Blue Orchid
Blue Orchid
"সুমনা দি.. পামেলা আছে বাড়িতে? ফিরেছে?"...
"আরে জয়িতা... আয় না"..
পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটু থেমে গেলেন শ্রীমতী সুমনা বসু... জয়িতার পাশে মেয়েটার দিকে চোখ পড়তেই অবাকও হলেন.. আবার যেন ভেতরে কিছুটা নাকও সিটকোলেন.... একেবারেই ছাপোষা গ্রাম্য.. ঢ্যাঙা লম্বা, কেমন বাকা চেহারা, ভাঙাচোরা মুখ.. অবয়বে মেঠো ভাব,এক বিশ্রী বেমানান মূর্তি ...ওদের এই ফ্ল্যাটে, জয়িতার পাশে একেবারে বেমানান..চোখের ইশারায় দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন "কে রে জয়িতা?"...
"আর বলো না, ওর জন্যই তো আসলাম... পামেলার সাথে কথা ছিলো একটু.. এই ওকে নিয়েই.."
সুমনা দেবী খানিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে " কি দরকার আমাকে বল না .. পামেলা ফিরেছে তাও অনেকক্ষন হলো ... বাথরুমে ফ্রেশ হচ্ছে..."
"তাহলে তোমাকেই বলি.. ওরা বাঁকুড়া থেকে এসেছে...এখানে এসে কাজ খুঁজছে...এই ওর husband অজিতেশের বুট পলিশ করে প্রায়ই...অনেক কথাই বলে.. আর্থিক অবস্থার কথা.. অনেকবার Request করেছে যদি ওর বউকে আমরা কাজে নি.. অজিতেশ নাকি বলেছে পাঠিয়ে দিও, দেখব.. আজ তো এ এসে হাজির.. কিন্তু তুমি তো জানো আমাদের already দুজন কাজ করে.. মিনা আর দিলু.."...
সুমনা দেবীও তখন তড়িঘড়ি বলে ওঠে," আমাদেরও তো.. "
" হ্যা জানি.. তাই তো পামেলাকে বলতে আসলাম.. যদি ওর বুটিকে হয়... "
" বাড়িতে কাজ করা আর বুটিকে কাজ করা একনাকি? এই মেয়ে ওসব পারবে বলে তো মনে হয়না.. "..
" তাও তুমি একবার পামেলা কে বলে দেখো.. আমি আর দাঁড়ালাম না, পামেলার দেরি হবে মনে হয়.. ডোডোটা চলে আসবে গো এক্ষুনি, তুমিই বলে দিও তাহলে..."..
" ঠিকাছে কথা বলে দেখব... তোকে জানিয়ে দেবোখন"..
" আচ্ছা.. এলাম তবে.."..
এতক্ষণ পাশে মেয়েটা কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো.. জয়িতা বেরোতেই মেয়েটাও পেছন পেছন বেরিয়ে গেলো...
ডিনারে বসে কথা হচ্ছিলো.. টুকটাক এটা ওটা কথা হওয়ার পর সুমনা দেবী পাড়লেন কথাটা.." পামি তোর বুটিকে নতুন লোক লাগবে না কি রে ?..
পামেলা খাওয়া থামিয়ে কৌতুহলী হয়ে সুমনা দেবীর দিকে তাকায় , " কেনো বলোতো মামনি..আমার বুটিকে? হঠাৎ নতুন লোকের কথা বলছো.. কি হয়েছে .. "
" না আজ সন্ধ্যার কিছুপর জয়িতা এসেছিলো..একটা মেয়ে কে নিয়ে.. গ্রামের বুঝলি, সে যদি তুই দেখতি.. চেহারার যা ছিড়ি.. বাবা!.." একটু হেসে ওঠে কথাগুলো বলার সময়.. "ওরা স্বামী স্ত্রী মিলে এখানে কলকাতায় এসে কাজ খুঁজছে, জয়িতারা ওকে রাখবে না বলেই দিয়েছে.. ওদের লোক আছে, আমাদেরও তো পূর্ণিমা, রাখাল এরা সব আছে.. তাই তোর বুটিকে যদি হয়.. সেই কথাই বলতে এসেছিলো.. "
পামেলা চুপ করে খেতে খেতে শোনে সবটা , কিছুক্ষন পর বলে .." আমি দেখছি.. তুমি বরং জয়িতা আন্টিকে বল আমি ওর সাথে দেখা করতে চেয়েছি.. "
সুমনা বলে "দেখ.. তবে আমার মনে হয় না পারবে বলে.. ওই মেয়েকে দেখেই তুই নিজেও reject করে দিবি.. তাও জয়িতাকে বলবো পাঠিয়ে দিতে... তুই কথা বলে নিস "...
কথাটা বলেই সুমনা দেবী খাওয়া শেষ হতে উঠে যায়...
এতক্ষণে মুখ খোলে তরঙ্গ.." দেখা করার কি আছে তোমার.. শুনলেই তো গ্রামের মেয়ে, আর অজিতেশ আঙ্কেল রাও তো কাটিয়ে দিলো দেখলে... তোমার কোনো কাজেই লাগবে না, শুধু শুধু উটকো ঝামেলা...".
"উফ, তুমি বুঝতে পারছ না.. এদের দিয়ে অনেক কিছুই অনেক কম টাকায় করিয়ে নেওয়া যায়.. যেগুলো শহুরে মেয়েদের দিয়ে হয়না..এই বাজারে এরকম একজন পেলে তো ভালোই হয় .. দেখা যাক না..."..
"যা মনে হয় তাই করো তাহলে... ".. বলে উঠে যায় তরঙ্গ..
এভাবেই শুরুটা হয়েছিলো... পরে দেখা করে পামেলা নাম জেনেছিলো মেয়েটার.. মৌসুমী.. পামেলা মনে মনে বলেছিলো বাবা!.. এর নামটা তো বেশ বাহারি আর তাই একেবারে মানায় না ওর সাথে.. তবে এরকম একটা সাদাসিধে অল্প বয়সী মেয়ে পেয়ে খুশিই হয় ও, বয়স এই একুশ বাইশ হবে .. রোদে পোড়া রং, শিরা ওঠা গেটো হাত দেখেই বোঝে মেয়েটা বেশ খাটিয়ে.. দীর্ঘদিন পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট হয়ে নির্লজ্জ ভাবে উৎকট আকারে দৃশ্যমান ... ও আর দেরি করেনি.. বুটিকের ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়ে পরদিন থেকেই চলে যেতে বলেছিলো কাজে..
এরপরে আজ আট - ন'মাস কেটে গেছে মৌসুমী কাজ করছে পামেলার বুটিকে.. কোনো ধরাবাধা কাজ না, যখন যা বলে তাই করে দিতে হয় ওকে.. কর্মী না বলে ওকে হেল্পার বলাই ভালো..মেয়েটার সবই ঠিকাছে.. বেশ বাধ্য,চটপটে.. কিন্তু খুব বেশি কথা বলে এই যা... আবার ধমক দিয়ে কড়া কথা শুনিয়ে দিলেও হাসে...
প্রথম চিনচিনে ব্যথা টা অনুভব করেছিলো পামেলা, যেদিন ছুটি হওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে দেখলো মৌসুমী তখনও দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে..
"এখনও দাঁড়িয়ে আছো যে.. কি.. কোনো অসুবিধে ?"
মৌসুমী তাড়াতাড়ি হাত মাথা নেড়ে বললো, "না গো দিদি.. সে পোসান্ত আসেনি তো এখনও.. আজ দেরি হচ্ছে কেনো কে জানে.."
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে পামেলা "কে প্রশান্ত?.."
মৌসুমী দাঁত বের করে লজ্জা পেয়ে হেসে বললো "আমার কত্তা.. বর.. "
পামেলা ভাবে, ও হ্যা.. মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো, ওর husband এর নাম প্রশান্ত .." তোমাকে নিতে আসছে আজ? "
" রোজই তো আসে গো দিদি... আজকার সে দেরি হচ্ছে, দাঁড়িয়ে আছি তাই দেখতে পেলে গো..নাতো চলে যাই.. আমাকে না নিয়ে ও বাড়ি যাবেই না.. পোসান্ত আমাকে পোচ্চুর ভালোবাসে গো দিদি, আমাকে ... "
পামেলা বোঝে এখানেই থামাতে হবে নাহলে সবার সামনে এভাবে না জানি আরো কত কি বলতে থাকবে..." আচ্ছা ঠিকাছে... তুমি সাবধানে ফিরো মৌসুমী ".. বলেই গাড়িতে উঠে পড়ে পামেলা...
গাড়িতে ঢুকেই চোখ বুজে মাথাটা পেছনে এলিয়ে দেয়...
----আওগে যব তুম ও সজনা... আঙ্গনা ফুল খিলেঙ্গে.. বরসে গা সাওয়ান.. ঝুম ঝুমকে..... হালকা মিষ্টি গান বাজছে গাড়িতে...
"বাদল দা music টা বন্ধ করে দাও.." ভালো লাগছে না গান শুনতে পামেলার.. মনে পড়লো ওর মায়ের colleague cum বন্ধু ছিলো সুমনা বসু, খুব মিশুকে, মন খোলা মানুষ.. একইসাথে হাই স্কুলে পড়াতো...পামেলাদের বাড়িতেও যাতায়াত ছিলো.. একদিন বলেই বসলো.. "তোর মেয়েটাকে আমায় দে না রে সঞ্চিতা, কি সুন্দর হয়েছে রে দেখতে, আবার একা হাতে বুটিক টাও কি সুন্দর সামলাচ্ছে...আমার ছেলেটার সাথে বেশ মানাবে কি বল.. আমার তরঙ্গের সব ভালো শুধু কাজের চাপে কেমন কাটখোট্টা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন... পামি গেলে যদি ওর জীবনে ঢেউ লাগে.."..
ব্যাস তারপরেই দেখেশুনে বিয়ে টা হয়ে যায় ওদের, তখন পামেলার বয়স তেইশ ...তারপর তরঙ্গ আর শাশুড়ি মা এই নিয়েই আজ পামেলার চার বছরের ছোটো সংসার... সব ভালোই তো ছিলো.. ভালোই তো আছে.. তাহলে মন খারাপ করছে কেনো পামেলার...ও ভাবে, হ্যা তরঙ্গ এত বড় পোস্টে কাজ করে, ও সত্যি ব্যস্ত.. তাই হয়তো ওকে নিতে আসতে পারেনি এই চার বছরে একবারও.. বুটিক সম্পর্কে কোনো আগ্রহও ওর নেই, ভাবনার রাশ টেনে ধরে নিজেকে শুধরে নেয় , হয়তো সময়ের অভাবেই কোনোদিন সেভাবে..... , ওর ওপর যে অনেক দায়িত্ব .... তবে মাসের শেষে টাকাটা খরচ না করে কোথায় কি ভাবে জমাবে, সেটা ও-ই সামনে বসে সব হিসেব করে শক্ত হাতে বেধে দিয়েছিলো, কিন্তু আবার নিজেকে থামিয়ে দেয় পামেলা, মনকে বোঝায় সেও তো ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ...উফ আজ বারবার অন্যদিকে ভাবনার স্রোত বয়ে চলেছে, অজান্তেই কখন যে চোখ থেকে উষ্ণ নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে... মুছে নেয় তাড়াতাড়ি...না, সব ঠিকাছে.. ওই মেয়েটার জন্যই কি সব উল্টো পাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে আজ ...ওই মৌসুমীর বাড়াবাড়ি যতো! "বাদল দা music টা on করোতো!", সোজা হয়ে উঠে বসে বলে পামেলা .....
হঠাৎ সেদিন বুটিকে গিয়ে পামেলা দেখলো মৌসুমী আরো কয়েকটা মেয়ে মিলে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মৌসুমীর গলাই পাওয়া যাচ্ছে... পামেলা কে দেখে সব মেয়েরা সরে যেতেই ওর চোখে পড়লো মৌসুমী চোখ মুচ্ছে.. চোখদুটো ফোলা.. আরেকটু কাছে গিয়েই খেয়াল হলো.. গালে কালসিটে দাগ.. পামেলা এবার একটু ব্যস্ত হয়ে উঠলো.. তাড়াতাড়ি কাঁধের ব্যাগটা রেখেই ওর দিকে এগিয়ে যায়.. "এটা কি করে হল!?".. কড়া গলায় জিজ্ঞেস করতেই মৌসুমী আবার কেঁদে ফেললো.. "পোসান্ত গো দিদি.. সকাল সকাল সে তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে রুটি টা একটু পুড়ে গেসলো.. তাই রাগের মাথায় মেরে দিলো, এত বললাম কিছু না খেয়েই সে চলে গেলো, সারাদিন সে বাইরে খাটে, পেটে কিছু যদি না পড়ে বলো? বাবুদের জুতা সে পালিস্ করে, পর আবার সবজি নিয়ে ঘোরে.."
অবাক না হয়ে পারলো না পামেলা.. থামিয়ে দিয়ে চাপা স্বরে ভর্ৎসনার সুরে বলে ওঠে " তুমি প্রশান্তর খাওয়ার চিন্তা করছো এখনও ! তোমায় মেরে এই অবস্থা করেছে.. কতদিন ধরে চলেছে এসব? তুমি কোথাও জানিয়েছো? পুলিশ বা.... "কথা শেষ করতে পারেনা..
চমকে উঠে চোখ বড় করে হাত নারে মৌসুমী, " না না দিদি, ওর কি দোষ বলো! .. সে একবার সকালে খেয়ে যায়, ওরকম দেখে তো সে মাথা গরম হয়ে যাবেই.. আগেরকার বারো যখন আমায় রেগে গিয়ে মারলো,দুদিন কথা বলেনি আমার সাথে, সে হেবি রাগ! পরদিন সে আমি কাজ থেকে বাড়ি গিয়ে দেখি সে আমার জন্য রান্না করে রেখেছে.. টেনে নিয়ে খাইয়ে জড়িয়ে ধরে সে.. "লজ্জায় হেসে ওঠে...
" থাক! .. তুমি যাও লিস্ট টা নিয়ে এসো ভেতর থেকে.. "সাথে সাথে থামিয়ে দিয়ে কড়া করে নির্দেশ দেয় পামেলা ..
পামেলার মনে পড়ে ওর যখন মন খারাপ করেছিলো তরঙ্গ ওকে সোজা ওর বাড়ি দিয়ে এসেছিলো, বলেছিলো এখানে কিছুদিন থেকে মন ভালো হলে ফিরে যেতে.. কই এরকম তো পাগলামি ছিলো না তাতে.. ওর কটা লাইন মনে পড়ে গেল...
" সন্ধ্যেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই
বিছানা আলাদা
হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ
মধ্যরাতে আচমকা মিলন
পাগলী, তোমার
সঙ্গে ব্রক্ষ্মচারী জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে আদম ইভ কাটাব জীবন।"...
এরকম আবেগঘন মাখোমাখো ভালোবাসা তো সেও চেয়েছিলো, যে ভালোবাসায় আবেগের সীমা থাকবে না, প্রচন্ড রাগ হবে,সেই গরমে পুড়বে ওদের সুখী গৃহকোন.. তারপরেই আবার দুকুল ছাপিয়ে হবে বৃষ্টি, তাতে ভিজে শান্ত হবে দুটো শরীর, মন.... তারপরে আচমকাই হুশ ফেরে পামেলার, আবার কি সব ভাবছে.. মনে মনে বলে, ওসব বস্তি কালচার.. কোনো ভদ্র, সুস্থ সম্পর্কে এসব হয়না...!মার্জিত হয়ে মার্জিনের মধ্যে বাচাটাই আভিজাত্য......
আজ ওর বুটিক," সাজো" এর সপ্তমতম জন্মদিন... সেইজন্য প্রতি বছরের মতো এ বছরও পামেলা দের ফ্ল্যাটে অনুষ্ঠান ছিলো.. সবাই এসেছে.. তার মধ্যে উদ্ভট চকচকে একটা বেঢপ চুড়িদার পরে প্রশান্তকে নিয়ে এসেছে মৌসুমীও...সবাই মুখ টিপে হাসছে..সুমনা দেবীও হাসলেন মুখ চেপে,আবার পামেলাকে ইশারা করে দেখালেনও .. তরঙ্গ বিরক্তই হয়.. পামেলাকে আলাদা ডেকে বলে, "basu বাড়ির একটা স্ট্যাটাস আছে তো নাকি... ওদের কেনো বলতে গেলে তুমি?".. পামেলা কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যায়.. কারণ পামেলা তো জানে তরঙ্গ এরকমই, নতুন কিছু তো নয়,সব নিয়েই ও খুঁতখুঁতে......সিলেক্টিভ..
থেকে থেকে পামেলার চোখ চলে যায় মৌসুমীদের দিকে.. ওরা দুজন দুজনের সাথে এত ব্যস্ত যে কারো দিকে ওদের নজর নেই... মৌসুমী ছেলেটাকে হাত দিয়ে এটা ওটা কি সব দেখাচ্ছে আর হাসছে..আর ছেলেটাও হাসি মুখে ওর একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে..পামেলা দুজনকে পাশাপাশি দেখে ভাবল, যা দেখতে.. মানিয়েছে দুটিকে....!
সবার মধ্যে থেকেও যেন ওরা আলাদা করে শুধু দুজন দুজনের মধ্যেই মগ্ন... পামেলাকে দেখেই ওর দিকে তাড়াতাড়ি ঈষৎ লাফিয়ে এগিয়ে আসে মৌসুমী ছেলেটা কে নিয়ে, চোখেমুখে কি উচ্ছলতা "দিদি এই যে পোসান্ত! ..দেখতে অনেক সুন্দর না?দিদি দেখো আমাকে সে এই জামা এনে দিলো.. বললো এটা পড়বা.. " ছেলেটা একটু লজ্জা পেলো যেন, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে.. "দিদি তোমাকেও কি সুন্দর লাগছে গো.. এগুলো কি ফুল গো তুমি পড়েছো..সে কোনোদিন দেখিনি কি সুন্দর,কি সুন্দর রং! সারা বাড়ি এই ফুলে সাজানো ওকে দেখাচ্ছিলাম গো সেগুলোই দিদি,এসব তোমাদেরই ভাল্লাগে গো দিদি, তোমরা সে কত সুন্দর.. এই ঘর বাড়ি !"....মুখে কি নিষ্পাপ খুশি,চোখগুলো ধাঁধা লেগে যাওয়ার মতো করে জ্বলজ্বল করছে, একটা প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষা, কিছুটা লোভও মিশে আছে যেন তাতে.....
"এগুলো blue orchid...হ্যা তোমরা দেখো.. আমি আসছি একটু".. বলেই ওদের সামনে থেকে সরে এসেছিলো পামেলা...
সেদিন রাতে শুয়ে ভাবে তরঙ্গ তো কোনোদিন শাড়ি এনে বলেনি, পড়ো.. কোনোদিন ওকে এসব নিয়ে মাথাও ঘামাতে দেখেনি পামেলা, সেটা কি ও নিজেই বুটিক চালায় তাই.. নিজেকেই যুক্তি দেয় পামেলা .. আর আজ তো তরঙ্গ একবারও এই অনুষ্ঠানে ওর পাশে এসে দাঁড়ালো না.. অনেকক্ষন তো চোখেও দেখতে পায়নি.. আর ওরা কেমন নির্লজ্জের মতো পাশাপাশি.... ওপাশ ফিরে তরঙ্গকে একবার দেখে নিলো পামেলা, কিরকম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে.. নাহ্ তরঙ্গ আর যাই হোক, হ্যা হয়তো আবেগে ভাসে না.... কিন্তু ওরকম নির্লজ্জ ও কোনদিনও হতে পারবেনা...কিন্ত তাও যে কেন মনে চিনচিনে ব্যথা করছে...
"মৌসুমী ফোন টা রাখো! তুমি ফোনে এত কী কথা বলো? আর তো কারো তোমার মতো এত ফোন আসেনা"..
"আসলে দিদি সে পোসান্ত.. খোঁজ নেয় মাঝ করে.. বলে নতুন জায়গা সে কুনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা".. বলে ফোন টা রাখতে যায় মৌসুমী.. পামেলা ভাবে কই ওর ফোন তো কোনোদিন অসময়ে বেজে ওঠে না... বিয়ের প্রথম প্রথম ও অপেক্ষায় থাকতো.. কিন্ত এখন ও তরঙ্গ কে বোঝে...একদিন বলেছিলো সবারই একটা প্রাইভেট পার্সোনাল স্পেস দরকার হয়.. বাড়িতে এসে তো একসাথেই থাকবে দুজন...পামেলা মনে মনে বলে, সেই তো ভালো.. এরকম গাইয়াঁদের মতো সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করাটা বিরক্তিকর..যতোসব আদিখ্যেতা!
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে বসে পামেলার চোখে পড়লো কি একটা ঠোঙা মতো হাতে ধরা প্রশান্তর... মৌসুমী একহাতে ছাতা ধরে গায়ে গা লাগিয়ে পাশে হেঁটে যাচ্ছে.. মাঝে মাঝে হেসে ছেলেটার গায়ে গড়িয়ে পড়ছে...
হারিয়ে যায় পামেলা ভাবনায়.. পামেলাও তো চেয়েছিলো এরকম বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় রাস্তায় পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটবে, তরঙ্গর কাঁধে মাথা রাখবে ইচ্ছে হলেই .. তবে আবার পরক্ষণেই ভাবে... না তা কেনো, তরঙ্গ তো ওকে নিয়ে গেছে কয়েকবার নামি-দামী সব রেস্টুরেন্টে, দারুণ সব আদবকায়দায় কত লাঞ্চ, ডিনার করেছে সেখানে ...তাহলে ওই বৈভব ছেড়ে রাস্তায় এভাবে হাঁটবে কেনো?এসব ওদেরকেই মানায়...পামেলা কাচটা তুলে দেয় জানলার....
সেদিন পামেলা বুটিকে ঢুকতেই হাসিমুখে দুটো নাম না জানা সস্তার বিস্কুট বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে মৌসুমী.. "এসব আবার কি?"..
" দিদি আমি বাঁধিয়ে বসেছি গো.. আবার কি"..
"মানে..?"
"বাচ্চা হবে গো, পোসান্ত যা খুশি না কি বলবো..আমাকে এগুলো এনে দিলো বললো সবাইরে দিবা .."..দাঁত বের করে মাথা নিচু করে হাসতে হাসতে বলে...
"কিন্তু তোমার তো কি complications আছে.. এই অবস্থায়.."
"পোসান্ত বললো সে আমি আছি চিন্তা কিসের.. সব হয় যাবে, আমি খেয়াল রাখবো,যা করার হয় করে দেবো..."বলেই নিষ্পাপ হাসে..
পামেলা হাতে বিস্কুট টা নিয়েই চলে যায় ওর সামনে থেকে... সব মনে পড়ে..তরঙ্গর বাচ্চা না নিতে চাওয়া, Miscarriage থেকে শুরু করে তরঙ্গর ওই সময়ে ওর হাত ছেড়ে দেওয়া, ওকেই দায়ী করা...পামেলা সামনের চেয়ার টায় বসে পড়ে... এতদিনের বিশ্বাসগুলোকে আবার মনে মনে ঝালিয়ে নেয়... হতে পারে যে তরঙ্গ রেডি ছিল না সত্যি , হতেও তো পারে, দায়ী করতে চায়নি, ও কষ্ট পেয়েই বলেছিল কথাগুলো..হাতের বিস্কুট দুটো ছুড়ে ফেলে দেয় পামেলা ....
বুটিক থেকে ফিরেই বিছানায় শুয়ে পড়ে পামেলা, তরঙ্গ ফেরেনি এখনও..কিচ্ছু ভালো লাগছে না আজ ওর... ও টের পায় একটা মন ভারী করা কষ্ট নেমে আসছে ওর বুকে.. বুকের ভেতরে একটা চাপা ব্যথা অনুভব করছে ও.. একটা গ্রাম্য রিক্ত মেয়ে ওর আরামের জীবনের খুঁতগুলো কিছু না বলেই এভাবে কি করে ওর সামনে তুলে ধরছে, দিনের পর দিন........ কিছু না থেকেও ও কি করে এত পূর্ন? আর পামেলা সব থেকেও ওর সামনে কত শূন্য! ওরা যেগুলো অবলীলায় করতে পারে, পামেলা তো তা চেয়েও পায়নি কোনোদিন .. চোখের জল আর আজ আটকাতে পারেনা.. আজ কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারছে না আর.. সব গুলিয়ে যাচ্ছে.... নাহ্ মৌসুমীকে আর সহ্য করতে পারছে না.. বের দেবে ওকে বুটিক থেকে...ওই মেয়েটাই এলোমেলো করে দিয়েছে ওর সাজানো শখের সৌখীন দাম্পত্য, পাল্টে দিয়েছে হিসেবের খাতার যোগ বিয়োগ আর ফলাফলের সমীকরণ,নিজের সংসারের ভারসাম্যকে কিছুতেই আর আগের সাজানো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছেনা পামেলা .. মৌসুমী কি করে পামেলার ভেতর থেকে খুঁড়ে বার করলো সব কালো কালো অজানা অনুভূতিগুলো, যেগুলো মৌসুমী না আসা অবধি ও অনুভবই করতে পারেনি, পামেলা ভাবে...ও তো ভালোই ছিলো ওভাবে....কিছুর অভাব ছিলো না, কিন্তু ওই মেয়েটার সামনে মনে হচ্ছে সব কতো ফাপা...কিছুতেই রাখবে না আর ওই মৌসুমীকে! ..ওকে ক্ষমতার জোরে তাড়িয়ে দিয়েই জিতে যাবে পামেলা ...
ফোন বেজে ওঠে এই সময়ে..
ও মৌসুমী নাম টা স্ক্রিনে দেখে অবাক হয়, তাড়াতাড়ি উঠে বসে সবুজ সংকেতে আলতো আঙুল ছোয়ায়.. "বলো মৌসুমী.."....
"দিদি কি করছো গো ? সে বলছি কাল থেকে আর আসতে পারবো না গো দিদি... পোসান্ত বলেছে.. কোনো কাজ করতে না.. খুব খেয়াল রাখছে গো দিদি.. এইতো এখন সে আবার চপ আনতে গেছে.. খেতে ইচ্ছে হলো যেই বললাম সে চলে গেল.." হেসে কথাগুলো বলে মৌসুমী..
পামেলার মনে একটা তীক্ষ্ণ খোঁচা লাগে.. নিজে ছেড়ে চলে গেলো.. আবারও হেরে যাচ্ছে এই গেয়ো অশিক্ষিত মেয়েটার কাছে.. চোখের জল মুছে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, "মৌসুমী তুমি কোথায় থাকো?.."
"কেনো গো দিদি.. ও দিদি তুমি আসবা নাকি গো ?.. ওই তো সাথী কলোনী.. ওই শনি মন্দিরের পাশের গলিতে সে বাচ্চু দের বাড়ি ভাড়া থাকি গো দিদি.. সত্যিই তুমি আসবা? খুব ভালো লাগবে গো দিদি.. খুব ভা ..... "
মাঝেই পামেলা বলে ওঠে, " হ্যা ভাবছি যাবো একবার.. এত ভালো খবর শোনালে..আচ্ছা এখন রাখলাম.. "
ফোন টা রেখেই ঠিক করে নেয় পামেলা, নিজের জিতে যাওয়াটা নিঃস্ব মৌসুমীর অবাক চোখের লোভাতুর চাউনির মধ্যে দেখবে, তাড়িয়ে উপভোগ করবে ...নাহ্ কিছুতেই হারবে না... যাবে অভিনন্দন জানাতে.. পড়ে যাবে ওর বুটিকেরই সেরা শাড়ীটা, তার সাথে মানানসই হীরের চোখ ধাঁধানো সেট... আর সাথে নিয়ে যাবে এক গোছা চড়া দামের blue orchid.....
*******সমাপ্ত********

