তৃপ্তির আহার
তৃপ্তির আহার
আমার কয়েকটা সার্টিফিকেট তোলার জন্য শিক্ষাবোর্ডে যায়। সবগুলো কাজ শেষ করে বের হতে হতে দুপুর দুইটার মতো বাজে। কাজ শেষ করে বাইরে বের হয়ে বুঝতে পারি প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। এতক্ষণ সার্টিফিকেট তোলার টেনশনে খিদের কথা মাথায় ছিল না।
যাই হোক যথারীতি আমি শিক্ষাবোর্ড অফিস থেকে বের হয়ে বাইরে চলে আসি। অনিচ্ছা স্বত্তেও কিছু খাওয়ার জন্য মনোনিবেশ করি। আসলে আমি বাইরের খাবার একদম খাই না। অতি বেশি খুদা নিবারণ করতে না পারলে বা সহ্য করতে না পারলে তবেই কিছু খাই। কিন্তু এবার আমি পারছিলাম না আর সহ্য করতে। কিছু না খেলে আর চলবে না। তাছাড়া বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনেকটা পথ বাসে করে যেতে হবে। খালি পেটে তো আর এতটা পথ যাওয়া যাবে না।
তবে তার জন্য আগে পকেটের স্বাস্থ্য দেখা দরকার আমার। কারণ আমি যে শিক্ষাবোর্ড থেকে বের হলাম সেখানে ইতিমধ্যে অনেক টাকা চলে গেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এখানের পিওনদের আগে সন্তুষ্ট করতে হয়। তারপর ফাইল এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে যায়। এদেশের সবগুলো সেক্টরে এখন ব্যাপক হারে ঘুষ, সুদ, দূর্নীতি বেড়ে গেছে। পিওন থেকে প্রথম শ্রেণির সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া কথা বলে না। তাদের কাছে এটা অবশ্যই চা নাশতা খাওয়ার মতো ব্যাপার।
সুতরাং আমার কাছ থেকে এই মদনগুলো একটা অংশ নিয়েছে এরপর ফাইলটা নড়াচড়া করছে।
বাইরে এসে এক জায়গায় বসলাম। তারপর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলাম। সব টাকাগুলো বের করে গুনতে লাগলাম। দেখলাম গাড়িভাড়ার টাকা বাদ দিয়ে আর কিছু টাকা থাকে। সেই টাকা যথেষ্ট নয় খাবার খাওয়ার জন্য! একটা মধ্যম সাইজের হোটেলে খাবার খেতে গেলে মিনিমাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে নেবে। কিন্তু আমার কাছে গাড়িভাড়া বাদ দিয়ে টাকা আছে ১০০ এর মতো!
টাকা দেখে খিদের কথা ভুলেই গেলাম মনে হয়। মাথায় এলো তখন এরকম হোটেলে না খেয়ে ছোটোখাটো কোনো ভাতের দোকান পাওয়া যায় কি না। একজনের থেকে জিজ্ঞেস ও করলাম। ওনি বলেও দিলেন এরকম ছোটোখাটো ভাতের দোকানের সন্ধান দিলেন আর সেদিকে হাঁটতে লাগলাম।
১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর পেয়েও গেলাম কয়েকটা মিনি ভাতের দোকান৷ একটু এদিক ওদিক দেখে একটা ফাঁকা দোকান দেখে সেটাতে ঢুকে গেলাম। এখানে লোকজন তেমন নেই। নাই বললে ভুল হবে। অন্য দোকান থেকে একটু কম আছে আর কি। ভাত খাবার আগে জিজ্ঞেস করে নিলাম কি দিয়ে খেলে কত টাকা খরচ হবে। বড় হোটেল থেকে দাম কম। তবে কিছুটা। যাই হোক আমি ডিমের তরকারি দিয়ে ভাতের অর্ডার দিলাম৷
আমি ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসে অপেক্ষা করছিলাম কখন খাবার নিয়ে আসেন। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। খাবার চলে এল। সুগন্ধি পেয়ে বুঝতে পারলাম খাবার এতটা খারাপ হবে না। ভালোই হবে।
যাই হোক আর দেরি করা যাবে না। এবার খেয়ে নিতেই হবে।
প্লেট নিয়ে তাতে ভাত নিলাম। তরকারি মানে ডিমটা নিতে যাব ঠিক সেই মুহুর্তে আমার শরীরে কেউ স্পর্শ করল! আমাকে কে ধরল সেটা দেখতে গিয়ে দেখি একটা ৬০-৭০ বছরের মহিলা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে! আমি ওনার দিকে যখন তাকালাম তখন ওনি মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়েছে। কোনদিকে ওনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেটা দেখতেই দেখলাম ওনার নজর আমার খাবারের প্লেটের দিকে!
হঠাৎ মেয়েটা আমার শরীর নেড়ে বলল,
❝বাজান, আজ দুইদিন ধরে কিছু খাই নি। টসকামপয়সা কিছু নাই। তাই খাবার খেতে পারি নি। খিদের জ্বালায় থাকতে না পেরে বের হয়েছি। আর পারছি না থাকতে আমি। খুব খিদে লেগেছে। আমাকে কিছু খাবার দাও। আল্লাহ তোমার ভালো করবে।❞
কথাটা বলতে দেরি মহিলাটা কেঁদে দিল। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না ব্যাপারটা! কেমন যেন নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল! আর খেলাম না আমি ভাতগুলো৷ উঠে গেলাম আমার বসার জায়গা থেকে। তারপর ওনাকে আমার জায়গায় বসিয়ে দিলাম।
❝এইগুলো আপনার৷ আপনি এখান থেকে খান। পেট ভরে খান। আপনার টাকা আমি দিয়ে দিব।❞
ঠিক তখন দোকানদার বলে উঠল, ❝ভাই আপনি এদের কথা বিশ্বাস করবেন না। এরা এরকম করে সবসময়। অপরিচিত লোকজন দেখলে তাদের ইমোশনাল কথা বলে। খাবার খাওয়ার কথা বলে। নানা রকম মিথ্যা কথা বলে মানুষের থেকে খাবার খায়, টাকা চায়, সুযোগ পেলে চুরি করে।❞
আমি একটু মুচকি হেসে লোকটাকে বললাম, ❝ভাই, আপনি তো সাহায্য করছেন না, অন্যকেউ করলে তাকে মানা করবেন না৷ খিদের জন্য ওনি কাতর হয়ে আছে। কথাও বলতে পারছে না ভালো করে। আমি জানি খিদের জ্বালা কি। কত কষ্ট খিদের।❞
এরপর পকেটে হাত দিয়ে ১০০ টাকার নোটটা বের করে ওনাকে দিয়ে বললাম, ❝আমার কাছে নির্দিষ্ট গাড়িভাড়া বাদে খাওয়ার জন্য এই ১০০ টাকা ছিল। সেই ১০০ টাকার পুরোটা আমি আপনাকে দিচ্ছি। ওনাকে পেট ভরে খাওয়াবেন। যদি আরও চায় তাহলে আপনার দায়িত্বে খাওয়াবেন৷ আল্লাহ আপনার ব্যবসায়ে বরকত দিবেন।❞
কথাগুলো বলে একবার মহিলার দিকে তাকালাম। দেখলাম ওনি তৃপ্তির সাথে আামর আসনে বসে আমার জন্য আনা ভাত তরকারি খাচ্ছে! নাহ, ওনার খাওয়া দেখে আমার পেট ভরে গেল! অনুভব করলাম আমার খিদেও উধাও হয়ে গেছে। আশ্চর্য ব্যাপার একটু আগে খিদের জন্য অপেক্ষা করতে পারছিলাম না, আর এখন খিদে গায়েব হয়ে গেছে!
- ***** সমাপ্ত *****
