অনুশোচনা
অনুশোচনা
পদ্মাবতীকে কেন্দ্র করে 'স্বপ্নবাসবদত্তা'-র একটি পুনর্কল্পিত সমাপ্তি-
ভূমিকা: ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে এসেছি রাজকীয় কূটনীতি আর বাসবদত্তার নীরব আত্মত্যাগের গল্প। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই পুরো রাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে বড় প্রতারণা কার সাথে হয়েছিল? সে রাজকন্যা পদ্মাবতী। যাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে উদয়নের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মূল গল্পের: সেই সমাপ্তিটি আমার মনঃপূত হয়নি। একজন সাধারণ পাঠক এবং লেখক হিসেবে পদ্মাবতীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে এবং তাঁর আত্মসম্মানকে মর্যাদা দিতে আমি এই গল্পটির একটি আধুনিক ও সম্পূর্ণ নতুন সমাপ্তি নিজের মতন করে সাজিয়েছি। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।
মূল গল্পে: রানী পদ্মাবতী ও অবন্তিকা (ছদ্মবেশী বাসবদত্তা) উদ্যান থেকে ফিরে এলেন পদ্মাবতী কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি জানতেন মহারাজের হৃদয়ে বাসবদত্তার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা রয়েছে। কিন্তু তিনি এটা কখনোই ভাবেননি, তিনি তার স্বামীর কর্তব্য ব্যতীত আর কিছুই নন। কারণ উদয়ন যখন উদ্যানে বিদূষককে জানান তিনি এখনও বাসবদত্তাকেই ভালোবাসেন তখন তিনি অবাক হননি কিন্তু তার জায়গা যে মহারাজের হৃদয়ে কোথাও নেই সেই উপলব্ধিও তিনি আজ করে ফেলেছেন। বাসবদত্তা পদ্মাবতীর মন ভালো করতে তার কক্ষে গেলেন সখীকে পেয়ে পদ্মাবতী তার মনের সকল কথা বললেন তিনি জানান বাসবদত্তা কি তার থেকে এতটাই সুন্দর ছিলেন যে তার মৃত্যুর এতকাল হওয়ার পরেও মহারাজ তাহাকে ভুলতে পারছেন না। তিনি এত চেষ্টা করেও মহারাজের মন পাননি কারণ তার সর্বস্য জুড়ে বাসবদত্তা রয়েছে। পদ্মাবতীর মুখ থেকে তাঁর এই গভীর দুঃখের কথা শুনে বাসবদত্তা নিজের ভেতরে এক তীব্র গ্লানিবোধ ও অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, নিজের অজান্তেই, তাঁর স্বামীর মঙ্গল করতে গিয়ে তিনি অন্য একজন নিষ্পাপ নারীর জীবনে চরম অন্যায় করে ফেলেছেন।
বাসবদত্তা আর নিজের ভেতরে এই সত্যিটা চেপে রাখতে পারছিলেন না। তিনি সমস্ত কথা মন্ত্রী যৌগন্ধরায়ণকে জানান, এবং বলেন যে তিনি নিজের আসল পরিচয় সবার সামনে প্রকাশ করে দিতে চান। কিন্তু যৌগন্ধরায়ণ তাঁকে বাধা দেন। তিনি বাসবদত্তাকে বোঝান, "এখন যদি আপনি নিজের আসল পরিচয় সবার সামনে আনেন, তবে কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। সকলে আপনাকে শত্রু পক্ষের মানুষ বা কোনো প্রতারক হিসেবে ভুল বুঝবে।"
তাই মন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেই এমন একটি পরিকল্পনা করবেন যাতে সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সবার সামনে আসে। অবশেষে যৌগন্ধরায়ণ ঠিক করেন, তিনি বাসবদত্তার মাতার সাথে যোগাযোগ করবেন। কারণ, মায়ের কাছে মেয়ের চেয়ে আপন আর কেউ হতে পারে না। মা এই কঠিন সমস্যার কথা শুনলে কোনো মতেই বাসবদত্তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবেন না।
যৌগন্ধরায়ণের কথা মতো উজ্জয়িনীর মহারাজ মহাসেনের বিশ্বস্ত কঞ্চুকী এবং বাসবদত্তার ধাত্রী মাতা বসুন্ধরা এসে পৌঁছালেন। তাঁদের সাথে এক অপরূপ চিত্র এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রীও এসেছে।
ধাত্রী আর কাঞ্চুকি এসেছে শুনে, উদয়ন পদ্মাবতীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে জান। কাঞ্চুকি জানায় মহাসেন তাঁর রাজ্যে ফিরে পাওয়ায় অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। এর পর ধাত্রী মা বলেন মহারাজ ও মহারানীর তাদের বিবাহে কোন আপত্তি ছিল না। তাই উদয়ন যখন বাসবদত্তাকে নিয়ে তার রাজ্যে চলে আসেন তখন মহারানী তাদের উভয়ের চিত্র বানিয়ে তাদের বিবাহ দেন। এখন যখন তার মেয়েই তার কাছে নেয় তখন এই চিত্র রেখে কী করবেন, তাই তিনি এই চিত্র পাঠিয়েছেন। পদ্মাবতী বাসবদত্তার চিত্র দেখার আগ্রহে অতি দ্রুত কাপড় খুলে চিত্র দেখেন। চিত্র দেখে পদ্মাবতী অবাক হয়ে যান ও উদয়নকে বারে বারে জিজ্ঞেসা করেন ইনি কী বাসবদত্তা? উদয়ন অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে বলেন হ্যাঁ এটাই বাসবদত্তার চিত্র। পদ্মাবতী তাকে জানান এই রকমি দেখতে একজন কন্যা আমার কাছে আছে এক পরিব্রাজক সেই কন্যাকে তার কাছে দিয়ে গেছেন তাঁর স্বামী বিদেশ প্রত্যাগত, তাই তাকে যেন কিছু কালের জন্য আশ্রয় দিই। উদয়ন একথা শুনে সেই কন্যাকে ডেকে পাঠালেন। কন্যাতো অন্য কোনো পরপুরুষের সামনে মুখ দেখাবে না তাই বাসবদত্তার ধাত্রীকে পরিক্ষা করে দেখবার জন্য পাঠালেন। মায়ের পর একজন ধাত্রী তা বুঝতে পারবেন, কারণ সে যে তাকে লালন পালন করে বড় করেছে। ধাত্রী বাসবদত্তাকে দেখে চিনতে পারেন, এবং তিনি বলেন এই কন্যায় বাসবদত্তা। কিন্তু অবন্তিকা কিছুতেই মানতে চাননা যে তিনি বাসবদত্তা, কারণ যৌগন্ধরায়ন তাকে বারণ করেছে যে তার আসল পরিচয় জানাতে, তাতে যে তাদের পরিকল্পনা সফল হবে না। তাই অবন্তিকা কিছুতেই মানতে চাননা যে সেই বাসবদত্তা। অবন্তিকা যত বার না বলে উদয়নের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, করেন তিনিও ভেবেছিলেন বাসবদত্তা সত্যিই আবার তার কাছে ফিরে আসবে, তাই অবন্তিকা না বলাতে উদয়ন ভাবে বাসবদত্তা কী সত্যিই অন্য কোনো পুরুষকে ভালোবেসে ফেলেছে তাই সে তার আসল পরিচয় জানাতে চাইছে না। অবশেষে যৌগন্ধরায়ন সেখানে প্রবেশ করেন, এবং সকল সত্য কথা সফলকে জানান যে অবন্তিকায় বাসবদত্তা। যৌগন্ধরায়ন সকলের কাছে নত মস্তক ক্ষমা প্রার্থনা জানান তার এই পরিকল্পনার জন্য। পদ্মাবতীও সকল সত্য জেনে বাসবদত্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি এতকাল বাসবদত্তাকে দাসীর ন্যায় কাজকর্ম করিয়েছেন তাই। বাসবদত্তাও পদ্মাবতীর ন্যায় ক্ষমা প্রার্থনা জানান। কারণ তিনিও অন্যায় করেছেন পদ্মাবতীর সাথে। তার প্রতি উদয়নের ভালোবাসার কথা জেনেও তিনি তার সাথে পদ্মাবতীর বিবাহ দিয়েছেন, বাসবদত্তা এও বলেন দাসী হয়ে থাকলেও পদ্মাবতী তাকে অধিক নিজের সখীর স্থান দিয়েছেন, সেই বরং নিজের স্বামী আর রাজ্যের কথা ভেবে এক নারীর সাথে অন্যায় করে ফেলেছেন। পদ্মাবতী বাসবদত্তার মুখ থেকে সব শুনে পর তাকে ক্ষমা করে দেন, এরপর রাজা উদয়নের সঙ্গে তারা দুজনে সুখে বসবাস করেন দুই ভগিনীর ন্যায়।
উপসংহারের লেখকীয় বক্তব্য: মহাকবি ভাস সংস্কৃত সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং তাঁর সৃষ্টি 'স্বপ্নবাসবদত্তম্' এক কালজয়ী নাট্যকৃতি। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগের এক মহান লেখকের অমর সৃষ্টির ওপর কলম ধরার মতো ধৃষ্টতা বা যোগ্যতা আমার নেই। আমি ২০২৬ সালের এক অতি সাধারণ মেয়ে মাত্র। তাই অবান্তরভাবে তাঁর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করার জন্য আমি শুরুতেই মহাকবির চরণে এবং পাঠককুলের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কাউকে ছোট করা বা কোনো অমর সৃষ্টিকে খাটো করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
তবে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে নাটকটি পড়ার সময় পদ্মাবতী চরিত্রটির নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি আমার মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মূল নাটকের শেষে দেখা যায়, বাসবদত্তা ফিরে আসার পর পদ্মাবতীই উল্টে বাসবদত্তার কাছে ক্ষমা চাইছেন-কারণ বাসবদত্তার পিতা ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা।
কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এই পুরো গল্পে সবচেয়ে বড় অন্যায় এবং প্রতারণা করা হয়েছিল পদ্মাবতীর সাথে। বাসবদত্তা যা করেছিলেন, তা নিজের ইচ্ছায় ও পরিকল্পনা করে করেছিলেন। কিন্তু পদ্মাবতী সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে, নিষ্পাপ মনে উদয়নকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। অথচ শেষে যখন সত্য প্রকাশ পায়, তখন উদয়ন ও বাসবদত্তার মিলনের মাঝে পদ্মাবতী এক 'তৃতীয় চরিত্রে' পরিণত হন।
যিনি এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলেন এবং মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেলেন, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা বংশমর্যাদার খাতিরে তাঁকেই ক্ষমা চাইতে হলো! এই অসমাপ্তি এবং অন্যায়টি আমার মন মেনে নিতে পারেনি। আমার মনে হয়েছে, ক্ষমা তো আসলে উদয়ন এবং বাসবদত্তার যৌথভাবে পদ্মাবতীর কাছে চাওয়া উচিত ছিল, কারণ তাঁরা দুজনে মিলে পদ্মাবতীর সরল আবেগের সাথে খেলা করেছিলেন। মহাকবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই, একজন সাধারণ নারী হিসেবে পদ্মাবতীর সেই নীরব কষ্ট এবং তাঁর প্রতি হওয়া অন্যায়ের দিকটিই আমি আমার এই নিজস্ব ভাবনায় তুলে ধরার একটি ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি মাত্র।
