AYAN DEY

Drama Thriller


3  

AYAN DEY

Drama Thriller


ছায়াবাজি

ছায়াবাজি

11 mins 18K 11 mins 18K

সেইবার কোচবিহার ঘুরতে গিয়েছিল অভিষেক তার পাঁচ বন্ধুর সাথে | দার্জিলিং ভ্রমণ শেষ করে নিতান্ত হুজুকে কোচবিহার ঘুরতে এসেছিল একদিনের জন্য | হুজুকটা ছিল প্রধানত ওখানকার বেশ কয়েকটি রাজবাড়ী ঘুরে দেখার এবং তার সাথে কিছু পর্যটন ক্ষেত্র |

মহারাজা বিশ্বনারায়ণের পুরাতন রাজবাড়ির ইতিবৃত্ত ছয় বন্ধুর বেশ ভালো লাগলো | ওখানকারই এক বাসিন্দা তার প্রপিতামহের যুগের সময়কার কথা বলতে গিয়ে ওই রাজবাড়ির আড়ম্বরের কথা ওদের জানায় |

পলাশীর যুদ্ধের পরপরই বিশ্বনারায়ণের প্রপিতামহ পীতাম্বরনারায়ণ মহারাজা উপাধি পেয়েছিলেন অতএব মহারাজা এনাদের জন্মগত উপাধি নয় | মহারাজ বিশ্বনারায়ণ নিজের ক্ষমতায় প্রচুর প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন | তাঁর প্রায় দশটি নানান প্রজাতির ঘোড়া এবং দুটি হাতি ছিল ; এমনকি একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারও ছিল | প্রজাদের তিনি সবসময় দুধে-ভাতেই রাখতেন কিন্তু নিঃসন্তান হওয়ায় বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে সেই ভাবে কেউ থাকেনা | এক মাসতুতো ভাই এর ছেলেকে দত্তক নিলেও রাজবাড়ীর দায়ভার তারা কেউই সামলাতে চায় নি | সেই মাসতুতো ভাই এর বংশ লন্ডনে বাস করতে থাকে | ইংরেজ শাসনের অবসানের পরেও বেশ কিছুদিন রাজবাড়ীর আড়ম্বর ছিল তবে বিশ্ব নারায়ণের মৃত্যুর পর স্ত্রী জানকি দেবী বিহারে তার বাপের বাড়ি গিয়ে ওঠেন এবং চাকর-বাকর যে কজন ছিল তারাও দেশে ফিরে যায় | ক্রমে রাজ বাড়ির রং ফিকে হতে হতে আজ শুন্যপুরীতে এসে ঠেকেছে | সরকার বাড়িটিকে হেরিটেজ করে রেখেছে এবং রাত কাটানোর জন্য পারমিশন লাগে | ভেতরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা জেনে-বুঝেই করা নেই যাতে ঐতিহ্যের বিন্দুবিসর্গ বাদ না যায় | তবে রাজবাড়ী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে |

বিবরণ শুনে অভিষেকের খুব ইচ্ছে হলো রাজবাড়ীতে রাত কাটানোর বাকিরাও তাতে সায় দিলে পারমিশন জোগাড় করা গেল | সন্ধ্যে ছটা নাগাদ ওরা বাড়ির ভেতর উপস্থিত হল |

বড় একটা উঠোন পেরিয়ে ওরা অতিথিশালাতে এসে উপস্থিত হল | যে লোকটি এসেছিল তাদের ভেতর অবধি পৌঁছে দিতে সেই বলে গেল রাত্রি নটা নাগাদ সে কোয়ার্টার থেকে খাবার এনে দেবে | ওরা বলে দিল রুটি আর ডিমের কারি আনতে |

অনিকেত প্রথমে মুখ খুলল , বলল “ তুই বললি ভোলে ভাই অভিষেক , নইলে নিজেকে রাজা ভাবা সেই আহ্লাদটা পুষেই রাখা ছিল | "

অতিথিশালা ব্যতীত একটি স্নানঘর একটি ছোট শোয়ার ঘর খোলা রয়েছে আর বাকি ঘর গুলো দেখে মনে হয় অনেক কাল ধরেই বন্ধ রয়েছে | তবে অতিথিশালার বিস্তৃতি দেখেই অনুমান করা যায় গোটা বাড়ি কত বড় | ওরা সকলে সোফায় বসে পাশের টেবিলে রাখা মোমদানি দুটোতে এক এক করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল |

শুভদীপ বলল , “ বাহ , কি দারুন লাগছে দেখ ঘরখানা ! ওই দেখ অভিষেক কি বিরাট আয়না ! ”

অভিষেক বলল , “ আরে হ্যাঁ তো ! উপরে ঝাড়বাতিটা দেখ | "

সকলে মিলে ওরা গোটা ঘরের নানান নকশা এবং নানা কাজ দেখতে লাগলো | সাথে আনা মুড়ি চানাচুর ফ্লাস্কে রাখা চা সহযোগে নানারকম গল্প করতে লাগলো | সাথে বেশ কয়েক প্যাকেট মোমবাতি থাকায় সেই বিষয়ে কোনো চিন্তা তাদের ছিল না |

শুরুটা প্রথম করেছিল রাজ ; গল্প চলাকালীনই দেয়ালের গায়ে হাতের আঙুল দিয়ে হাতির মুখের মতো একটা ছায়া করে নিজের মুখে হাতির আওয়াজ করে উঠলো | সকলেই গল্প থামিয়ে নজর দিল সামনের দেওয়ালটাতে |

এরকম খেলা বন্ধুরা মিলে অনেক সময় করে থাকে আর তাই রাজের সাথে সাথে একে একে অনির্বাণ , রক্তিম , অভিষেক , অনিকেত সকলেই যোগ দিল | ধীরে ধীরে ওরা দেওয়ালের উপর রাজা , মন্ত্রী , হাতি , ঘোড়া ইত্যাদির ছায়া তৈরি করে একটা ছায়া নাট্য ধরনের ফুটিয়ে তুলল |

মোমবাতিগুলো যখন অর্ধেক হয়ে এসেছে তখন ওরা খানিকক্ষণের জন্য ছায়াবাজি থামিয়ে রাজের মোবাইলে চালানো ধ্রুপদী গান নিয়ে মেতে থাকলো | সেই গানের সুর শুধু অতিথিশালা কেন , গোটা রাজবাড়ীময় গমগম করতে লাগলো আর তাই মনে হল রাজ মেজাজ তাদের মধ্যে আরো জাঁকিয়ে বসেছে |

হঠাৎ মোবাইলে বাজতে থাকা গানের সঙ্গে একটা অন্য গলা আলাদাভাবে শোনা গেল | প্রথমটা সকলেই সকলের দিকে চাইল এই জিজ্ঞাসা নিয়ে যে গানটা তাদের বন্ধুদের মধ্যেই কেউ করছে কিনা | কিন্তু যখন বুঝতে পারল তাদের মধ্যে কেউই গান করছে না তখন ফোনের গানটা বন্ধ করে সকলে কান পাততে একটা গলা বাইরে একটু দূর থেকে শোনা গেল |

সেই গলার স্বর ক্রমে তাদের দরজার কাছে এগিয়ে এসে দরজার ঠিক সামনে গিয়ে থেমে গেল এবং সেই কণ্ঠস্বর শোনা গেল , “ বাবুরা আপনাদের খানা | " বোঝা গেল সরকারি কোয়ার্টার থেকে যে লোকটার খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল সেই লোকটা |

লোকটা চলে যেতে যাচ্ছিল কিন্তু রক্তিম বলল , “ গানটা কি আপনি গাইছিলেন ? ”

খানিকটা ফ্যাসফ্যাসে গলায় লোকটি জবাব দিল , “ হ্যাঁ , বড় ভালো গানটা বাজিয়েছিলে তোমরা | তোমরা হয়তো শুনে অবাক হবে কিন্তু অতিথিশালার গঠনই এমন যে এর ভেতরের শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে | চলি বাবুরা | " গুলাম আলীর গান টা মুখে গুনগুন করতে করতে লোকটা চলে গেল |

খাওয়া শেষ হওয়ার একটু আগে বাতিগুলো নিভে গেল আর অভিষেক খাওয়া থামিয়ে আরো দুটো মোমবাতি মোমদানিতে জ্বালিয়ে দিলো |

অভিষেক বলল , ” এমন কত যে রাজবাড়ী কোচবিহার ছড়িয়ে রয়েছে কে জানে ? যেমন তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তেমন তাদের শৈল্পিক নৈপুণ্য | "

রাজ বলল , “ তা তো বটেই | আর এমন এক রাজবাড়িতে আমরা যে রাত্রি বাস করবো তা চিন্তার অতীত | তুই দেখ এই মোমের আলোতেই শুধু এই একটা ঘরে কত রকম কারুকার্য লক্ষ্য করা যায় | "

বোতল থেকে জল পান করতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ে দেয়ালের দিকে | চমকে উঠে সে রাজকে বলে , “ ওই দেখ | "

“ কি দেখব ? ” বলে যেই রাজ পেছনের দেওয়ালে তাকিয়েছে সেই মুহূর্তে সে দেখল দেওয়ালে তাদের ছায়া ছাড়াও আরো অনেক নতুন ছায়া তৈরি হয়েছে | "

একে একে বিষয়টা সকলেরই নজর কাড়লো | এ যেন এক গোটা রাজসভার প্রতিচ্ছবি | ওই যে একটা ছায়া হেঁটে যাচ্ছে আর অন্যান্য ছায়ামূর্তি রা যেন খুব উল্লসিত ভঙ্গিতে হাত নাড়ছে | ওই হেঁটে যাওয়া ছায়ামূর্তি সিংহাসনের যে ছায়া তৈরি হয়েছিল তাতে বসার পর কার দিকে যেন একটা আঙুল দেখিয়ে ইশারা করে ডাকলেন | হঠাৎই রাজ দেখল তার ঠিক পাশেই বসা অভিষেকে ছায়াটা তার দেহ থেকে আলাদা হয়ে সিংহাসনের ছায়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে | রাজ একবার মাত্র চেঁচিয়ে ডাকল , “ অভিষেক | "

পাশে বসে থাকা সত্ত্বেও যখন অভিষেক কোন উত্তর দিল না তখন বাকি সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো অভিষেকের নাম ধরে |

সিংহাসনে বসা ছায়ামূর্তি অভিষেকের শরীরের বিচ্ছিন্ন ছায়ার সঙ্গে বিভিন্ন ছায়া ভঙ্গিতে কথা বলল এবং অভিষেকে ছায়াকে সিংহাসনে বসানো হল | এ যেন যুবরাজের অভিষেক হলো | একটা খাপখোলা তরোয়াল অভিষেকের ছায়াকে উপহার দিল যেন |

শুভদীপ এসব দেখে এতক্ষণে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে গদির উপর | এরপর রক্তিম অনির্বাণকে ঠেলা মারলো দেওয়ালের উপর ছায়াচিত্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে | মাত্র কিছুক্ষণের জন্য অনির্বাণ মুখটা ফিরিয়ে ছিল | এমন অবস্থায় ঘটলো আরও একটা আশ্চর্য ও একই সাথে ভয়ংকর ঘটনা | অনিকেত দেখলো তার ঠিক পাশে বসা অনির্বাণের ছায়ামূর্তি কে কেউ যেন টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং যে নিয়ে যাচ্ছে তার হাতে তরোয়াল | ঠিক সিংহাসনে ছায়ার সামনে নিয়ে এসে অনির্বাণের ছায়ার উপর কেউ যেন তরোয়াল বসিয়ে দিল | এই ঘটনার বীভৎসতা দেখে যারা সজ্ঞানে ছিল তাদের তিনজনের প্রত্যেকে চেঁচিয়ে উঠলো অনির্বাণের নাম ধরে | কিন্তু কোন সাড়া নেই |

ঠিক এই সময় আরো দুটো মোমবাতি জ্বলে জ্বলে শেষ হয়ে গেল কিন্তু এবার নতুন মোমবাতি জ্বালানোর সাহস করলো না কেউ | অভিষেক আর অনির্বাণ তখনো যেন মূর্তির মত বসে |

এই মুহূর্তে কাউকেই প্রকৃতিস্থ করার কথা না ভেবে বাকিরা তন্দ্রায় ঢলে পড়ল এবং ক্রমে তন্দ্রা গাঢ় নিদ্রায় পরিণত হল | সকালে প্রথম ঘুম ভাঙলো অভিষেকের এবং সে বাকি সকলকে ডেকে দিল | এক পাশের জানালা দিয়ে উজ্জ্বল রোদ এসে অতিথিশালার দেওয়ালে পড়েছে | শুভদীপের তখনো যেন ভয় কাটে নি | অনির্বাণ চোখ খুলে প্রথম প্রশ্ন করল , “ আমি কোথায় ? ”

অভিষেক আর অনির্বাণ বাদে বাকি সকলেরই চোখে অনেকরকম জিজ্ঞাসা ঘোরাফেরা করছিল কিন্তু অভিষেকই ওদের সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে দিল | সে দেখালো ঘরের সমস্ত দেওয়ালেই ছোট ছোট নানা ঘটনার ছবি আঁকা যা মোমবাতির আলোয় স্পষ্টতই ছায়ামূর্তি মনে হয় | সকলে দেখল বটে কিন্তু মন থেকে প্রশ্ন যেন গেল না |

প্রশ্নটা প্রথম করলে অনিকেত , “ সে না হয় বুঝলাম কিন্তু দুটো ছায়াকে তোর আর অনির্বাণের ছায়ার মতোই লাগছিল কেন ? ”

অভিষেক বলল , “ তা হয়তো তোদের মনের ভুল | তোরা যে দুটো ঘটনার কথা বলছিস ওই দেখ তার ছবি | " ভালো করে দেখিয়ে দিল অভিষেক | সকলে সামনে এগিয়ে এসে ছবি দুটোর দিকে তাকালো এবং প্রত্যেকেরই একটা ধারণা স্পষ্ট হলো যে যুবরাজের অভিষেক হওয়ার ছবিতে এবং অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ছবিতে অভিষেক আর অনির্বাণের মুখ যুবরাজ আর অপরাধীর মুখের মধ্যে যথাক্রমে ফুটে উঠেছে |

এবার রক্তিম বলল , " কিন্তু ভাই অভিষেক তোদের দুজনের থেকে কোনরকম উত্তর আমরা পাইনি কোন তোদের ছায়াকে তোদের শরীর থেকে আলাদা হতে দেখেছি | "

অভিষেক জোর গলায় বলল , “ তোদের যত সমস্ত আজগুবি কথা , অনেক খাওয়ার পর আর সারা দিনের ক্লান্তির পর আমাদের দুজনেরই চোখ লেগে গেছিল তাই তোরা কোন উত্তর পাসনি | "

সেই মুহূর্তে আর কেউ কিছু বলল না |

রাজবাড়ী থেকে বেরোবার সময় অভিষেকের বারেবারে একটা টান অনুভব হতে লাগলো | হাওয়াতে যেন কেউ কানে এসে বলে গেল , “ যেওনা , যেওনা | " অভিষেক খানিকটা মনে জোরে এনে বাইরে বেরিয়ে এলো |

এদিকে রাজবাড়ীর প্রধান দরজা দিয়ে অনির্বাণ বের হতে যাবে তো দরজা খুলে তার ঘাড়ের উপর পড়তে লাগলো | রক্তিম তৎপর হয়ে অনির্বাণের হাত টেনে নিল | কেউ না দেখলে একটা বড়সড় বিপদ ঘটে যেত |

রাজবাড়ী থেকে বেরোনোর পর , যে লোকটা গতরাতে খাবার দিতে এসেছিল তার সাথে দেখা হল আবার | একটা গাড়িতে মালপত্র সব তুলে দেবার পর সবাই যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন পিছন থেকে লোকটা হঠাৎ বলে উঠল , “ আবার কবে আসবেন বাবু ? ”

সকলে বুঝলো কথাটা অভিষেকের দিকে চেয়েই লোকটা বলল | অভিষেকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটার দিকে চেয়ে বলল , “ আসবো , আবার ছুটি পেলেই আসবো | "

গাড়িতে উঠে প্রথম রক্তিম বলল , “ ভদ্রলোকের মুখের সঙ্গে অতিথিশালা আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে কোন একটা মুখের মিল খুব রয়েছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা | "

রাজ বলল , “ একদম ঠিক কথাই বলেছিস , রাজার ছবির পাশে যে লোকটার ছবি আঁকা রয়েছে , হয়তো মন্ত্রী গোছের কেউ হবে , তার সাথে লোকটার মুখের হুবহু মিল | গত রাতের ছায়ার খেলাতে ওনাকেই দেখেছি অভিষেকের ছায়ার হাতে তরোয়াল তুলে দিতে | "

অভিষেকের কানে কথাগুলো গেল আর মনে মনে সে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলো |

কোচবিহার থেকে ফেরার পর ওই বন্ধুরা একসাথে আর কোনদিন ছায়াবাজি খেলেনি | তবে আলাদা আলাদাভাবে অনির্বাণ আর অভিষেক একবার করে খেলেছে এবং তাতে যে ঘটনার সামনাসামনি তারা হয়েছে তা অত্যন্ত ভয়ের |

অভিষেক এক ছুটির দিনে লোডশেডিংয়ে মোমবাতির আলোয় ছায়া নিয়ে খেলার সময় দেখেছে যেন এক মৃতদেহের ওপর তার ছায়া চোখের জল ফেলছে | অনির্বাণ দেখেছে তার ছায়াকে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে | মারাত্মক ভয় পেয়ে অনির্বাণ টানা দুটো দিন ভুল বকেছে | এরপর থেকে তার আর কেউ ছায়াবাজি না খেললেও উত্তর একটা তারা খুঁজে পেয়েছিল |

অভিষেক জানতো যে তার জন্ম লন্ডনে এবং মাত্র তিন বছর বয়সে তার বাবা যখন transfer হয়ে যায় কলকাতাতে তখন তারা কলকাতায় চলে আসে এবং এখানেই তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় | কোচবিহার থেকে ঘুরে আসার পর সে কিছু জানতে চায়নি কিন্তু কলকাতায় এসেও কেন অমন ব্যাপার ফের ঘটলো তার বিষয়ে জানতে গিয়ে নতুন অনেক কিছু ঘটনা সম্পর্কে সে অবগত হল |

একদিন সে তার বাবাকে প্রশ্ন করল , “ বাবা আমাদের আদি বাড়ি আদপে কোথায় ? ”

বাবা চিত্তরঞ্জন বললেন , “ সে তো জানোই ঐ চিৎপুরের বাড়িটা | "

অভিষেক ফের প্রশ্ন করলো , “ সে তুমি বলেছ কিন্তু আমি জানতে চাই কোচবিহারের মহারাজা বিশ্ব নারায়ণের পরিবারের সাথে আমাদের কি সম্পর্ক ? "

কেন এই প্রশ্ন বাবা জানতে চাইলে বিগত কিছুদিন এর ঘটনা অভিষেক জানালো |

এরপর বাবা বললেন , “ এতদিনে এইকথা কাউকে বলিনি , এমনকি তোর মাও জানেন না | আমার প্রপিতামহ ছিলেন মহারাজা বিশ্ব নারায়ণের মাসতুতো ভাই অম্বরনাথ | তার পুত্র অচিন্ত্যদেবকে উনি দত্তক নিয়েছিলেন | তিনি লন্ডনে চলে যাবার পর বিশ্ব নারায়ণের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে | শুধুমাত্র ঈর্ষার কারণে লোক লাগিয়ে অম্বরনাথ এবং অচিন্ত্যদেবকে হত্যার চেষ্টা করেন | অচিন্ত্য দেব বেঁচে গেলেও অম্বরনাথ গুলির আঘাতে মারা যান | এই খবর বিশ্ব নারায়ণের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতক বন্ধুকে পুরো রাজসভার মাঝে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় | "

অভিষেক একথা শুনে পূর্বপুরুষের ছবি দেখতে চায় এবং অচিন্ত্য দেবের ছবি দেখে চমকে ওঠে , এ যেন তার ছবি | এতদিনকার রহস্য আজ যেন অভিষেকের কাছে সম্পূর্ণ রূপে ধরা দিয়েছে |

অভিষেক তার বংশের ইতিবৃত্তের কথা জানতে পেরে যেমন মন থেকে কিছুটা শান্তি পেল তেমনি অনির্বাণের বংশের ইতিবৃত্ত যে ঠিক কি তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইল | পরের দিন কলেজে অনির্বাণের কাছে তার বংশের ইতিহাস এর কথা গল্প করল | তবে আশ্চর্য রকম ভাবে এইসব কথা শোনার পর অনির্বাণ একটু দূরে দূরে থাকতে লাগল | অনির্বাণ কিছু জানতে পেরেছে কি না জানতে চাইলে সে কেমন যেন থতমত খেয়ে যায় এবং কোনরকম অভিষেকের জিজ্ঞাসাকে এড়িয়ে যায় | এইসব ঘটনা শোনার পর থেকে অনির্বাণ অভিষেকের সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিল, এমনকি দেখা হলে কেমন যেন ভয়ার্ত মুখ নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল |

বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিন ও যখন সকলে থেকে নিজেকে আড়াল করে রইল অনির্বাণ তখন অভিষেক মন থেকে স্থির করলো অনির্বাণকে জোর করে আজ জিজ্ঞেস করতে হবে যে তার কি হয়েছে |

ক্যান্টিনের সামনে অনির্বাণকে দেখতে পেয়ে পেছন থেকে অভিষেক তাকে হাত ধরে টানলো জানতে চাইল , “ এই অনির্বাণ , তোর ঠিক কি হয়েছে বলতো ? কেন সকলের থেকে দূরে দূরে হয়ে থাকছিস ? আজ তোকে বলতেই হবে কারন টা কি | "

অভিষেকের হাতের বন্ধন ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও শেষে বাধ্য হয়ে অনির্বাণ মুখ খুলতে রাজি হল | সে বলল , “কোচবিহার থেকে ফেরার পর আমার অসুস্থতার কথা শুনে থাকবি হয়তো , তো তার কারণ ছিল সেই ছায়াবাজি | আমি সুস্থ হওয়ার পর জোর করে আমাদের বংশের ইতিহাস জানতে চাওয়ায় আমি জানতে পারি যে আমার প্রপিতামহ ছিলেন করালিপ্রসাদ যে মহারাজ বিশ্বনারায়ণের বিশ্বাস ভঙ্গের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড স্বীকার করেছিল | করালিপ্রসাদের ছবি দেখতে গিয়ে আমার মুখের সাথে অবিকল মিল লক্ষ্য করি এবং এই কারণেই হয়তো আমার ওপর কোনো অদৃশ্য প্রতিশোধের বিপদ ঝুলছিল | তোর মুখ থেকে তোর পরিবারের ইতিবৃত্ত শোনার পর আমার মধ্যে কেমন যেন এক ভয় কাজ করতে শুরু করলো তাই আমি দূরে দূরে থাকছিলাম | "

অভিষেক বলল , “ আমাদের পূর্বপুরুষরা অপরাধ করে থাকলে তার দায় আমাদের ওপর নিশ্চয়ই বর্তাবে না কারণ আমরা পরস্পরের খুব ভালো বন্ধু কিংবা হয়তো ভগবান এক জনমের অপরাধ খন্ডন করার জন্যই এ জন্মে আমাদের সকলকে বন্ধু করে পাঠিয়েছেন | কলঙ্কময় ইতিহাসকে ভুলে আমাদের এইভাবে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে হবে | "

অনির্বাণ বলল , “ ঠিক বলেছিস অভিষেক , আমাদের বন্ধুত্ব কি এতই ঠুনকো ! ”

এই ইতিহাস বাকি বন্ধুদের কোনোভাবেই জানতে দিল না শুধু একবার দুই বন্ধু দুজনের গলা জড়াজড়ি করে চোখ ভেজাল |

ছায়াবাজি তে লাভ-লোকসান যেমন কিছু হয়নি তেমন কোনরকম সুখকর স্মৃতি ও তৈরি হয়নি বরং এইবারে যে ভয়ংকর স্মৃতি তৈরি হয়েছে তার কারণে আর কেউই কোনদিন ছায়া নিয়ে বাজি লড়তে সাহস করেনি |


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design