অবিস্মরণীয় ভালোবাসা ❤ পর্ব ১৬
অবিস্মরণীয় ভালোবাসা ❤ পর্ব ১৬
আদির খারাপ লাগছে বুঝতে পেরে অহনা একবার মায়ের মুখের দিকে তাকায় তারপর আহত বাঘিনীর মতো আক্রমণ করে বড়ো পিসি এবং অন্যান্য নিন্দুকদের উপর । অহনা সকল নিন্দুকদের উদ্দেশ্যে বলে, " আমার মা তোমাদের সকলকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আমাকে এবং আদিকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করার জন্য কিন্তু তোমরা আমাদের আশীর্বাদ করাতো দূর, কটূ কথা বলার জন্য এসেছো । বড়ো পিসি তুমি মাকে কি যেন বললে আমি তোমার একমাত্র আদরের ভাইঝি ? হুমমম্! তা ভালো বলেছো কিন্তু পিসি তবে আমি একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে বাবার মৃত্যুর পর তোমার এই আদরের ভাইঝিটাকে একবারও মনে পড়ে নি কেনো ? বাবার মৃত্যুর পর এই বছর দশেকের মধ্যে তোমরা কেউই তো আমার আর মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখো নি তাই আমার মনে হয় আমার বিয়ে সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য তোমাদের মুখে শোভা পায় না । আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত আমার নিজের , আদিকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য, আয়ুশের মতো একটি সন্তানের মা হওয়ায় আমি গর্বিত । সর্বোপরি আমার মায়ের অফুরন্ত আশীর্বাদ আমার জীবনের চলার পথ সহজতর করার জন্য যথেষ্ট এবং আমি বিশ্বাস করি বাবা স্বর্গলোক থেকেও আমাকে অনেক আশীর্বাদ করছেন তাই তোমাদের কারো কোনোরকম মন্তব্য শুনতে আমি বা আমরা বাধ্য নই । তোমরা যদি আমাদের আশীর্বাদ করতে না পারো কোরো না কিন্তু দয়া করে দুদিনের জন্য এসে আমাদের হাসিখুশির জোয়ারে ভাঁটা এনো না । " এই সমস্ত কথা বলার পর অহনা একহাতে আদি এবং অন্য হাতে আয়ুশকে ধরে " মা এদিকে আসো " বলে মাকে ডেকে নিয়ে সেই জায়গা থেকে সরে অন্য জায়গায় চলে যায় ।
অন্যদিকে অহনার বড়ো পিসি এবং অন্যান্য আত্মীয়রা অহনার কথায় প্রচন্ড অপমানিত বোধ করে আবারও অহনার উদ্দেশ্যে , নিজেকে বেশি বড়ো মনে করছে, এই মেয়ে কোনোদিন সুখী হবে না, আজ দাদা বেঁচে থাকলে ঐটুকু মেয়ে এইভাবে আমাদের অপমান করতে পারতো না , বৌদি একবারও প্রতিবাদ করলো না ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম মন্তব্য করতে শুরু করে ।
বিয়ের পরের দিন বিকালে অহনা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাড়ি দেয় তার নতুন সংসারে । আদির নিজের বলতে কেউ নেই তাই ইভানের পরিবার ওর কাছে খুবই আপন । ইভানের মা অহনাকে পুত্রবধূ রূপে বরণ করে ঘরে তোলেন তারপর নিজের শ্বাশুড়ী মায়ের মতোই পালন করেন সমস্ত বৈবাহিক রীতিনীতি । বৌভাতের অনুষ্ঠানও পালিত হয় খুব জাকজমক করে । গ্যালাক্সি শপিং কমপ্লেক্সের মালিক আদিত্য মুখার্জীর বিয়ে বলে কথা তাই নিমন্ত্রিত ছিলেন বড়ো থেকে ছোটো বিভিন্ন মাপের অতিথিবৃন্দ । সকলের ভালোবাসা ও আশীর্বাদকে পাথেয় করে আদি আর অহনা আবদ্ধ হয় বৈবাহিকসূত্রে । অহনা হয়ে একজন স্ত্রী, একজন মা এবং অতি অবশ্যই একজন ভালো শিশু মনস্তাত্ত্বিক ।
আনন্দে - হাসিতে - খুশিতে ভরভরন্ত আদি - অহনার সোনার সংসার । অহনার মাতৃত্ব ও প্রতিনিয়ত চেষ্টা এবং আদি আর ইভানের উপর্যুপরি সহোযোগিতায় ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো বুলি ফুটতে শুরু করে ছোট্ট আয়ুশের । অহনাকে ' মা ' , আদিকে ' পাপা ' , ইভানকে ' ছোটো পাপা ' , অহনার মাকে ' দিদুন ' ইত্যাদি এছাড়াও টুকরো টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা বলতে শিখেছে অহনার আদরের Little Boy ।
একমাত্র সন্তান আয়ুশকে ঘিরে আদি - অহনার সংসারের স্বর্ণতরী ভেসে চলে আপন খেয়ালে । দেখতে দেখতে কেটে যায় দুটি বছর , পাঁচ বছরের ছোট্ট আয়ুশ এখন হয়ে উঠেছে সাত বছরের কথা বলা জাপানী পুতুল । এমন কোনো কথা নেই যা সে বলতে পারে না, এককথায় বলা ভালো ' কথার সাগর ' । আদি আর অহনা যেমন ছেলে অন্তপ্রাণ তেমনই আয়ুশেরও ' মা - পাপা ' ছাড়া একমূহুর্ত চলে না ।
অহনার বিয়ের বছর দুয়েক কেটে যায় , এই বছর দুয়েকের মধ্যে একবার মাত্র দিন সাতেক আর একবার দিন তিনেকের জন্য নার্সিংহোম থেকে ছুটি নিয়েছিল সে । ডাক্তার হিসেবে অহনার যথেষ্ট নামডাক তবে ইদানীং কেমন যেন দুর্বলতা - বমি বমি ভাব তার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে থাকে , তাই দিন তিনেক এইরকম অসুস্থতা অনুভব করায় অহনা বুঝতে পেরে যায় হয়তো সে সন্তানসম্ভবা । অহনা কোনোরকম দেরী না করে নিজের নার্সিংহোমের একজন বিখ্যাত গাইনোকলজিস্ট ডঃ তনভি জুনেজার সাথে পরামর্শ করে এবং শারীরিক পরীক্ষা- নিরীক্ষা ও টেস্টের মাধ্যমে প্রেগন্যান্সি ধরা পড়ে । অহনা সেদিন বাড়িতে ফিরে অধীর আগ্রহে আদির অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষা করতে থাকে , তবে অন্য দিনের তুলনায় ঘন্টা খানেক দেরীতে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফেরে আদি । বসার ঘরে ঢুকে অহনার হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ দিয়ে ধপ্ করে সোফায় বসে শরীর এলিয়ে দিয়ে অহনাকে বলে , " অহনা, আয়ুশ কি করছে ? "
অহনা আদির পাশে বসে জলের গ্লাসটা আগিয়ে দিয়ে উওর দ্যায়, " ওর ঘরেই আছে , পড়ছে মৌসুমির কাছে । মৌসুমি খুব ভালো পড়ায় আর আমাদের আয়ুশও বেশ ইন্টারেস্ট নিয়ে পড়াশোনা করে ওর কাছে । "
আদি জলের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলে ," জানো তো অহনা, আমার দাদাভাইও পড়াশোনা, আঁকা, সাঁতার, ক্রিকেট এই সব কিছুতেই ছিল এক নম্বর আর আয়ুশও হয়েছে এক্কেবারে ওর মতোই । আজ যদি দাদা - বৌদি বেঁচে থাকতো.............. " । আদির ঠোঁটের উপর অহনা হাত চাপা দিয়ে তাড়া করে থামিয়ে দিয়ে বলে, " দাদা - বৌদির আশীর্বাদ সবসময় আছে আমাদের মাথার উপর , তুমি দেখো আয়ুশ একদিন মস্ত বড়ো মানুষ হবে । তবে তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ যতোদিন না আয়ুশ বড়ো হচ্ছে ততোদিন যেন ও জানতে না পারে ও আমাদের সন্তান
নয় । Please আদি " এই বলে দুই হাত জোড় করে আদির সামনে আর আদিও অহনার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, " না বলবো না তবে যখন আয়ুশ বুঝতে শিখবে তখন সব ঘটনা খুলে জানানো উচিত তাই না ? যতোই হোক আমরা দুজন ওর কাকা - কাকীমাই বলো বা পালক মা - বাবাই বলো কিন্তু জন্মদাতাতো নই । "
আদির কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে থাকে অহনা আর দুচোখ দিয়ে নেমে আসে জলের ধারা । অহনাকে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখে আদি অহনাকে জড়িয়ে ধরে কপালে আদর করে চুম্বন করে ।
এইভাবেই কেটে যায় মিনিট দশেক , হঠাৎ করেই অহনা বলে ওঠে, " আদি, তোমাকে একটা সুখবর দেওয়ার ছিল । "
আদি ভ্রু কুঞ্চিত করে অবাক হয়ে বলে,
" সুখবর ? বলুন ম্যাডাম কি সুখবর ? "
অহনা একটু চুপ করে থেকে আদির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে , " আয়ুশের আরেকজন খেলার সাথী আসতে চলেছে খুব শীঘ্রই । "
আদি : ( সজোরে হেসে ) ওহ্ ! এটা তোমার সুখবর ? আয়ুশের আরেকটি নতুন বন্ধু হয়েছে সেতো ভালো কথা তাতে আবার সুখবরের কি দেখলে ডার্লিং ? "
অহনা ডান হাতের আঙুলের চাপে আদির কপালে আলতো আঘাত করে বলে " বুদ্ধু একটা , আয়ুশের আরেকজন খেলার সাথী বলতে আমি বন্ধুর কথা বলিনি মশাই । আয়ুশের ছোটো ভাই বা বোনের কথা বলেছি । উফ্ ! সত্যি তোমার বুদ্ধির তারিফ করতে হয় । " এই বলে মুখ চেপে হাসতে শুরু করে ।
আদি চোখদুটো গোলগাল করে চেয়ে থাকে অহনার মুখের দিকে তারপরেই আচমকা অহনাকে সজোরে বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলে, " অহনা , আজকে আমি সত্যিই খুব খুশি । আমাদের দুজনের ভালোবাসার চিহ্ন আজ তোমার গর্ভে , আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না । " এই বলে আনন্দে - উল্লাসে আত্মহারা হয়ে চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দেয় অহনার কপাল - গাল - চিবুক ।
অহনা ভালোবাসা জড়ানো আদুরে কন্ঠে বলে, " আরে ছাড়ো ছাড়ো অনেক হয়েছে নয়তো এক্ষুনি আবার আয়ুশ এসে পড়বে । তার মধ্যে মৌসুমি পড়াচ্ছে এখনো, দেখে ফেললে কি ভাববে বলোতো ? "
আদি দুই হাত দিয়ে আস্তে করে অহনার দুই গাল টিপে দিয়ে মজার ছলে বলে, " কি আবার ভাববে ? তুমি তো আর পরস্ত্রী নও এবং আমিও পর পুরুষ নই , আমি আমার নিজের আইনত একমাত্র বৌকে আদর করতেই পারি । তাতে কেউ যদি দ্যাখে দেখুক না, ক্ষতি কি ? "
অহনা লজ্জা পেয়ে " তুমি না সত্যিই দিনে দিনে খুব অসভ্য হয়ে যাচ্ছো " এই বলে উঠে চলে যায় আয়ুশের ঘরের দিকে ।
নতুন অতিথি আসার এখনো ঢের বাকী কিন্তু আদির যেন তর সইছে না , তাই প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে অহনার পেটে মাথা রেখে বলবে, " এই যে জুনিয়র আমি পাপা বলছি , শুনতে পাচ্ছো কি ? আমি জানি না তুমি ছোট্ট প্রিন্স না প্রিন্সেস তবে যেই হও বাপু একটু চটজলদি বেরিয়ে আসো মায়ের পেট থেকে । "
প্রত্যেক দিন আদির এই শিশুসুলভ কান্ড দেখে অহনা হেসেই অস্থির অন্যদিকে আয়ুশেরও প্রায় রোজই এক প্রশ্ন " ছোট্ট পরীকে কবে আনবে মা ? রোজই বলো খুব তাড়াতাড়ি আনবে কিন্তু কবে আনবে ? "
বাবা - ছেলের এই অস্থিরতা দেখে মাঝে মধ্যেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে অহনা ।

