Keya Chatterjee

Inspirational


3  

Keya Chatterjee

Inspirational


সুখ

সুখ

5 mins 640 5 mins 640

কণিকাকে অটোর লাইনে দেখতে পেয়েই মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল নন্দিনী। কণিকার ডাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়াতে হলো। স্মিত হেসে বলল, “ও তুই, ভালো আছিস?” কান থেকে হেডফোন খুলতে খুলতে কণিকা বলল, “হ্যাঁ রে ভালো আছি। তা তুই কি এদিকে থাকিস?” 

― হ্যাঁ আরেকটু ভিতরে। চল না।

― না রে। আজ অফিস যেতে হবে তাড়াতাড়ি। পরে একদিন যাবো। তোর ফোননম্বরটা দে না।

নম্বর বিনিময়ের মাঝে নন্দিনী আড় চোখে গিলতে থাকলো কণিকার পোশাক, কানের দুল, স্পা করা চুল, ওয়াক্স করা হাতে পিছলে পড়া রোদ্দুর। মিলিয়ে নিল নিজের রোদে পোড়া চামড়া আর ফেটে যাওয়া গোড়ালি। নাঃ কোনো ভাবেই কণিকার পাশে নন্দিনীকে মানাচ্ছে না। ফোনটা ব্যাগে চালান করে কণিকা বলল, “বল, কি করছিস আজকাল?” নন্দিনী এই প্রশ্নের উত্তর দিতে একটু অস্বস্তি বোধ করে বরাবর। একইরকম ম্লান হেসে বলল, “কিছু না। বাড়িতেই থাকি।” কণিকা ভ্রূ কুঁচকে বলে ফেলল, “উফ বাড়িতেও অনেক কাজ রে। ভালোই আছিস। আমি তো দুদিক সামলে আর পেরে উঠছি না। জবের চেষ্টা করছিস?”নন্দিনী কিছু বলার আগেই অটো চলে এলো। কণিকা হাত নেড়ে উঠে পড়ল অটোতে। চেঁচিয়ে বলল, “আসি রে। ফোনে কথা হবে।” নন্দিনী ঘাড় নেড়ে বিদায় জানালো। অটোটা মিলিয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো নন্দিনী। বিয়ের পর থেকেই এই এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সে ক্লান্ত। চাকরি করে না কেন? আজকাল যেকোনো শিক্ষিত মেয়েই চাকুরিরতা। নন্দিনীর যে ইচ্ছে করে না তা নয়। কিন্তু বৃদ্ধ দিদি শাশুড়ি আর তিন বছরের বিট্টুকে ছেড়ে বেরোনো তার পক্ষে অসম্ভব। নন্দিনীর স্বামী বেসরকারী চাকুরে। বাড়ি সেই মেদিনীপুর। ওর মা বাবা পরিবার থাকে ওখানেই। শ্রীমন্ত কলকাতায় চাকরি সূত্রেই থাকে।  নন্দিনীর সাথে বিয়ের দু বছরের মাথায় বিট্টু আসে। ছেলে বছর খানেক হতে না হতেই শ্রীমন্ত তার সংসারে নিয়ে এলো তার দিদাকে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর অতিরিক্ত আয়া রাখা শ্রীমন্তর পক্ষে সম্ভব নয়, জানে নন্দিনী। তাছাড়া, ছেলেটাকে অপরিচিত একজনের হাতে ছেড়ে যেতেও মন চায়না। ভীষণ অসহায় লাগে নিজেকে। কতো স্বপ্ন ছিল তার নিজের জীবন নিয়ে। কতো ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেল। শ্রীমন্ত মানুষটা খারাপ নয়। তবু তার এই অসম্পূর্ণ জীবনের জন্য বিয়েকেই দায়ী করে সে। কি ক্ষতি হতো বাবা মায়ের, যদি আরেকটু সময় দিত? চোখ ফেটে জল আসে নন্দিনীর। ছেলের গায়ের চাদরটা আরেকটু টেনে দিয়ে জানলার কাছে এসে বসে। দুপুরগুলো খুব আলসে কাটে তার। এইটুকু সময় নিজের করে পাওয়া যায়। বই পড়া, গান শোনা, আকাশ পাতাল চিন্তা, সব টুকুই নিজের, একান্ত নিজের। কেউ ভাগ বসানোর নেই। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল নন্দিনীর। অচেনা নম্বর। রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে কলকল করে ভেসে এলো কণিকার কণ্ঠ, “কি রে কি করছিস? ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম?” আলতো হেসে নন্দিনী জানালো সে দুপুরে ঘুমায়না। নানান কথায় ভাসতে লাগলো দুই সখীর শব্দতরী। পুরোনো গল্প, পুরোনো বন্ধুদের কথা। নন্দিনীর মনে আরেকবার দগ্ধে উঠল ক্ষত। তার থেকে কম রেজাল্ট করা ছেলে মেয়েগুলোও এখন স্ব-নির্ভর আর সে পঞ্চাশ টাকার জন্য স্বামীর কাছে হাত পাতে। চোখটা ভিজে গেল আবার। এ জ্বালা যে কবে জুড়াবে! কণিকা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো , “তোর ফিউচার প্ল্যান কি?” নন্দিনী থতমত খেয়ে বলল, “কিসের ফিউচার প্ল্যান বলতো?” 

― কেন? তোর এত ভালো রেজাল্ট, এত ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিলি তুই। নিজের আইডেন্টিটি তৈরি করবি না?

নন্দিনী একচোট হেসে নিয়ে বলল, “আমার আবার কেরিয়ার! সব শেষ রে, সব শেষ।” 

ওপারে কণিকার গলায় সন্দেহ ভেসে উঠল, “কেন তোকে চাকরি করতে দিচ্ছে না শশুরবাড়ি?” নন্দিনীর মনে হলো বহুদিন পর কাউকে পাওয়া গেল যে তার কথা শুনতে চায়। তার ব্যাপারে জানতে চায়। সে নিজের মনের আগল খুলতে শুরু করলো। তার অভিমান, ব্যথা, কষ্ট একে ঝরে পড়ল অশ্রুবিন্দু হয়ে। নন্দিনীর কথা শেষ হতেই ওপাশে শোনা গেল কণিকার হাসি। নন্দিনীর মনে হলো এ তাচ্ছিল্যের হাসি। তার ব্যর্থতায় কণিকার সাফল্য হাসছে। নন্দিনী বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই হাসছিস? খুব মজা লাগছে বল আমার কষ্টে?” কণিকা তার হাসির বেগ চাপল, “আরে তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? তোর তো অনেক সুবিধা। মাথার ওপর ছাদ আছে। খেতে পাস। কোল জুড়ে একটা সন্তান আছে। কতো মানুষের আরো কতো কষ্ট, কতো সমস্যা আছে জীবনে জানিস?” নন্দিনী কিছুই শুনতে চাইছে না এখন। তার মন চাইছে সমবেদনার কথা কিন্তু কণিকা তাকে জ্ঞান দিচ্ছে। কণিকা ওদিকে বলেই চলেছে, “আমার বাপেরবাড়ির পাড়ায় একটা মেয়েকে তার বাবা টাকার বিনিময়ে পাচার করে দিয়েছিল, সেই মেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে এখন একজন সমাজসেবী। আমার কাজের মেয়েটা দশ বাড়ি খেটে মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেল। আর তুই তো ভালো আছিস, সুখে আছিস। এত ডিপ্রেশন কেন তোর?” নন্দিনী বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর পক্ষে এসব কথা বলা বেশ সোজা। তুই চাকরি করিস, প্রতিষ্ঠিত, নিজের টাকা আছে। আমার কিছু নেই। দশটাকা নিজের জন্য খরচ করলে মনে হয় দেনা বেড়ে গেল। কোন অধিকারে অন্যের কষ্টের টাকা খরচ করছি। তোর জীবনটা অনেক সুখের।” ওপাশ এবার নিস্তব্ধ। নন্দিনী ভাবলো একটু কি বেশিই বলে ফেলল সে? বার কয়েক হ্যালো হ্যালো করে সারা এলো।

 “বল”

― চুপ করে আছিস যে?

― এই ভাবছি, আমি কতো সুখী।

―মানে?

― আমার বিয়ের পাঁচ বছর হলো, এখনো একটা সন্তান হলো না রে। প্রবলেমটা ওর, কিন্তু মানতে চায়না, ট্রিটমেন্ট করে না। রোজ ঝগড়া, রোজ ঝামেলা। শশুরবাড়ির কুকথা। একটা ব্যবসা করতো, ধার দেনায় লাটে উঠলো। বাধ্য হয়ে চাকরি করছি রে। নাহলে তো খেতে পাবো না। কতো ইচ্ছে ছিল জানিস নিজের একটা পার্লার বানাবো। নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করবো। সবার জীবন বাইরে থেকে যতটা সুখের মনে হয় ততটা সুখের নয় জানিস তো। তবে যেদিন তোর সাথে দেখা হলো সেদিন চাকরিটা আমি ছেড়ে দিলাম।” নন্দিনী আকাশ থেকে পড়লো, “চাকরি ছেড়ে দিলি?” কণিকা স্বস্তির হাসি হাসল, “হ্যাঁ। পাড়ায় একটা ঘর ভাড়া নির পার্লার খুলেছি। বর খুব চেঁচামেচি করেছিল। পাত্তাই দিইনি। খুব ভালো লাগছে। কোনো চাপ নেই। বস নেই। একদম ফ্রি। বল জয়েন করবি আমায়?” নন্দিনী চুপ করে রইল। কণিকা বলল, “এই শোন না কাস্টমার এসেছে। এখন রাখি পরে কথা হবে। বাই।” ফোনটা কাটার সঙ্গে সঙ্গে বিট্টু এসে দাঁড়ালো পাশে। ছেলেটা ঘুম ভাঙলে এখন আর কাঁদে না। বিট্টুকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো নন্দিনী। এই একটি অভাব কতো বুক খালি করে রেখেছে! বিট্টুকে কোলে নিয়েই আরেকটা ফোন করলো সে, “হ্যালো সুতপা। তোমার মেয়েকে পড়তে পাঠাবে বলেছিলে, পাঠাবে আমার কাছে? --- তবে কাল থেকেই পাঠিও.....”


নন্দিনীর ভীষণ শান্ত লাগে নিজেকে। শিক্ষা আর ইচ্ছা একটা না একটা পথ বানিয়ে দেয় পরিচিতি গড়ে তোলার। টাকার থেকেও বেশি দামী এই পরিচিতি। পথ নিজেকেই বানিয়ে নিতে হয়। এগিয়েও যেতে হয় নিজেকেই।


Rate this content
Log in

More bengali story from Keya Chatterjee

Similar bengali story from Inspirational