অন্যরকম মা দিবস
অন্যরকম মা দিবস
নাশতা খাওয়া শেষ করে গুটি গুটি পায়ে মায়ের রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম মা বিছানা পরিস্কার করছে আর বকবক করছে।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে মা দরজার দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
- "কী হয়েছে? ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? তোর হাতে ওটা কিসের প্যাকেট?"
- "মা, তোমার জন্য একটা নতুন শাড়ি এনেছি। এই নাও এখনি শাড়িটা পড়ে নাও। আমার সাথে এখনি বের হতে হবে।"
- "কোথায় বের হব? আর বের হতে গেলে নতুন শাড়ি পড়তে হবে কেন?"
- "মা, এত কথা বলছ কেন? আমার সময় নেই বলার। যখন বের হবো তখন দেখতে পারবে। নাও শাড়িটা। তোমার প্রিয় খয়েরী কালারের। আমিও রেডি হতে যাচ্ছি। এসে যেন তোমাকে রেডি দেখি।"
শাড়িটা মায়ের হাতে দিয়ে মাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে এলাম। আমার রুমে ঢুকে মায়ের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে নেওয়া পাঞ্জাবিটা পড়লাম। পায়জামা পড়লাম। তারপর চুলগুলো একটু স্টাইলিশ করে আঁচড়াতে যাব ঠিক তখন মায়ের গলা পেলাম,
- "কই তোর হলো? আমি রেডি হয়ে গেছি। কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে বল তো?"
- "হয়ে গেছে মা। ফিরতে দেরি হবে। তালা নাও। বাড়িতে তালা দিতে হবে।"
কথাগুলো বলতে বলতে আমার রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে যখন এলাম মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে অবাক চোখে! মা আমাকে এভাবে আশা করে নি! আমি একটা মদনমার্কা হাসি দিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা কী জন্য আমার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা আমি বেশ ভালো করে বুঝতে পারছি। মায়ের শাড়ির কালারের সাথে আমার পাঞ্জাবি কালার মিলে গেছে তাই মা এভাবে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শেষে আমি মাকে বললাম,
- "কী হলো মা এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আমাকে চিনতে পারছ না নাকি? আমি তোমার মায়ের ছেলের বোনের জামাইয়ের ছেলে হই।"
- "ইয়ার্কি ছাড়, এসব কি? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে? এই তুই আমাদের না জানিয়ে বিয়ে ফিয়ে করে ফেললি না তো আবার?"
- "মা এরকম কিছু নয়। চল তো এবার। দাও তালা চাবি আমাকে। বাড়িতে আমি তালা লাগিয়ে নিই।"
মাকে নিয়ে বাইরে বের হলাম। তারপর দরজায় তালা লাগালাম। চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটতে লাগলাম বাইরের দিকে। একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে পড়লাম।
রিকশাওয়ালাকে কর্ণফুলী নদী বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললাম।
রিকশা এগিয়ে চলছে। মায়ের দিকে তাকালাম। দেখলাম মা বেশ আনইজি ফিল করছে। এদিকে ওদিকে মানুষজনদের দেখছে। মূলত আমরা মা ছেলে দুইজনে এরকম এক কালারের পোষাক পড়াতে মায়ের আনইজি লাগছে বেশ বুঝতে পারলাম। আমি এসবের কোনো কেয়ার করলাম না।
বন্দরে এসে রিকশা থামল। আমি আর মা নেমে গেলাম। এগিয়ে গেলাম নৌকার দিকে। নৌকায় উঠে বসলাম। মায়ের একটা শখ ছিল নৌকায় চড়বে। অবশ্যই মা সেটা বুঝতে পারল যখন আপনা আপনি গিয়ে নৌকায় উঠে বসল। নৌকা ছেড়ে দিল।
এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে নৌকা। একটু এগিয়ে যেতেই মা আমাকে ঝাপটে ধরল। যেভাবে মুরগী তার বাচ্চাদের শত্রুদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঝাপটে ধরে রাখে। অন্যান্য যাত্রীরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা দেখে মা আবার আনইজি ফিল করল। যাক সে সবের কোনো পাত্তা দিলাম না।
মাকে দেখলাম নিচু হয়ে কর্ণফুলীর পানি ধরার চেষ্টা করছে। আমাকে এক হাত দিয়ে ধরে মা পানির স্পর্শ পেল। স্পর্শ পেতেই মায়ের গালে হাসির রেখা ফুটে উঠল! মা খুব খুশি হয়েছেন। ততক্ষণে ওপারে পার হয়ে গেলাম। মা নেমে গেল। দেখলাম মা আবার আরেকটা নৌকার দিকে তাকিয়ে আছে। মায়ের দিকে তাকালাম আবার। চোখের ইশারায় মা বুঝিয়ে দিল আবার নৌকায় চড়ে ওপারে যাবে।
আবার উঠে পড়লাম নৌকায়। এবার মা একটু সাহসী হয়ে উঠল। হাতের অনেকটা পানিতে ডুবিয়ে দিল। আপন মনে বিড়বিড় করে কী সব যেন বলতে লাগল মা। শেষে এপারে উঠে এলাম। বাইরে চলে এলাম বন্দর এরিয়া পার করে।
হঠাৎ মা একটা হাসি দিয়ে বলে উঠল,
- "আমার জীবনে নদীপথে ঘুরার একটা সুপ্ত ইচ্ছা জমেছিল সেই ছোটবেলা থেকে। আজ এতবছর পর সেটা পূরণ করলি বাবা তুই।"
আমি কিছু না বলে মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলাম শুধু।
এরপর রিকশা নিলাম একটা। উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম জো! কিছু সময় পর চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় এসে রিকশা থামল। তারপর টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে এক এক করে সব রকমের প্রাণি, জন্তু, জানোয়ার মা আর আমি দুজনে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।
খিদে লাগার কারণে পুরো চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখতে পারলাম না। সেটা মাকে বলাতে বের হয়ে এলাম দুজনে। একটা রেস্টুরেন্টের দিকে এগিয়ে গেলাম। মায়ের প্রিয় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু মেজবানি কালো মাংস ভুনা অর্ডার করলাম।
মা আর আমি দুজনে মিলে তৃপ্তি সহকারে দুপুরের খাবার খেলাম। খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে দিয়ে বাইরে বের হয়ে এলাম। ঘড়িতে দেখলাম ৪ টা বাজতে চলল। এবার একটা সিএনজি নিয়ে সোজা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ছুটে চললাম।
সিনজিতে উঠে মা এবার আমাকে বলল,
- "তোর আজ কি হয়েছে বলতো? এভাবে আমাকে নিয়ক ঘুরছিস মতলবটা কি তোর?"
- "মা আরেকটু অপেক্ষা কর। তারপর সব বুঝতে পারবে। এখন চুপ থাক। কোনো কথা বলবে না।"
কিছু সময় পর সিএনজি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কাছে এসে থামল। আমি আর মা নেমে গেলাম। সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাকে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে নামলাম। সমুদ্রের পানি দেখে মা ছোটো বাচ্চার মতো আচরণ শুরু করে দিল। পানিতে নেমে ঝাঁপাঝাপি, ধাপাধাপি শুরু করে দিল। পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে বালিতে কি সব আঁকিবুঁকি করতে লাগল। একটু পর পর আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ব্যাপারটা ওখানে আসা অনেকে খেয়াল করছে৷ তারা মায়ের এসব কান্ড দেখে অবাক হচ্ছে, আবার হাসছে, বা চুপচাপ দেখে চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দেখছে মা আর আমার একই রকমের ড্রেস দেখে। আমি এসব দেখে না দেখার ভান করছি।
অনেকটা সময় পর সমুদ্র থেকে উঠে ফিশ ফ্রাই খাওয়ার জন্য একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। ওখানে ফিশ ফ্রাই খেলাম। তারপর বের হয়ে আবার সিএনজি নিয়ে নিউ মার্কেট এরিয়ায় আসার জন্য চেপে বসলাম।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- "বাবা আজকের দিনটা সত্যিই এই বয়সে এসে আমার জীবনের সেরা দিন। খুব উপভোগ করেছি। কিন্তু লজ্জাও লাগছে যখন আমাদের দুজনের দিকে লোকজন সবাই...."
মায়ের মুখ থেকে কথা কেঁড়ে নিয়ে আমি বললাম,
- "মা, যে লোকের মনমানসিকতা যেমন সে তেমন ভাববে৷ তাদের ভাবতে দাও না। আমি আমার মাকে নিয়ে কি এভাবে ঘুরতেও পারব না? আমার ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারব না? সারাদিন তো ঘরের ভেতর থেকে বের হও না৷ কোথাও যাও যদি এই গেলে এই এলে এমন কর। ঘরের কাজ, বাইরের কাজ এটা ওটা করতে করতে একটু বের হওয়ার, ঘুরার সুযোগ পাও না৷ আজকে মনে হলো আমি তোমাকে এভাবে ঘুরাই। এতে কে কি বলল তাতে কিছু যায় আসে না আমার।"
একটু পর সিএনজি নিউ মার্কেট এরিয়ায় চলে এল। সিএনজি থেকে নেমে গেলম আমি। মাকে মার্কেট এর সামনে দাঁড় করিয়ে বললাম,
- "মা একটু দাঁড়াও তুমি। আমি দুই মিনিটে আসছি।"
আমি ঝটপট ফুলের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। খুব তাড়াতাড়ি আবার ফিরেও এলাম। হাতে একটা ফুলের তোড়া নিয়ে। মায়ের কাছে আসাতেই মা আমার দিকে কেমন যেন চোখ করে তাকাল।
আমি কাছে গিয়ে মাকে হাত ধরে নিউ মার্কেটের মোড়ের মাঝখানে নিয়ে এলাম। এরপর হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লাম রাস্তায়। মায়ের দিকে ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে অনেকটা জোরে চিৎকার দিয়ে বললাম,
- ❝মা, মরে যাওয়ার জন্য হাজার হাজার রাস্তা আছে, কিন্তু জন্ম নেওয়ার জন্য একমাত্র তুমিই আছ। মা, আজকে মা দিবস। আজকের এই দিনে তোমার দেওয়া দিনটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। তুমি আমাকে জন্ম দিয়ে নতুন দুনিয়া দিয়েছ। তার বিনিময় কখনও শোধ করতে পারব না। এটা চাই আজীবন যেন তোমাকে সুখী রাখতে পারি৷❞
কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে থামলাম। মুহুর্তের মধ্যে হাজার হাজার করতালি, চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠল নিউ মার্কেট মোড়ের ঠিক মাঝখানটা! আমি খেয়াল করে দেখলাম আমি আর মাকে চারপাশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘিরে রেখেছে। তাদের কারও মুখে হাসি। কারও চোখে কান্না, আনন্দের হাসি হাসছে তারা। আবার কারও মা নেই বলে মুহুর্তটা মনে করে চোখের পানি লুকানোর জন্য কেউ চোখ মুছছে!
মা এগিয়ে এসে আমার থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে জড়িয়ে ধরল। অনুভব করলাম আমার কাঁধে বৃষ্টির মতো পানি গড়িয়ে পড়ছে৷ কিছু কিছু কান্না সুখের কারণও হয়।
এটা সত্যি ঘটনা নয়। আমি সুযোগ পেলে আমার মাকে নিয়ে এভাবে ঘুরব আগামীর সবগুলো মা দিবসে।
পৃথিবীর সকল মা দের মা দিবসের শুভেচ্ছা। মাকে ভালোবাসুন৷ মায়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। মক্কা-মদিনা গিয়ে হজ করতে হবে না। মায়ের দিকে একবার সুন্দর করে তাকালে, সুন্দর ব্যবহার করলে একটা কবুল হওয়া হজের সওয়াব পাওয়া যায়৷
