অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৩
অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৩
পরেরদিন সকাল নয়টা নাগাদ আদিত্যর মোবাইলে একটা ফোন আসে । অচেনা নাম্বারের ফোন আদিত্যর ধরার অভ্যাস নেই তবুও হয়তো অহনা সান্যালের ফোন হতে পারে ভেবে ফোনটা রিসিভ করে বলে ," হ্যালো , কে বলছেন ? " অপরপ্রান্ত থেকে উওর আসে , " নমস্কার মিঃ মুখার্জী , আমি অহনা , অহনা সান্যাল । " আদিত্য বলে, " আমি বুঝতে পেরেছি , হ্যাঁ বলুন কি বলবেন । " অহনা একটু চুপ করে থেকে বলে , " কালকে আমি আয়ুশের ব্যাপারে অনেক ভাবলাম । সব দিক ভেবে একটা উপায় বের করেছি তবে জানি না তা আপনার পছন্দসই হবে কিনা । " অহনার কথা শুনে আদিত্য বলে, " ঠিক আছে আপনি বলুন তো একবার , আপনার প্রস্তাব যদি ভালো হয় তাহলে তো পছন্দ না হওয়ার কিছু নেই । আপনি নিশ্চিন্তে বলুন । " আদিত্যর কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে অহনা বলতে শুরু করে , " আমি যে নার্সিংহোমে যুক্ত আছি সেখানে সকাল দশটা থেকে দুপুর তিনটে পর্যন্ত থাকি । সকাল দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে ( outdoor ) চাইল্ড কাউন্সিলিং করি । ওখানেই বাচ্চাদের একটা খেলার ঘর আছে যেখানে অনেক বাচ্চারা নানা রকম অ্যাক্টিভিটিস করে থাকে যেমন - Drawing, Puzzle game ইত্যাদি । ওদের সাথে আমি দুপুর বারোটার পর থেকে তিনটে পর্যন্ত থাকি । That time is the most favorite time of the day for me . তাই বলছিলাম আয়ুশের স্কুল কখন ছুটি হয় আমি ঠিক জানি না তবে স্কুল ছুটির পর যদি সোজা আমার কাছে চলে যায়.......... । " অহনাকে মাঝপথে থামিয়ে আদিত্য বললো, " আয়ুশের স্কুল ছুটি হয় সকাল ১১ টা বেজে ৩০ মিনিটে , কিন্তু ওতো সবার সাথে মিশতে পারে না এছাড়া কাউকে নিজের কাছেই আসতে দেয় না তবে কি করে ওকে পাঠাবো । " অহনা বলে , " বেশ তো, স্কুল ছুটির পর যখন আয়ুশ আসবে তখন নার্সিংহোমের গেট থেকে আমি ওকে নিয়ে নেবো । Don't Worry Mr. Mukherjee . তাহলে এবার আপনি বলুন কি করবেন ? ও আরেকটা কথা দুপুর তিনটের পর আয়ুশকে নিয়ে আমি আপনার বাড়িতেই যাবো এবং আয়ুশের দেখাশোনা করবো । তবে রাত আটটা পর্যন্ত থাকতে পারবো কারণ দেরী হলে বাড়ি ফেরার জন্য গাড়ি পেতে সমস্যা হবে । " সব কথা শুনে আদিত্য বলে , " ঠিক আছে মিস সান্যাল , তাহলে কালকে থেকে স্কুল ছুটির পর আমার ড্রাইভার আয়ুশকে আপনার কাছে পৌঁছে দেবে । তবে একটা অনুরোধ আছে, আয়ুশ রোজ আপনার কাছে পৌঁছালে আপনি আমাকে একটু জানিয়ে দেবেন । আর গাড়ি ঐ সময়টুকু ওখানেই থাকবে, দুপুর তিনটের পর আপনি আয়ুশকে নিয়ে গাড়িতে করেই আমার বাড়িতে চলে আসবেন । " অহনা বলে, " অসংখ্য ধন্যবাদ মিঃ মুখার্জী । আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো আয়ুশকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার । তাহলে এখন ফোন রাখলাম । Have a good day Mr. Mukherjee . " এই বলে অহনা ফোন রেখে দিতেই আদিত্য তাড়াতাড়ি করে ইভানকে ফোন করে সব কথা জানায় , তারপর মিঃ ঘোষালকে ফোন করে বলে, " ঘোষাল মিস অহনা সান্যাল রাজি হয়েছে । তুমি একটা কাজ করো একবার আমার বাড়িতে চলে এসো কিছু কথা বলার আছে । " মিঃ ঘোষাল, " Ok Sir " বলে ফোন রেখে দেয় ।
দুপুর বারোটা নাগাদ আয়ুশকে স্কুল থেকে নিয়ে একবারে আদিত্যর বাড়িতে আসে মিঃ ঘোষাল । ততোক্ষণে ইভানও এসে উপস্থিত । আয়ুশ ঘরে ঢোকার পর আদিত্য তাকে কোলে বসিয়ে বলে , " সোনা কালকে যে আন্টিটা এসেছিল তোমার মনে আছে ? " আয়ুশ উপর - নীচে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ করে । আদিত্য আবার বলতে শুরু করে , " ঐ আন্টিটা আমাকে ফোন করে বললো কালকে থেকে তোমার স্কুল ছুটির পর ওনার কাছে পাঠিয়ে দিতে । ওখানে আরও অনেক বেবী থাকবে তোমার সাথে খেলার জন্য আর ঐ আন্টিও থাকবে তোমার সাথে । তুমি যাবেতো ? " আয়ুশ একটু চুপ করে থেকে ইভানের মুখের দিকে তাকায় তখন ইভান বলে , " Champ, say yes . Best of luck champ. Say yes . " তখন আয়ুশ একগাল হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের ছোট্ট মাথাটা
উপর - নীচে নাড়িয়ে সম্মতি জানায় । ছেলে রাজি হওয়ায় আদিত্য আর ইভান দুজনেই " That's like a good boy " বলে চীৎকার করে ওঠে ।
পরেরদিন আয়ুশের স্কুল ছুটির পর আদিত্য নিজেই ছেলেকে নিয়ে পৌঁছে যায় অহনার নার্সিংহোমে । সেখানে পৌঁছে অহনাকে ফোন করতেই সে ছুটে আসে নার্সিংহোমের ভিতরে যাওয়ার প্রবেশদ্বারে । " I'm extremely sorry Mr. Mukherjee , আপনারা কি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ? আসলে এইমাত্র আমার আউটডোরের রোগী দেখা শেষ হোলো , তাই নীচে নামতে একটু দেরী হয়ে গেল । " আদিত্য একটা আলতো হাসি মুখে টেনে বলে , " It's ok , আমরাও এইমাত্র এসেছি । আপনার দেরী হয় নি । " অহনাকে দেখার সাথে সাথেই আয়ুশ গিয়ে অহনার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর অহনার সাথে যাবার জন্য মাঝেমধ্যে হাত ধরে টানছে । আদিত্য ছেলের কান্ড দেখে বলে, " কি হোলো আন্টির হাত ধরে টানছো এভাবে, আন্টি পড়ে যাবে তো । " অহনা " না, না কোনো ব্যাপার না । আমি ওকে নিয়ে উপরে যাচ্ছি , আপনিও আসুন না একবার সমস্তটা নিজের চোখে দেখে যান । " অহনার কথা শুনে আদিত্য " Ok , চলুন " বলে পা বাড়ালো । আদিত্য অবশ্য মাঝেমধ্যেই আড়চোখে খেয়াল করছে আয়ুশ যেন অহনা আন্টিকে পেয়ে আজ ভীষণ খুশি । অহনার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে চলেছে জুনিয়র । ঘরের বাইরে একদম নতুন একটা জায়গায় একজন স্বল্প পরিচিতার সাথে এতোখানি স্বতস্ফূর্তভাবে থাকতে আয়ুশকে আগে কখনো দেখেনি সে । আদিত্য মনে মনে ভাবে , " অহনা কি এমন যাদু করেছে আয়ুশের ওপর কি জানি , তবে কেনো জানি না মন বলছে হয়তো এই মেয়েটি ঠিক পারবে আয়ুশকে স্বাভাবিক করে তুলতে । হে ভগবান অহনার পাশে থেকো তুমি যাতে সে আমার ছোট্ট সোনার মুখে কথা ফোটাতে পারে । " সেই সময় " মিঃ মুখার্জী ! মিঃ মুখার্জী ! " ডাকে সম্বিত ফেরে তার , চোখ তুলে অহনার দিকে তাকাতেই অহনা বলে , " ভিতরে আসুন , আমার মনে হয় আপনার ভালোই লাগবে । " অহনার ডাকে " হ্যাঁ আসছি " বলে ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে যায় আদিত্য , চারিদিকে অনেক ছোটো ছোটো বাচ্চা ছেলে - মেয়ে নিজেদের মতো ব্যস্ত সকলেই । গোলাপী রঙের শাড়ি পরিহিতা অনেকগুলো কমবয়স্কা থেকে মধ্যবয়স্কা বেশ কিছু attendent রয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে । " ব্যবস্থা বেশ ভালোই এখানে, এবার আয়ুশ কি করে সেটাই দেখার বিষয় " মনে মনে ভাবে আদিত্য । এমন সময় হঠাৎ একটা চীৎকার , আয়ুশ আর আরেকটা বাচ্চা একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে টানাটানি করছে এবং আয়ুশ সেটা নেবার জন্য চীৎকার করছে । অহনা আর আদিত্য দুজনেই তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় । আয়ুশের এই আচরণের জন্য আদিত্য ধমক দিতেই আয়ুশ অহনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে । তখন অহনা অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, একটা চকোলেট দিয়ে আয়ুশকে শান্ত করতেই আয়ুশ রাগত দৃষ্টিতে তাকায় বাবার দিকে । ছেলে রেগে গেছে বুঝতে পেরে আদিত্য অহনাকে ইশারা করে বলে আয়ুশকে একটু সামলে নিতে । ধীরে ধীরে আয়ুশের রাগ কমে যায় অহনার সাথে খেলার মাধ্যমে । এভাবে কখন যে তিনটে বেজে যায় অহনা এবং আদিত্য খেয়ালই করে নি । দুপুর তিনটে মানে অহনার সেদিনের মতো নার্সিংহোমের কাজ শেষ তাই ওরা দুজন একসাথেই আয়ুশকে নিয়ে রওনা হোলো বাড়ির দিকে, ঠিক যেমনটা কথা ছিল অহনার । বাড়িতে ঢুকেই আয়ুশ অহনার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় নিজের ঘরে । অহনা আয়ুশের ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে চারিপাশ দেখতে থাকে আর মনে মনে ভাবে , " সত্যি প্রচুর টাকা না থাকলে হয়তো এতো সুন্দর করে সাজানোই যেতো না একটা শিশুর ঘর । টাকা থাকলে সবকিছুই সম্ভব । "
আয়ুশের ঘরটা বোধকরি ১২ × ১৮ হবে । ঘরটির একদিকে রয়েছে একটা খুব সুন্দর একটা ছোটোখাটো পালঙ্ক , তার উপর গুছিয়ে রাখা অনেকগুলো সফ্ট টয়েজ । পিছনের দেওয়ালে বিশাল বড়ো বাঁধানো ফ্রেমে আয়ুশের জন্ম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ছবির কোলাজ । ঘরটির সিলিংয়ে যেন পুরো আকাশটাই তুলে আনা হয়েছে , চারপাশের দেওয়ালের উপরেও নানা ধরনের ছবি আঁকা । ঘরটির একদিকে বিছানা, স্টাডি টেবিল , দুটো ছোটো বুক সেল্ফে থাকে থাকে সাজানো সমস্ত শিশুদের নানাবিধ বই আর অপরদিকে আছে একটা ছোটোখাটো শিশুউদ্যান । সেখানে আছে দোলনা , স্লাইড , কাঠের বড়ো একটা ঘোড়া , ক্যাটারপিলার টানেল ইত্যাদি অনেক কিছু । অহনা এর আগে কখনো কারো বাড়িতে এতো সুন্দর করে সাজানো শিশু কক্ষ দেখেনি তাই বিস্ময়ের সীমা ছিল না তার । সত্যিই মনে মনে আদিত্যর ছেলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রশংসা না করে পারলো না অহনা । বাড়ি যাবার আগে পর্যন্ত আয়ুশের সাথে নানা ধরনের খেলা , গল্পের বই থেকে গল্প পড়ে শোনানো এইসব করেই দারুণ সময় কেটে যায় অহনার । অহনা বাড়ি ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই আয়ুশ অহনার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আটকানোর চেষ্টা করে তাই অনেক চেষ্টা করে বুঝিয়ে কোনোরকম শান্ত করে বেরিয়ে যায় অহনা । আদিত্য ড্রাইভারকে বলে , " আমান ভাই প্লিজ আপ অহনা ম্যাডামকো উনকে ঘর লে যাও । ম্যাডাম ঘরকে আন্দর যানে তক্ আপ ইন্তেজার করনা , ঠিক হ্যায় ? " ড্রাইভার আমান " জী স্যার " বলে অহনাকে নিয়ে রওনা দেয় । " আদিত্য মুখার্জী সত্যিই খুব ভালো মানুষ " মনে মনে ভাবে অহনা । বাড়ির ভিতরে ঢুকে অহনা ড্রাইভারকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসে পড়ে । আজকে খুব ধকল পড়েছে , আসলে অন্য দিনগুলোতে দুপুর তিনটের পর হয় সোজা বাড়িতে ফিরে আসে আর নয়তো প্রিয় বান্ধবীর বাড়িতে বসে জমিয়ে আড্ডা দেয় । সেদিন প্রথম নার্সিংহোমের ডিউটির পর আয়ুশের জন্য কিছুটা বাধ্য হয়েই তাকে দেখাশোনার কাজটা ওকে নিতে হয়েছে । মেয়েকে সোফায় ক্লান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে অহনার মা পাশে গিয়ে বসলেন , মাকে দেখে অহনা আলতো করে মায়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিতেই মা বলেন , " কিরে ! তোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে আজকে , কি হয়েছে ? " মায়ের কথা শুনে অহনা বলে, " হ্যাঁ মা আজকে সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগছে । আসলে আজকে থেকে একটা নতুন কাজে যোগ দিয়েছি , তোমাকে বলা হয় নি । দিন তিনেক আগে হঠাৎ আমার মোবাইলে একটা ফোন আসে ইন্টারভিউর জন্য । আমি সেই ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনলাম সেটা একটা বাচ্চার গভর্নেসের কাজ । প্রথমেই আমি না করে দেই কিন্তু পরক্ষণেই বাচ্চাটিকে দেখে মত বদল করি । মাঝে একদিন তোমাকে বলেছিলাম একটা ছোট্ট ঘটনা , তোমার মনে আছে কিনা জানি না । " অহনার মা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলেন , " কোন ঘটনা ? তুই তো প্রায় রোজই কোনো না কোনো ঘটনা বলিস , কোনটার কথা এখন বলছিস সেটা বলবিতো । " " উফ্ বলছি বলছি , কিন্তু যদি এক কাপ কফি পেতাম তাহলে........ " অহনার কথা মা বলেন , " বুঝেছি বুঝেছি, ওতো ভণিতা না করে পরিস্কার বললেই হয় মা এক কাপ কফি দাও । তুই জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নে । আমি কফি বানিয়ে আনছি তারপর সব গল্প শুনবো " এই বলে অহনার মা উঠে রান্নাঘরে চলে যান । অহনাও জামাকাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে এসে কফিতে একটা চুমুক দিয়ে মায়ের সাথে গল্প শুরু করে । অহনা বলে, " তোমাকে মাঝে একদিন এসে বললাম না যে গ্যালাক্সি শপিং কমপ্লেক্সে একটা বাচ্চা ছুটতে ছুটতে পড়ে যায়, তাকে আমি তুলে আদর করে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করি কিন্তু বাচ্চাটি মুখে উত্তর না দিয়ে কাগজের চিরকুটের লেখা দেখিয়ে জবাব দিচ্ছিলো । " অহনার মা বলেন , " হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে । কিন্তু বাচ্চাটা কথা না বলে কাগজের চিরকুটের মাধ্যমে উত্তর দেয় কেনো ? কথা বলতে পারে না ? নাকি খুব লাজুক ? " অহনা বলে , " মাত্র এক বছর বয়সে একটা দুর্ঘটনার জন্য ট্রমার থেকে কারো সাথে স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা করা এবং কথা বলার ক্ষমতা দুই হারিয়েছে । তবে কাউন্সিলিং করতে করতে ঠিক হয়ে যাবে সব । আমি আজকে থেকে ঐ বাচ্চাটি মানে আয়ুশের দেখাশোনা এবং কাউন্সিলিং করার ভার নিয়েছি । আসলে সেদিন শপিং কমপ্লেক্সে ঐ স্বল্প পরিসরের আলাপে আয়ুশ আমাকে খুব আপন করে নিয়েছে অথচ সে চেনা - অচেনা কারো সাথে মেলামেশা করা দুরস্ত, কাছে পর্যন্ত যায় না । কারো কাছে যেতে বা কারো সাথে মিশতে খুব ভয় পায় আয়ুশ আর এটাই হচ্ছে সমস্যা । আমাকে কাছে পেলে ছাড়তেই চায় না তাই প্রথমে এই কাজটি করবো না ভেবেও ওর কথা ভেবে রাজি হয়ে যাই । তুমি দেখো মা আমি আয়ুশকে স্বাভাবিক করে তুলবোই , It's my challenge . " অহনার মা সব শুনে বলেন, " সত্যিই খুব খারাপ লাগছে বাচ্চাটি এবং তার বাবা - মায়ের জন্য । বাচ্চাটির বাবা - মা কি করেন ? " অহনা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলে, " আয়ুশের মা নেই , তবে অবশ্য এটা জানি না যে তার মা - বাবার কি ডিভোর্স হয়েছে নাকি তিনি গত হয়েছেন ! আয়ুশের বাবা গ্যালাক্সি শপিং কমপ্লেক্সের মালিক মিঃ আদিত্য মুখার্জী । আয়ুশ ওনার একমাত্র সন্তান । " অহনার মা বলেন , " বলিস কী ? আরে উনি তো কলকাতার একজন বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি । শুনেছি ঐ গ্যালাক্সি শপিং কমপ্লেক্সের সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আরও সাতটি শাখা আছে । আচ্ছা তাহলে ওখানে তো নিশ্চয়ই তোর পারিশ্রমিক বেশ ভালোই তাই না ? " মায়ের কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে অহনা তারপর কোনোরকমে হাসি থামিয়ে বলে, " মা, তুমি পারো বটে । আমি নিজে থেকে টাকার কথা কিছু বলি নি, actually বলার সুযোগই দেন নি মিঃ মুখার্জী । " অহনার মা বলেন , " সেকি ! তুই কি বোকা নাকি ? তোর কতো টাকা পারিশ্রমিক পেলে সুবিধা সেটা নিজে থেকে ওনাকে জানাবি না ? " " আরে মা আগে শোনো সবটুকু , তা না সবটা না শুনেই........... " অহনার এই বিরক্তি প্রকাশ দেখে মা বলেন, " আচ্ছা বাবা আমার ঘাট হয়েছে , ঠিক আছে তুই বল্ আমি শুনছি । " এই বলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন উনি । অহনা আবার বলতে শুরু করে , " আরে কতো পারিশ্রমিক আমার দরকার সেটা নিজের মুখ ফুটে বলার আগেই মিঃ মুখার্জী যে টাকা অফার করেছেন তারপর আর কিছু বলা যায় না । আমি রাজি হওয়ার সাথে সাথেই উনি প্রথম মাসের পারিশ্রমিক হিসেবে পঁচিশ হাজার টাকার একটা চেক্ দিয়ে দিয়েছেন আমাকে । তুমিই বলো মা, সত্যিই কি এরপর আর কিছু বলা সম্ভব ? " অহনার মা প্রায় হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মেয়ের মুখের দিকে , " একটা বাচ্চার দেখাশোনার জন্য মাসে পঁচিশ হাজার টাকা ? না না ও নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে হয়তো, হুমম আমি নিশ্চিত অনা ভুলই শুনেছে " এই ভেবে নিজের মনেই মাথা দোলাতে থাকেন । মাকে এরকম অন্যমনস্কভাবে মাথা দোলাতে দেখে অহনা মায়ের গায়ে হাত দিয়ে " মা, মা , ও মা " বলে ডাকতেই মনের ঘোর কেটে চমকে ওঠেন । ঘোর কাটতেই অহনার মা বলেন , " মা, তুই ভুল শুনিস নি তো ? মানে এক মাসে পঁচিশ হাজার টাকা হতেই পারে না, তুই ভুল শুনেছিস । " অহনা বলে , " না মা, আমি যা বলেছি একদম ঠিক বলেছি । আদিত্য মুখার্জী তার ছেলের দেখাশোনার পারিশ্রমিক বলো বা child counselor হিসেবে fees বলো, পঁচিশ হাজার টাকা আমাকে দেবেন । আমি নিজেও এতো টাকা শুনে অবাক হয়ে ওনাকে বলেছিলাম কিন্তু উনি বললেন, আয়ুশ কারো কাছে যায় না এবং মেশে না কিন্তু আমি নাকি ব্যতিক্রম । আয়ুশের কাছে আমি খুব স্পেশাল তাই আমার যাতে কোনো বিষয়ে কোনোরকম সমস্যা না হয় সেটাও নাকি দেখার দায়িত্ব ওনার । আমি সত্যিই ভাবতেও পারিনি কোনোদিন কারো কাছ থেকে এতোটা স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাবো । মা জানো তো মিঃ মুখার্জী এবার থেকে আমাকে ওনার গাড়ি করে বাড়িতে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন । মানে ওনার গাড়ি করে নার্সিংহোম থেকে ওনার বাড়ি আবার কাজের শেষে ওনার বাড়ি আমার বাড়িতে ফিরে আসা সবটাই ওনার গাড়িতে । উনি সত্যিই এতো ভালো মানুষ , আজকাল এতো ভালো মানুষ খুবই কম পাওয়া যায় । " অহনার মা সব শুনে বললেন, " ঠিক আছে অনেক গল্প হোলো এবার ডিনার করবি চল, রাত কতো হোলো সে খেয়াল আছে ? কালকে থেকে জীবনের নতুন ধারাপাত পড়তে হবে যে দিদিমনি । " মায়ের কথা শুনে অহনা হেসে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরে ।

