Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sanhita Ghosal

Classics Inspirational Children


4.7  

Sanhita Ghosal

Classics Inspirational Children


বোধন

বোধন

5 mins 432 5 mins 432


রতন ছোট্ট রেডিও নিয়ে ভোরবেলায় উঠে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে শুরু করল। এবছর মহালয়া ও পুজোর মধ্যে এক মাসের তফাৎ। বছরের প্রথমে রতনের মনে তাই বেশ আনন্দ ছিল।বকুলপুর গাঁয়ের যে চারটি পুজো হয় সব ঠাকুর‌ই রতনের হাতে তৈরী। পুজোর চারদিন মেয়ে উমাকে নিয়ে প্রতিটি মন্ডপে হাজির হয় রতন,বাবা-মেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে গাঁয়ের কত লোক ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করছে। রতনের ঐ চারদিন মনটা ভরে থাকে,শিল্পী রতনের স্বপ্ন বকুলপুরের মাটির বাড়ির চারদেয়ালে হারিয়ে গেলেও পটুয়া রতন ও চারদিন সকলের দ্বারা সমাদৃত হয়, শ্রদ্ধা পায়। এইটুকু পটুয়া রতনের সারা বছর বেঁচে থাকার অক্সিজেন। কিন্তু এই বছর কি যেন একটা ভাইরাস পটুয়া রতনের সবটুকু খুশী ছিনিয়ে নিয়েছে। তাই রেডিওর শব্দে ওর দু চোখ জলে ভরে ওঠে।একটাও পুজোর বায়না এবার পায়নি। আশায় ছিল বটতলার বড় পুজো অন্তত এবার হবে। কিন্তু কোথায় কি গত পরশু পুজো কমিটির সদস্যরা এসে জানিয়ে গেলেন মূর্তি নয় বরং ঘটে ও ছবিতে পুজো হবে এবং পুজোর জন্য বরাদ্দ অর্থ লক ডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে সাহায্যের জন্য। রতন একবুক কষ্ট নিয়ে বলেছিল,"দাদা গো, তাই হোক। মানুষের এত কষ্ট দেখা যায় নে। তোমরা ভালো করেচ।"পুজো কমিটির সভাপতি গোপাল দাস রতনের করুণ মুখের দিকে চেয়ে কোনো রকমে বলেছিলেন,"ভাই পরের বছর দ্বিগুণ টাকা দিয়ে তোমার কাছ থেকে ঠাকুর নিয়ে যাব।"রতন শুধু অর্থহীন হাসি হেসেছিল। শেষ আশাটুকু কফিন বন্দী হয়ে গেল।


     রেডিও শুনতে শুনতে রতন লক্ষ্য করল উমা ঘুম থেকে উঠে চোখ দুটো ঘষছে। বিছানার কাছে গিয়ে ছোট্ট উমাকে কাছে টেনে নিল।অন্য বছরগুলোয় উমা এতক্ষণে কত প্রশ্ন করত,"বাবা দূর্গা মা কী করে ওত অস্ত্র পেলে?"কিন্তু এই বছর একেবারে চুপ। পরিস্থিতি বুঝে হয়তো চুপ আছে।লতা মানে রতনের ব‌উ দুই কাপ চা আর কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে রেডিওর সামনে বসল। তিনটি মানুষের মাঝে জড় বস্তুটি একাগ্র ভাবে মহিষাসুরমর্দিনী শুনিয়ে চলেছে। আকাশের পেঁজা তুলোর মত মেঘ ভেদ করে কখন সূর্যোদয় হয়েছে তা ওরা খেয়াল করে নি।অসুর বধের সঙ্গে সঙ্গে যখন রেডিওতে শঙ্খধ্বনি হচ্ছে তখন লালমাটির পথ ধরে সাদা রঙের একটি স্করপিও গাড়ি ওদের ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল। ওরা তিনজন ঘর থেকে বেরিয়ে এগিয়ে গেল গাড়িটার দিকে। গাড়ি থেকে নেমে এলেন সিল্কের শাড়ি পরিহিতা একজন ভদ্রমহিলা, চোখে রোদ চশমা।রোদ চশমা খুলে ওদের জিজ্ঞাসা করলেন,"রতন পাল আছেন? একটু ডেকে দেবেন।"

-"আমি রতন পাল, বলেন দিদিমণি।"

-"আমি ঐন্দ্রী রায়,এই ব্লকের নতুন বিডিও। এখানে কে দূর্গা মূর্তি তৈরী করেন বলতে সকলে আপনার কথা বলল। তাই এলাম।"

-"দিদিমণি মূর্তি গড়তি হবে?"

-"হুম, ছোট মূর্তি,যাতে আমি গাড়ি করে নিয়ে যেতে পারি। আসলে আমার মায়ের ইচ্ছা পুজো করবেন।এই বছরে আমি প্রথম চাকরি পাই।তাই মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে প্রথম খোঁজ আমার কর্মক্ষেত্রে করি। "


-" তা ভালো করিচেন।ও লতা,টুল দে দিদিমণিকে।"

-" না না লাগবে না দাদা। আমি পঞ্চমীর দিন এসে নিয়ে যাব।আর কোনো অসুবিধা হলে আমাকে এই নম্বরে ফোন করে নিতে পারেন।"কথাগুলো শেষ করে ঐন্দ্রী একটি কাগজের টুকরো রতনের হাতে দিল।

রতন অদ্ভুত বিস্ময়ে কাগজের টুকরো খানি নিল। কাগজের টুকরো হাতে রতনের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। ওদিকে ঐন্দ্রী ততক্ষণে ওদের দিকে বিদায়সূচক হাত নাড়তে নাড়তে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রতনের গোটা পরিবার তখন চেয়ে আছে ঐন্দ্রীর চলে যাওয়া পথের দিকে।তবে কি ঐন্দ্রী দিদিমণির মধ্যে দিয়ে দেবী এলেন?সে যাই হোক, এই দূর্দশায় যেটুকু কাজ পাওয়া গেছে তাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচার লড়াই শুরু করতে হবে।


    পরের দিন থেকে রতনের ঘরে ব্যস্ততা শুরু।মাটি আনা,খড় বাঁধা, কাঠামো তৈরী, রং গোলা সব কিছু একমনে করে চলেছে।আর তার কাজের সঙ্গী হল মেয়ে উমা। একখানি খাতা নিয়ে মাটির মেঝেতে বসে খাতায় দূর্গা ঠাকুর আঁকছে আর বাবাকে ঠাকুর তৈরীতে সাহায্য করছে।সব কিছুর মধ্যে লতা লক্ষ্য করেছে রতন আজকাল যেন একটু আনন্দে আছে।আর হবে নাইবা কেন কাজ হারিয়ে দিনের পর দিন রতনকে ভিতরে ভিতরে ভেঙে যেতে দেখেছে ও। প্রতিদিন রতনের কাজের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে ও দেখেছে শুকনো হয়ে যাওয়া মাটি, রং, নষ্ট হ‌ওয়া কাঠ। এগুলো বড় কষ্ট দিত। অবশেষে মা দূর্গা এলেন ওদের ঘরে। সারাদিনে কাজের মাঝে লতা দেখে আসে কি সুন্দর করে ছোট্ট দূর্গা ঠাকুর তৈরী করছে রতন।


  দেখতে দেখতে মা দূর্গা ডাকের সাজে সজ্জিতা হলেন। এবার অস্ত্রে সুসজ্জিতা হ‌ওয়ার পালা। গ্রামের বহু জায়গায় খোঁজ করে ছোট অস্ত্র পেল না। অগত্যা একদিন ভোরবেলায় সাইকেল নিয়ে রতন র‌ওনা দিল শহরে। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে একটি দোকানে ছোট অস্ত্র পেল। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন ঘরে ফিরল লতা লক্ষ্য করল রতনের শরীর জুড়ে ক্লান্তি থাকলেও মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি।পরের দিন সকালে উঠে স্নান করে পরিষ্কার জামা গায়ে দিয়ে দেবীকে অস্ত্রে সজ্জিত করতে শুরু করল।উমাও বাবা পাশে বসে একমনে লক্ষ্য করছে সব কিছু। হঠাৎ করে রতন লক্ষ্য করল দূর্গার ত্রিশূল বাঁকা। অনেক চেষ্টা করল ঠিক করার। কিন্তু কিছুতেই পারল না।লতাও ওদের পিছনে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখছিল।এই অবস্থা দেখে ও খানিক চিন্তিত হল। ঠিক তখনই বাবা -মাকে অবাক করে দিয়ে উমা ছোট্ট হাত দুখানি দিয়ে ত্রিশূল খানিকটা সরিয়ে দিল অসুরের বুকে।আর বাবাকে বলল,"এইখানে লাল রং একটু দিয়ে দাও। ত্রিশূল বিঁধেছে তো তাই।"যে জায়গা উমা দেখালো রতন লক্ষ্য করল ঐ জায়গায় সত্যি লাল রং দেওয়া হয়নি।ঐ টুকু মেয়ের বুদ্ধি আছে,সবে তো দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। রতন তুলি দিয়ে লাল রং করে দিল। উমার আনন্দ আর ধরে রাখা যাচ্ছে না তখন।খালি পায়ে উঠানে বার কয়েক চক্কর কেটে আবার গিয়ে বসল ঠাকুরের সামনে। রতনের মনে শান্তি যাক যে কাজ দিদিমণি দিয়েছেন তা ও করতে পেরেছে।


 পঞ্চমীর দিন সকালে সেই সাদা রঙের স্করপিও আবার এলো ওদের ঘরের সামনে। রতন লতাকে বলে নাড়ু করিয়ে রেখেছিল ঐন্দ্রী দিদিমণির জন্য। কিন্তু কোথায় কি, গাড়ি থেকে নেমে এলেন ঐন্দ্রী দিদিমণির ড্রাইভার। কাছে এগিয়ে এসে বললেন,"ম্যাডাম আমাকে ঠাকুর নিয়ে যেতে বলেছেন।"রতন খানিকটা হতাশ হল। তারপর ড্রাইভারের সঙ্গে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে দিল ঠাকুর।লতা শঙ্খধ্বনি করল। গাড়ি চলে যাওয়ার পর রতনের কাজের ঘরে শুধু নিস্তব্ধতা।উমা খাতায় একমনে কী যেন এঁকে চলেছে।লতা কাজে ব্যস্ত। শুধু রতনের মনে অস্থিরতা। হাতে একটাও টাকা নেই যে মেয়েকে নতুন জামা কিনে দেবে।


  ষষ্ঠীর দিন বটতলার ঠাকুর দালানে ঢাকের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ওদের। রতনের মনে কষ্ট, হাতে একটু টাকা এল না।এই সব ভাবতে ভাবতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে লক্ষ্য করল সেই সাদা গাড়ি আবার আসছে রতন প্রমাদ গুণল, তাহলে কি ভুল হয়েছে কিছু? গাড়ি থেকে নেমে এলেন ঐন্দ্রী দিদিমণি সাথে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা। বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে ঐন্দ্রী বলল,"দাদা মা দেখা করতে চাইলেন।তাই আনলাম ।"ভদ্রমহিলা তখন মৃদু হেসে বললেন,"মেয়ের কাছে আবদার করেছিলাম পুজোর জন্য।আপনি খুব সুন্দর প্রতিমা গড়েছেন। আপনারা সবাই আসুন আমাদের বাড়িতে পুজো দেখতে।"রতন কথাগুলো শুনে সম্মতিসূচক মাথা দোলালো।


ঐন্দ্রী বলল,"দাদা কাল খুব ব্যস্ত ছিলাম অফিস বন্ধ হবে তো তাই।আজ এলাম আপনার কাজের মূল্য দিতে।এই নিন পনেরো হাজার টাকা আর আপনাদের জন্য কিছু এনেছি। নিতে হবে ওগুলো।" এই বলে ও ব্যাগে করে আনা নতুন জামা কাপড় রতনের হাতে দিল।উমাকে কাছে টেনে গাল টিপে বলল,"বাবা-মাকে সঙ্গে করে এসো কিন্তু আর রং ও পেন্সিল দিয়ে সুন্দর করে ছবি আঁকবে কেমন।"বলে ওর হাতে রং এর খাতা, পেন্সিল ধরিয়ে দিল। লতা নাড়ু আর জল দিল।নাড়ু মুখে নিয়ে ঐন্দ্রী বলল,"আমার সাথে নাড়ু গড়তে এসো কিন্তু।"লতা মাথা নেড়ে হাসল। মুখে তখন শরতের হাসি। ঐন্দ্রী চলে যাওয়ার পর রতন উমাকে কোলে তুলে বলল,"অনেক বড় হতে হবে মা তোকে।"

-" ঠিক ঐন্দ্রী দিদির মত ,বিডিও।"


রতনের দু চোখ ঝাপসা হয়ে এল। উমার মাথায় স্নেহের স্পর্শ করে অস্ফুটে বলল,"পাশে থাকব মা",রতন বুঝতে পারল উমার বোধন শুরু হয়েছে,মানস চোখে দেখতে পেল উমা ক্রমশ এক হয়ে যাচ্ছে ঐন্দ্রীর সাথে,ক্রমশ পরাস্ত হচ্ছে দারিদ্র্যাসুর আর বৃদ্ধ রতন অনেক কিছু না পাওয়ার মাঝে নতুন কিছু পাওয়াকে খুঁজে নিচ্ছে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanhita Ghosal

Similar bengali story from Classics