ঠাকুর বাড়ির নতুন বৌঠান
ঠাকুর বাড়ির নতুন বৌঠান
ঠাকুর বাড়ির নতুন বৌঠান তথা কাদম্বরী দেবী। কাদম্বরী দেবী ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ষষ্ঠ সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বিবাহিতা পত্নী। ওনার ব্যাপারে অনেক কথা আছে যা আজও আমাদের কাছে অজানা। ঠাকুর বাড়ির প্রতিটি আনাচে কানাচে তে ভেসে ব্যারায় সেই সব কথা। ওনার জীবনযাত্রার থেকেও আমাদের কাছে বেশি কৌতূহল তৈরী করে ওনার মৃত্যু সংবাদ এর খবর । সেটা আদেও কতটা স্বাভাবিক বা অস্বাবিক তা কেউ জানে না। তিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি তে কতটা নিজের জায়গা বানিয়ে নিতে পেরেছিলেন বা কবি রবির জীবনে তার কি গুরুত্ব ছিল সেসব অজানা। ঠাকুর বাড়িতে তার জীবন যাত্রা অজানা। অজানা রয়ে গেছে তার মৃত্যু র পেছনের কারণ। আমাদের এই আলোচনার মধ্যে দিয়েই আমরা তুলে ধরবো ঠাকুর বাড়িতে কাদম্বরী দেবীর জীবন,তার মৃত্যুর কারণ।বাড়ির অন্য সকল বৌদের থেকে তার জীবন এতো তা আলাদা শুধুই কি বাড়ির কাজের লোকের মেয়ে হওয়াতে।
রমপ্রিয়া ছিলেন জয়রাম ঠাকুর এর কনিষ্ঠ পুত্র গোবিন্দরাম ঠাকুর এর পত্নী।গোবিন্দরাম এর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান রমপ্রিয়া দেবী সম্পত্তি বিভাগের জন্য মামলা করেছিলেন তার ফলস্বরূপ তিনি রাধাবাজার এর এবং জ্যাকসন ঘাটের দুটি বাড়ি পেয়েছিলেন। তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্র জগন্মোহন গাঙ্গুলী কে কলকাতার হারকাটা গলি তে একটি বাড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া রমপ্রিয়া দেবীর ইচ্ছে তেই জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির দ্বারকানাথ ঠাকুর এর মামা কেনারাম রায়চৌধুরী র কোননা শিরমণী দেবীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন জন্মোহনের। এনাদের সন্তানদের মধ্যে চতুর্থ সন্তান ছিলেন শ্যামলাল গাঙ্গুলী। যিনি ছিলেন কাদম্বরি দেবীর পিতা।কাদম্বরী দেবীর মা ছিলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রামমনি ঠাকুর এর পুত্র রাধানাথ ঠাকুর এর পুত্র মথুরানাথ ঠাকুর এর দৌহিত্রী ত্রৈলোক্যসুন্দরী। সম্পর্ক হলেও তিনি পিতামাতা উভয়ের দিক দিয়েই ছিলেন ঠাকুর বাড়ির। তও তিনি নিজের যোগ্য সন্মান কোনো দিনই পাননি।
কাদম্বরী দেবী জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কলকাতার ওই হারকাটা গলির বাড়ি তাই ,৫জুলাই ১৮৫৯।এরপরেই ১৮৬৮,৫জুলাই মাত্র ৯ বছর বয়সেই বিবাহ সূত্রে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর হাত ধরে এসে পৌঁছান ঠাকুর বাড়ির চৌকাঠে। তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র ১৯ বছর ২মাস। এই বাড়িতে বৌ হয়ে আসার কিছু দিনেই ওনার ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ছোট্ট রবি ,রবির বয়স তখন মাত্র ৭ বছর। তখন থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন রবির নতুন বৌঠান। ধীরে ধীরে যত সময় অতিবাহিত হতে থাকে দুজনের মধ্যেকার বন্ধুত্ব তত্ত্বই বাড়তে থাকে তার সাথে বাড়তে থাকে দুজনের মধ্যেকার খুনসুটির সম্পর্ক।সাল টা ১৮৭৩,দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হিমালয় থেকে ফায়ার আসার পর নির্ধারিত দিনে ৬ ফেব্রুয়ারী ঠিক করলেন ছোট্ট রবির উপনয়ন। উপনয়ন এর পরের ৩দিন রবি ছিল তেতলার ঘরে র তাকে সেই ৩দিন তাকে গোবিন্দ ভোগ চালের ভাত তার ওপর সুগন্ধি ঘি দিয়ে হবিষ্যান্ন রান্না করেদিতেন তার নতুন বৌঠান। সাল তা তখন ১৮৭৫ ,১০ই মার্চ সকল কে গেলেন সারদাসুন্দরী দেবী। তখন রবির বয়স সবে ১৩। তখন থেকেই ছোট্ট রবি কে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন কাদম্বরি দেবী।সেই সময় থেকে রবি হয়ে গেলেন তার কাছের মানুষ। সারদা মৃত্যু র পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর পাঠ তুলে চলে গেলেন হিমালয় সেখান থেকে ফায়ার পার্কস্ট্রিট এর বাড়িতে। তখন থেকে তেতলার ঘর দখল করলেন জ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর। সেখানে আনলেন নিজের শখের পিয়ানো। তার পাশের মহলেই থাকতেন স্বর্ণকুমারী দেবী। জ্যোতিরিন্দ্র নাথ এর দিদি। কাদম্বরী দেবী যে ঘরে থাকতেন সে ঘরে দরজার পেছনে ছিল একটি আয়না। যা তৈরী বেলজিয়াম গ্লাস দিয়ে। দরজা খোলা থাকলে তা দক্ষ যে না কিন্তু বন্ধ করলেই সেটা দৃশ্যমান হয়।
কাদম্বরী দেবী ছিলেন সৌখিন মানুষ। তিনি সব সময় বাথরুম এ তোলা জলে স্নান করতেন।তার ছিল পাখি পোসার শখ, ঘরের বাইরের পশ্চিমের বারান্দায় তিনি পাখি রাখতেন এছাড়া ছিল নানা ফুল গাছ। ঘরের লাগোয়া ছাদে নিজের হাতে বানিয়েছিলেন বাগান যা দেখাশোনা করতেন রবি এবং তার নতুন বৌঠান। সেখানে বসত আসর। নানা গল্প ,আড্ডা, গানবাজনা ,সেখানে আসতেন নানা জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব। সবাইকে নিজের হাতে মটন কাটলেট রান্না করে খাওয়াতেন তিনি।মাঝে মাঝে সে দোলে যোগ দিতেন রবীন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। শোনা যায়ে একবার জ্যোতিইন্দ্রনাথ এর "মানময়ী" নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি এছাড়া কাদম্বরী দেবী ভালো গানও গাইতেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথর অলিকবাবু নাটকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথের সাথে অভিনয় করেছিলেন কাদম্বরী "হেমাঙ্গিনী "র চরিত্রে। সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ তাকে ডাকতেন "হেকেটি" বলে।
বিয়ের এতদিন পরেরও কোনো সন্তান না হবে তিনি অবসাদে ভুগতেন।সংসারে তাকে শুনতে হতো ছোট বড়ো নানান কথা। তার ননদ স্বর্ণকুমারী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা উর্মিলা ছিলেন তার নয়নের মনি। উর্মিলা তাকে বুঝিয়েছিলেন মাতৃত্বের স্বাদ। তিনি যেমন উর্মিলা কে ভালোবাসতেন তেমনি ঊর্মিলাও ভালোবাসতেন কাদম্বরী দেবীকে। তার থাকা খাওয়া ঘুমোনো সব আদরের নতুন মামীর কাছে। রোজ কার মতোই সেদিন উর্মিলা দুপুরে ঘুমোচ্ছিলো কাদম্বরী দেবীর কাছে। কাদম্বরী দেবী র চোখ লেগে গেলে সেই সময়ের সুযোগে উর্মিলা খাট থেকে নেমে কাদম্বরী দেবীর ছাদের ঘর দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে পরে গিয়ে তার মাথায় লাগে। ১৮৭৯ সালের ৩১ই ডিসেম্বর ৫বছরের সেই ছোট্ট উর্মিলার মৃত্যু হয়ে। তখন কাদম্বরী দেবীর বয়স ২১।
তখন থেকেই তার একাকীন্নতা বেড়ে যায়। ১৮৮০ সালে প্রথমবার কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তার ফল স্বরূপ সেই বছর রবীন্দ্রনাথ এর বিদেশ যাওয়া পিছিয়ে যে। এই ঘটনার পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে বেড়াতে যান বোম্বাই শহরের একটি পাহাড়ি অঞ্চলে।সেসময় জোড়াসাঁকো বাড়িতে তাদের মহলে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেখান থেকে ফেরার কাদম্বরী দেবী ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যেতেন রোজ বিকেলে হাওয়া খেতে ঘোড়ায় চড়ে। ১৮৮১ সালের জুন মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন "ভগ্নহৃদয় " যা তিনি উৎসর্গ করেছিলেন নিজের নতুন বৌঠান কে। ১৮৮৩ সাল তখন বাড়িতে তোড়জোড় শুরু হলো রবীন্দ্রনাথের বিয়ে নিয়ে। জ্ঞানদানন্দিনী সহ কাদম্বরী দেবী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী সকলেই গিয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী বাপের বাড়ি যশোরের একটি গ্রামে। সেখানেই হটাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন কাদম্বরী দেবী ,যার প্রমান মেলে বাড়ির হিসেবনিকেশ এর খাতা র থাকা তার নাম আসা নানান ওষুধের কথা থেকে।
১৮৮৩ সালের ২১ জুলাই স্টার থিয়েটারের উদ্বোধন হল গিরিশের লেখা “দক্ষযজ্ঞ' নাটক দিয়ে, সতীর ভূমিকায় অভিনয় করেন বিনোদিনী। তখন তো এই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাথে আর আলাপ হয় বিনোদিনীর | গিরিশ ঘোষ এর সাথে জ্যোতিরিন্দ্র কথা বলতে গেলে তিনি বলেন , মালিক সবাইকে অপমান করছেন। বিনোদিনী পনেরো দিন বেনারস বেড়াতে গেছিল বলে ওর টাকা কেটেছে। বিনোদ তাই রাগ করে ন্যাশনাল ছেড়ে দিল। আমিও বেবিয়ে এসে নাটক করছি। এখন নতুন থিয়েটার তৈরি করতে চাই। আপনার তো অনেক টাকাপয়সা, প্রতিপত্তি। দেখুন না কিছু-করতে পারেন কি না। সে কথা সোনার পর জ্যোতি উল্লসিত হন। জ্যোতিরীন্দ্রনাথ তখন উদগ্রীব হয়ে জানতে চান সে কি করলে তাদের সুবিধা হবে কারণ কোনো মোটেই তিনি বিনোদিনী কে দুঃখে দেখতে পারবেন না। । যখন বিনোদিনীর পুরনো প্রেমিক পালিয়ে বিয়া করেনিন তখন তার নিজের মানুষ বলে কেউ ছিলোনা । জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তার সাথে ছিলেন সেই সময় ,তখন থেকেই দুজনের মধ্যে বাড়তে থাকে ঘনিষ্টতা। সময় গেছে যখন জ্যোতি রাতে বাড়ি ফিরত না থেকে যেত বিনোদিনীর কাছে তখন কাদম্বরী দেবীর বড্ডো একা লাগতো ,তিনি ভাবতেন হয়তো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বিনোদিনীর কাছে থাকার জন্য রাতে বাড়ি ফিরতে পারেন না। বেশকয়েকদিন পর অলস দুপুরে বিনোদিনীর কোলে মাথা রেখে জ্যোতিরীন্দ্রনাথ গল্প করতে করতে তাকে জানাই নতুন জাহাজের খোল কেটার কথা,তারপর সেই জাহাজ সাজিয়ে তাকে নিয়ে জ্যোতি ঘুরতে যাবেন।সে কথা শুনে বিনোদিনী জ্যোতিরীন্দ্রনাথের চুলে বিল্লি কেটে দিতে দিতে তাকে জিজ্ঞেস করেন খোল কিনে কি হবে?তুমি অতবড় জমিদারবাড়ির ছেলে, তুমি এ-সব জাহাজের ব্যাবসা ট্যাবসা করবে কেন? তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ,বিনোদিনীকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে করতে বললেন তিনি বিনোদিনীর নাম একটা থিয়েটার বানিয়ে দেবেন।বিনোদিনী তার কাছে তার স্ত্রী কাদম্বরী র কথা জানতে চাইলে তিনি বিষাদমাখা গলায় বলেন ,কাদম্বরী দেবী হলেন তার গৃহলক্ষী।তার সঙ্গে রতিখেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানোর আনন্দ, কিন্তু তুমি আমার উত্তেজক মদিরা। আমার সৃষ্টির উন্মাদনা। এই দুইয়ে তুলনা চলে না। এরপরেই দুজনের মধ্যে পৃথিবীর আদিম মানব মানবীর মতো উদ্দাম রতিখেলা শুরু হয়ে। অন্যদিকে কাদন্বরী ঘরে ১৯এ এপ্রিল এর অনুষ্ঠানের কথা ভাবছিলেন যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাকে বলেছিলেন অনুষ্ঠানের দিন একেবারে জাহাজে নিয়ে গিয়ে তাকে চমক দেবেন ,কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন তিনিও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যে চমক দিবেন তার পছন্দের কমলা রং এর স্বর্ণচূরি শাড়ী পরে। ১৯এপ্রিল আজ অনেক অর্থব্যয়ে ও পরিশ্রমের পর উদ্বোধন হতে চলেছে জ্যোতিরিন্দ্রর নতুন জাহাজ যার নাম তারই নাটক "সরোজিনী " নামে রাখা হয়েছে ।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর জামা গোছাতে গিয়েই অভ্যেসমতো জ্যোতিরীন্দ্রনাথের জোববার পকেটে হাত দিয়ে কাগজপত্র বার করতে গিয়ে তার হাতে উঠে এল সুগন্ধী একটি খাম,কোনায় মেয়েলি ছাদের অক্ষরে লেখা “সরোজিনী” আর মাঝখানে জ্যোতির নাম। কাদন্বরীর বুক ধড়ফড় করে। কিছুটা সময় নিয়ে চিঠিটা খোলেন তিনি লেখাছিল যে ,বিনোদিনী যখন চিঠি টা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কে লিখছিলেন তখন জ্যোতিরিন্দ্রা তার পশে শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন।তিনি আরো বলেন যে ,তার শরীরের মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রের একটি ক্ষুদ্র বীজ বাড়িয়া উঠিতেছে, কয়েকদিন বমিবমি লাগিতেছিলো তার , এমাসে খঝতুদর্শন হয় নাই। প্রথমবার পোয়াতি হইবার সময়ে যেমন হওয়ার কথা ঠিক সেইরকম । জ্যোতিরিন্দ্র শুনিয়া খুশি হইবে কি না সে জানেনা বলেই সে মুখে বলিতেপারেনি । সন্তানের পিতৃপরিচয় সে কাউকেই জানাবে না শুধু সে নিজে জানবে আর জানবে জ্যোতিরিন্দ্র । সে জ্যোতিরিন্দ্র কে শতশত চুম্বন গ্রহণ করতে বলেছিলেন । এই চিঠি পড়ার পর তিনি শুধু অপেক্ষা করেছিলেন ১৯ তারিখ সন্ধ্যার।গত তিন দিন ধরে চলছে তার প্রস্তুতি , জ্ঞানদানন্দিনীও ছিলেন তার সাথে। কাদম্বরী দেবীর গৃহসজ্জায় রুচির পরিচয় পাওয়া গেলেও ,জাহাজ সাজানোর দায়ত্বি ছিল জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর ওপর। তাতে কাদম্বরী দেবীর অভিমান হলেও তা প্রকাশে আনেননি তিনি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের তাকে নিতে আসার কথা ছিলো ঠিক সন্ধ্যে ৬টার সময়। বিকেলে ৫টা থেকে, কমলা রঙের স্বর্ণচুরি শাড়ী তে সাজিয়ে তুললেন নিজেকে,দুপায়ে পড়লেন আলতা,বারোটি ধুপ জ্বালিয়ে তার ধোয়া লাগলেন চুলে। তারপর খোঁপা করে তাতে জুঁইফুলের মালা জড়িয়ে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন দরজার পিছনের আয়নাটার সামনে। ঘড়িতে ৬তা বেজে যাওয়ায় তিনি দেখতে গেলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাকে নিতে আসলেন কিনা কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন ঘরে এঁবং পালঙ্কে বসে ভাবতে লাগলেন কিভাবে দিনের পর দিন তিনি অবহেলিত হয়ে চলেছিলেন বাড়িতে, রান্না ঘরে কুটনাকাটার সময় বাড়ির বৌ মেয়ে দেড় আসরে তাকে আর ডাকা হয়ে না। রবীন্দ্রনাথের বিয়ার পর থেকেই তার বৌ কে জ্ঞানদানন্দিনী এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলাম নিজের সার্কুলার রোড এর বাড়ি তে ,সেখানেই বসে এখন সন্ধের আসর। রবি ও আসেননা এখন র নিজের নতুন বৌঠান এর সাথে দেখা করতে। তাই তিনি ভেবেছিলেন আজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর সাথে সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমান করবেন তিনি কতটা সুখী। কিন্তু অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ায় ,তখনও জ্যোতিরবীন্দ্রনাথ তাকে নিতে না আসায়ে রাগে -দুঃখে -অভিমানে ঘরের কোন থাকা জ্যোতির রুপোর ছড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলেন তার দীর্ঘদিনের শখের আয়নাটি। আয়নার সেই টুকরো কাঁচের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন এমন অবহেলিত মহিলাকে তার দেখতে হবেনা কোনোদিন। তিনি ছুটে গেলেন পাশের ঘরে এবং আলমারি খুলে বের করে আনলেন হাতির দাঁত এর কারুকার্য করা চন্দন কাঠের তৈরী গয়নার বাক্সটি।তাতে থাকা মনি-মুক্তার হার সরিয়ে বের করে আনলেন একটা কাগজের মোড়ক। তাতে ছিল কালো রঙের ৪টে আফিমের বড়ি ,যেটা খেলে নাকি পাখির মতো উড়েযাওয়া যে আকাশে। কাদম্বরী দেবীর কাপড়ওয়ালা বিশু বলেছিলো এক দেওয়াসিনী ঘুমের ওষুধ দায়ে। একটু ঘুম,বসি ঘুম,মরণ ঘুম,সেই শুনেই তিনি আনিয়েছিলেন সেই বড়ি। বাক্সে ছিল সযত্নে রাখা তিনটি মেয়েলি চিঠি ,সেগুলি পড়লেন আরেকবার। তার পর খেলেন সেই ৪টি আফিম এর বড়ি। ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়ে হেটে পাশের ঘরে যাবে তার পা থেকে পড়তে লাগলো রক্ত যাতে সারা ঘরে সাদা মার্বেল এর ওপর আঁকা হলো আল্পনা। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কে একটি চিঠি লিখে ওঠার পর তিনি দাঁড়াতে না পেরে পরে গেলেন মাটিতে।
কাদম্বরী দেবীর ভোরে ওঠার অভ্যেস ,পরের দিন ভোর বেলায় না ওঠে তার নিজস্ব দাসী হলোড় মা তাকে ডাকতে যান। দরজা খোলেননি কাদম্বরী। পাশের ৫নং বাড়ির একটা অংশ থেকে দেখা যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর মহল। সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাদম্বরী দেবীর ফাঁকা ঘর ও ফাঁকা পালঙ্ক। গুনেন্দ্রনাথ এর ছোট কন্যা সুনয়নি কে বোরো টুলে দাঁড় করিয়ে তাকে দেখতে বললেন ঘরের ভেতরে ,তিনি দেখে বললেন নতুন কাকী অস্বাভাবিক ভাবে শুয়ে আছে ঘরের মেঝে তে। তাকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে তার মৃত্যুর কথা। তার স্বামী উপস্থিত না থাকে দেবেন্দ্রনাথ তার বিশস্থ লোক কিশোরীকে দায়িত্ব দিলেন দরজা ভাঙার এবং সেই কথামতো কিশোরী চার জন পালোয়ান নিয়ে গেলেন তিনতলাতে। দরজা ভেঙে ঘরে যাওয়ার পর সে দেখতে পেলো কাদম্বরীর কামিজ পড়া শরীর এবং সেটা তিনি ঢেকে দিলেন চাদর দিয়ে। সে সাথে সাথে গিয়ে তার নারী পরীক্ষা করে দেখলেন নারী এখনো চলছে,আনন্দের সাথে এই কথা দেবেন্দ্রনাথ কে জানাতে যাওয়ার সময় সে দেখতে পেলো মেঝেতে ছড়ানো তিন টি চিঠি দুলাইন পরেই সে ছিড়ে ফেললো সেই তিনটি চিঠি এবং টেবিল এ রাখা চিঠিটি যেটি জ্যোতি কে লিখেছিলেন সেটিও ছিড়ে ফেললেন।তার পর ডেকে আনা হল সাহেবি ডাক্তার ও তিন জন বাঙালি ডাক্তার। এই খবর পাওয়া মাত্রই রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছুটে এলেন জোড়াসাঁকোর বাড়ি তে।তারপর ১৯ ও ২০ এপ্রিল টানা ২দিন ধরে বাড়ি তে থেকেই চলেছিল তার চিকিৎসা, কিন্তু বাড়ির হিসেবের খাতায় কোনো উল্লেখ মেলেনি। টানা ২দিন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের পর ২১এ এপ্রিল সকালবেলা তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২১ ও ২২ এপ্রিল ২দিন করোনা কোর্ট এর দুই কেরানি ,কেমিক্যাল এক্সামিনার সহ সাহেব কে বাড়ি তে ডেকে আনা হয়েছিল |দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কথা মতো ঘোষণা করা হয়েছিল যে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু তা ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু। ২৩এ এপ্রিল তার দাহকার্য শেষ করা হয়েছিল। শশানে তখন উপস্থিত ছিলেন সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর,দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর ,অরুনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
