Keya Chatterjee

Drama Tragedy

3  

Keya Chatterjee

Drama Tragedy

সমুদ্র হবে দেখা?

সমুদ্র হবে দেখা?

5 mins
320



সমুদ্র হবে দেখা?কেয়া চ্যাটার্জীবাড়ীর দরজায় তালা ঝুলিয়ে তেতো মুখে রাস্তায় পা রাখল সরমা। ছ'মাস হলো একটি বৃদ্ধা ও একটি বাচ্চার দেখাশোনা করে সে। বুড়িমার ছেলে দেশের বাইরে থাকে। বৌমা স্কুলে পড়ায়। সাতমাসের বাচ্চা আর সত্তর বছরের পঙ্গু শাশুড়িকে রেখে সকাল আটটায় বেরোয়।  সরমা সাড়ে সাতটায় ঢুকে পরে। ওকে সব কাজ বুঝিয়ে তবে বেরোয় পূর্ণা। দুজনকে একসাথে দেখা সম্ভব নয় বলে কাজটা প্রথমে ছেড়েই দিতে চেয়েছিল সরমা। পূর্ণার অনেক অনুরোধে শেষে রাজী হয়েছিল। হয়তো দুপক্ষেরই টাকায় পুষিয়ে গেছিল। কিন্তু এ কাজের ঝক্কি অনেক। বাচ্চাটা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তার খাবার তৈরি করে রাখতে হয়। তার মধ্যেই বুড়িমাকে চিনি ছাড়া চা দেওয়া, বেডপ্যান এগিয়ে দেওয়া, চুল বেঁধে দেওয়ার কাজ গুলো করে দিতে হয়। ছেলে উঠে গেলে চাপটা বেড়ে যায়। দুজনেই তো শিশু। এছাড়াও, রান্নার নমিতাকে কাজ বোঝানো, ঠিকে ঝি প্রমিলার পিছনে টিকটিক করা। যেন তার নিজেরই সংসার।


এইসবের মধ্যে এক পশলা ঠান্ডা হাওয়ার মতো প্রাণ দিয়ে যায় খোকা। ওকে কোলে নিয়ে ওর তুলতুলে শরীরটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে প্রানভরে ঘ্রাণ নেয় সে। হুহু করে ওঠে মনটা। তার ছেলেটাও যে ভিনরাজ্যে পরে আছে কাজের খোঁজে। হপ্তায় দুবার করে ফোন করে। মুম্বাইয়ের সেই বিশাল বস্তির একটা চৌখপিতে থাকে। সমুদ্রের দিকে ফোন ঘুরিয়ে মাকে বলে শোনায় ঢেউয়ের আনাগোনার শব্দ। হেসে বলে, “তোমাদেরও একদিন সমুদ্র দেখাতে নিয়ে আসব মা। আর কটা দিন অপেক্ষা।” খোকাকে ঘুম পাড়িয়ে বুড়িমাকে খাট থেকে সাবধানে নামায় সরমা। ঘরে বসিয়েই স্নান করায় বাচ্চাদের মতো। হার্ট এটাকে বাঁদিকটা অসাড়। অতো বড় শরীরটা টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই সরমার রোগা শরীরটার। মাথা মুছিয়ে, কাচা নাইটি পরিয়ে দিয়ে বিছানায় হেঁচড়ে তুলে দেয়। খাইয়ে মুখ মুছিয়ে দিলেই বুড়ি অঘোর ঘুমে তলিয়ে পরে। এরপরেই ঘুম ভাঙে খোকার। সারাটা দুপুর ওকে নিয়েই কাটে। হামা দিয়ে গোটা বাড়ির তদারকি করে। এই সময় সরমার চারিদিকে ফুল ফুটে ওঠে, প্রজাপতি রঙিন ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। জীবনটা ভীষণ সুন্দর লাগে। এরকমই এক গতে বাধা দিনে, বুড়িমাকে চান করানোর ফাঁকে খাট থেকে পরে গেল খোকা। মাথা ফুলে আলু। দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে শুরু করে সরমা। ছেলে সামলাবে, না বুড়ি। সারা দুপুর মুখে কিছু দিল না ছেলেটা। কেঁদে কেঁদেই সারা। বৌদির স্কুলটাও যেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে। ফিরে আসতে অনেক দেরী হবে। এক মুহূর্ত কোল ছাড়া করলো না আজ ছেলেটাকে সরমা। যদি কান্না থামে, যদি ক্ষিদে পায়।  


আজ সন্ধ্যের আগেই ফিরে এলো বৌদি। মাকে দেখেই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটা। কয়েক মুহূর্তে ঘুমিয়েও পড়ল। সরমা'র বুকের ভেতর এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। যতই হোক, মা তো সে নয় বাচ্চাটার। পরেরদিন সকালে ভয়ে ভয়ে গেট খুলল সরমা। আজ বুঝি কাজটা গেল। বৌদি হয়তো বলবে, আর আসতে হবে না। কিন্তু না, তা হলো না। রোজের মতো সব কাজ বুঝিয়ে পূর্ণা বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল খোকাকে নজরে রাখতে। এর মানে বোঝে সরমা। এটা একটা সাবধান বাণী। সব কিছুরই একঘেয়েমি থাকে। এই কাজের একঘেয়েমিও পেয়ে বসল সরমাকে। নিজের সংসার গুছিয়ে রেখে, পরের সংসারে সারাদিন খাটা, আবার রাতে নিজের হেঁসেল ঠেলা। অপর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবে সরমার শীর্ণ শরীর আরো শীর্ণ হতে লাগল। চোখের তলায় কালি পড়ল। তবু কাজ যে তাকে করে যেতেই হবে। সংসারের জন্য, ছেলের জন্য। আজ তেতো মুখে ঘর থেকে বেরোলেও সে জানে এই বিস্বাদ জিভের কোনো প্রতিকার নেই। ও বাড়ী গিয়ে অবাক হলো সরমা। উঠোনে তিনটে ঢাউস ব্যাগ পরে। দরজা খোলা। ভেতর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসছে। বৌদির কণ্ঠেও উচ্ছ্বাস। ডাইনিংয়ের সোফায় আদুল গায়ে হাফপ্যান্ট পরে বসে আছে একটি বছর পয়ত্রিশের লোক। সরমা একে চেনে। বুড়িমার ছেলে। ছবি দেখেছে। বৌদি আজ স্কুলের জন্য তৈরি হয়নি। সে আজ রোজের গম্ভীর খোলস ভেঙে উচ্ছল নদীর মতোই শ্রোতস্বিনী। সরমাকে দেখে চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকে গেল লোকটি। পূর্ণা এগিয়ে এসে বলে, “সরমাদি আজ থেকে কদিন তোমার ছুটি।” ছ্যাৎ করে ওঠে সরমার বুকটা। অস্ফুটে বলে ফেলে, “আর আসবো না?”


পূর্ণা হাসে, “না না তা নয়। লোকডাউন শুরু হচ্ছে কাল থেকে। একটা মারণ ভাইরাস ছেয়ে গেছে গোটা বিশ্বে। কেউ কাউকে ছোঁবে না, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলবে না, বাইরে গিয়ে কাজ করবে না। তাহলে সংক্রমণ ছড়াবে না। খোকার বাবা কাল রাতের ফ্লাইটে কোনো মতে ফিরতে পেরেছেন। আজ থেকে ট্রেন, বাস সব বন্ধ। আমার স্কুলও। এসব কাটলে তুমি আবার এসো। কেমন?” পূর্ণা সরমার হাতে গুঁজে দেয় দুমাসের টাকা। সরমা ছুঁয়ে দেখে নোটগুলো। কড়কড়ে বিশ হাজার টাকা। এত টাকা কোনোদিন একসাথে দেখেনি সে। চোখটা ঝাপসা হয়ে এল। মনে মনে হিসেব করে নিল ধার দেনা মেটানোর। চৌকাঠ পেরিয়ে বেরোনোর আগে আবার ফিরে তাকালো ঘরটার দিকে। খোকা এখনও ওঠেনি, উঠলেই দুধ চায়, বুড়িমা চায়ে চারটে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে ভালোবাসে। ছাদের ওপর জামরুল গাছের পাতা পরে নোংরা হয়ে যায়। প্রমিলাকে না বললে ঝাঁট দেয় না। ও পাড়ার ভুলু কুকুরটা পাঁচিল টপকে উঠোনে ঘোরে, নোংরা করে, কার্নিশে ঘুমায়। তাড়া না করলে যায় না। বৌদি একা পারবে তো সব। এ সংসারের সব কিছু যে এতদিন সরমা দেখেছে। বৌদি পারবে?  হর্নের শব্দে চমকে ওঠে সরমা। কখন যেন রাস্তায় এসে পড়েছে। আবার হৃৎপিন্ডটা লাফিয়ে উঠল। ছেলেটা যে ভিন রাজ্যে পরে আছে একা। কাজ না পেলে খাবে কি? গাড়ী না চললে ফিরবে কিভাবে? ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে ফোন করে ছেলেকে। উল্টো দিক থেকে এক উনিশ বছরের বৃদ্ধ জবাব দেয়, “সব ঠিক হয়ে যাবে।


আমরা হাঁটা লাগিয়েছি। বাড়ী ফিরছি মা। কতদিন লাগবে জানিনা। তোমাদের একদিন সমুদ্র দেখাবই মা। আর ক'টা দিন অপেক্ষা।”  তালা খুলে বিছানায় এসে বসে সরমা। লোকটা বসে আছে। আজও বিছানা ভিজিয়েছে। একবছর আগেও অটো চালাতো শঙ্কর, সরমার স্বামী। একটা এক্সিডেন্টে পা'টা অকেজো হয়ে গেল। তারপর থেকে শুধু শরীরই নয় মনটাও নিথর। সরমা রোজ সকালে টেবিলে খাবার রেখে যায়। খাটেই জামা কাপড় ছাড়িয়ে দেয়। কোনোদিন খায়, কোনোদিন পরেই থাকে। টাকার অভাবে চিকিৎসা হলো না মানুষটার। আজ ব্যাগের ভিতরের নোটগুলো যেন তার বুকে সূচের মতো বিঁধছে। সরমা চোখ বুজে দেখতে পায়, ছেলেটা হেঁটে ফিরছে। অনন্ত কাল ধরে হাজার মাইল পেরিয়ে ছেলেটা বাড়ী ফিরছে। তার এক পেট ক্ষিদে, গলা শুকিয়ে কাঠ, পায়ে ফোস্কা পড়েছে, রক্ত ঝরছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথা ঘুরছে, ক্লান্তি শ্রান্তি গ্রাস করছে বিভীষিকার মতো। তবু লক্ষ লক্ষ পা হেঁটে চলেছে। হেঁটে চলেছে জীবনের খোঁজে। হেঁটে চলেছে খাদ্যের খোঁজে। পেট যে কারো কথা শোনে না। কোনো নিয়ম মেনে না। তাদের চোখে একটাই স্বপ্ন সমুদ্র দেখার। সকলকে সমুদ্র দেখানোর। শঙ্কর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানলার দিকে। শুধুই একটা লাবডুব জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্বের। সরমা তার বুকে মাথা রেখে ডুকরে ওঠে, “হ্যাঁ গো আমরা সমুদ্র কবে দেখবো?” তৎক্ষণাৎ বাইরে মাইকে কেউ গর্জে ওঠে, “ঘরে থাকুন, বাইরে বেরোবেন না। ঘরে থাকুন, বাইরে...”


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama