বৃত্তের বাইরে পর্ব তেত্রিশ
বৃত্তের বাইরে পর্ব তেত্রিশ
পর্ব তেত্রিশ
বাড়িতে এক গাড়ি পুলিশ এসেছে দেখে রাজদীপের বড় দাদা রাজকিশোর এবং রাজকুমার পুলিশের মুখে দুর্ঘটনার কথা শুনে বিচলিত হয়ে পড়ল ।
মঞ্জরী দেবী ঠাকুর ঘরে জপ করছেন । আসন ছেড়ে উঠতে পারছেন না , অথচ বেশ বুঝতে পারছেন বাড়িতে পুলিশ এসেছে ।
রাজকিশোর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল - কোন হাসপাতালে আছে আমার ভাই ? কেমন আছে সে ?
পুলিশ অফিসারটি বেসরকারি হাসপাতালের নাম , আই টি ইউ রুম নং দিয়ে বললেন - ভেরী সিরিয়াস কণ্ডিশন । আপনারা আমাদের সঙ্গে চলুন।
রাজকিশোর রাজকুমারকে বুঝিয়ে পুলিশের সঙ্গে চলল । বলে গেল - মাকে সঠিক কথাটি না বলে ওঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসবি । আমি আসছি ।
রাজকিশোর পুলিশের গাড়িতে উঠল । মঞ্জরী দেবী বেরিয়ে এসে বললেন - ওকে নিয়ে যাচ্ছেন কেন ? কি দোষ করেছে ও ?
রাজকুমার মাকে বোঝাতে লাগল ।
- দীপু হাসপাতালে ভর্তি আছে মা । বাইক এক্সিডেন্ট করেছে । পা ভেঙে হাসপাতালে আছে । তুমি কি যাবে ?
মঞ্জরী দেবী উদ্বিগ্ন হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন ।
- দীপু তো রোজকার মচ দোকানে গেছে । এক্সিডেন্ট কোথায় হল ?
- তা তো জানি না মা । চল হাসপাতালে যাই। সব জানা যাবে ।
রাজকুমার গাড়ি বের করে মাকে নিয়ে চলল হাসপাতালে।
রুম নং ১১৯ , ইনটেনসিভ ট্রমা কেয়ার ইউনিট । পুরো ঘরটা পরিস্কার কাঁচ দিয়ে ঘেরা । তবে বাইরে থেকে ইউনিটে ঢুকলে তবে দেখা যায় । অর্থাৎ একটা রুমের ভেতর আরেকটা কাঁচের রুম তৈরী করা আছে ।
অক্সিজেন, ইকো, সেলাইন থেকে সবকিছু সেখানে উপলব্ধ ।
রাজকিশোর রুমে ঢুকে কিছু বুঝতে পারল না । শুধু দেখল সাদা ব্যাণ্ডেজ কাপড়ে একটি দেহকে আচ্ছাদিত করে রাখা আছে । ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হাত এবং পা ঝুলিয়ে রাখা আছে । নাকে অক্সিজেন লাগানো । হার্ট মনিটরে কয়েকটা আঁকা বাঁকা লাইন সরে সরে যাচ্ছে ।
রাজদীপের রক্তমাখা প্যান্ট ও শার্ট দেখে রাজকিশোর চিনতে পারল ভাইকে ।
পুলিশ অফিসার ঘটনার বিবরণ দিয়ে বললেন - এন এইচ ২ ফ্লাই ওভারের সামনে রেলওয়ে স্টেশন যাবার পথে সে পড়েছিল ।
রাজকিশোরের সন্দেহ হল দোকান ছেড়ে ভাই কেন ওদিকে যাচ্ছিল । সদুত্তর না পেয়ে রিসেপশনে এসে দাঁড়াল। রাজকুমার মঞ্জরী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে দাদাকে দেখতে পেয়ে বলল - এখন কি অবস্থা ?
রাজকিশোর বলল - ডাক্তারের সাথে কথা হয়নি । সিস্টার বললেন ডাক্তারবাবু বাহাত্তর ঘন্টা অপেক্ষা করতে বলেছেন । তারপর বোঝা যাবে পেশেন্টের কণ্ডিশন কোনদিকে মোড় নেবে ।
- মোড় নেবে মানে ? মঞ্জরী দেবী কেঁদে ফেললেন ।
রাজকুমার মাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল ।
- ধৈর্য্য রাখো মা । বিপদ ঠিক কেটে যাবে ।
এমন সময় মেডিকেল বোর্ডের জনৈক ডাক্তার বাবু ট্রমা সেন্টারের দিকে যাচ্ছিলেন । মেয়ে রিসেপশনিস্ট রাজকিশোরকে বলল - ওই ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞেস করে দেখুন পেশেন্টের কণ্ডিশন কেমন । স্যার মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য ।
রাজকিশোর ডাক্তার বাবুর পিছু পিছু দৌড়াল । এভাবে দৌড়াতে দেখে ডাক্তার ভদ্র দাঁড়িয়ে পড়লেন ।
- কি ব্যাপার ? আপনি দৌড়াচ্ছেন কেন ?
- স্যার আমার ভাই ট্রমা কেয়ারে আছে। দয়া করে যদি বলেন সে কেমন আছে ---
ডাক্তার বাবু বললেন - সার্টেনলি ভেরি ভেরি সিরিয়াস । বাট উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট । লেট পাস এটলিস্ট সেভেন্টি-টু আওয়ারস । তারপর বলতে পারব পেশেন্ট কোমায় চলে গেছে নাকি ট্রিটমেন্টে সাড়া দিচ্ছে ।
- স্যার যে ভাবেই হোক , আমার ভাইকে বাঁচিয়ে দিন। না না টাকা পয়সা খরচের জন্য আমরা ভাবি না । উই আর রেডি ।
ডাক্তার বাবু হাসলেন - টাকা দিয়ে প্রাণ কেনা যায় না মিস্টার লাহা । ভগবানকে ডাকুন ।
রাজকিশোর বললেন - স্যার ওই দেখুন আমার সদ্য বিধবা মাকে । তিনি এখনও শোনেননি ভাইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক । শুনতে পেলে হার্টফেল করবেন ।
- ভেরি সরি মিস্টার লাহা । অলৌকিক কিছু না ঘটলে আমরা ওকে বাঁচাতে পারব কি না সন্দেহ আছে । এনি ওয়ে উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট । এবার তাঁর ইচ্ছা ।
ডাক্তার বাবু চলে গেলেন । রাজকিশোর মাকে বোঝালো ভাই কিছু ভালো, তোমরা বাড়ি যাও। ওখানে তো কাউকে ঢুকতে দেবে না । নইলে দেখিয়ে দিতাম । সেই বিকেলে একজনই দূর থেকে দেখতে পাবে ।
পুলিশ অফিসার রাজকিশোরকে বললেন - আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।
রাজকিশোর বলল - বলুন ।
পুলিশ অফিসার হাসপাতালের পার্কিং জোনে ওঁদের গাড়িতে বসে রাজকিশোরকে প্রশ্ন করতে লাগলেন ।
- মাঙ্গলিকীর প্রোপ্রাইটার মিঃ রাজদীপ লাহা স্টেশন রোড ধরে কোথায় যাচ্ছিলেন ?
- স্টেশন রোড ? ও তো দোকান ছেড়ে সাধারণত কোথাও যায় না । এমনকি কাস্টমার ডেকে পাঠালেও কোন কর্মচারীকে পাঠিয়ে দেয় ।
পুলিশ অফিসার - হুমম্ । সার্চ করে দেখেছি ওর পকেটে কয়েকটা খুচরো টাকা আর এই একটুকরো কাগজ পাওয়া গেছে । এমনকি তার মোবাইলও ছিল না । ওই ফাঁকা প্যাড দেখে আমরা দোকানে গিয়ে আপনাদের বাড়ি যাই ।
রাজকিশোর বলল - মোবাইল ছিল না ? দেখুন তো এই নাম্বারে রিং করে !
বলে রাজদীপের দুটো নাম্বারই দিল । ফোন অফ । অফিসার বললেন - আইদার কেউ হাতিয়েছে কিম্বা ব্যাটারী খতম হয়ে গেছে । এনিওয়ে আমি নাম্বার দুটো রেখে দিলাম । তদন্ত করে দেখতে হবে ।
পুলিশ অফিসারটি আরও বললেন - প্রয়োজন পড়লে আপনাদের থানায় আসতে হতে পারে ।
রাজকিশোর বলল - নিশ্চয়ই যাব স্যার । যখন ডাকবেন ।
মঞ্জরী দেবী ছেলেকে না দেখে বাড়ি যাবেন না বলে দিলেন। বাধ্য হয়ে রাজকুমার রিসেপশনিস্টের শরণাপন্ন হল ।
সে বলল - ইম্পসিবল ঋ স্যারদের কারও অনুমতি ছাড়া আমরা কিছু করতে পারব না ।
রাজকুমার অনুনয় বিনয় করে বলল - প্লীজ যদি আপনি ডাক্তার বাবুর সাথে কথা বলে পারমিশন নিতে পারেন ।
রাজকিশোর এসে বলল - তোরা যাসনি ?
- মা যাচ্ছেন না । দীপুকে চোখে না দেখে যাবেন না বলছেন । সেইজন্য এই ম্যাডামকে রিকোয়েস্ট করছি যদি দেখা করতে দেন ।
এমন সময় মাইকে ঘোষণা হল - এটেণ্ডেন্টস অফ পেশেন্ট রাজদীপ লাহা আর রিকোয়েস্টেড টু মিট ডক্টর সুদীপ্ত কুমার ভদ্র এট দ্য আই টি ইউ ডেস্ক ইমিডিয়েটলি ।
রাজকিশোর, রাজকুমার ভয় পেয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করল । রাজকিশোর আর কোন ঝুঁকি না নিয়ে মঞ্জরী দেবীকে বললেন - চল মা! ডাক্তার বাবু ডেকেছেন ।
মঞ্জরী দেবীর তো অজ্ঞান হয়ে যাবার মত দশা । ঠকঠক করে হাত পা কাঁপছে । চেয়ার থেকে উঠতে পারছেন না । হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন - দীপু রে ! এ কি হাল করলি বাবা !
দুই ভাই মিলে মঞ্জরী দেবীকে নিয়ে লিফ্টে করে ট্রমা ডেস্কে এসে পৌঁছাল।
ডক্টর ভদ্র বললেন - হিয়ার ইজ এ গুড নিউজ ফর ইউ । পেশেন্ট রাজদীপ লাহা চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন । ইয়েট নেক্সট ফর্টি-এইট আওয়ার্স ইজ ভেরি ক্রুসিয়াল ফর আস ।
মঞ্জরী দেবী বললেন - ছেলেকে একবার দেখতে পারি ডাক্তার ?
ডক্টর ভদ্র বললেন - ওহ্ সিওর । আসুন আমার সঙ্গে ।তবে তেমন কিছুই তো দেখতে পাবেন না । গোটা শরীরটাই ব্যাণ্ডেজ করে মুড়ে রাখা হয়েছে ।
রাজকুমার বলল - আমি কি সঙ্গে যাব স্যার । বলছিলাম ভেতরে গিয়ে মা যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন ...
ডক্টর ভদ্র বললেন - আসুন ।
( চলবে )

