লিগের লগে যোগাযোগের অভিযোগে মাঝেমধ্যেই আমারে প্রাণে মাইরা ফেলনের হুমকি চিঠি পাই। তাই ভাবছি যামুইগা এই দেশ ছাইড়া। আর আমারার সম্পত্তি মানে ত শত্ত্রুসম্পত্তি। শত্রুসম্পত্তি ত আইনত বেচতেও পারুম না। যদি কেউ কিছু দেয়, এমনিই সাদা কাগজে দানকবলা কইরাই দিয়া যামু গা। কি কও?
মকবুল সাহেব তো তখন হাঁ বা না কিছুই বলেননি। শুধু গম্ভীর মুখে পিতৃদেবের কথাগুলো শুনে হুহাঁ করে মাথা নাড়িয়ে গেছেন। তাহলে পিতৃদেব কীভাবে বুঝবেন বন্ধুর মনের ইচ্ছেটা কী? শেষে সেই কয়েক লক্ষ টাকার সম্পত্তি মাত্র দশ হাজার টাকায় প্রতিবেশী রশিদ সাহেবের হাতে দখল দিয়ে পিতৃদেব আমাদেরকে নিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে ছিলেন।
সেই সময়ে কিজানি মকবুল সাহেব হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, পিতৃদেব একেবারে বিনেপয়সায় তাকেই বাড়ির দানকবলা করে দিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। তাছাড়া আওয়ামি লিগের সঙ্গে পিতৃদেবের সম্পর্কও হয়তো তিনি মেনে নিতে পারেননি। সেটাও হয়তো বৈরিতার কারণ!
পিতৃদেবের সঙ্গে আমাদের সেদিনের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাটা হয়তো চিরতরের জন্যে জেলখানার কালকুঠুরিতে গিয়ে অপমৃত্য হয়ে যেত। পরিণতিতে হয়তো আমাদের ভুগতে হতো অবর্ণনীয় নিপীড়ন, লাঞ্ছনা আর মানসিক যন্ত্রণা। এমনকি হয়তো পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জেলকুঠুরিতেই আমাদেরকে হত্যা করে দেওয়া হতো। যদি না পিতৃদেবের মামাতুতো ভাই আমাদের কেশবকাকা সেদিন শেষ মুহূর্তে ময়েমনসিংহ রেলস্টেশনে হাজির হয়ে তার কেরামতি না দেখাতে পারতেন।
কেশবকাকা ছিলেন পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁনের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন এক কর্মচারী। ময়মনসিংহ শহরে মোনায়েম খাঁনের যত ব্যবসা বাণিজ্য তার সমস্ত দেখাশোনার ভার ছিল কেশবকাকার ওপরে। গভর্নর সাহেবের তিনি অত্যন্ত প্রিয়পাত্র বলে প্রশাসনিক মহলেও বেশ নামডাক ছিল কেশবকাকার।
সেদিন কেশবকাকার মধ্যস্থতায় মিটে গেছিল সব কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেখানে পুলিশের দাবি ছিল বহু হাজার টাকা, সেখানে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় রফা হয়ে গেছিল।
আমার আজও মনে আছে রফা হয়ে যাওয়ার পর কেশবকাকা পিতৃদেবকে বলেছিলেন, যাও তাড়াতাড়ি গিয়া গাড়িতে উঠো। টাকার জন্যে চিন্তা কইর না, আমি পুলিশরে এখন দিয়া দিতাছি, তুমি কুচবিহারে তপনের কাছে টাকাটা পাঠাইয়া দিও।
তপন কেশবকাকার একমাত্র ছেলে যে কোচবিহারে থাকে।
চোখের নিমিষে মালপত্র সব ট্রেনের কামরায় উঠে আসছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্টেশনের কুলিরাও ওনার অনুগত। এমনকি স্টেশনমাস্টার পর্যন্ত কেশব কাকার অনুরোধে প্ল্যাটফর্মে আরও কিছুক্ষণ ট্রেনটিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন।
ইস্ত্রি করা ধব ধবে সাদা ধুতির ওপরে খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা, সাড়েপাঁচফুটের ওপরে লম্বা সুপুরুষ শ্যামলা আমাদের কেশবকাকা ওদিকটায় দাঁড়িয়ে পুলিশের সঙ্গে রফা করছিলেন। আর সাহেবি পোশাক পরা আমাদের পিতৃদেব এদিকটায় দাঁড়িয়ে নাগাড়ে বকে যাচ্ছিলেন মাকে, ঘটিবাটি যা আছে সবকিছু লইয়া ত রওনা হইছ, সেলাই মেশিনটা পর্যন্ত ছাড়ো নাই। শত্রুগুলার ত চোখ পড়বই।
মা কোনও উত্তর দিচ্ছিলেন না। মাথায় তার গাঁয়ের বধুর মতো ঘোমটা। কপালে রক্ত বর্ণের বড় সিঁদুরের টিপ। চোখে রোলগোল্ড ফ্রেমের চশমা। চশমা তো নয় যেন সোনার অলংকার। সামনের দাত সামান্য উঁচু বলে নিচের ঠোঁট সামান্য স্ফীত। আর সেই ঠোঁট পান খেলেই লাল টকটকে হয়ে ওঠে। পান খাওয়া লাল টকটকে ঠোঁটে তিনি পিতৃদেবকে কটাক্ষ হেনে বললেন, আইজ যদি কেশবঠাকুরপো না আইত তুমার বাহাদুরি যে কত দেখতাম!
পিতৃদেবও কম যান না, বলে উঠলেন, হঁ বরাবরই তো কেশব তুমার প্রাণের ঠাকুরপো!
এই কয়েক বছরেই যেন কত পালটে গেল এই দেশের চেহারা। সেই পূর্বপাকিস্তানের অস্তিত্ব আজ আর নেই। এখন লোকে চেনে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামের একটা দেশকে।
ধীর পায়ে স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম । যাব কোথায় এবার আমি? কাদের আশ্রয়ে গিয়ে উঠব? কাদের বাড়িতে যাব? কে দেবে আমাকে জায়গা? কে দেবে আমাকে এই বাংলাদেশে আশ্রয়? কেশবকাকাও তো এখন আর এ দেশে থাকেন না। মুক্তিযুদ্ধের পরে পরেই তিনি চলে গেছেন কোচবিহারে। আত্মীয়স্বজন বলতে এদেশে যারা এখনও আছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগও অনেকদিন থেকেই বিচ্ছিন্ন। আমাদের জ্ঞাতি সম্পর্কের দুই দাদা থাকেন জুবলিঘাটে এটুকু আমার মনে আছে। সম্পর্কে তারা জেঠতুতো দাদা হলেও আমাদের পিতৃদেবেরই সমবয়সি। তাদের সঙ্গে এমন কোনও গভীর সম্পর্কও আমার নেই যে, অনায়াসে তাদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি।
তবে মিনুভাইদের বাড়িতে গিয়ে ওঠা যেতে পারে। বড়দার বন্ধু মিনুভাই, ভালো নাম শাহ্ মহম্মদ ফরহাদ। বড়দার সঙ্গে মিনুভাইয়ের চিঠি আদান প্রদানের সূত্রে যতদূর আমি জানি, ওনারা এখন আনন্দ মোহন মহাবিদ্যালয়ের পাশে কলেজ রোডে থাকেন। পূর্বপাকিস্তানে থাকার সময়ে ওদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়ের মতো সম্পর্ক ছিল। মিনুভাইয়ের ওপরে আরও দুই ভাই আছেন - ফরিদ আর ফারুক। ফারুক ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তদুপরি স্বনামধন্য একজন কৃষিবিজ্ঞানীও। দ্বিতীয় ফরিদ ছিলেন অর্থনীতির ছাত্র। পাকিস্তান সরকারের আমলেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের পরীক্ষা দিয়ে আমলা হয়ে গেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরেও তিনি এখন সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা।
আনন্দমোহন কলেজ রোডের সবাই ওদের চেনে। বাড়ি খুঁজে বের করতে কোনও অসুবিধেই হল না আমার। ওদের একমাত্র বোন সব ভাইদের ছোট লুলু, আমার ছোড়দির বান্ধবী। আমাকে সে বাড়ির সদর দরজায় দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠল, ও আম্মা দেখো আইসা কে আইছে?
আম্মা দৌড়ে এলেন। আমাকে দেখেই অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন, আরে খোকন তুই? তুই কি এখন ভারত থিকা আইছস?
‘হাঁ মাসিমা। আপনাদের এখানে কয়দিন থাকব বলে এসেছি।’ হেসে বললাম আমি।
‘ভারতে গিয়া তো তোর ভাষাও দেখতাছি বদলাইয়া গেছে! ভালো আছস বাপ? তোর বাবা-মা ওনারা কেমন আছেন? আয় আয় ঘরে আয়। কত ছোট দেখছি তরে। ভারতে গিয়া আরও ফরসা সুন্দর হইয়া গেছস দেখতাছি!’
অনায়াসেই আশ্রয় জুটে গেল আমার মিনুভাইদের বাড়িতে। কাটছিলও দিনগুলো বড় আনন্দে। লুলু আমাকে নিয়ে এদিক ওদিক বেড়াতে যায়। আমি যেন তার ছোটভাইয়ের মতো। অত পরদানশিন তারা নয়। অপরূপা সুন্দরী লুলু। তার সঙ্গে অচেনা আমাকে দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকায়।
একদিন সে আমাকে নিয়ে গেল কল্যাণীদের বাড়িতে। পণ্ডিত পাড়ায় কল্যাণীদের বাড়ি। কল্যাণীও ছোড়দির বান্ধবী। কল্যাণী বার বার জিজ্ঞেস করছিল, শিপ্রা কি ভালো গান গাইত! কি দারুণ গলা আছিল! এখনও কি সেরকমই গান গায় সে? ইন্ডিয়াতে কলকাতায় তো কত সুযোগ গান গাওয়ার!
আমি বুঝলাম না ইন্ডিয়া বলতে কল্যাণী কী বোঝাতে চাইছে? বাঙালিদের কাছে ইন্ডিয়া মানেই কি শুধু কলকাতা? কলকাতার বাইরে আর কিছু না?
আমি বললাম, না না কোথায় সেই সুযোগ? কলকাতা হলে এক কথা। আমরা তো থাকি কলকাতা থেকে অনেক অনেক দূরে। ভারতের উত্তরপূর্বে অসম রাজ্যের এক নগাঁও শহরে। ভীষণ বেকওয়ার্ড জায়গা। প্রতিভা থাকলেও কোনও লাভ নেই সেখানে।
‘এ হে এত সুন্দর গলা, কোনও কাজেই লাগাইতে পারল না?’ আফশোস করে উঠল কল্যাণী।
অনেকক্ষণ ছিলাম ওদের বাড়িতে। কল্যাণীদির মা মুড়িমাখা দিয়ে গেছিলেন। বহুদিন বাদে যেন মায়ের হাতে মাখা মুড়ির মতো খেলাম।
next episode- চিঠি
