Aparna Chaudhuri

Inspirational


4.8  

Aparna Chaudhuri

Inspirational


পরচুলা

পরচুলা

7 mins 950 7 mins 950

“আর কোন দিন তোমাকে এভাবে রাস্তায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো না আমি।“ বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বলল শ্যামল। শ্যামল আর অনিলা, দুজনে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে অটোর জন্য। রাত এগারোটা বাজে, রাস্তা শুনশান লোকজন নেই। ওরা কোনো অটো , ট্যাক্সি কিছুই পাচ্ছেনা। অসহায় ভাবে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।  আশপাশের লোকগুলো ওদের দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। ওদের নজর গুলো ভশ্যামলই বলেছিল অনিলাকে, “সুন্দর করে সেজে এসো কিন্তু। আর শোন, চুলটা ছেড়ে দেবে। কেমন?” ছিপছিপে চেহারা, কোমর অবধি খোলা চুল, পরনে একটি গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজে অনিলাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। যে একবার ওর দিকে তাকায়, সে আবার ফিরে তাকায়। ওদের তাকানো গুলো শ্যামলের দেখতে ভালো লাগছে না।

কেন যে মরতে সেজে আসতে বললাম।“ মনে মনে নিজেরই মুণ্ডপাত করে শ্যামল।

মাত্র দু'মাস বিয়ে হয়েছে ওদের । এই প্রথম অনিলাকে নিয়ে বন্ধুদের পার্টিতে গিয়েছিলো শ্যামল। পার্টিতে যে এতো দেরি হয়ে যাবে সেটা ও ভাবতেই পারেনি । হঠাৎ একটা খালি অটো । আকাশের চাঁদ হাতে পেলো শ্যামল । অটোতে চড়ে বসে দুজনেরই ধড়ে প্রাণ এলো যেন । এর কিছুদিনের মধ্যেই একটা মারুতি ৮০০ গাড়ী কিনল শ্যামল। যাতে আর কখনো অনিলাকে নিয়ে রাস্তায় না দাঁড়িয়ে থাকওদের যখন বিয়ের কথা হচ্ছিল অনিলার লম্বা চুলই শ্যামলকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করেছিল।

এই ঘটনার পর আরও দু'বছর কেটে গেছে । ওদের একটি ছোট্ট মেয়ে হয়েছে, নাম মঞ্জুলা । মায়ের লম্বা চুল নিয়ে খেলা করতে মঞ্জুলার খুব ভালো লাগে । তার নরম কচি কচি আঙুল দিয়ে একবার চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরতে পারলে সে কিছুতেই ছাড়তে চায় না । আর অনিলার মনে হয়, যদি ওই নরম আঙুল গুলো চুলে লেগে কেটে যায় ? যেই ছাড়ানোর চেষ্টা করে অনিলা, আরও শক্ত করে চেপে টেনে ধরে মঞ্জুলা। অনিলা চেঁচিয়ে ওঠে,”আআ মাগো ...!” মঞ্জুলা খিলখিল করে হাসতে থাকে । খুব সাবধানে আঙুলগুলো চুল থেকে ছাড়িয়ে নেয় অনিলা বাচ্ছারা কেমন যেন হঠাৎ করে বড় হয়ে যায়। মঞ্জুলা ও বড় হয়ে গেল। বাড়ীর কাছে একটা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তিঅনিলার কাজ ওকে রোজ স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসা নিয়ে আসা। এক মাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল আর বড় বড় চোখে ওকে একদম একটা ডল পুতুলের মত দেমঞ্জুলার ও মাথায় খুব চুল, কিন্তু মা অনিলার মত অতটা নয়। মায়ের লম্বা চুল নিয়ে ওরও খুব গর্ব। ওদের স্কুলের প্যারেন্ট টিচার মিটিঙে সব বন্ধুদের মায়েরা আসে, কারুর মাথার চুলই ওর মায়ের মত না। সবার চুলই ছোট ছোট। বাড়ী এসে বাবার সঙ্গে মেয়ের উত্তেজিত আলোচনা শুনে অনিলা রান্না ঘর থেকে হেসে আর বাঁচ“জানো বাবা আজ আমি স্টাফ রুমে গেছি রিনা মিস রত্না মিসকে বলছিল তুমি দেখেছ মঞ্জুলার মাকে, আরে ঐ যে যার বিরাট চুল।“ মঞ্জুলার গলায় গর্বের সুর।“তাই নাকি? তোরও চুল তোর মায়ের মতন হবে দেখিস।“ বলল শ্যামল।

নিজের ছোট পনি টেলটা সামনে নিয়ে এসে নেড়ে চেড়ে দেখে একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়ল মঞ্জুলা। তারপর ছুটে এলো রান্নাঘরে, ”মা তোমার চুল কি ছোটবেলা থেকেই এতো লম্বা ছি“ না না। আমি যখন অনেক বড় হলাম, মানে এই কলেজে পড়ি, তখন আমার চুল লম্বা হল।“ মুচকি হেসে জবাব দিল অনিলা“ তাহলে আমি যখন কলেজে পড়ব তখন আমার চুলও তোমার মত হবে তাই না মা?”“ হ্যাঁ তাই।“ ওর গাল টিপে আদর করে দেয় অনিলা।

 সুখ স্বপ্নের মত কেটে গেলো আরও দশটা বছর। মঞ্জুলা এখন ক্লাস এইটে পড়ে । অনেক বেশী স্বাবলম্বী হয়ে গেছে ও। ওর জন্য একটা আলাদা ঘর দেওয়া হয়েছে, যাতে ওর পড়াশোনার অসুবিধা না হয়। আজকাল স্কুলের পর টিউশনে পড়তে যায় মঞসেদিন মেয়ের জন্য পাস্তা বানাচ্ছিল অনিলা। স্কুল থেকে ফিরে মেয়েটা কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজেই পড়তে চলে যায়। তাই ওর জন্য কিছু ভালোমন্দ বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেআজ অনিলার শরীরটা হঠাৎ বেশ খারাপ লাগছে। কেমন বুকের কষ্ট হচ্ছে। কোন রকমে রান্নাটা শেষ করে ও বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। সেদিন রাত্রে বেশ জ্বর এলো অনিলডাক্তার দেখান হল, ডাক্তার বাবু বললেন চিন্তার কিছু নেই ভাইরাল ফিভার। তিন চার দিনে সেরে যাবে। তা সেরেও গেল জ্বর তখনকার মত কিন্তু কয়েকদিন বাদে আবার এলো। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই ঘুষঘুষে জ্বর হতে লাগলো অনিলার। ধীরে ধীরে শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে লাগলো, চোখের তলায় বেশ গাড় কালি পড়ে গে“ এতো ঠিক কথা নয়। রোজ রোজ জ্বর। চল ডাক্তার দেখাই।“ বলল শ্যামল।সেদিন বিকালে অফিস থেকে ফিরে শ্যামল অনিলাকে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে।

ডাক্তারবাবু কয়েকটা টেস্ট করতে বললেন । বায়োপ্সি টেস্টে ধরা পড়ল অনিলার ক্যান্সার হয়েছে।প্রথমে অনিলার বিশ্বাসই হল না। এ কি করে সম্ভব! ও খুব নিয়মে থাকে। তার ওপর ওদের বাড়ীর কারুর ক্যান্সার হয়নি। চারিদিক কিরকম অন্ধকার মনে হল অনিলার। মেয়েটা এখনও ছোট। ওর অনেক কাজ বাকি। কি জানি সবকাজ শেষ করতে পারবে কিনা। বড্ড তাড়াতাড়ি ওর সময়টা শেষ হয়ে গেল যেন। ওর বয়সী বাকিরা তো এখন কতকিছুডাক্তার বাবু ওদের অঙ্কোলজিসটের কাছে পাঠালেন। পরের দিন অঙ্কোলজিসট অনেকক্ষণ ধরে ওদের বোঝালেন, ক্যান্সার এখন সেরে যায়, ঠিকমত সময়ে ডিটেক্ট হলে আর ঠিকমত চিকিৎসা হলে একেবারেই সেরে যায়। তবে সময় একদম নষ্ট করা যাবে নচিকিৎসা শুরু হল ।

প্রথমে কেমোথেরাপি।

কেমোথেরাপির প্রথম দিন ডাক্তারবাবু অনিলাকে বললেন, “ আমার খুব বলতে খারাপ লাগছে । আপনার এত সুন্দর চুল, কেমোথেরাপিতে কিন্তু সব চুল ঝরে যাবে ।“

অনিলা আড়চোখে শ্যামলের দিকে তাকাল, ওর মুখটা করুণ হয়ে গেছে । ও মৃদু হেসে ধীরে ধীরে বলল ,” আমি জানি। ”ডাক্তার বাবু বললেন,” আপনি বরং চুলগুলো ছোট করে কেটে ফেলুন, তাতে trauma টা কম হবে।“

 “ কেটে দেবো?” শ্যামলের গলা দিয়ে প্রায় আওয়াজ বেরচ্ছেনা শ্যামলের মুখের দিকে তাকিয়ে, অনিলা বলল,” থাক......, যতদিন আছে। যখন ঝরে পড়বে তখন দেখা যাবে।কিন্তু বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না, এক সপ্তাহের মধ্যেই চুলগুলো ঝরে পড়তে শুরু করল। কেমোথেরাপির দিন সাতেক পর একদিন চুল আঁচড়াতে গিয়ে অনিলা দেখল একটা টেনিস বলের সমান চুলের গোলা হাতে এসে গেল । সবাইকে লুকিয়ে চুলটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল ও । প্রত্যেক দিন ঝরে পড়া চুলের সংখ্যা বাড়তে লাগলো । ঝরা চুলগুলো আঁচড়ে ফেলে না দিলে মাথায় অসহ্য ব্যথা হয় । ধীরে ধীরে চুলগুলো মনে হতে লাগল একটা বোঝা । একদিন চুলগুলো লুকিয়ে ফেলতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা পড়ে গেলো শ্যামলের কাছে। শ্যামল স্তম্ভিত হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে, চোখ দুটো ছল ছল করছে জলে। ও শুকনো গলায় বলল, “ এসো তোমার চুল গুলো ছোট ককিন্তু বব কাট চুলে ঝামেলা আরও বাড়লো । আগে চুলগুলো খসে পড়ে চুলের মধ্যেই আটকে থাকতো জটার মত কিন্তু এখন যেহেতু ছোট হয়ে গেছে সারা বাড়িময় চুল । খুব মুশকিল হতে লাগল । শেষ পর্যন্ত একদিন বিকালে শ্যামল ওর ইলেকট্রিক রেজারটা দিয়ে অনিলার মাথা শেভ করে দিতে লাগলো। খনিকটা মাথা কামানো হয়েছে এমন সময় কোচিং থেকে ফিরে এসে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো মঞ্জুলা । মাকে দেখে ও কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল । তারপর ছুটে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল বড় হয়ে গেছে মেয়ে। নিজের চোখের জল মাকে দেখাতে চায় না।

যখন পুরো চুলটা কাটা হয়ে গেল, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো অনিলা। ওর নিজেকে দেখে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী মনে হলো। কাঁধে একটা হাল্কা চাপ অনুভব করলো ও। শ্যামল পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, “ইউ আর বিউটিফুল।“ ফিসফিস করে ওর কানে বলল শ্যা “আই নো।“ বলল অনিলা।

কিছুদিনের মধ্যেই চোখের পাতা আর ভুরুর চুলগুলোও ঝরে পড়ে গেল অনিলার। আয়নায় নিজেকে দেখে শিঁউরে উঠলো অনিলা। ওর নিজেকে দেখে ‘ অগ্নিপথ’ সিনেমার সঞ্জয় দত্তের মতো লাগলো। তারপর থেকে পারতপক্ষে আয়না দেখেনা ও। শ্যামলের চোখের তারায় খোঁজে নিজের মুমঞ্জুলা আজকাল কমই আসে ওর কাছে। আসলেও বড্ড দূরের লাগে মেয়েকে। মায়ের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখাবার অভিনয়টায় এখনও পাকাপোক্ত হয়ে উঠতে পারেনিশুধু শ্যামলের মধ্যেই কোন ফারাক নেই। ওর সমস্তটা দিয়ে আগলে রেখেছে অনিলাকে। দ্বিতীয় কেমোথেরাপি নেবার সময় এসে গেলো। এই প্রথম অনিলা বিনা চুলে বাইরে বেরবে। 

কেমোর আগের দিন শ্যামল আর মঞ্জুলা বাজারে গিয়ে আই ব্রাও পেনসিল আর একটা খুব সুন্দর পরচুলা কিনে আনল। তারপর বাবা আর মেয়ে মিলে, হসপিটাল যাবার আগে, অনিলাকে পরচুলা পরিয়ে ভুরু এঁকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো। আয়নায় নিজেকে দেখে অনিলার চোখ জলে ভরে উএকদিকে শ্যামল আর অন্যদিকে মঞ্জুলা অনিলাকে ধরে রাস্তায় নিয়ে বেরিয়েছে। অনিলার সেদিন রাস্তায় বেরোতে খুব লজ্জা করছিল, মনে হচ্ছে সবাই ওর দিকেই দেখছেরাস্তায় রিঙ্কু আন্টির সঙ্গে দেখা। রিঙ্কু আনটি ভুলভাল জায়গায়, ভুলভাল কথা বলার জন্য বিখ্যাত। উনি জানেন যে অনিলার চুল কেটে দেওয়া হয়েছে । তবুও অনিলাকে দেখেই ভালোমানুষের মত মুখ করে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, “আরে অনিলা, কেমন আছ “ভালো।“ স্মিত হেসে উত্তর দিল অনিলা।

“ কোথায় যাচ্ছ?” “ হাসপাতাল, আজ আমার কেমোথেরাপি।“

“ আচ্ছা! এটা কি প্রথম?”

“না , আজ দ্বিতীয়।“ “ অ... তা কেমোথেরাপিতে শুনেছি চুল উঠে যায়। তা এটা কি তোমার নিজের চুল?”

অনিলা আর শ্যামল হঠাৎ করে যেন পাথর হয়ে গেল ।

মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মঞ্জুলা হেসে বলে উঠলো,” হ্যাঁ এটা আমার মায়েরই চুল। আমি কিনে দিয়েছি। যেমন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনে দিয়েছি। এখন ওগুলো সবই আমার মায়ের । কি সুন্দর দেখাচ্ছে নওর জবাব শুনে রিঙ্কি আনটি কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন, আর আমতা আমতা করে বলে উঠলেন, “তা তো বটেই, তা তো বটেই!” বলেই পা চালিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলেন “ইউ আর দ মোস্ট বিউটিফুল মম।" বলে মঞ্জুলা অনিলাকে জড়িয়ে ধরল। অনিলা, মঞ্জুলা আর শ্যামলকে সজলচক্ষে জড়িয়ে ধরে বলল, “আই নো......।অনিলাকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে ওরা গাড়ীতে বসাল। গাড়ী চালু করে শ্যামল মঞ্জুলার উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,” উয়ি আর প্রাউড অফ ইউ বেটা। থ্যাঙ্ক ইউ। আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না রিঙ্কি আনটিকে কি ভাবে সামলা “ইটস ওকে বাবা। আমরা ফ্যামিলি। তাই নো থ্যাঙ্কস। আমরা যদি একজন অন্যজনকে সাপোর্ট করব না তো কে করবে বল?" বলে উঠলো মঞ্জুলা।


এতক্ষণ অনিলা চুপচাপ বাবা আর মেয়ের কথা শুনছিল, এবার আদুরি আদুরি গলায় বলল, “আচ্ছা, তাহলে শাড়ীর সঙ্গে পরার জন্য একটা খোঁপা আর সালওয়ারের সঙ্গে পরার জন্য একটা বিনুনি কিনে দাও। বেশ বদলে বদলে পরওর কথা শুনে বাবা মেয়ে একসঙ্গে হেসে বলে উঠলো, “ নিশ্চয়ই।"


Rate this content
Log in

More bengali story from Aparna Chaudhuri

Similar bengali story from Inspirational