রঙ
রঙ
"অপর্ণা কোথায় তুমি?"
"আমি ঠাকুরঘরে।"
"বাব্বা এর মধ্যেই চান করা হয়ে গেছে।" অরূপ বললেন।
"আজ যে হোলি ,ঠাকুরকে একটু ফল মিষ্টি দিতে হবে। একটু বেশী সময় তো লাগবে।"
" যতই চান করো আজ আমি তোমাকে রঙ মাখাবোই।"
"মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে এখন আবার রঙ মাখা কিসের?"
" গিন্নি ,রঙ মাখার আবার বয়েস হয় নাকি।" কথাটা বলে অরূপ হাসল।
"ও হ্যাঁ, কুহু কী উঠে পরেছে? ভাবছি ওকে নিয়ে রঙ কিনতে যাবো।"
"সে তো কোন ভোরে উঠে পরেছে। কোন জামা পরে রঙ মাখবে তাই বাছাবাছি চলছে।"
"ঠিক আছে । তাহলে আমি গিয়ে বলি রেডি হতে । আমরা বেরিয়ে গেলে দরজাটা ভেজানো থাকবে তুমি মনে করে বন্ধ করে দিও কিন্তু ।"
কিছুক্ষণ পর অপর্ণা ঠাকুরঘর থেকে শুনতে পেল দরজাটা অরূপ ভেজিয়ে দিয়ে কুহুকে নিয়ে বেরল।
ডোরবেলাটা বাজতেই অপর্ণার সম্বিৎ ফেরে,
"উফ্! আঙুলটা খুব গভীর ভাবে ছুরিতে কাটল।" অপর্ণা দেখল টুপ টুপ করে রক্ত পরছে সবজী কাটার কাগজের ওপর, সেই অবস্হায় গিয়ে দরজা খুলে দিল , রাতুলের মা এসেছে কাজ করতে।
"এতো রক্ত! কী করে এমন ভাবে কাটলে হাতটা? দাঁড়াও, আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।"
" তুই জানিস? কোথায় আছে ওষুধ।"
" জানবো না বৌদি , সেই কবে থেকে তোমাদের বাড়িতে কাজ করছি । দাদা বাবু সেই যে কুহুদিদিমণিকে নিয়ে রঙ কিনতে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল আর ফিরলো না। "
কথাগুলো বলে রাতুলের মা আঁচলে চোখ মুছলো। " তোমার মনে আছে বৌদি দাদাবাবু বেরিয়ে যাওয়ার সময় তুমি ছিলে ঠাকুর ঘরে ব্যস্ত। আমি তখন ঘর ঝাড় দিচ্ছিলাম , তাই ওনারা বেরিয়ে গেলে আমিই তো দরজাটা বন্ধ করে দিই।
এই দেখো কতো রক্ত বেরোচ্ছে , কথা বলতে বলতে খেয়াল করি নি। তুমি এখানে বোসো দেখি নি ,আমি ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিই।"
অপর্ণার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে রাতুলের মা বাসন মাজার জন্য রান্নাঘরে গেল।
" ওমা এখনো দেখছি কিছুই রান্না করো নি, সবে সবজী কাটা চলছে , আজ আর তোমায় রান্না করতে হবে না , দাও কাটা সবজী কটা আমি একটা তরকারী বানিয়ে দিই , আর ভাত টা কুকারে বসিয়ে দিচ্ছি। আমি আবার ওতে ভালো ভাত করতে পারি না তুমি জলটা মেপে দাও ,আর সময়টা দেখে নাও আমাকে বলে দিলে আমি গ্যাসটা বন্ধ করে দেব। মায়ে ঝিয়ে আজ এক তরকারী আর ভাত দিয়ে চালিয়ে নাও।"
রাতুলের মা রান্নাঘর থেকে আরো বলল ,
"কুহুদিদিমণি কী করছে বৌদি?"
"কী আর করবে বইয়ে মুখ গুঁজে পরে আছে। তোর দাদাবাবু চলে যাবার পর মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। কম ডাক্তার বদ্যি তো করিনি , যে যেখানে ডাক্তারের খোঁজ দিয়েছে নিয়ে গেছি, সব ডাক্তারেরই একই কথা ,আবির , রঙ দেখলে ভয় পাওয়া এগুলো মনের অসুখ নিজেকে এগুলো থেকে বেরতে হবে, কিন্তু কোথায় কী পাঁচ বছর ধরে সেই ভয় কাটানোর চেষ্ঠা করছি সব ব্যর্থ। ঘরে বসে থেকে চলা হাঁটা না করে নিজের হাঁটার ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলল। এখন হুইল চেয়ার ই ভরসা। এই মেয়েকে রেখে মরেও যে আমি শান্তি পাব না।"
কথাগুলো বলতে বলতে অপর্ণার দুচোখ ভিজে যায়।
কিছুক্ষণ পর সৌম্য আসে, সে কুহুর ছোটবেলার বন্ধু।
"কাকীমা
কুহু কোথায়?"
" ওর ঘরে রয়েছে বাবা। প্রতি বছর তুমি ওকে রং মাখাতে আসো, আর ও তোমাকে ফিরিয়ে দেয় । ও বোধহয় আর ঠিক হবে না।"
" না ,না কাকীমা । আশা ছাড়বেন না। দেখবেন একদিন ও নিশ্চয়ই সেরে উঠবে।"
রাতুলের মা বলল, " সৌম্য দাদা
বাবু একদম ঠিক কথা বলেছে। কুহু দিদিমণির দোষটা কোথায়? যার চোখের সামনে তার বাবাকে গাড়ি পিষে দিয়ে চলে , হাতের মুঠোয় রাখা আবির ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায় ...এ কোন খেলা বিধাতার বুঝি না।"
সৌম্য দোতলায় কুহুর ঘরে গেল, দরজাটা খোলাই ছিল। তবু সৌজন্যের খাতিরে হাল্কা করে কড়াটা নাড়ে।
" আয় ভেতরে আয়।"
"বই পড়ছিস?"
"হুম।"
"আজ তোর অফিস তো বন্ধ।"
"হ্যাঁ"।
"কুহু আজ তোকে আমি খুব করে রঙ মাখাবো। তোর কোন আপত্তি শুনবো না। এই পাঁচ বছরে তুই আমাকে ছুঁতে পর্যন্ত দিস নি, নিজেকে অন্ধকারে বন্দী করে রেখেছিস, আমাকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছিস আর নয়। আমি তোকে
সারাজীবন পাশে আর কাছে পেতে চাই । তোকে এই চেয়ার ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমার পরিবার তোর জন্য অপেক্ষা করছে।" সৌম্য ঠোঙাতে রাখা একমুঠো লাল আবির নিয়ে কুহুর দিকে এগোতে থাকল । কুহু তত হুইল চেয়ারটা পিছন
দিকে চালাতে চালাতে একসময় দেওয়ালে ঠেকে গেল। সৌম্যকে প্রবল ভাবে বাধা দিতে গিয়ে একসময় কুহু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
ও মা.. বলে খুব জোরে চিৎকার করল। অপর্ণা আর রাতুলের মা ওপরে এসে দেখল কুহু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুহুর হঠাৎ তার ঘরে রাখা ড্রেসিং টেবিলে মুখ আর সিঁথি লাল আবিরে রাঙানো নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। অপর্ণা বললেন,
" সৌম্য , তুমি আজ অসাধ্য সাধন করলে বাবা ।" "কাকীমা আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।"
অপর্ণা ঈষৎ হেসে বললেন,
"তাই বুঝি।"

