ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-24-অগ্ন্যুৎপাত
ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-24-অগ্ন্যুৎপাত
কিছুটা দূর থেকে হলেও স্পষ্ট বুঝতে পাচ্ছিলাম, জমায়েতকে ঘিরে একটা চাপা উত্তেজনার ঘুরপাক খাচ্ছে। প্ররোচিত ঝাঁজালো কিছু মন্তব্যও মাঝে মাঝে ছিটকে বাতাসে ভর করে ভেসে আসছে। কোনও একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ আর উন্মত্ত তারা। ক্রুদ্ধ বেপরোয়া মুখগুলো দেখেই বলে দেওয়া যায় যে, কোনও একটা অপ্রিয় অবাঞ্ছিত ঘটনা কোথাও হয়তো ঘটে গেছে। আর সেই ঘটনা যেকোনও মুহূর্তে অগ্ন্যুৎপাত ঘটাতেও বোধহয় সমর্থ। যদি সত্যিই তাই, তাহলে কী সেই ঘটনা?
হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি আরও কিছুক্ষণ।
হিন্দু বাংলাভাষী ছাত্র আমি। তদুপরি আমাদের পরিচয় আমরা পূর্বপাকিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালি। আমাদের শঙ্কার বীজ নিহিত সেই উদ্বাস্তু হিন্দুত্বের মধ্যেই। আমরা আতঙ্কিত যেন হিন্দু শরণার্থী বলেই।
আর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। সময়ও তো প্রায় দশটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই। আরও একটু এগিয়ে ভিড়ের ফাঁকফোকর গলিয়ে ঢুকে পড়লাম কলেজের ভেতরে। ঢুকেই বুঝতে পারছিলাম পরিবেশ পরিস্থিতি খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আমার এই একটি বছরের কলেজ জীবনে খুব কাছ থেকে যাদেরকে দেখেছি ও পেয়েছি ক্লাসে, লাইব্রেরিতে, ক্যান্টিনে নয়তো কলেজের নানা ঘটনার চক্রে তারাও আজ কেমন যেন ঘৃণা আর অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে ।
বিজ্ঞান বিভাগের দিকে হেঁটে যেতে যেতে এদিক-ওদিকে তাকিয়ে সহপাঠী কাউকে খুঁজছিলাম। কিন্তু কাউকে খুঁজে না পেয়ে যেন আরও বেশি একা ও অসহায় হয়ে পড়ছিলাম। একটা ভয় আর শঙ্কাও একটু একটু করে মনে এসে ভর করছিল। মনের অজান্তেই কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।
এমন সময়েই হঠাৎ দূর থেকে বন্ধু সৌম্যকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে গেলাম। কাছে গিয়ে প্রায় আঁকড়ে ধরে হেঁকে উঠলাম, সৌম্য সৌম্য তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি রে? তখন থেকে তোকে আমি খুঁজছি!
‘আমিও তো তোকেই খুঁজছিলাম! তোর আসতে এত দেরি হল? প্র্যাকটিক্যাল খাতা জমা দিবি না? সবার খাতা জমা হয়ে গেছে। শুধু তোরটাই বাকি!’ শঙ্কিত গলায় বলল সৌম্য।
আমি আঁতকে উঠে বললাম, এ হে! আসলে কলেজের গেটের সামনে এত ভিড়! ভেতরে ঢুকতেই আমার দেরি হয়ে গেল। চল তাহলে, খাতাটা জমা দেই গিয়ে?
এমন সময় কোথা থেকে যেন দৌড়ে এল বিশ্বজিৎও। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আরে তহতে ইয়াত আহি পাইছ ... আরে তোরা এখানে চলে এসেছিস? আমি তো তোদের কথাই ভাবছিলাম! খবর শুনেছিস, আমাদের কলেজের ছাত্র সংস্থার সম্পাদক হোজাই গিয়ে নাকি খুন হয়ে গেছে!
আঁতকে উঠল যেন সৌম্য, এবিলাক কি কইছ?..এসব কি বলছিস? সত্যিই?
‘একৌ মিছা নহয়.. একটুও মিথ্যে নয়। সব সত্যি!’
আতঙ্কিত সৌম্য আবার বলে উঠল, ‘হাঁ, আমিও অবশ্য সেরকমই কিছু একটা শুনতে পাচ্ছিলাম! প্রথমটায় বিশ্বাস করিনি। কিন্তু সেটা যে সত্যি সত্যিই ঘটে যাবে ভাবতেও পারিনি। কি ভয়ংকর কথা বল তো! যদি একটা হইচই গন্ডগোল শুরু হয়ে যায় এখন, কী হবে?
‘আমি তো সেজন্যেই তোদেরকে খুঁজছিলাম। তোরা একটু সাবধানে থাকিস।’ বলল বিশ্বজিৎ।
‘সাবধানে থাকতে হবে কেন, কীসের জন্যে? আমরা বাংলাভাষী ছাত্র, তার জন্যে?’ বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম আমি।
খেপে উঠল বিশ্বজিৎ, ওইরে ফুকন, তুই আজও সেরকমই রয়ে গেলিরে বঙাল, কিচ্ছুই কি বুঝিস না? তুই কি জানিস না, ছাত্র সংস্থার সম্পাদক হোজাই গেছিল সেখানকার ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে, আমাদের ভাষা আন্দোলনের জন্যে তাদের সমর্থন আদায় করতে! উলটে সমর্থন তো দূর, খুনই হয়ে গেল সে!’
এবার সত্যি সত্যিই আঁতকে উঠতে হল আমাকেও, সর্বনাশ! এসব কী বলছিস? এ তো বারুদের স্তুপে দেশলাই কাঁটি!
অতকিছু খবর না রাখলেও আমি এটুকু তো অন্তত জানি যে, অসমের সাম্প্রতিক এই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বরাক আর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে বাক-বিতণ্ডা, মতবিরোধ ও রেষারেষি চলছেই। আর এই রেষারেষির মধ্যেই জনপ্রিয় এক ছাত্রনেতা বংলাভাষী অধ্যুষিত হোজাই গিয়ে যদি খুন হয়ে থাকে, পরিণতি কোন দিকে যে মোড় নেবে কে বলতে পারে?
আমি শঙ্কিত সুরে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম, ও.. এর জন্যেই তো বলি আজ রাস্তা-ঘাটে লোক চলাচল কেন এত কম! কোনও যানবাহনও চলছে না, সব নীরব শুনশান! বাজারঘাটও সব বন্ধ! যেন হরতাল পালন হচ্ছে!
‘হাঁ, বড়বাজার, ঢাকাইপট্টি, হাসপাতাল রোড সব জায়গায় দোকানপাট আজ বন্ধ। খবরটা আসার সঙ্গে সঙ্গে যেন অঘোষিত হরতাল শুরু হয়ে গেছে চারদিকে।’ শঙ্কিত সুরে জানালো সৌম্যও।
গল্প করতে করতে তিনজনই এসে দাঁড়ালাম ডিপার্টমেন্টের একতলার অফিসরুমের বারান্দার কাছে। ব্যাচের বাকি ছাত্ররাও আগে থেকেই ওখানে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরীক্ষা আজ হবে কি হবে না, সে নিয়েই আলাপচারিতায় ব্যস্ত তারা।
আমি প্র্যাকটিক্যাল খাতা জমা দেবার জন্যে অফিস রুমের দিকে সবে মাত্র পা বাড়িয়েছি। এমন সময়েই জনৈক অধ্যাপক বেরিয়ে এলেন অফিসঘর থেকে। আর তিনি বেরিয়ে আসা মাত্রই ছাত্রদল, পরীক্ষা আজ হবে কি হবে না সে ব্যাপারেই জানতে ঘিরে ধরল তাকে। আর তিনি পরীক্ষার ব্যাপারে কিছু না বলে উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করে দিলেন ছাত্রনেতার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে, তোমালোকে তো জানাই....তোমরা তো জানোই আমাদের প্রিয় ছাত্রনেতা হোজাই গিয়েছিল। পরের ঘটনাও তোমরা নিশ্চয়ই শুনে থাকবে। হোজাই গিয়ে সে খুন হয়ে গেছে! ওখানকার কিছু ছাত্র আর লামডিং লংলাইফ ক্লাবের ছেলেরা মিলে ওকে হত্যা করেছে, কেটে টুকরো টুকরো করেছে! ওরা একবারও ভাবল না এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিণাম কী হতে পারে? বলো, তোমরাই বলো!
প্রশ্নটা তিনি উপস্থিত ছাত্রদের দিকে এমনভাবে ছুড়ে দিলেন যেন, যার তাৎক্ষণিক কোনও উত্তরও হয় না। তাই উপস্থিত ছাত্ররাও সেই প্রশ্নটিকেই লুফে নিয়ে নীরব অথচ প্রতিহিংসার দৃষ্টিতে ছুড়ে দিল যেন আমার আর সৌম্যর দিকেই। কেননা আমরাও তো সেই জনগোষ্ঠীরই দুই ছাত্র যাদের ওপরে হত্যাকাণ্ডের দায় আরোপিত হয়ে গেছে।
আবারও বলতে শুরু করলেন অধ্যাপক, এবার আরও উত্তেজিত ভঙ্গিতে, লামডিংয়ের কুখ্যাত লংলাইফ ক্লাব, নিশ্চয়ই তোমরা এর নাম শুনে থাকবে, যত নকশালদের আড্ডখানা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত যত নকশাল সব ওখানে এসে আস্তানা গেড়েছে আর শুরু করেছে জঙ্গলের রাজত্ব। এদের কাজই তো হচ্ছে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। হত্যা…আর হত্যা! আমাদের প্রিয় ছাত্রনেতাকে এরাই হত্যা করেছে!
বলে অধ্যাপক একটু থামলেন, তারপর ঢোক গিলে আরও হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আর এই সময়েই কয়েকজন ছাত্র প্রশ্ন করে বসল, স্যার তেনেহলে আজি আমার পরীক্ষা?..স্যার তাহলে আজকের আমাদের পরীক্ষা?
‘পরীক্ষা? কিহর পরীক্ষা?’ অসীম বিরক্তিতে ভ্রু কোঁচকালেন অধ্যাপক, পরীক্ষা আজি নহব।...পরীক্ষার আজ হচ্ছে না। তোমরাই বলো, এরকম এক হত্যাকান্ডের পরেও কি পরীক্ষা কখনও হতে পারে, হওয়া কখনও সম্ভব? পরে যখন হবে সেই পরীক্ষার তারিখ তোমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
‘পরীক্ষা আজ হচ্ছে না’ কথাটা শোনা মাত্রই মনে হচ্ছিল যেন আমার মাথার ওপরে ঠাটা পড়ল একটা। বোধহয় পড়ে যাব আমি এক্ষণি। যেন বিরাট এক হাহাকারের উদ্গার উঠে আসছিল আমার বুকের ভেতরে থেকে। আজই ছিল চলতি পাঠক্রমের শেষ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। শেষে এই একটা প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষাটার জন্যেই আমার বছরটাই নষ্ট হয়ে না যায়!
এমন সময়েই বাইরের রাস্তার ওপর থেকে কয়েক হাজার ছাত্র-জনতার মিলিত এক জয়ধ্বনিতে খানখান হয়ে গেল সমগ্র আকাশ-বাতাস। তারপরেই পরপর কয়েকখানা গাড়ির শব্দ। হাজার ছাত্র-জনতার জয়ধ্বনির মাঝে কলেজ প্রাঙ্গণে এসে ঢুকছিল ফুলে ফুলে ঢাকা ছাত্রনেতার মরদেহ বাহিত গাড়িখানা।
একটা তুমুল হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। কে যে কোথায় দৌড়ে যাচ্ছে মালুম হচ্ছিল না! অনেক আগে থেকেই একটু একটু করে ভাঙছিলাম। এবার সেটুকুও বুঝি পূর্ণ হল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেললাম। সৌম্যকে ডেকে ফিসফিস করে বলে উঠলাম, সৌম্য চল পালাই!
ওদিকে সায়েন্স বিল্ডিংয়ের বারান্দা মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল। সবাই চলে গেছে কলেজের প্রধান ফটকের ওদিকে যেখানে মরদেহ বাহিত গাড়িখানা এখন দাঁড়িয়ে আছে। ডিপার্টমেন্টের অফিস রুমও প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
সৌম্য ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আতঙ্কিত সুরে বলল, এনসিসি অফিসের পেছনের পাঁচিল টপকে আমাদের পালাতে হবে! আর দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়! চল পালাই!
বলেই সৌম্য বড়বড় পা ফেলে দিল হাঁটা, তারপরেই দৌড়। জ্যামিতি বক্স ফেলে দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল খাতাটিকে বুকে আগলে ধরে আমিও দৌড়লাম ওর পেছনে। দৌড়তে দৌড়তে চলে এলাম আমরা এনসিসি অফিসের পেছনের পাঁচিলের কাছে। বুক সমান উঁচু ইট-পলেস্তারা খসে পড়া পুরানো যুগের পাঁচিল। এমন কিছু খাড়া নয় যে টপকিয়ে ওপারে যাওয়া যাবে না। তবুও সেই পাঁচিলের ওপরেও যেন আমি উঠতে পারছিল না। যেন পেরেক ঠুকে আমার পাদুটোকে কেউ আটকে দিয়েছে।
বিকৃত সুরে চেঁচিয়ে উঠল সৌম্য, ওই শালা ভীতু ফুকন, তুই কি ওখানেই দাঁড়িয়েই থাকবি? যদি বাঁচতে চাস ওঠ পাঁচিলের ওপরে।
বলেই হেঁচকা টানে তুলে ফেলল সে আমাকে পাঁচিলের ওপরে। তারপর পাঁচিলের ওপর থেকে সামনের রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম দুজন একসঙ্গে। এটাই সেই ভিড় গিজগিজ হসপিটাল রোড, আজ কেমন যেন বুক চিতিয়ে নীরব নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাঁদিকে কিছুটা দূর এগিয়ে গেলেই সদর থানা তারপর সিভিল হাসপাতাল। সৌম্য হাঁটা দিল হাসপাতালের দিকেই। ওই রাস্তা ধরেই সে চলে যেতে পারবে পানিগাঁওয়ের ওদিকে। পানিগাঁওয়েই ওদের বাড়ি।
next episode- অগ্নি
