অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৭
অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৭
অহনা আর আদির দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ইভান আস্তে করে আয়ুশকে কোলে করে নিয়ে বেরিয়ে যায় সেই ঘর থেকে এবং যাওয়ার সময় আদিকে একটু সামান্য ধাক্কা দিয়ে বলে, " এই সুযোগ আদি, ভালো করে কথা বল তোর হবু স্ত্রীর সাথে । "
ইভানের ধাক্কা খেতেই আদি আর অহনার হুঁশ ফেরে তখন দুজনেই লজ্জায় মাথা নীচু করে নেয় । আদি বলে, " অহনা আমি তোমার সব কথা শুনেছি and I'm impressed । বিয়ের পর আমি কখনই আমার সিদ্ধান্ত তোমার উপর চাপিয়ে দেবো না , যে কোনো বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত আমরা দুজন মিলে আলোচনা করে ঠিক করে নেবো । জানোতো অহনা আমার বাবা - মা এবং দাদা - বৌদিও কোনোদিন কেউ কারো উপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় নি তাই তাদের মধ্যে আমি কোনোদিন কোনো রকম ঝামেলা হতে দেখি নি, হ্যাঁ তবে ছোটো - খাটো খুনসুটি চলতো । আদির এই সাবলীল কথাগুলো শুনে অহনা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আদির দিকে আসলে এখন এই মূহুর্তের আদিত্য মুখার্জীর সাথে আগে চেনা আদিত্য মুখার্জীকে কিছুতেই মেলাতে পারছে না । অহনা তন্ময় হয়ে ভাবে " আচ্ছা আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? " এই ভেবেই সে নিজের সাথে নিজেই একটা চিমটি কাটে তারপর নিজেই " উফ্! করে ওঠে । অহনার এই কান্ড দেখে আদি হেসে উঠে বলে, " আরে অহনা তুমি স্বপ্ন দেখছো না, যা সত্যি তাই দেখছো । কি হোলো মিলছে না তাইতো ? " আদির হঠাৎ এই শুনে হকচকিয়ে যায় সে তারপর মনে মনে বলে, " মিঃ মুখার্জী কি মাইন্ড রিড ( Mind Read ) করতে পারেন নাকি ? উনি বুঝলেন কি করে যে আমি ওনাকে কিছুতেই মেলাতে পারছি না । " ঠিক তখনই আবার আদি বলে ওঠে, " কি হোলো অহনা, ভাবছো তো যে আমি কি করে বুঝলাম ? " এই কথা শোনার সাথে সাথেই অহনা তাড়াতাড়ি লজ্জায় মাথা নীচু করে নেয় । আদি বলে, " আমি কোনোদিনই কারো সাথে এতো সাবলীলভাবে কথা বলি নি একমাত্র আয়ুশ, ইভান আর আমার সেক্রেটারী মিঃ ঘোষাল ছাড়া । আর কোনো মেয়ের সাথে আমার কোনোদিনই বনিবনা হয় না , তা সেটা স্কুল জীবন হোক বা কলেজ জীবন হোক অথবা কর্মজীবনেই হোক । তবে কেনো জানি না তোমার মধ্যে এমন কিছু আছে যা তোমার প্রতি আমাকে আকর্ষিত করেছে , যদিও এই আকর্ষণটা আমি আজকে ভীষনরকম ভাবে এই অনুভব করছি । " এই বলে আদি আলতো করে অহনার হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে, " Ahna will you marry me ? Will you ever regret this decision in the future ? " অহনা তখন ঠোঁটের কোণে আলতো লজ্জামাখা হাসির রেখা টেনে বলে , " হ্যাঁ আমি রাজি আপনার জীবনসঙ্গিনী হতে আর আজকের এই সিদ্ধান্তের জন্য আমি কোনোদিনও regret করবো না । তবে আপনাকে এই বিয়ের ব্যাপারে আমার মায়ের সাথে কথা বলতে
হবে । আমার বাবা মৃত আর মা আমার একমাত্র অভিভাবক তাই আপনাকে ওনার সাথে কথা বলতে হবে আর এই কাজটা খুব একটা সহজতর হবে না । " আদি বলে ওঠে, " মানে ? সহজতর হবে না কেনো ? " অহনা একটু হেসে বলে, " না, না ভয় পাওয়ার কিছু নেই , আমার মা ভীষণ ভালো । আসলে আপনার সন্তান আছে তা জেনে হয়তো বিয়েটা মেনে নেবে না সহজে । তবে আপনি আমার মায়ের কাছে সব কিছু খুলে বলবেন তারপর তো আমি আছি । আমি নিজেও মায়ের সাথে কথা বলবো । " অহনার কথায় বেশ দোটানায় পড়ে আদি ।
আদির কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বুঝতে পেরে অহনা বলে, " আমি আজকে বাড়িতে ফিরে এই ব্যাপারে মায়ের সাথে আলোচনা করবো । তারপর মায়ের কি
প্রতিক্রিয়া হয় সেই বুঝে আমি আপনাকে জানাবো । আপনি অযথা চিন্তা করবেন না মিঃ মুখার্জী । " অহনার কথার মাঝে হঠাৎ ইভান এসে ফোঁড়ন কেটে বলে, " একি অহনা এটা কি করছো ? " ইভানের আচমকা এই প্রশ্ন শুনে অহনা বিস্মিত হয়ে বলে, " আমি ? আমি আবার কি করলাম ইভান বাবু ? " ইভান বেশ গম্ভীর হয়ে বলে, " আর কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার আর আদির বিয়ে হতে চলেছে অথচ এখনো তুমি আদিকে মিঃ মুখার্জী এবং আপনি - আজ্ঞে করছো ? কেনো আমার মিষ্টি sister - in - law , আদিকে নাম ধরে ডাকতে আর তুমি বলে সম্বোধন করতে কি কোনো বিশেষ লগ্নের প্রয়োজন আছে ? " ইভানের কথায় অহনা লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে বলে ,
" না মানে , নাম ধরে কি করে ডাকবো ? " ইভান অহনার এই কথা শুনে হো - হো করে হেসে উঠে বলে, " সেকি অহনা , তুমি না একজন আধুনিকা তার উপর আবার
ডাক্তার । আচ্ছা, তুমি আজ এখন থেকে আমাকে ইভান আর আদিকে আদি বলে ডাকবে । Ok my dear sister - in - law . "
অহনা বলে, " আচ্ছা ঠিক আছে ইভান
বাবু । ওহ্ ! Sorry ইভান । " ইভান বলে,
" Good , এবার তোমার হবু স্বামীকে সম্বোধন করার পালা । " ইভানের এই মজা করা দেখে আদি বলে, " কি হচ্ছে টা কি ইভান ? এবার চুপ কর দেখি । " আদির ধমক খেয়ে একেবারে চুপ করে যায় ইভান আর মুখটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে পুরো বাংলার পাঁচ করে বসে থাকে । ইভানের রাগ করা দেখে অহনা হেসে বলে, " Little boy r u angry ? এই ইভান তোমাকে না এখন পুরো আয়ুশের মতো ছোটো বাচ্চা মনে হচ্ছে , ছোটো বাচ্চারা যেমন রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে । " এই বলে আবারও হেসে উঠলো অহনা আর অহনাকে হাসতে দেখে আদির ঠোঁটের দুকোণে ছড়িয়ে পড়লো সামান্য হাসির ঝলক । আদি বলে, " রাগ করিস না ইভান । " ইভান মুখটা গোমড়া করেই উত্তর দিল, " না রাগ করি নি, আমি রাগ করে কি করবো ? আমার রাগে কার কি যায় আসে ? " অহনা বললো, " ঠিক আছে ইভান এবার রাগ দানবের শরীরে বেশি করে বরফ ঢালো তাতে তার শক্তিটা কমে যাবে তারপর আস্তে আস্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে
যাবে । " ইভান এই কথা শুনে হো - হো করে হেসে উঠলো । এবার অহনা হঠাৎ প্রশ্ন করে,
" ইভান তুমি তো আমাকে এখন থেকেই sister - in - law বলছো কিন্তু আমার মা এই বিয়েতে মত না দিলে আমার কিছুই করার থাকবে না । এই নিয়ে আমার সত্যিই খুব টেনশন হচ্ছে , আমার মনে হয় মিঃ মুখার্জীর যে খুব টেনশন হচ্ছে সেটা ওনার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি অথচ দেখ তোমার কোনো চিন্তাই হচ্ছে না । তুমি কি করে নিশ্চিন্তে রয়েছো জানি না । " অহনার কথা শুনে ইভান বলে ওঠে, " জুনিয়র মিস সান্যাল কোনো চিন্তা নেই সিনিয়র মিসেস সান্যালকে নিয়ে । ওনার সামনে শুধু একজন খুব সাধারণ ব্যক্তিত্বপূর্ণ আদিত্য মুখার্জীকে দাঁড় করাতে হবে , কোনো গাম্ভীর্য মনোভাবাপন্ন বিজনেস ম্যান গেলে হবে না । " ইভানের কথা শুনে অহনা আর আদি একে অপরের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সটান মুখ ঘুরিয়ে ইভানের মুখের দিকে বিষ্ময়মাখা চোখে তাকিয়ে থাকে । ওদের দুজনের এই অবস্থা দেখে ইভান বলে, " কি হোলো মিস্টার এন্ড মিসেস মুখার্জী ? Is anything wrong on my face ? " অহনা যেন বশীভূতের মতো উপর - নীচে মাথা দুলিয়ে ছোট্ট একটা
" হুমমম " করে উত্তর দিতেই ইভান বলে,
" সেকি ! কি হয়েছে আমার মুখে ? " ইভানের কথা শুনে আদি বলে, " এই, তুই এতো নিশ্চিতভাবে কি করে বলছিস যে অহনার মাকে নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না ! " অহনাও আদির কথায় তাল মিলিয়ে বলে,
" হ্যাঁ, আমারও তো সেটাই ভেবে অবাক লাগছে । " আদি আর অহনার কথা শুনে ইভান বলে, " আরে এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই । আমি আজকেই একবার তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম তোমার মায়ের সাথে আলাপ করতে । আমি গিয়ে তোমার মায়ের সাথে কথায় কথায় বললাম যে একটা খুব ভালো ছেলে আছে, যাকে অহনাও খুব পছন্দ করে । অহনা পছন্দ করে শুনে মাসিমা কৌতুহলবশতঃ জিজ্ঞাসা করলেন সেই ছেলে কে ? আমিও সব বিস্তারিত বলে দিলাম । তাতে মাসিমার কোনো আপত্তি নেই
তবে........ "। অহনা বলে, " তবে ? তবে কি ? এমন কি বলেছে মা যেটা বলতে তোমার কুণ্ঠাবোধ হচ্ছে । শোনো ইভান, আমি যখন ঠিক করেছি আয়ুশের দায়িত্ব নেবো একজন প্রকৃত মা হয়ে তখন সেটা আমি করবোই । এবার মা কি বলেছে সেটা আমার এবং মিঃ মুখার্জী উভয়েরই জানা প্রয়োজন তাই কোনোরকম তবে - কিন্তু এসব না করে বলে ফেলো । " ইভান অবাক হয়ে অহনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, " সত্যি অহনা, তোমার তুলনা নেই । তুমি খুব দৃঢ়চেতা , তুমি ঠিক পারবে আমার চ্যাম্পকে সুস্থ করতে । " তারপর আদির দিকে তাকিয়ে বলে, " আদি, তুই সত্যিই খুব ভাগ্যবান । এতোদিন বিয়ে করবি না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি কারণ সে আয়ুশের জন্য ভালো মা হতে পারবে কিনা তাই ভেবে । ভগবানের কৃপায় আজকে তোর আর আয়ুশের জীবন নতুন করে সাজতে চলেছে । " ইভানের কথা শুনে আদি একটু চুপ করে থাকে তারপর বলে, " হ্যাঁ, আমি সত্যিই ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞ অহনার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটানোর জন্য । এবার তুই বল অহনার মা exactly কি বলেছেন ? অহনাও আদির কথার তালে মাথা নাড়ায় । ইভান টেবিলের উপর রাখা জলের বোতল থেকে কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে বলতে শুরু
করে । ইভান বলে, " আমি যখন মাসিমাকে বললাম গ্যালাক্সি শপিং কমপ্লেক্সের মালিক মিঃ আদিত্য মুখার্জী অহনাকে বিয়ে করতে আগ্রহী , সেই শুনে মাসিমা প্রায় লাফিয়ে উঠে বলেন, " অসম্ভব " । আমি তখন বললাম, কেনো মাসিমা এতে অসম্ভবের কি আছে ? আদিত্য আমার ছেলেবেলার বন্ধু , তাই আমি ওকে আমার হাতের তালুর মতো চিনি । আদির মতো ছেলে পাওয়া খুবই দুস্কর , ওর টাকাপয়সা - সম্পত্তির অভাব নেই , মনটা একেবারে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, কোনোরকম নেশা নেই , আজ পর্যন্ত একটাও প্রেম - ট্রেমও হয়ে ওঠে নি ওর দ্বারা । " এসব শুনে উনি বললেন, " সবই তো বুঝলাম । আচ্ছা ওনার তো একটি ছেলে আছে যার চিকিৎসা করছে আমার মেয়ে তাইনা ? তুমি বলছো কোনোদিন কোনো সম্পর্কে ছিল না তবে এক ছেলের বাবা হোলো কিভাবে ? " " আমি তো একথা শুনে কি বলবো বুঝতে না পেরে যা সত্যি সব বললাম, সব শুনে উনি এই ব্যাপারে আদি এবং তোমার সাথে কথা বলতে চান । এখন সবটাই তোমাদের উপর নির্ভর করবে । " সব কথা শুনে আদি বলে,
" হুমমম বুঝলাম, ঠিক আছে আমি ওনার সাথে কালকেই দেখা করবো । " অহনা বলে,
" না না মিঃ মুখার্জী, আমি আজকে বাড়িতে গিয়ে আগে মায়ের সাথে কথা বলি তারপর আপনাকে জানাবো । তাহলে আজকে আমি চললাম । " আদি বলে, " অহনা, এখনও কি আমাকে মিঃ মুখার্জী বলেই সম্বোধন
করবে ? " আদির মুখে একথা শুনে লজ্জায় অহনার মুখ লাল হয়ে ওঠে, অহনা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায় ঘর থেকে । অহনা বেরিয়ে যেতেই ইভান বলে, " বাহ্ ! তাহলে আদিত্য মুখার্জী খুব শীঘ্রই বিয়ে করে সংসারী হতে চলেছেন । আদি আর দেরী করে লাভ নেই , বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দেই তাইতো ? " ইভানের ঠাট্টা বুঝতে পেরে আদিও লজ্জা পেয়ে উঠে চলে যায় নিজের স্টাডি রুমে ।
******** To Be Continued

