Aparna Chaudhuri

Romance


3  

Aparna Chaudhuri

Romance


সূচনা

সূচনা

16 mins 334 16 mins 334

আজ একাদশী। পাড়ার প্যান্ডেলের বাঁশগুলো শুধু দাঁড়িয়ে আছে এখন। জানালা দিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে মনটা হুহু করে উঠলো শ্রাবণীর। কাল অবধি কি মজাই না হচ্ছিল ওখানে! আর আজ দেখ।

কাল ভাসানের সময় ও শেষবার দেখেছিল বুবাইদাকে। কাল বিকেলে যখন ঠাকুর নামানো হচ্ছিল সিঁদুর খেলার পর তখন শ্রাবণীও ওখানে ছিল। বাকি সবাইয়ের সঙ্গে বুবাইদাও হাত লাগিয়েছিল ঠাকুর নামাতে। তারপর ঠাকুর লরিতে চড়ানো হল। পাড়ার মেয়ে বউদের সঙ্গে শ্রাবণীও খানিকটা হেঁটে গিয়েছিল লরির পিছন পিছন। মাইকে গান বাজছিল,” আসছে বছর আবার হবে.তালে তালে নেচে উঠেছিল পাড়ার অসীমা বউদি, সোমা, পারুল। মেয়েদেরকে ঘিরে পাড়ার ছেলেরাও হাঁটছিল। শ্রাবণী খেয়াল করে যে বুবাইদা ঠিক ওর পাশে পাশে হাঁটছে। এত কাছে যে ওর শার্টের পারফিউমের গন্ধটাও শ্রাবণীর নাকে আসছিল। কথাটা ভাবতেই সেই মিষ্টি শিরশিরে অনুভূতিটা হযব্যাস ঐ পর্যন্তই । তারপর পাড়ার মোড় এসে গেল। ছেলেরা টপাটপ লাফিয়ে লরিতে উঠে পড়লো। মেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়ে গেল রাস্তায় আর লরি বড় রাস্তা দিয়ে চলে গেল।

কিছু মেয়ে অবশ্য গেল ভাসানে কিন্তু তারা পিছনে একটা বাসে করে গেল। শ্রাবণীর খুব ইচ্ছা ছিল যাবার। কিন্তু মা, ঠাকুমা পই পই করে মানা করে দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ও মায়ের চেয়ে ঠাকুমাকে বেশী ভয় পায়। কারণ মা শুধু ওকে বকবে, কিন্তু ঠাকুমা ওকে বকা দিয়ে শুরু করে মাকে বকা দিয়ে শেষ করবে। সেটা ওর খুব খারাপ লাগে। যাকগে এইসব নানা কথা ভেবে শেষ অবধি আর গেলো না ও। লরির ওপর থেকে বুবাইদা ওর দিকেই চেয়ে ছিল।

বুবাইদা হল পাশের চ্যাটার্জি বাড়ীর ছেলে। কোটাতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। পুজোতে বাড়ী এসেছে। এ পাড়ার পুজোটা বারোয়ারি হলেও পুজোর সব ব্যবস্থা করে চ্যাটার্জি বাড়ীর ঠাকুমা, মানে বুবাইদার ঠাকুমা। কয়েক পুরুষ আগে এই পুজোটা নাকি ওদের বাড়ীতেই হত। এখনও পুজোটা ওদের বাড়ীর সঙ্গে লাগানো খেলার মাঠেই হয়। এই জমিটা ওদেরই পূর্বপুরুষ ক্লাবকে দান করে।

শ্রাবণীদের বাড়ী মাঠের অন্য দিকটায়। আড়াই কাঠা জমির ওপর ছোট্ট একতলা বাড়ী ওদের। সামনে একচিলতে বাগান। ওদের বাড়ীর সামনে দিয়ে রোজ চ্যাটার্জি ঠাকুমা হাঁটতে যান। পুজোর কয়েকদিন আগে যখন মাঠে বাঁশ পড়লো, প্যান্ডেল বাঁধার জন্য, একদিন ঠাকুমা ওদের বাড়ীর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ওর মাকে ডেকে বললেন,” বৌমা, চতুর্থীর দিন দুপুর দুপুর চলে এসো, মেয়েটাকেও এনো। ঐদিন নারকেল নাড়ু বানানো হবে, মনে আছে তো?”

মা হেসে বলেছিল,” হ্যাঁ হ্যাঁ মাসিমা চলে আসবো। আপনি চিন্তা করবেন না। আসুন না ভিতরে এক কাপ চা খেয়ে যান।“

“না না আজ চলি মা। ও পরে হবে’খন।“

চ্যাটার্জি ঠাকুমা বয়সে শ্রাবণীর ঠাকুমার চেয়ে বড় কিন্তু এখনও খুবই শক্ত আছেন। এখনও নিজে হাতে মায়ের ভোগ রান্না করেন। সেই তুলনায় শ্রাবণীর ঠাকুমা একটু নড়বড়ে। বাতের ব্যথার জন্য উনি বিশেষ ঘর থেকে বেরতে পারেন না। কিন্তু ঘর থেকেই বাড়ীর সব খবর রাখেন।

“ কে এসেছিল বৌমা?” চ্যাটার্জি গিন্নি চলে যেতেই উনি ঘর থেকে জিজ্ঞাসা করলেন।

“ চ্যাটার্জি মাসিমা এসেছিলেন।“

“ অ … হ্যাঁ তাই তো দুগ্‌গা পুজো এসে গেল। তা নিশ্চয়ই কাজ করতে ডাকচে? বুড়ি খুব চালাক। সারা বচর দেকলে কতা বলে না। কিন্তু পুজোর সময় হলেই ঠিক লাটি ঠুক ঠুক করে চলে আসবে, বৌমা, বৌমা করে…। যত্তসব !”

শ্রাবণীর মা এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।

শ্রাবণী যানে ওর মত, ওর মায়েরও চ্যাটার্জি বাড়ী গিয়ে পুজোর কাজ করতে ভালোলাগে। পাড়ার বাকি বউ মেয়েরাও আসে। কাজ বিশেষ নেই। ওদের বাড়ীর উঠোনে ভিয়েন বসে। অবশ্য খরচ দেয় ক্লাব। পুজোর জন্য নানা রকম মিষ্টি নোনতা তৈরি হয়। নারকেল নাড়ু বানানোর বেশীর ভাগ কাজটা ঠাকুররাই করে দেয়। মেয়েরা শুধু গোল হয়ে বসে নাড়ু গড়ে। নানা রকম গল্প করে হাসাহাসি করে। তারপর কাজ হয়ে গেলে সবাই চা জলখাবার খেয়ে বাড়ী যায়।

ওদের বাড়িটা বেশ লাগে শ্রাবণীর। চ্যাটার্জি ঠাকুমা, চ্যাটার্জি জেঠিমাকে একটুও বকেনা। বরং পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে বসে যখন জেঠিমা হাসাহাসি করে তখন উনিও মুচকি মুচকি হেসে অন্য ঘরে গিয়ে বাকি পুজোর জিনিষপত্রের কেনাকাটা ঠিকঠাক হয়েছে কিনা দেখেন। ওদের বাড়িটা বিশাল। কিন্তু লোকজন খুবই কম। তাই নিচেকার বেশীরভাগ ঘরই সারা বছর তালা দেওয়া থাকে। এই পুজোর সময় সেই ঘরগুলো খুলে দেওয়া হয়। পুজোর জিনিষপত্র রাখার জন্য।

পাড়ার মেয়েরা সবাই চ্যাটার্জি ঠাকুমার অ্যাসিস্ট্যান্ট । উনি সবাইকে কিছু না কিছু কাজ দেন। যেমন এবার শ্রাবণীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন চাঁদমালাগুলো গুছিয়ে রাখার। ওগুলো রাখা হবে বাড়ীর পিছনের দালানের সিঁড়ির পাশের ঘরটাতে। শ্রাবণী ওগুলো রাখতে গেছে। ওদের বাড়ীর পিছন দিকটা একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা। পিছনের বাগানটাও একটু জঙ্গল জঙ্গল মত। তখন সন্ধে্য হব হব। শ্রাবণীর একটু গা ছম ছম করছিল। পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি ও পৌঁছে গেল ঘরটার সামনে।

ঘরের দরজাটাড় ল্যাচটা টানা রয়েছে। পুরনো দিনের ল্যাচ, জং ধরে শক্ত হয়ে গেছে। এক হাতে চাঁদমালার থলি, তাই অন্য হাত দিয়ে ল্যাচটা খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো ও।

“ সর, আমি খুলে দিচ্ছি।“ একটা গম্ভীর আওয়াজ বলে উঠলো ওর পিছন থেকে।

শ্রাবণীর প্রায় পিলে চমকে ওঠার অবস্থা। ও লাফিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো, আর হাত থেকে চাঁদমালার ব্যাগটা ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। সারা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো চাঁদমালাগুলো। একটি বছর কুড়ি একুশের ছেলে, একটা কালো লোয়ার আর সাদা টিশার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চতা প্রায় ছ ফুট, ঝকঝকে দুটো চোখ, পেটানো শরীর, মাথার চুল উসকোখুসকো, বোঝাই যাচ্ছে সবে ঘুম থেকে উঠেছে। শ্রাবণীর চিনতে অসুবিধা হল না, এতো বুবাইদা, চ্যাটার্জি জেঠিমার ছেলে। নিশ্চয়ই পুজোর ছুটিতে বাড়ী এসেছে। খালি পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছে তাই শ্রাবণী আওয়াজ পায়নি।

“ এ বাবা ! দিলি তো পুজোর জিনিষগুলো মাটিতে ফেলে! আমি গিয়ে ঠাকুমাকে বলে দিই?” একটা দুষ্টু হাসি খেলে গেল ছেলেটির চোখে।

শ্রাবণী মাথা নিচু করে তাড়াতাড়ি চাঁদমালাগুলো তুলতে থাকে ব্যাগের মধ্যে। চোখের কোন দিয়ে দেখে হাতের এক অনায়াস ঝটকায় দরজার ল্যাচটা খুলে ফেলল বুবাই।

চাঁদমালাগুলো ব্যাগে ভরা হতে ও ব্যাগটা কোনোরকমে ঘরে রেখেই একছুটে চলে এলো বাড়ীর সামনের হলে। সেখানে ওর মা সবার সাথে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছিল। ওকে দেখে মা বলে উঠলো , “ ওকিরে ! অমন হাঁপাচ্ছিস কেন?”

ও কিছু জবাব দেবার আগেই বুবাইদা অন্য দরজা দিয়ে হলে ঢুকল।

“ কাকিমা ভালো আছো?” বলেই মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

“ আরে বুবাই যে ! কবে এলি? থাক থাক বাবা।“ 

পাড়ার বাকি কাকিমা, মাসীমা সবাই বুবাইকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবার মনে হাজার প্রশ্ন। কবে এলো? কতদিন থাকবে? কবে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হবে? তারপর কি করবে? বিদেশ যাবে না দেশে থাকবে......ইত্যাদি ইত্যাদি।

শ্রাবণী দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ দেখল তারপর ধীরে ধীরে মায়ের কানে কানে বলল,” মা সাড়ে ছটা বাজে।“

শ্রাবণী জানতো আর কিছু বলার দরকার নেই। মা এতেই উঠে পড়বে। আর হলও তাই, মা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে,”দিদি আসি গো। বড্ড দেরি হয়ে গেছে ।“ বলে ওকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো।

মাঠ পেরিয়ে গ্রিলের গেটটা খুলতে খুলতেই শ্রাবণী ঠাকুমার গলা শুনতে পেলো, “বলি পাড়ার ঠাকুর আসছে বলে কি ঘরের ঠাকুর আর সন্ধ্যে পাবেনা? আমার কথা ছেড়েই দাও। ......”

মা তাড়াতাড়ি ছুটল রান্নাঘরে , চা বসাতে। আর শ্রাবণী ছুটে চলে গেল নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। এখনও ওর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়নি। আয়নার সামনে দাঁড়ালো গিয়ে। কেমন দেখাচ্ছিল ওকে? ইস আজকেই এই পুরনো রংচটা স্কার্ট আর টপটা পরে গিয়েছিল ও। চুলটাও ঠিক করে বাঁধেনি। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে ও। ওকে সবাই ফরসা বলে। ওর মুখটা পান পাতার মত, টানাটানা দুটো চোখ। না সাজলেও মন্দ দেখায় না ওকে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিকে নিজেই কমপ্লিমেন্ট দেয় ও। 

“ বুড়ি ! দরজাটা খোল।“ মায়ের ডাকে দরজাটা খুলে দেয় ও।

“ কি করছিলিস? এখনও জামা ছাড়িস নি? “ মার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। তাড়াতাড়ি কাপড় ছেড়ে মা ঠাকুরকে ধূপ দেখিয়ে আবার ছুটল রান্নাঘরে।

মা চলে যেতেই ও আবার গিয়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে। নাহ্‌ , কাল ঠিকমত তৈরি হয়ে যেতে হবে। মনে মনে ঠিক করে নেয় কোন জামাটা পরবে আর তার সাথে ম্যাচিং গয়না ইত্যাদি।

পরেরদিন পঞ্চমী । বিকালে ঠাকুর আসবে। শ্রাবণী জানালা দিয়ে দেখলো মাঠের প্যান্ডেল বানানো প্রায় শেষ। লাল সাদা কাপড় দিয়ে বানানো হয়েছে গেট টা। প্যান্ড্যালটা আকারে বেশ বড়, পুরো মাঠটাকেই ঘিরে ফেলেছে। ভোরবেলা থেকে কয়েকবার ঢাক বেজেছে, মানে ঢাকিরা এসে গেছে। পাড়ার পঞ্চুদা মাইক লাগাচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গান বাজতে শুরু করবে।

সকাল দশটা নাগাদ পাড়ার রিঙ্কু, সোমা, মালা সবাই ওর বাড়ীর সামনে এসে হাজির।

“ অ্যাই বুড়ি, বাইরে আয়।“

“ কি রে?”

“ ক্লাবের ছেলেরা বলছে মা দুর্গার বেদীটা আলপনা দিয়ে সাজাতে। তোকে ছাড়া হবে না।“

“ তোরা যা আমি আসছি।“

তাড়াতাড়ি ঘরে আসে শ্রাবণী। আর ও না সেজে বেরোচ্ছে না। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেয় ও।

“ আমি আসছি মা। প্যান্ডেলে আছি।“

“ বাবা! এতো সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?”

“ মা কোথায় সাজ? আজ পঞ্চমী, বিকালে ঠাকুর আসবে।“ ছুটে বেরিয়ে গেল ও।

শ্রাবণীর আঁকার হাত ভালো। তাই পাড়ায় তার বেশ সুনাম আছে। ও প্যান্ডেলে ঢুকতেই পাড়ার শঙ্করদা চেঁচিয়ে উঠলো,” এইতো এসে গেছে। অ্যাই, বুড়িকে আলপনা দিতে দে।“

শ্রাবণী তাড়াতাড়ি জুতোটা খুলে মা দুর্গাকে বসানোর বেদীটাতে উঠতে যাবে, দেখলো বুবাইদা সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সোজা ওর দিকে তাকিয়ে। ওর সঙ্গে চোখাচুখি হতেই ও চোখ নামিয়ে নিল। উফ! সাদা পাজামা পাঞ্জাবিতে কি দারুণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে বুবাইদাকে। মাথা নিচু করে বুবাইদাকে পাশ কাটিয়ে ও চলে গেল আলপনা দিতে।

আলপনা দেখে সবাই প্রশংসা করল, শুধু বুবাই উরফে বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জি, নাক কুঁচকে বলল,” এ তো সহজ! আসল আলপনা আমাদের কলেজে দেওয়া হয়। মাটিতে গোল করে। সাইজ হয় দশ ফুট বাই দশ ফুট। “

“ সে আর এমন কি? আমাদের বুড়িও পারবে। কি রে পারবি না?“ শঙ্করদা শ্রাবণীর হয়ে চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করে নিল।

“ পারবো। কিন্তু মাপটা বুঝবো কি করে?” জিজ্ঞাসা করল শ্রাবণী।

“ সে আমি করে দিচ্ছি। অ্যাই পটলা, আমাদের বাড়ী গিয়ে একটা পেন্সিল, একটা চক আর একটা হাত পাঁচেকের সুতলি দড়ি নিয়ে আয় তো। “ বলে উঠলো বুবাই।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব জিনিস এসে গেল।

বুবাই দড়ির একটা দিক পেন্সিলে আর অন্য দিকটা চকে বাঁধলো। তারপর পটলাকে ঠিক মাঝখানে দাঁড় করিয়ে পেন্সিলটা মাটিতে শক্ত করে ধরে রাখতে বলল, আর নিজে চকটাকে নিয়ে সরে গেল বৃত্তের পরিধি যেখানে হবে সেখানে। তারপর চকটা দিয়ে একটা নিখুঁত বৃত্ত এঁকে দিল।

শ্রাবণী পাঁচ মিনিট ভাবল। তারপর আঁকতে শুরু করল। পাড়ার সব ছেলে মেয়েরা ঘিরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। সময় যেমন যেমন গড়িয়ে গেল লোকজনের ভিড় কমতে লাগলো। শেষে শুধু শ্রাবণী আর বুবাই রইল মণ্ডপে।

এদিকে দুপুর গড়িয়ে গেল, কিন্তু মেয়ে বাড়ী ফিরল না দেখে শ্রাবণীর মা ওকে প্যান্ড্যালে ডাকতে এসে দেখল খালি প্যান্ড্যালে ওরা দুজন রয়েছে। একজন একমনে এঁকে যাচ্ছে, অন্যজন বিভোর হয়ে দেখে যাচ্ছে।

“কি রে ! সেই কখন বেরিয়েছিস, একটা আলপনা দিতে এতো সময় লাগে?”

বলতে বলতে কাছে এসে কথা বন্ধ হয়ে গেল ওঁর। এই অপূর্ব আলপনাটা শ্রাবণী আঁকছে! নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হত না ।

“আসলে ও একা একা আঁকবে, তাই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আসুন না এখানে বসুন কাকিমা।“ ওনার উপস্থিতি টের পেয়ে যেন সাফাই দিল বুবাই।

ওর গলার স্বরে হুঁশ এলো শ্রাবণীর, “ অনেক বেলা হয়ে গেল কি মা? আচ্ছা চল বাকিটা পরে করব।

“ বেলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু তুই ওটুকু শেষ করে নে। আমি বসছি।“

“ আমি তাহলে আসি?” একটু যেন ইতস্তত করল বুবাই।

শ্রাবণী একবার মুখতুলে ওর দিকে তাকাল।

“ আচ্ছা শেষ হবার পরেই যাব।“ বলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল বুবাই।

সেদিন বিকালে প্যান্ড্যালে গিয়ে শ্রাবনী দেখলো ওর আলপনাটা বাঁশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। আর তার ওপর খুব সুন্দর করে লাগানো হয়েছে প্রদীপ।

শ্রাবণীকে দেখে পটলা, শঙ্করদা সবাই হই হই করে উঠলো,” কি কাণ্ড করেছিস রে! তুই যে এতো ভালো আঁকিস তা তো আমরা জানতাম না। ভাগ্যিস বুবাই চ্যালেঞ্জটা দিল। আর দেখ, বুবাই কি সুন্দর করে আলপনাটাকে ঘিরে দিয়েছে,যাতে নষ্ট না হয়। তোকে একটা প্রাইজ দিতে হবে দেখছি।“

ও দেখল বুবাইদা ওর দিকে চেয়ে হাসছে। ওর হাসির মধ্যে কি ছিল কে জানে, শ্রাবণীর সারা শরীরে একটা অদ্ভুত মিষ্টি শিরশিরানি শুরু হয়ে গেল। ও একটু হেসে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচল।

বুবাইদাকে দেখলে ওর এরকম কেন হল? আগে তো কখনো...। না ওর সামনে মাধ্যমিক, মা বলেছে এখন মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। কিন্তু খালি বুবাইদার মুখটা চোখের সামনে ভাসছে।

সেদিন রাত্রে ঠাকুর আসলো। কিন্তু শ্রাবণী আর গেল না প্যান্ড্যালে। পরের দিন ভোর পাঁচটায় পারুল ডাকতে এলো ওকে,” কিরে শিশির আর দুব্বো তুলতে যাবি না?”

“এক্ষুনি আসছি ।“ বলে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো শ্রাবণী।

চ্যাটার্জি ঠাকুমা স্নান করে তৈরি। ওকে দেখে একগাল হেসে বললেন,” মা আমার, কি সুন্দর আলপনা দিয়েছিস, সারা পাড়া ধন্যি ধন্যি করছে।“

ওনার এই গুণটা বড় ভালো লাগে শ্রাবণীর, সব সময় হাসি মুখ আর মিষ্টি কথা। তাড়াতাড়ি ঠাকুমার কাছ থেকে শিশির তোলার জন্য খানিকটা তুলো আর দূর্বা তোলার জন্য একটা বাটি নিয়ে ওরা চলল বাগানের দিকে। পারুল বাগানের বাইরের দিকটায় গেল আর শ্রাবণী ভিতরের দিকটায় ।

“তুই কাল রাতে ঠাকুর আসার সময় এলি না কেন?” পিছনের দালান থেকে বুবাইদার গলা শোনা গেল।

শ্রাবণী সবে তুলো দিয়ে দূর্বার উপরে পড়া শিশির গুলো তুলতে শুরু করেছিল। ও একেবারে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে গেল।

“ কি রে উত্তর দিচ্ছিস না যে।“

“ না মানে , আমি ...।“

“ আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।“

“ কেন?”

“ এদিকে আয়।“

শ্রাবণীর পা একটুও নড়ল না। ও অসহায় ভাবে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুবাই ওর দিকে এগিয়ে এলো। ওর সামনে দাঁড়িয়ে ওর দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। হাতে ধরা রয়েছে একটা ক্যাডবেরি।

“ নে তোর প্রাইজ। খুব ভালো আলপনা দিয়েছিস, তাই। কালকেই দেবো ভেবেছিলাম, কিন্তু তুই তো এলি না। “

ক্যাডবেরিটা এক ঝটকায় নিয়ে শ্রাবণী এক ছুটে চলে এলো পারুলের কাছে।

“ কি রে অমন ছুটছিস কেন?”

“ না মানে ওদিকটায় ভালো দূর্বা নেই।“

ষষ্ঠীর দিন বিকালে যখন শ্রাবণী প্যান্ডেলে পৌঁছল তখন সেখানে বেশ ভিড়। প্যান্ডেলের অন্য দিকের কোনে বুবাই দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছেলের সঙ্গে। ছেলেগুলো এ পাড়ার নয়। পারুলই ওকে খবর দিল ,”ওরা সব বুবাইদার কলেজের বন্ধু। ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এখনি ওরা সবাই ঠাকুর দেখতে চলে যাবে।“

“ হ্যাঁ রে, তোরা ঠাকুর দেখতে যাবি না?” জিজ্ঞাসা করল শ্রাবণী।

“ হ্যাঁ, আমার মাসি আর তার দুই ছেলে মেয়ে এসেছে আমরা একসাথে বেরবো একটু বাদে। আর তোরা ?”

“ জানিনা দেখি মা বাবা কি বলে।“ মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ । ও জানে মা বাবা বেরোবে না। ঘরে বসে টিভিতে পূজা পরিক্রমা দেখবে।

প্যান্ডেল থেকে বেরনোর সময় শ্রাবণী দেখল বুবাইদা ওদের কালো রঙের এস ইউ ভিটায় বন্ধুদের সঙ্গে হই হই করতে করতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে গেল।

বাড়ী ঢুকতেই মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, “ কি রে! এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে? আর একটু প্যান্ডেলে থাকতে পারতিস! “

“ নাহ।“ বলে ও নিজের ঘরে চলে যেতে যেতে আড় চোখে দেখল ঠাকুমা আর বাবা বসার ঘরে দুজনে পাশাপাশি বসে পূজা পরিক্রমা দেখছে।

“ হ্যাঁ গো, পুজোর দিন একটু স্পেশাল কিছু ভাজাভুজি বানাবে না?” বাবার গলা ভেসে এলো।

“ আচ্ছা আনছি।“ মা উত্তর দিল রান্নাঘর থেকে।

অসহ্য লাগে শ্রাবণীর। ওদের বাড়িটা এরকম সৃষ্টিছাড়া কেন? মনে হয় মানুষগুলো

পঞ্চাশ বছর আগের। ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ায় শ্রাবণী।

“ আচ্ছা এই পুজোর কটা দিন কি বাইরের খাবার খেলে হয় না? সবার মা মাসি বাইরে ঠাকুর দেখতে যাচ্ছে। আমরা যেতে পারি না?”

মা কিরকম একটা অপরাধীর মত তাকায়,” আজ যে ষষ্ঠী। আমি , তোর ঠাকুমা সবার নিরামিষ।“

“কেন বাইরে কি নিরামিষ খাবার পাওয়া যায় না? চলো না মা আমরা ঠাকুর দেখতে যাই।”

“ তোর বাবাকে বল। আজ আমার পক্ষে বেরনো মুশকিল, রাতে লুচি। ও গরম গরম ভেজে না দিলে খাওয়া যায় না।“ বেগুনির জন্য বেসন গুলতে গুলতে মা বলল।

শ্রাবণী মরিয়া। বাইরের ঘরে গিয়ে বাবার সামনে দাড়াল ও।

“বাবা যাবে ঠাকুর দেখতে?”

“ ওরে বাবা। আমি ? ঐ ভিড়ের মধ্যে। আমায় মাফ কর মা। তুমি আর তোমার মা যেতে চাইলে যাও।“

ও অসহায় ভাবে ঠাকুমার দিকে তাকাল। ঠাকুমা একমনে টিভি দেখে চলেছে। ওর দিকে তাকালোই না। ও ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শুনল ঠাকুমা বাবাকে বলছে,” একটু চা হলে বেশ হয়, কি বলিস?”

সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিনদিনই শ্রাবণী অঞ্জলি দেয়। এবার অঞ্জলি বেশ সকাল সকাল পড়েছে। স্নান করে, মায়ের একটা শাড়ি পরে ও গিয়েছে অঞ্জলি দিতে। অনেকে এসেছে তাই বেশ ভিড়। ঠাকুরমশাই সবাইকে ফুল দিলেন। শ্রাবণী ফুলটা নিয়ে হাতজোড় করতে যাবে, এমন সময় ওর পিছন থেকে একটা হাত ওর হাতের পাশে এলো,” তোর থেকে আমায় একটু ফুল দে তো!”

ওর কানের একদম কাছে বুবাইদার আওয়াজ। ওর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে বুবাই। ব্যাস হয়ে গেল অঞ্জলি দেওয়া। পুরোহিত মশাই কি মন্ত্র পড়েন তা এমনিই কম বোঝা যায় , এবার তো কিছুই বুঝতে পারল না ও।

অঞ্জলির শেষে যখন ও বাড়ী ফিরছে গলির কোনে দাঁড়িয়ে ছিল বুবাইদা,” শাড়িটা কার? কাকিমার? ভালো দেখাচ্ছে।“

অন্যদিকে তাকিয়ে কথাগুলো হওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে, শ্রাবণীর বুকের ভিতর ঝড় তুলে দিয়ে, হেলতে দুলতে বুবাই প্যান্ড্যালের দিকে চলে গেল।

ছুটে ঘরে এসে নিজেকে আয়নায় দেখে ও। মায়ের রয়্যাল ব্লু রঙের শিফন শাড়িটাতে ওকে একেবারে একটা বিদ্যুৎ শিখার মত দেখাচ্ছে। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই চোখ ফেরাতে পারেনা ও।

বিকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। চ্যাটার্জি জেঠী ওদের বাড়ী এলেন।

“ বলছি বিমলা, তোমরা তো ঠাকুর দেখতে বেরোও না। আমরা আজ গাড়ী করে যাচ্ছি ঠাকুর দেখতে। আমি , মা, বুবাইয়ের বাবা সবাই। বুড়িকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাই?”

“ হ্যাঁ, হ্যাঁ ! দিদি নিয়ে যান না। “ মা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল।

“ ওকে আমি নিজে পৌঁছে দিয়ে যাব। তুমি একদম চিন্তা কোর না।“

গাড়ীতে করে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শ্রাবণীর এই প্রথম। চ্যাটার্জি জেঠু গাড়ী চালাচ্ছে, তার পাশে বসে আছে বুবাই। মাঝের সিটে জানালার ধারে ঠাকুমা, মাঝে জেঠিমা আর তারপাশে শ্রাবণী।

চারিদিকের বাড়িগুলো আলোর মালায় সাজানো, রাস্তায় মানুষের ঢল, তার মধ্যে দিয়ে খুব ধীরে ধীরে চলতে লাগলো ওদের গাড়ীটা। অনেক ঠাকুরই ওরা গাড়ীতে বসে দেখতে পেলো। কিন্তু কিছু ঠাকুর যেগুলো দেখার জন্য অনেক হাঁটতে হয় সেগুলোতে ঠাকুমা আর নামলেন না। জেঠু জেঠিমার আর বুবাইদার সাথে শ্রাবণী গেল ঠাকুর দেখতে। রাস্তায় এগরোল, ফুচকা, আইসক্রিম সব খাওয়া হল। ঠাকুমা শুধু চা আর আইসক্রিম খেলেন। শ্রাবণীর মনটা মায়ের জন্য হুহু করে উঠলো। ওরাও তো এরকম ভাবে বেরতে পারে। একদিন মাও ছুটি পায় রান্নাঘর থেকে।

যোধপুর পার্কে পৌঁছে জেঠিমা বলল,” আমি আর হাঁটতে পারছিনা বাবা। এখানে অনেক হাঁটা। তোমরা যাও আমি আর মা বসি। “

জেঠু বলল,” তাহলে বুবাই তুই আর বুড়ি যা । আমি বরং গাড়িটাকে যে দিক দিয়ে বেরনোর রাস্তা তার সামনে নিয়ে গিয়ে রাখছি।“

বুবাই মুখটা ব্যাজার করে বলল,” ছাড় তাহলে আমিও যাবনা।“

শ্রাবণী চুপ।

ঠাকুমা বললেন ,” যা না মেয়েটাকে দেখিয়ে নিয়ে আয়...।“

ওরা নামতেই জেঠু গাড়িটাকে নিয়ে এগিয়ে গেল। বাঁশ দিয়ে ঘেরা রাস্তায় খুব ভিড়। বুবাইদা ওর হাতটা চেপে ধরল, “ হাত ধরে হাঁট। কোথায় আবার হারিয়ে যাবি। আফটার অল আমার দায়িত্ব।“

“ ধ্যাৎ!” বলে শ্রাবণী হাতটা ছাড়িয়ে নিল।

ওকে লজ্জা পেতে দেখে বুবাই কাঁধ ঝাকিয়ে একটা অদ্ভুত কায়দায় হেসে উঠলো। রাস্তার পাশে অনেক স্টল লেগেছে। তাতে খাবার থেকে আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারি সবই বিক্রি হচ্ছে।

“ কিছু কিনবি?” জিজ্ঞাসা করল বুবাই।

“ না । “

“পয়সা আছে আমার কাছে। সামনের বছর ক্যাম্পাস ইন্টার্ভিউ হবে। তখন আমি চাকরিও পেয়ে যাব।“ নিজের মনেই বলে চলল বুবাই।

“ আমায় এসব বলছ কেন?” মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করে শ্রাবণী।

শুনতে না পাওয়ার ভান করে মাথাটা ঝুকিয়ে ওর কাছে নিয়ে চলে আসে বুবাই,” অ্যাঁ? কি বললি?”

“ আমায় বলছ কেন?”

“ কেন বলছি বলত? “ ওর চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে বলল বুবাই।

লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে শ্রাবণীর ফর্সা গাল দুটো। ইস চারিদিকে এতো লোক! সবাই কি ভাবছে। মুখ নিচু করে নেয় ও।

হঠাৎ ওর হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেয় বুবাই। পাশ দিয়ে একটা বিরাট দল হই হই করে বেরিয়ে যায়।

“ কোন দিকে খেয়াল নেই, আমাকেই সামলাতে হবে দেখছি।“ কানের কাছে কথাগুলো বলে হাঁটতে শুরু করল বুবাই।

এরপর অষ্টমী, নবমী, দশমী পুরো স্বপ্নের মত কেটে গেল। সর্বক্ষণই বুবাই ওর আশেপাশে। কিন্তু আজ কি হবে? আজকে টিউশনের ক্লাসও নেই। কাল থেকে শুরু হবে। এ পাড়ার সব তাতেই তাড়াহুড়ো। সবার পাড়ার ঠাকুর দ্বাদশী বা ত্রয়োদশীর দিন যায়। এদের দশমীর দিনই বিসর্জন দিতে হবে। সারাদিন মনখারাপ করে বিছানায় শুয়ে রইল শ্রাবণী।

বিকালে পারুল এলো ওদের বাড়ী বিজয়া করতে। ওমনি শ্রাবণীর মন নেচে উঠলো।

“ কিরে তুই কোথাও বিজয়া করতে যাবি না?”

“ তুই যাচ্ছিস ?”

“ হ্যাঁ । তুই যাবি আমার সাথে?”

“ মা আমি যাই?” 

পারুলের সাথে কয়েকটা বাড়ী ঘুরে শেষে ও গেলো চ্যাটার্জি জেঠিদের বাড়ী। কিন্তু বুবাইদা নেই। কোথায় গেছে জিজ্ঞাসা করার সাহস হল না।

পাড়ার ছেলেমেয়েরা পূজা কার্নিভাল দেখতে গেল। কিন্তু শ্রাবণীর যাবার অনুমতি নেই। আসলে সেদিন শ্রাবণী ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল বলে বাড়ীতে ঠাকুমা খুবই অশান্তি করে। তাই এবার মা আর ওকে যেতে দেয়নি।

সেই বিসর্জনের পর থেকে বুবাইদার সঙ্গে দেখা হয় নি শ্রাবণীর।

আজ লক্ষ্মী পুজো। মাঠে ছোট একটা প্যান্ড্যাল করে পুজো হচ্ছে। দুর্গা পুজোর পর এই পুজোটা কেমন ন্যাতানো মনে হয় শ্রাবণীর। যাই হোক বিকালের দিকে ও গেছে প্যান্ড্যালে। একপাশে চেয়ার নিয়ে বসে পাড়ার ছেলেরা আড্ডা মারছিল। বুবাইদাও ছিল। কেমন যেন শুকনো লাগলো ওর মুখটা। ও দুএকবার তাকালো বুবাইদার দিকে কিন্তু বুবাইদা এমন একটা ভান করলো যেন ওকে চেনেই না। খুব রাগ হল ওর। গট গট করে হেঁটে বাড়ী চলে এলো। না দেখলো তো বয়েই গেল। ওদের বাড়ীতেও লক্ষ্মী পুজো। সেখানে ওর অনেক কাজ।

বিকালে পুজো হয়ে যাবার পর মা বলল,” বুড়ি, প্রসাদটা চ্যাটার্জি জেঠিমাকে দিয়ে আয়।“

“ আমি পারব না।“

“ ওমা, ও কি কথা। কি হয়েছে? জেঠী কিছু বলেছে?”

“ না।“

“ তাহলে?”

“ কিছু না । “

“ আচ্ছা তাহলে আমিই নাহয়......”

“ থাক। দাও । আমিই দিয়ে আসছি।“

পুজোর প্রসাদটা নিয়ে মাঠ দিয়ে যখন যাচ্ছিল শ্রাবণী তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে চারিদিক। আকাশে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ। দরজার বেলটা বাজিয়ে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগলো শ্রাবণী। কয়েক মিনিটের মধ্যে জেঠিমাই দরজাটা খুলল। বাইরে থেকেই জেঠির হাতে প্রসাদটা দিয়ে শ্রাবণী বলল,“ মা পাঠিয়েছে।“

“ আয়...... বস।“ বলল জেঠী ।

“আজ আর আসবো না জেঠী। পরে একদিন আসবো।“ বলে বেরিয়ে আসলো শ্রাবণী। বুবাইদা মনে হয় এখনও প্যান্ড্যালেই আছে, ভাবতে ভাবতে গেটের দিকে পা বাড়াল শ্রাবণী।

এদের বাগানটা বেশ অন্ধকার। বাগানের শেষপ্রান্তে একটা ঝাঁকড়া টগর গাছ। ঐ গাছটা পেরোলেই গেট। গাছটার কাছে আসতেই একটা হাত ওকে এক ঝটকায় টেনে নিল ঝোপের ভিতর।

একটা অস্ফুট চিৎকার করে ও পুরো আছড়ে পড়লো বুবাইদার বুকের ওপর।

“ কি ব্যাপারটা কি রে তোর?” ফিসফিস করে বলে উঠলো বুবাইদা।

“ কি?” আর কিছু বলতে পারল না শ্রাবণী। বুবাইদা ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে নিজের বুকের কাছে। ভীষণ ভালো লাগছে শ্রাবণীর।

“ এ কদিন তোর কোন পাত্তা নেই। আমি তোর সঙ্গে যোগাযোগ করার কোন রাস্তাই পাচ্ছি না। জানিস আমি কালই চলে যাচ্ছি ফেরত। “

“ কালই?”

“হুম। তোর মোবাইল নাম্বারটা দে?”

“ আমার নিজের কোন মোবাইল নেই।“

“ কি? আজকালকার দিনে এও হয় নাকি?”

“ ছাড়ো।“

“ উঁহু।“

“ কেউ এসে যাবে।“

“ আগে বল, তোর সাথে যোগাযোগ করব কি করে?” অস্থির শোনায় বুবাইয়ের গলাটা।

“ কেন? কি দরকার?” ফিক করে হেসে ফেলে শ্রাবণী।

“ উফফ! তোরা মেয়েরা না......কেন? বুঝতে পারছিস না, কেন?”

শ্রাবণী আবছা অন্ধকারে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ায়,”না”।

আর কোন কথা না বলে নিজের ঠোঁটটা শ্রাবণীর ঠোঁটে চেপে ধরে বুবাই।




Rate this content
Log in

More bengali story from Aparna Chaudhuri

Similar bengali story from Romance