অক্সিজেন সংকটে - রাগিব আবিদ
অক্সিজেন সংকটে - রাগিব আবিদ
অনুচ্ছেদ ১ : বিদঘুটে সৃষ্টি
-----------------------------------
অতঃপর তুমি সদর দরজায় এসেও আমায় ডাকলে না, বারংবার আমারই তোমায় ডেকে নিতে কেন হবে? আমি তো তোমার অপেক্ষারই প্রহর গুনি! অথচ তুমি জানলেও না, আমি কতবার তোমার দিকে ফিরে যেতে চেয়েছি! এই বিষাদগ্রস্ত শহরে তোমার আমার গল্পের ভীড়ে কত অহেতুক ফেরিওলার দেখা মিললো, কত বেমানান আত্মচিৎকার কর্কশ স্বরে কানে এসে ঠাঁই পেল, কত অহেতুক ফুপিয়ে কান্নার স্পর্শে ভিজলাম, তাঁর কলিজা টেনে হিচরে ছিড়ে ফেলতে গিয়েও সে পথ ভুলে দাঁড়িয়ে, পাশে অপেক্ষা আর কত শত জান্ত লাশ! পচা লাশের গন্ধে অপৃপ্ত আত্মারা ভালোবাসা চুরির ফাঁকে বিশ্রী কন্ঠে তোমার আর্তনাদ, বুঝলাম এসব মনে পড়বার নিরর্থক যন্ত্রনা মনে পড়বে আরো কয়েক'শ যুগ! এপিটাফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে খানিকটা দূরে বৃষ্টির ঝুড়ি ঝুড়ি বরফের স্পর্শটা যেন তোমার কথা বলে, উহু,পথ চেয়ে শুধু আমি আর নিস্তব্ধতা! হাত বেয়ে টুপ টুপ করে চুয়ে পড়া কয়েকফোটা অসুস্থ রক্ত বিন্দু, স্মৃতি খাতা উল্টোতে থাকা বিশ্রী মস্তিষ্ক, তার উপর উড়ছে দল বেঁধে কত মাছি,মশা আর ছোট ছোট রক্তচোষক! বৃষ্টির শব্দে নিস্তব্ধ চারপাশ, হুট করে ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠে জানান দেয়, এপিটাফে আর দাঁড়ানোর ঠাঁই নেই। বৃষ্টি ভেজা দিনে আরো একদিন আপনার গল্প নিরর্থক যন্ত্রনা নিয়ে মনে পড়তে চাইবে, হয়তো ততদিনে এপিটাফ ছেড়ে অন্য কোথাও দাড়াবো!
অনুচ্ছেদ ২ : রক্তক্ষরণ
----------------------------------
এপিটাফে সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত আত্মাটা আমার! অস্তিত্বের অবয়বে আমি ঢের করে বলতে পারি, রক্তচোষক কয়েকদল ছোট্ট কিট ছোকড়া আমায় তাড়া করছে, হয়তো জানে না আমার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা খুব বেশি হলে ০ এর কাছাকাছি! আমি খোলা আকাশের নিচে বিষাদগ্রস্থ সুবিশাল দেহ নিয়ে উদ্ভট ভাবে শুয়ে আছি, আবার ও বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মশার দল মৃত্যুর অপেক্ষা করছে, রক্তচোষক রক্তক্ষরণের, তোমার কলিজাটুকু টেনে হিচরে ছিড়ে ফেলবো বলে ছোট খাটো একটা বাধাই করা ছুড়ি হাতে নিয়ে কয়েক'শ গবেষণার পর স্থির করলাম, এই অভ্র বিকেলে বিক্ষোভের মিছিল নিয়ে আমি অনশন করবো, যেন আরেকবার মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে যেতে পারি, তোমাকে মনে পড়বার যন্ত্রনা আমায় রোজ তোমার বুক ছিঁড়ে ফেলতে বলে, কত শত মিথ্যে অভিনয় আর কথার আগ্রাসে অক্সিজেন সংকটে আমি বারংবার ভুগছি, আমার শ্বাসকষ্টের মাত্রা বেড়েছে, রক্তচোষকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুনছে, অর্ধেক দেহ হতে কি বিশ্রী গন্ধ ছড়াচ্ছে, কয়েক'শ মাছি তাদের ইফতার সাজাচ্ছে, দলে দলে যোগ দিচ্ছে আরো অনেকে, টুপ টুপ করে কয়েক ফোঁটা রক্ত আর বৃষ্টি একই সাথে আমার দেহের ওপাশ টায় সুরের মূর্ছনায় কাব্য বুনছে, অন্য পাশে আমি ছুরি হাতে তোমার অপেক্ষায়!
অনুচ্ছেদ ৩- বোবা টানেলে বিস্ফোরণ
-------------------------------------------------------
এপিটাফের চত্তরে তীব্র নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কি সব দেখতে লাগলাম! বোধ করি, বোবা টানেলে আর কোনদিন গিয়ে নিজের স্মৃতিটুকু ফিরে দেখা হবে না! চাই ও না! আপনার নিকট ব্যক্ত করা কিছু অহেতুক অভিপ্রায় এখনো বোবা টানেলে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে, আর তার সাথে আমার প্রাণের অস্তিত্বটাও! নীল আকাশ জুড়ে ট্রাফিকজেমে আটকা পড়া মেঘেদের কোলাহল পরখ করতেই আমি আমার চেনা পরিচিত একটা বিদঘুটে মেঘের বেমালুম দেখা পেলাম!একসময় মেঘটা আমার আমার আকাশেই বসন্ত ফোটাতো! রুহু অব্দি চাপা কষ্ট আর আমার অর্ধগলা দেহের বিচ্ছিরি বিকট গন্ধ বোবা টানেলে ভরপুর! মেঘটা আমার ভিতরের সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে বিচরন না করে আমার অর্ধপচে যাওয়া দেহের উপর ঘৃনা সৃষ্টি করে আত্মচিৎকার করতে লাগলো! বিচ্ছিরি বিকট শব্দে আমার আত্মা প্রাণ ফিরে পেতেই লক্ষ করলাম, আমার মস্তিষ্ক বেয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত টুপ টুপ করে পড়ছে, কয়েক'শ রক্ত চোষক আর ছোট ছোট মাছি মিলে তাদের তৃপ্তি মেটানোতে ব্যস্ত, আমিও বাধা দেই না আজকাল, অন্তত আমার পচে যাওয়া দেহের উপর কারো বিশেষ গুরুত্ব আছে এটা ভেবে কান্নার স্কন্দে নিজেকে ভেজাতে তো পারি! বোবা টানেলে ঢুকবার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও বারংবার ঢুকতে হয়, কখনও মস্তিষ্ক বেয়ে আবার কখনো স্মৃতির অসহ্যকর অবস্থায়! আমি এপিটাফে ছুরি হাতে সস্তা সব স্বপ্ন বুনতে বুনতে, কয়েকটা মেঘ আমার উপরে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, আজ বৃষ্টি হবে! তবে কিছু মেঘ গুমোট করুক আকাশের মাঝেই,সব মেঘেদের মাটির বুকে ঝড়ে পড়তে নেই। এই বিচ্ছেদের শহরে কিছু বিদঘুটে মানুষের মস্তিষ্কে থাকা নিউরনে মাইটোসিস বিভাজন হওয়াটা খুব দরকার! কেননা স্মৃতির অস্বস্তিকর কিছু অধ্যায়ের নিষ্পত্তি অতি প্রয়োজন, যেমন ভাবে বোবা টানেলে বিস্ফোরণ হওয়াটা আজ অনুভবে! বিদঘুটে আর বিচ্ছিরি গন্ধে হয়তো কেউ কোনো দিন আর পা পিছলে আমার টানেলে পড়বে না, কিন্তু স্মৃতির মতোই হৃদয়ে বোবা টানেলের গন্ধ স্পষ্ট টের পাই, আর বিস্ফোরণ? সে আশা কতকাল আগেই বাদ দিয়েছি!এখন অধির আগ্রহে নিজের মৃত্যুর অপেক্ষা করি!
(সংক্ষেপিত)
