STORYMIRROR

Nikhil Mitra Thakur

Classics

4  

Nikhil Mitra Thakur

Classics

অগ্নিকন্যা লতিকা ঘোষ

অগ্নিকন্যা লতিকা ঘোষ

3 mins
337

লতিকা ঘোষ (১৯০২-১৯৮৭)

১৯০২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পরাধীন ভারতে,বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগরে লতিকা ঘোষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম মনোমোহন ঘোষ ও মাতার নাম মালতী ঘোষ। ঋষি অরবিন্দ ঘোষ ও বিপ্লবী বারিন্দ্র ঘোষ ছিলেন লতিকা ঘোষের কাকা। রাজনারায়ণ বসু ছিলেন লতিকা ঘোষের বাবার মাতামহ। জন্মসূত্রে লতিকা ঘোষ ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা।

লতিকা ঘোষ কলকাতার বিখ্যাত লরেটো হাউসের ছাত্রী ছিলেন। ১৯২৪ সালে এখানের শিক্ষা শেষে তিনি উচ্চ শিক্ষার লাভের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি লিট রিসার্চ ডিগ্রি ও ট্রেনিং ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করে ১৯২৬ সালে ভারতে ফিরে আসেন।

জন্মসূত্রে লতিকা দেবী জাতীয়তাবাদী ভাবধারা স্নাত ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি জাতীয়তাবাদী মতবাদ ও কাজকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এই কারণে তার যোগ্য হওয়া স্বত্তেও তাকে সরকারি বেথুন কলেজে কাজ দেওয়া হয়নি। অবশেষে তিনি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে যোগ দেন।

চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে তখন দুঃস্থ বিধবা,স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের জুনিয়র নার্সিং ও ধাত্রী বিদ্যায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। দুই বছর ধরে প্রশিক্ষণ চলাকালে লতিকা দেবী তাদের রিপোর্ট লেখাসহ অন্যান্য কাজ শেখাতেন। এছাড়াও তিনি এখানে চিকিৎসক-প্রশিক্ষকদের বক্তৃতার ব্যবস্থাপনা ও সংগঠনের সব ব্যবস্থা করতেন ।

পরবর্তী কালে লতিকা দেবীর উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের আরো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এইসব প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা ছাড়াও ম্যাজিক ল্যান্টার্ন দেখানো হত। এই সমস্ত কাজের মাধ্যমে লতিকা দেবী মহিলাদের রাজনৈতিক ভাবে সচেতন করে তুলতেন এবং দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করতেন।

তার এইসব কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল,মহিলাদের কে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সামিল করা,তাদেরকে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করতে এগিয়ে দেওয়া এবং সমাজে মহিলারা যাতে নিজেদের স্থান নিজেরাই অর্জন করতে পারে তার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।

১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে লতিকা দেবী কংগ্রেসের আহ্বানে সাইমন কমিশন বয়কট করার উদ্দেশ্যে কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে আয়োজিত সভায় তার সংস্থার বহু মহিলাকে নিয়ে উপস্থিত হয়ে ছিলেন এবং তাদেরকে সাথে একসঙ্গে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করার শপথ গ্রহণ করেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু লতিকা দেবীর এই প্রচেষ্টায় মুগ্ধ হন এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ গড়ার পরামর্শ দেন।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মা প্রভাবতী দেবীর সাহায্যে তিনি সেই সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। প্রভাবতী দেবী ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি এবং লতিকা দেবী হয়েছিলেন সম্পাদিকা।১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে নিখিল ভারত কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে মহিলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কর্নেল হিসাবে লতিকা দেবী ভারপ্রাপ্ত ছিলেন।

এই অধিবেশনের উদ্বোধনের দিনে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর পরামর্শে লতিকা দেবীর নেতৃত্বে এক বিশাল স্বেচ্ছাসেবীকা বাহিনী মিলিটারি কায়দায় পুরুষদের সঙ্গে মার্চ করতে করতে প্রবেশ করে। ভারতবর্ষে প্রথম প্রকাশ্য রাস্তায় তিন শত মহিলা লাল পাড়ের সবুজ শাড়ি ও সাদা ব্লাউজ পরিহিত হয়ে পুরুষের সঙ্গে সামরিক কায়দায় মার্চে অংশ নেন। নারীশক্তির বিচ্ছুরণ দেখে সারা কলকাতা বিস্মিত হয়ে পড়ে।

"কর্নেল" লতিকা দেবীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের বিশাল প্রদর্শনী মণ্ডপে মহিলা বেষ্টনিতে প্রথম মহিলাদের হাতে তৈরি চা ও খাবার বিক্রি করা হয়। ছেলেরা ভাই ফোঁটা নিয়ে তবেই খাবারের টেবিলে যেতে পারবে সেইরকম ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তবেই এমন সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে লড়াই করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন ।

১৯২৮ সালে তিনি নিখিল বঙ্গ যুব সংঘের একজন সক্রিয় সদস্যা হয়েছিলেন এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের হয়েছিলেন । তিনি পরে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্যা হয়েছিলেন।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের পর অবশ্য লতিকা দেবী রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে সরে আসেন এবং অধ্যাপনার কাজে ব্রতী হন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মোরাদাবাদ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষা পদে যোগ দিয়েছিলেন। তিন বছর পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফিরে এসে কলকাতার বেথুন কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের মহিলা বিভাগের অধ্যাপিকা হন এবং ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে দমদম সরোজিনী নাইডু কলেজের অধ্যক্ষা পদে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর নেন।

১৯২৪ সালে লতিকা দেবী কংগ্রেস নেতা ও সুভাষচন্দ্র বসুর বন্ধু ড.সুবোধচন্দ্র বোসের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। লতিকা ঘোষ ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১১ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রয়াত হন।



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Classics