রহস্য
রহস্য
ঝন্টিপাহাড়ের উদ্দেশ্যে আজ বেরিয়ে পড়লাম সঙ্গে আমার প্রিয় বান্ধবী তিথি। বেশ কিছুদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না, তাই ডাক্তার পরামর্শ দিল হাওয়া বদল করার।এই কথা তিথিকে বলতেই সে এক পায়ে রাজি হলো ঘুরতে যাওয়ার জন্য। তাই আর দিনক্ষণ না দেখে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। ট্রেনে উঠে তো বেশ মজাই লাগছিল এতোদিন পর ট্রেনে উঠলাম, ট্রেন ছুটে চলে দুর্বার গতিতে আর তার সাথে সাথে চলেছে রাস্তার ধারের গাছগুলি। দীর্ঘ ট্রেনের যাত্রা করে আমি আর তিথি প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এই ঝন্টি পাহাড়ে তিথির বাবার একটা পুরানো বাংলো আছে সেখানেই উঠলাম। এখানে আসার সময় শুনলাম, এই বাংলোর আবার কিছুটা বদনাম আছে। শুনেছি, তেনাদের বাস এখানে। আমি আবার এসব পুরোপুরি বিশ্বাসও করি না, আবার অবিশ্বাসও করি না। তিথি তেমন এসব কিছু মানে না, তাই প্রায় রীতিমতো জোর করে আমাকে এখানে নিয়ে এলো। ঘরে ঢুকে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে বাংলোর কেয়ার টেকার রবিদার বউয়ের হাতের মাংসের ঝোল আর ভাত খেলাম তা বেশ দারুণ রান্না করে রবিদার বউ। তারপর আমি আর তিথি মিলে একতলার ছাদে যে ব্যালকোনি আছে সেখানে বসে বেশ মজাদার আড্ডা দিলাম সঙ্গে রবিদা আর তার বউ রিমা বৌদি। বিকেল হতেই রবিদা বলে উঠলো দিদিমনি আপনারা কি আজ সত্যিই কাটাবেন এখানে যদি অসুবিধা না হয়তো আজকের রাতটুকু নয় এই গরিবের ঘরেই আশ্রয় নেবেন চলুন পাশেই আমার ঘর। তিথি হেসে উঠে বললো কেনো গো রবিদা, ভূতে ভয় পাও বুঝি? আমি তো আজ রাতটা এখানেই কাটাবো আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে চুপ করেই থাকলাম। সন্ধ্যা হতে না হতেই এইখানে সব কিছু বেশ চুপ চাপ হয়ে যায় রবিদা তাড়াতাড়ি করে আমাদের রাতের খাবার দিয়ে বাড়ি চলে গেলো। তিথি ওর মাকে ফোন করতে ছাদে চলে গেলো আমি কী করবো বুঝতে পারছিলাম না তেমন একটা নেটওয়ার্ক নেই এখানে ফোন ঘাঁটতে হলে সেই ছাদে যেতে হবে। এতো দূর থেকে ট্রেন জার্নি করে এসে আমার আর সিঁড়ি ভেঙে ছাদে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তাই একতলায় ব্যালকোনিতেই বসে রইলাম বসে বসে নিজের মনে গুনগুন করছি ঠিক তখনি একটা খটখট শব্দ শুনে আমার গা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। তাই শব্দটা কোথা থেকে আসছে না দেখেই খুব জোরে চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকারের শব্দে তিথি হড়বড় করে নিচে নেমে এলো এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে তোর? চিৎকার করে উঠলি যে ভয়ে আমি তিথিকে জাপটে জড়িয়ে ধরলাম, তিথি আমাকে বার বার বলে যাচ্ছে কী হয়েছে বল তোর আমি তখন ওকে বললাম কেমন একটা খটখট শব্দ উঠছে তিথি বললো কোথায় আমি ওকে হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলাম ব্যালকোনির পাশে রাখা সোফাটার দিকে তিথি আমাকে শান্ত করে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে সোফাটার দিকে এগিয়ে গেলো সোফার নিচে দেখে আমরা জলখাবারে যে কেক বিস্কুট খেয়েছি সেখান থেকে কিছুটা তিথির জুতোর মধ্যে পড়ে যায় আর সেটা খাবার জন্য একটা ইঁদুর জুতোর ভেতর ঢুকে পড়ে। ইঁদুরটা কেক খেতে গিয়ে তিথির জুতোটাও কেটে দিয়েছে সেটারই শব্দ শুনে আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম। এই দেখে তিথি আমার উপর কী হাসা হাসিনা করলো আমি তো আমার নিজের কাছেই লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর রাতের খাবার খেয়ে দুজনে শুতে চলে গেলাম। শুয়ে বার বার নিজের বোকামির কথা ভাবছি আর মনে মনে হেসে যাচ্ছি খারাপও লাগছিল তিথির অতো দামী জুতোটা ইঁদুরে কেটে দিলো। তিথি খেলাধুলায় খুব ভালো ছিল তাই ওর বাবা ওর জন্মদিনে ওই জুতোটা গিফ্ট করেছিল। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা লেগেগেছে বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায় আবার কীসব শুনতে পায় শব্দ এবার আমি আর ভয় না পেয়ে উঠে দেখতে বেরোয় কিসের শব্দ, ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। দরজা খুলে বেরিয়ে দেখি শব্দটা নিচ থেকে আসছে দেখলাম তিথি ঘর থেকে বেরোয়নি তার মানে ও ঘুমোচ্ছে শব্দটা ওর কানে আসেনি আমি সন্ধ্যার ঘটনার কথা ভেবে ওকে আর উঠালাম না নিজেই দেখতে গেলাম কিসের শব্দ। সিঁড়ি থেকে নেমে দেখি সিঁড়ির পাশেয় যে তিন নম্বর ঘর সেখান থেকে শব্দটা আসছে। বুঝতে পারছিলাম না যে কিসের শব্দ দেখতে যাব কি না তারপর মনে কিছুটা সাহস নিয়ে দেখতে চলে গেলাম। ঘরে ঢুকে দেখি ঘরটা বেশ সাজানো গোছানো তাই মনে মনে ভাবতে থাকি এতো সুন্দর একটা ঘর থাকতে আমাদের উপরের ওই ঘর গুলোতে থাকতে দিলো কেনো। এসব কথা যখন ভাবছি ঠিক তখন কে যেনো আমাকে ডাকছে পেছন ফিরতেই দেখি চেয়ারের উপর এক ভদ্রলোক বসে আছে মনে মনে ভাবতে থাকি আমি ঘরে ঢোকার সময় ওনাকে দেখলাম না তো। উনি আমাকে বললেন কিসের এতো চিন্তা করছো আমি কিছুটা ভয়ের মধ্যেই ছিলাম ভয়ে আধো আধো কথা বেরোছিল আমার মুখ থেকে আ মি মানে আ আ আপনি এ এ এখানে কি কি করে এলেন। ভদ্রলোক মৃদু হেসে আমাকে সামনের চেয়ারটির দিকে দেখিয়ে দিলেন বসার জন্য। অন্ধকারের জন্য উনার মুখটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তবে জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের যে আলো ঢুকছিল তাতে দেখে মনে হচ্ছিল লোকটা কোন রাজা মহারাজা বা কোনো বেশ বড়ো জমিদারি বংশের লোক। লোকটির পরনে ছিলো বেশ দামী ধুতি আর পাঞ্জাবি মাথায় তাও আবার পাগড়ি গায়ের পোশাকটি মনে হচ্ছিল যেমন হিরে দিয়ে তৈরি হয়েছে বেশ জমকালো, দশটি আঙুলে দশটি আংটি গলায় মোটা চেন পায়ে নাগরায় জুতো। ভদ্রলোকটি আমাকে বলে উঠলেন তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে আমি তো বেশ অবাকই হলাম এতো বড়ো মানুষ আমার কাছে সাহায্য চাইছে। তারপর আমি বলে উঠি স্যার আমি আর আপনাকে কি সাহায্য করবো বলুন আপনি এতো বড়ো মানুষ আপনার তো মনে হয় অনেক বড়ো মানুষদের সাথে উঠা বসা তো আপনি তাদের সাহায্য করতে বলছেন না কেনো কিংবা আপনার আত্মীয়স্বজন তাদের বলুন ভদ্রলোক হেসে উঠলো ভীষণ জোরে চোখ খুলে দেখি আমি আমার বিছানায় ভোর হয়ে গিয়েছে তিথি আমার দরজা বার বার ধাকাচ্ছে। সকাল সাতটায় আমাদের ট্রেন। আমি স্বপ্ন ভেবে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে দিলাম তিথি ঘরের ভেতর ঢুকে আমার উপর চিৎকার করতে লাগলো। কিরে, তুই এখনো রেডি হসনি? জানিস না, সকাল সাতটায় আমাদের ট্রেন? আর তুই এখনো ঘুমোছিস। আমার সেই ঘরের রহস্য সমাধান না করে বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করছিল না, আমি তিথিকে বলে উঠলাম আমি আজ বাড়ি ফিরে যাব না আমার এই জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেছে তাই আমি দু-তিন দিন থাকতে চাই তিথি মজা করে বলে উঠলো কেনো রে ভূতেদের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে বুঝি আমি হেসে উত্তর দিলাম, "তা হয়েছে কিছুটা।" এরপর তিথি থাকতে রাজি হয়ে গেলো ও আমার ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে বাগানে হাঁটতে চলে গেলো। আমি কাল রাতের স্বপ্নটা কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না মুখ ধুয়ে স্নান সেরে আমি নিচে নেমে ওই তিনতলার ঘরের দিকে গেলাম গিয়ে দেখি ঘরে তালাবন্ধ রবিদা সেখান থেকে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করে দিদিমণি তুমি ওই ঘর দিকে কেনো গিয়েছিলে তোমার কি কিছু হারিয়ে গেছে খুঁজছো। আমি রবিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হ্যাঁ গো রবিদা, ওই ঘরটা তালাবন্ধ কেনো? কি আছে ওই ঘরে?" রবিদা আমাকে জানায় এই সব অঞ্চলের রাজা ছিলেন মহারাজ রামনারায়ণ সিংহ তারই ছিল এই বাংলো। রাজার খুব প্রিয় জায়গা ছিল এই ঝন্টিপাহাড় তাই তিনি এখানে তার এই বাংলো বানান রাজা নাকি যতবার আসতো এই ঘরেই এসে থাকতো তাই মহারাজ মারা যাবার পর ওই ঘরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না, শুধুমাত্র টুরিস্টদের থাকার জন্য এই বাংলো ব্যবহার করতে দিয়েছিল কিন্তু তাও তো এখন ওই তিথি দিদিমণির বাবা এই বাংলো কিনেনিয়েছে। প্রথম দিকে টুরিস্ট আসতো কিন্তু তেনাদের ভয়ে আর কেউ এইদিকে আসতো না।
তাই মহারাজের বংশধরেরা এই বাংলো বিক্রি করে দিলেন আমি তো সেই ছোটবেলা থেকে এই বাংলো দেখে আসছি আগে আমার বাবা কাজ করতো এখন আমি। রবিদার মুখ থেকে সমস্ত কথা শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো কে ছিলেন ওই ভদ্রলোক? আমি রবিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম রবিদা তুমিতো সেই ছোটবেলা থেকে এখানে আছো তো তুমি জানো ওই তিননম্বর ঘরের চাবি কোথায় আছে রবিদা আমাকে বললো দিদিমান তাতো জানিনা আমি আমার জন্মের পর থেকে এই ঘরে তালাবন্ধ দেখছি বাপ মায়ের কাছে যেটুকু গল্প শুনেছি তাই তোমাকে বললাম চাবির ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। হুম ঠিক আছে তাহলে এরপর রবিদা বললো আমাদের পুকুরের কাতলা মাছ আজ তোমাদের জন্য রান্না করেছে তোমাদের বৌদি খেয়ে দেখো এই বলে রবিদা নিজের কাজে চলে গেলো। আমিও নিজের ঘরে চলে গেলাম কিছুতেই সেই স্বপ্নটা ভুলতে পারছিলাম না তিথি পা চালি করে আমার ঘরে এলো দুজনে মিলে ঠিক করলাম আজ এই জায়গাটা একটু ঘুরে দেখবো, তারপর বেরিয়ে পড়লাম বেশ সুন্দর জায়গা সারাদিন ঘুরে বাড়ি ফিরে বৌদির হাতের কাতলা মাছের রান্না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙে আবার আগের দিনের মতো ব্যালকনিতে বসে আড্ডা। সন্ধ্যা হতে না হতেই রবিদা আগের দিনের মতো খাবার দিয়ে চলে গেলো তারপর ঠিক রাত আটটাতে খাবার খেয়ে দুজনেই শুতে চলে গেলাম সারাদিন ঘোরাঘুরি করে দুজনে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। আজ যেন কিছুতেই ঘুমই হচ্ছিল না চোখ বন্ধ করলে সেই স্বপ্ন। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম আগের দিনের মতো ঠিক একই শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো আমার নিচে নেমে সেই ঘরের দিকে গেলাম দেখি ঘরের তালা খোলা আমি ভেতরে ঢুকে আগের দিনের মতো সেই চেয়ারটায় বসে পড়লাম। পেছন থেকে জুতোর খটখট শব্দ যেনো আমার দিকে কেউ এগিয়ে আসছে আমার সাহস হচ্ছিল না পেছন দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখতে গায়ে অজস্র ঘাম বেরিয়ে আসছিল ভদ্রলোক সামনে এসে আগের দিন যে চেয়ারে বসেছিলো সেই চেয়ারে এসে বসলো, আমি কিছুটা সাহসের সাথে বলে উঠলাম কে আপনি? আপনি কি মহারাজ রামনারায়ণ সিংহ? ভদ্রলোক বলে উঠলো ঠিকই চিনেছো তাহলে আমি বলে উঠলাম আপনি তো মারা গেছেন তাহলে? ভদ্রলোকটি বললেন হ্যাঁ আমি মারা গেছি তা বহু কাল হয়েছে একথা যেমন সত্য ঠিক তেমনি আমার মৃত্যু কোন স্বাভাবিক ঘটনা ছিলনা? আমি বললাম কেন আপনার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলনা কী হয়েছিল আপনার সাথে এই সব প্রশ্ন যখন করছি মনে যেন হঠাতি অজস্র সাহস এসে জন্মেছে তাকে দেখে আমার হাত-পা, ঠোঁট কাপেনি শুধু নানান রকমের প্রশ্ন ঘুরছে মাথার মধ্যে। ভদ্রলোক বললেন আমি এই সব অঞ্চলের রাজা ছিলাম বেশ সুখ্যাতি ছিল আমার সকল প্রজারা আমার শাসনে খুশিই ছিল কিন্তু খুশি ছিলনা আমার নিজের দাদা ওর আমার নেতৃত্বে থাকতে পছন্দ ছিলনা সারাদিন মদ খেয়ে বাজে খরচা করে বেড়াত। আমি একদিন তার ঘরে গিয়ে তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম আমি তার আর বাজে খরচার জন্য একটাকাও দেবনা বাবা বরাবরি দাদা রাধাকৃষ্ণের এই ব্যবহারে খুশি ছিলেননা তাই বাবার মৃত্যুর পর সমস্ত দায়িত্ব তিনি আমাকে দিয়ে যান। সমস্ত বিষয় সম্পত্তি আমার নামে করে দেওয়াতে দাদা প্রচন্ড রেগে যান। বড়োপুত্র হওয়া সত্ত্বেও সে রাজ্য না পেয়ে আমি পেলাম। ছোট ভাইয়ের নেতৃত্বে থাকতে ওর লজ্জাবোধ করে। তাই একদিন আমার বিশ্বস্ত মন্ত্রী চন্দ্রবাহাদুরের সঙ্গে পরিকল্পনা করে আমাকে মারার জন্য। আমার মনে মনে সন্দেহ হয়েছিল কিন্তু তার কোন প্রমাণ আমার কাছে ছিলনা তাছাড়া যাকে মন্ত্রী হয়েও বন্ধুর স্থান আগে দিরেছি সেই আমার সাথে বিশ্বাসঘাতক করলো। আমার এই ঝন্টিপাহাড় বেশ পছন্দের জায়গা ছিল তাই এখানে বাংলো বানিয়ে আমি আমার সম্পত্তি সবকিছু এখানে লুকিয়ে রাখি। আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে চন্দ্র বললো যে ঝন্টিপাহাড়ে এই বছর কাটাবে ওখানকার মানুষদের সাথে তারাও রাজার জন্মদিনে তাকে পেয়ে খুশি হবে। তাই চন্দ্র দাদা রাধাকৃষ্ণ ও আমি মিলে এই ঝন্টিপাহাড়ে চলে এলাম।
আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিছু খাওয়া দাওয়া আয়োজন হয়েছিল লোকজন কাউকেই ডাকা হয়নি শুধু আমরা তিনজন ছিলাম সঙ্গে একটি মাত্র চাকর নিয়ে গিয়েছিলাম রবির দাদু রামলালকে বেশি লোকজন আমার পছন্দ ছিলনা আর সেটারই সুযোগ নিল ওরা। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমতে চলে গেলাম আমি ঠিক রাত বারটা হবে দরজায় ঠকঠক শব্দ দরজা খুলে দেখি চন্দ্র দাদা ও রামলাল আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে কোন সমস্যা চন্দ্র আমাকে জোরে একটা ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিলো আমি চন্দ্রকে বললাম কী করছিস কী তুই আর কিছু বলে উঠব তার আগেই রামলাল আমার পা ও দাদা আমার হাত চেপে ধরলো চন্দ্র একটা মোটা দড়ি দিয়ে আমার গলাতে ফাঁসিয়ে শেষ করেছিলো আমাকে খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন তাই প্রতিশোধের আগুন আমার মধ্যে জ্বলছে। সেই কারনে আমার আত্মা মুক্তি পায়নি।
আমি বললাম আমি কী ভাবে আপনাকে সাহায্য করবো আমি কারও খুন করতে পারবো না। উনি বললেন না আমি তোমাকে খুন করতে বলিনি আমার মৃত্যুর পর ওরা অনেক সম্পত্তি খুঁজেছে পায়নি যেটুকু পড়েছিল শুনেছি তা নিয়ে চন্দ্রবাহাদুর বিদেশে চলে গেছে দাদা নাকি অতিরিক্ত মদ খেয়ে রোগে মারা গেছে আর ওই রমলালকে শাস্তি দিয়েছি আমি ওরা আমাকে খুন করে সকলকে প্রচার করে আমি স্নান করতে গিয়ে মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে জলে ডুবে মারা গেছি। তারপর এই ঝন্টিপাহাড়ে আমাকে পুড়িয়ে দিয়ে চলে যায় দাদা ও চন্দ্র রামলালকে দিয়ে যায় এই বাংলো। আগে রামলালের পরিবার বাংলোর ভেতরেই থাকতো একদিন তালা ভেঙ্গে ও আমার ঘরে প্রবেশ করে তখন আমি ওকে শেষ করেছি। তারপর থেকে সবাই জানে এটা ভূতবাংলো দু-একজন যদিও বা আসতো কিন্তু রাত বারোটা বাজলেই আমি অনেককে ডেকে এটা বলতে চেয়েছি কিন্তু ভয়ে সবাই এখান থেকে পালিয়ে যায় আর কোন টুরিস্ট আসে না এখানে। আমি ঠিক করলাম এতোদিন পর যখন কেউ এসেছে তাকে আমি যেকোনো উপায় সব জানিয়ে ছাড়ব। আমি বললাম, 'তাহলে এখন আপনি কী চান? না উনি বললেন চন্দ্রের শান্তি আর এই সমস্ত গোপন সম্পত্তি সাধারন মানুষের যাতে কাজে লাগে। আমার এই ঘরের ভেতরেই আরও একটা ঘর আছে যা সবাই জানেনা ওই আলমারি সরিয়ে দিলেই সেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করা যাবে সেখানেই আছে আমার সমস্ত সম্পত্তি আর চন্দ্রবাহাদুরের বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ। সকালে চোখ খুলে দেখি আমি নিজের বিছানায় শুয়ে তিথি আমার ঘরে এলে ওর কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম নিচে তিননম্বর ঘরে নাকি আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। রবিদা আমাকে আমার ঘরে তুলে এনে শুয়ে দিয়েছে। আমি তিথিকে কাছে ডেকে কাল রাতের সমস্ত ঘটনা জানালাম আমি ভেবেছিলাম ও হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবে ব্যাপারটা কিন্তু না ও আমার কথা মতো তিননম্বর ঘরে গিয়ে রবিদাকে দিয়ে সেই আলমারি সরালো। আমারা দেখলাম সত্যিই সেখানে দরজা আছে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম সেখানে অনেক অর্থ ও পুরোনো একটা ডায়েরি আর কিছু দলিলপত্র পেলাম। ওই সব নিয়ে আমরা চলে এলাম বাড়ি আর অর্থের দায়িত্ব দিয়ে গেলাম রবিদার ওপর। রবিদা ভূতের ভয়ে ওর ধারে কাছেও বা যায়নি।
তিথির বাবার চেনা বন্ধু ছিলেন এক পুলিশ কাকু তেনাকে সমস্ত কিছু জানালাম আর বার বার অনুরোধ করলাম কেসটা যেন একবার খুলে দেখেন। তিনি আমাদের কথা মতো তদন্ত করলেন চন্দ্রবাহাদুরকেও বিদেশ থেকে ডেকে আনা হলো পুলিশের মারে সত্যি কথা উনি স্বীকার করলেন। আদালতে উনার মৃত্যুদণ্ড হলো ও সমস্ত অর্থ সরকার হাসপাতাল, বিদ্যালয়, অনাথআশ্রম, বৃদ্ধাশ্রমে দান করলেন। হয়তো এখন তিনি শান্তি পেয়েছেন। তবে আজও আমার কাছে সেদিনের স্বপ্নটা রহস্য রয়ে গেছে।

