STORYMIRROR

aparna sadhukhan

Abstract Romance Others

3  

aparna sadhukhan

Abstract Romance Others

নীরবে ভালোবাসি

নীরবে ভালোবাসি

22 mins
15

মামমাম দাঁড়া,পরে যাবি।গাড়ি আসছে সোনা দাঁড়া”। 


কথাটা বলতে বলতে এক বাচ্ছা মেয়ের পিছনে ছুটে যাচ্ছে অনিকেত। অনিকেত সেনগুপ্ত, SNG ইনড্রাসট্রির বর্তমান কর্ণধার। টাকা পয়সার অভাব নেই,গাড়ি,বাড়ি,কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি সবই আছে তার। এই ৩০ বছরের জীবনে ওর একমাত্র বেচেঁ থাকার রসদ ওর ছোট্ট পরী ঋষিতা। 


বছর চারেকের ছোট্টো মেয়ে ঋষিতা,বাবার সাথে বাড়ি ফিরছিল ,রাস্তায় এক বেলুন ওয়ালাকে দেখতে পেয়ে বাবাকে গাড়ি থামাতে বলে,বাবার কথা না শুনেই গাড়ি থেকে নেমে সেই দিকেই ছুটে গেছে ঋষিতা। আর ঠিক তখনই তার দিকেই তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছিল একটা নীল মারতি। 

অনিকেত দুর থেকেই দেখতে পেয়েছে গাড়িটাকে। অনিকেত চিৎকার করে ওঠে।

 

“মামমাম”। 


বাচ্ছা মেয়েটিও হয়তো ওর বাবার আর্তনাদ বুঝতে পেরেছিল,তাই তো রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে পরেছিল। 


গাড়ির ড্রাইভার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোট্টো বাচ্ছা মেয়েটি গাড়ির সামনে এসে পরে। ঠিক তখনই বাচ্ছা মেয়েটিকে ছোঁ মেরে সামনে থেকে সরিয়ে নেয় একজন।গাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। অনিকেত দুর থেকে দেখে একজন মেয়ে ঋষিতাকে গাড়ির সামনে থেকে সরিয়ে নিল। 

 

দেবদত্তার পাশ দিয়ে ছোট্ট ঋষিতা ছুটে গেছিল,দেবদত্তা মুচকি হেসে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো একটা গাড়ি ঋষিতার দিকে তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে আর পিছন দিয়ে একটা আর্তনাদ ভেসে এলো। হাতে ধরে থাকা ট্রলিটা ফেলে দিয়ে ছুটে গেছিলো সেইদিকে, এক টানে টেনে নিয়েছিল ঋষিতাকে নিজের বুকের কাছে। 


অনিকেত এই ঘটনাটা চোখের সামনে দেখার পর স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্য ওর পায়ের তলার মাটি সরে গেছিল। এই ছোট্ট মেয়েটার কিছু হলে ওও আর বাঁচবে না। মোহনা ওকে ছেড়ে চলে যাবার পরে তো ওই পরীটাকেই তো আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। প্রতিটা মুহুর্ত ওও জীবনের সাথে লড়াই করছে ওর মেয়ের জন্য। ওর দিকে গাড়িটা ছুটে আসছিল দেখে অনিকেতের বুকের বাঁদিকটা ঠান্ডা হয়ে গেছিল।


সব কিছু প্রোসেস করার পর সে ছুটে যায় তার মেয়ের দিকে। 



****************


“তুমি কিন্তু খুব দুষ্টু এই ভাবে কেউ দৌড়ায়। পরে গেলে কি হতো। 

“আমি তো স্ট্রঙ্গ ,পাপা বলে আমি খুব স্ট্রঙ্গ।”


“এইভাবে দৌড়াচ্ছো কেন”। 


“ওই বেলুন নেবো।”

“ঠিক আছে আমি তোমাকে বেলুন কিনে দেব,তার আগে বলো তোমার নাম কি,আর তোমার মা,বাবা কোথায়”। 


আমার নাম ঋষিতা সেনগুপ্ত।আমার তো মা নেই,পাপা বলে আমার মা ওই আকাশে থাকে তারাদের সঙ্গে। 


বাচ্ছা মেয়েটি আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে। 

দেবদত্তা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আর কিছু বলে না। 


“হুম তোমার পাপা কোথায়”। 


পাপা তো ওইতো। 


এতক্ষনে অনিকেত ও এগিয়ে এসেছে ঋষিতার কাছে। 


ঋষিতার দিকে মুখ করে বসে ছিল দেবদত্তা। একটা উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে উঠে দাড়ালো,কন্ঠস্বর লক্ষ্য করে পিছন ফিরে তাকাতেই দেবদত্তার পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল। 



অনিকেত দা এখানে,তারপর হঠাৎ করেই কিছু একটা মনে পরতে দেবদত্তা ঋষিতার দিকে তাকালো। 

“ঋষিতার পাপা মানে ঋষিতা অনিকেত দার মেয়ে”।


অনিকেত ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে,তারপর ওর সারা গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে  

“সোনা মা তোর কিছু হয়নি তো তুই ঠিক আছিস তো।”


“না পাপা আমার কিচ্ছু হয়নি,ওই আন্টিটা খুব ভালো। 

আমাকে বলছে বেলুন কিনে দেবে”। 


অনিকেতের মাথার ঠিক নেই সে এবার অধৈর্য হয়ে মেয়েকে ধমকালো। 


,সবসময় তোর খালি এটা চাই ওটা চাই। সবসময় বায়না তোর”। 


বাবার বকুনি শুনে ছোট্ট ঋষিতা ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো। 


দেবদত্তা এতক্ষণ পুরো ঘটনাটাই পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ঋষিতাকে কাঁদতে দেখে ও এগিয়ে গিয়ে ঋষিতাকে কোলে তুলে নিয়ে ভোলাতে লাগলো। 


ঋষিতা দেবদত্তার কোলে উঠে গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা দিয়ে কেঁদে চলেছে। 


অনিকেত এবার উঠে দাঁড়ালো এই সবের মধ্যে অনিকেত ভুলেই গেছিল দেবদত্তার কথা। সে সামনে তাকাতেই অবাক হয়। অস্পুটে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে “দেবদত্তা”। 


“কেমন আছো অনিকেত দা”ঋষিতাকে কোলে নিয়েই দেবদত্তা এগিয়ে এলো অনিকেতের দিকে। 


“আমি ভালো আছি তুই কেমন আছিস, কতদিন পর দেখা হল”। 


আমি ভালো আছি, আসলে অনেক বছর কলকাতায় ছিলাম না তো তাই দেখা হয়নি। 

“হুম শুনে ছিলাম একবার তোদের পুরো ফ্যামিলি ব্যাঙ্গালোরে সিফ্ট করেছে।”


ঋষিতা এতক্ষণে কান্না থামিয়ে ওদের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনছে। ওও বুঝতে পেরেছে ওর পাপা এই আন্টিকে চেনে। 


“তো বাড়ির সবাই কেমন আছে অনিকেত দা। আঙ্কেল,আন্টি ভালো আছে তো”। 


“হুম ভালো আছে রে।” 


“বাহ্ তাহলে ভালো”। 


“মামমাম চলো বাড়ি যেতে হবে তো। অনেক দেরি হয়ে গেছে সোনা”। অনিকেত হাত বাড়িয়ে দেবদত্তার কোল থেকে ঋষিতাকে নিতে যায়। ঋষিতা দেবদত্তার গলা জড়িয়ে বলে “না তুমি বকবে আমাকে আমি যাব না”। 


দেবদত্তা বুঝতে পারলো ঋষিতা রাগ করেছে ওর বাবার উপর “ঋষিতা এমন বলতে নেই সোনা যাও বাবার কাছে যাও”। 


“না পাপা আমাকে বকবে আমি যাবনা”। 


“আচ্ছা পাপা যদি তোমাকে বকে তাহলে আমি পাপাকে বকে দেব ঠিক আছে।”


সত্যি পাপা আমাকে বকলে তুমি পাপা কে বকে দেবে।”


“হ্যা বকে দেব তো খুব বকে দেব”। ঋষিতা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। 


অনিকেত হাত বাড়াতেই ঋষিতা অনিকেতের কোলে চলে যায়।

“ওও আন্টি আমাকে বেলুন কিনে দেবে না?” 

কথাটা বলেই ঋষিতা মুখে হাত চাপা দেয়। এটা দেখে অনিকেত আর দেবদত্তা দুজনেই হেসে ওঠে। 


“আচ্ছা তুমি এখানে দাড়াও আমি বেলুন নিয়ে আসছি”। 


ঋষিতাও আনন্দে বলে ওঠে

 “ইয়ে কি মজা”। 

 

দেবদত্তা এগিয়ে গেল ওই বেলুন ওয়ালার কাছে হাতে দুটো বেলুন নিয়ে ফিরে এলো।

“এই নাও তোমার বেলুন”।ঋষিতা বেলুন পেয়ে বেজায় খুশি। 

“অনিকেত দা আজ তাহলে আসি অন্যদিন আবার কথা হবে”। 

“মামমাম আন্টিকে Thank you বলে দাও”। 


thank you আন্টি। 

দেবদত্তা ঋষিতার গাল টিপে দেয়। 

“পাকা বুড়ি একটা”


দেবদত্তা চলে যাচ্ছিল অনিকেতের ডাক শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পরে। 


“দেবদত্তা”। 


“বলো অনিকেত দা,কিছু বলবে”। 


“একদিন বাড়িতে আসিস মাও খুব খুশি হবে তুই বাড়িতে এলে,আর কাকু কাকিমাকে নিয়ে আসিস”। 


দেবদত্তা মলিন হেসে অনিকেতের কথায় সম্মতি জানিয়ে ওখান থেকে চলে গেল। 


অনিকেত ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ,তারপর বাড়ির দিকে রওনা দিল। 



দেবদত্তা কোনো রকমে নিজের চোখের জল আটকে রেখেছিল। 

ট্যাক্সিতে উঠে বসতে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না, চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। 

আজ এত গুলো বছর পর এই মানুষটাকে চোখের সামনে দেখলো। 

দেবদত্তা শুনেছিল অনিকেত দা বিয়ে করেছে। সোসাল মিডিয়াতে বিয়ের ফটো দেখেছিল। কিন্তু বিয়েতে ওও আসেনি। ওই বা কি করে দেখতো ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য কারোর হতে দেখতে। 

না অনিকেত কোনোদিন দেবদত্তাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়নি। দেবদত্তাই অনিকেতকে নীরবে ভালোবেসেছে। 

অনিকেতের একটা বাচ্ছা আছে এটা দেবদত্তা জানতো না। 

অনিকেতের মা আর দেবদত্তার মা দুজনে ছোটওবেলার বন্ধু।দুজনেরই ইচ্ছা ছিল ওদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিতে, কিন্তু সেটা হয়নি। কলেজে পড়াকালীন অনিকেত মন দিয়ে বসলো ওরই কলেজের জুনিয়র মোহনা মুখার্জীকে। আর দেবদত্তার ছোটো থেকে অনিকেতের প্রতি ভালোলাগাটা ভালোবাসায় পরিনত হয়ে গেল সে দুর থেকেই নীরবে ভালোবাসলো অনিকেতকে। 


এইজন্যই বলে ভালোবাসতে গেলে একবুক কষ্ট নিয়ে ভালোবাসতে হবে।সেটা দুতরফা হোক বা এক তরফা। 


*************

“ঠাম্মি,দাদান কোথায় তোমরা আমি এসে গেছি”।  

সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন অজিতেশ বাবু তার ছোট্টো নাতনির ডাক শুনে চায়ের কাপটা সামনের টেবিলে রেখে দরজার দিকে তাকালেন। 


ঋষিতা ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়ল অজিতেশ বাবুর কোলে। নাতনিকে নিজের কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন “কি রে পাকা বুড়ি কেমন পার্কে ঘোরা হলো।”


“আমাকে সবাই পাকা বুড়ি বলে আমি কারও সাথে কথা বলব না”। 


“এই কে আমার সোনাকে পাকা বুড়ি বলছে হ্যাঁ” কথাটা বলতে বলতে অনুরাধা দেবী বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। 


“এইতো ঠাম্মি, দাদান বলে আমাকে আজকে তো আবার ওই আন্টিটাও বলেছে আমাকে পাকা বুড়ি”


“আন্টি”। 


“হ্যা তো আমাকে বেলুন কিনে দিল,খুব ভালো আন্টিটা, কিন্তু আমাকে পাকা বুড়ি বলল”। ছোট্টো ঋষিতা হাত গুলো বুকের কাছে ভাঁজ করে মুখ ফুলিয়ে শেষের কথাটা বলল। 

এতক্ষণে অনিকেত এসে দাড়িয়েছে ওদের ড্রইংরুমে। 


অনুরাধা দেবী এবার অনিকেতের দিকে তাকিয়ে বলে “কি ব্যাপার বাবান সোনামা কি বলছে”। 


“আর বলো না” এর পর অনিকেত সব খুলে বলে ঠিক কি কি ঘটেছিল। সবটা শোনার পর অজিতেশ বাবু এগিয়ে এসে নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন। সবটা শুনতে শুনতে ওনার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছিল। 


“ভাগ্গিস দেবদত্তা ছিল না হলে কি সর্বনাশটাই না হতো আমার তো ভেবেই আমার হাত পা কাঁপছে”। 


পাশ থেকে অজিতেশ বাবু বলে উঠলেন “দেবদত্তার সাথে যখন দেখা হলো তুই ওকে বাড়িতে আনতে পারলি না কতদিন মেয়েটাকে দেখিনি। 


“বলেছি ওকে বাড়িতে আসতে। আর তোমার কাছে তো ফোন নাম্বার আছে ফোন্ করে নিও।”কথাটা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল অনিকেত। 


আজ বহু বছর পর এই বাড়িতে পা রাখলো দেবদত্তা। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িটা জুড়ে ,ওর আর অনিকেতের স্মৃতি । বাবা যখন বলল এই বাড়িটা বিক্রি করে দেবে তখন ও আপত্তি করেছিল। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখের কোণটা ভিজে গেছে খেয়াল করেনি,এই বাড়ির কেয়ার টেকার মদনের ডাকে দেবদত্তার চমক ভাঙলো। 


দিদিমণি তোমার ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি তুমি ওপরে যাও আমি রান্না করে তোমাকে ডাকবো। 


“মদন কাকা আজ আর রান্না করতে হবে না ,শরীরটা ভালো লাগছে না,আমি কিছু খাব না ”। কথাটা বলে দেবদত্তা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। 


ঘরে এসে দেবদত্তা ফ্রেস হয়ে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিল। ফোনের কর্কশ আওয়াজে চমকে উঠলো দেবদত্তা,ফোনের ওপরে নামটা দেখেই দেবদত্তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো,ফোনটা রিসিভ করে সামনে ধরতেই ওপাস থেকে একটা একজন মধ্যবয়স্ক মহিলার মুখ ভেসে ওঠে। 


 “কি রে দেবু পৌছে একবারও ফোন করতে নেই,এখানে যে দুটো মানুষ আছে ভুলে গেছিস বল”। 


"মা আমি এই সবে ফ্রেস হয়ে এলাম,ফোন আমি করতাম,আচ্ছা ছাড়ো এসব কথা, কি করছ বলো তো,খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করছো তো,বাপি যেন ওষুধ গুলো ঠিক করে খায়। আমি নেই বলে আবার অনিয়ম করো না যেন”। 

“না রে মা কোনো অনিয়ম করব না” । 

ও পাস থেকে একটা পুরুষালি কন্ঠস্বর শুনতে পেল দেবদত্তা। 

“বাপি ওষুধ গুলো ঠিকমতো খাচ্ছো তো”। 


“হ্যাঁ রে মা সব খাচ্ছি,তুই কিন্তু সাবধানে থাকবি আর কিছু দরকার হলে মদনকে বলবি ঠিক আছে”। 


“ঠিক আছে। তাহলে রাখি আমি।” 


“এই এই আমাকে ফোনটা দাও দেখি,”

দেবযানী দেবী দীনোলাল বাবুর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেন। ওদের এই কান্ড দেখে দেবদত্তার হাসি পায়। 

“বলুন মাতা রানি কি বলবেন”

দেবদত্তা মজা করেই কথাটা বলল মাকে। 


“হ্যা রে তোর সাথে অনিকেতের নাকি দেখা হয়েছে।”


“তুমি কি করে জানলে”দেবদত্তা একটু অবাক হয়। 


“অনুরাধা ফোন করেছিল বলছিল তুই নাকি অনিকেতের মেয়েকে একটা বড়ো এক্সিডেন্ট থেকে বাঁচিয়েছিস”।

 

“হ্যাঁ ওই আরকি”। 


“ব্যাপার কি বলতো অনিকেতের কথা শুনে তোর মুখটা ওই রকম ছোটো হয়ে গেল কেন”। 


“কই না তো,উফ্ তুমিও না,”


“আচ্ছা পারলে একবার অনিকেতের বাড়িতে ঘুরে আসিস,অনুরাধা অনেক করে বলল আমাকে।”


দেবদত্তা মনে মনে ভাবলো,

 “আমি ওই মানুষটার মুখোমুখি হতে চাই না,অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলেছি আর র্দুবল করে দিও না মা।”

আর মুখে বলল 


“আচ্ছা দেখবো সময় হলে যাবো”। 


“ঠিক আছে রাখছি হ্যাঁ, তুই রেস্ট নে”। 

ফোন রেখে দিয়ে চোখ বুঝলো দেবদত্তা,শরীরের ক্লান্তি আর মনের ক্লান্তি দুটোটেই বিধস্ত দেবদত্তা। চোখ বোজার সাথে সাথে ঘুম নেমে এলো। 



ঘড়ির কাটা সাড়ে বারোটা ছুঁই ছুঁই কিন্তু অনিকেতের চোখে ঘুম নেই। আজ বড্ড অস্থির লাগছে। ঘরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট শেষ করছে। একবার ঘরের ভিতর তাকিয়ে দেখলো ঋষিতা ঘুমোচ্চ্ছে। 


“দেবদত্তার ওই চোখটা কেন আমি ভুলতে পারছি না,ওই হাসিটা কেন আমাকে বলছে মেয়েটা ভালো নেই। না না আমারই মনের ভুল হবে হয়তো। কিন্তু আমার কেন এত অস্তির লাগছে। কেন মনে হচ্ছে দেবদত্তা আমাকে কিছু বলতে চায়”। 

হাতের সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুজে ঘরের ভিতর ঢুকলো। মেয়ের গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে এসির টেম্পারেচারটা এডজাস্ট করে মেয়ের পাশে আধ শোয়া ভাবে শুয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। 


************


সকালের নরম আলো জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে দেবদত্তার মুখে পরতেই চোখ কুঁচকে গেল,হাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ তারপর হাত সরাতেই আবার সূর্যের আলো দেবদত্তার মুখে এসে পড়ে, মুখে বিরক্তি নিয়ে উঠে বসলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘড়িতে ৭:১০ বাজে। 

বিছানা থেকে নেমে জানালার পর্দা গুলো সরিয়ে দিল,জানালার পাশেই একটা কাঠগোলাপ গাছ আছে তারই একটা ডালে দুটো শালিক পাখি বসে আছে।নিজেদের মধ্যে কত কথা বলতে ব্যাস্ত তারা। হয়তো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে অথবা একটা বাসা বাঁধার জোগাড় করছে তারা। হয়তো ওদের ভালোবাসা পরিনতি পেয়েছে তাই হয়তো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে। ওদের দেখে নিজের মনেই হেসে ওঠে দেবদত্তা। 


ফ্রেস হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেবদত্তার ফোন বেজে উঠলো। ফোনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ,


“আননোন নাম্বারে এত সকালেকে কে ফোন করছে!”

 ফোনটা কেটে যাবার আগে ফোনটা রিসিভ করল দেবদত্তা। 

“হ্যালো কে বলছেন”। 


“আমি অনিকেত বলছি”। 


নামটা শোনার সাথে সাথে বুকের হার্টবিট বেড়ে গেল মনে হল মিস করল একবার। বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

দেবদত্তার কোনো সাড়া না পেয়ে অনিকেত আবার বলল 

“দেবু শুনতে পাচ্ছিস”। 

“হ হ্যা বলো”। 

“বিকালে একবার বাড়িতে আসবি মা ডেকেছে”। 


“আমাকে কেন কি দরকার ফোনে বলো না”। 


“তোর কি বাড়িতে আসতে অসুবিধা আছে”,

আগেও তো তুই বহুবার আমাদের বাড়িতে এসেছিস,আজ আসতে কি অসুবিধা”?


দেবদত্তা মনে মনে ভাবে

 “আগের ব্যাপারটা আলাদা ছিল তখন অনুভুতি আলাদা ছিল আর এখনের অনুভূতি আলাদা” 

আর মুখে বলে 

“না অসুবিধা কেন হবে,আচ্ছা আমি যাব”। 


“ঠিক আছে মাকে বলে দিচ্ছি আমি” 

ওপাশ থেকে ফোন কেটে যায় দেবদত্তা তখনও ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে


সেনগুপ্ত ভিলা

 

দেবদত্তা প্রায় ১০ মিনিট ধরে অনিকেতের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একবার করে কলিংবেলে হাত দিচ্ছে আর নামিয়ে নিচ্ছে। মনের মধ্যে সাহস এনে বেলটা টিপতে যাবে এমন সময় ওর ঘাড়ের কাছে যেন কারোর গরম নিশ্বাস পড়লো,যেন কেউ এসে ওর পিছনে দাঁড়িয়েছে। দেবদত্তা পিছন ফিরতেই সেই আগন্তুকের সাথে ধাক্কা খায়,দেবদত্তা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল তার আগেই সেই আগন্তুক দেবদত্তাকে ধরে নেয়। 


অনিকেত বাড়ির মেন গেট থেকেই দেবদত্তাকে দেখতে পেয়েছিল,ওও গাড়ি র্পাক করে দেবদত্তার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে দেবদত্তাকে ডাকতে যাবে এমন সময় দেবদত্তা নিজেই পিছন ফেরে,আর অনিকেতের সাথে ধাক্কা লাগে। অনিকেত ধরে নেয় দেবদত্তাকে। 


অবাক,বিস্ময়,ভয়,সমস্ত অনুভূতিকে একত্র করে দেবদত্তা চোখ দুটো বড় বড় করে অনিকেতের দিকে তাকিয়ে আছে। অনিকেতও দেবদত্তার চোখের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে। অনিকেতের গরম নিশ্বাস দেবদত্তার মুখে পড়ছে। 

“অ অনিকেত দা ছাড়ো”। 

“ ছেড়ে দিলে পড়ে যাবি, আগে সোজা হয়ে দাড়া”

দেবদত্তা সোজা হয়ে দাঁড়ায় নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে নিয়ে বলে

 “স সরি”। 


অনিকেত নিজের কোর্টটা ঠিক করে বলে

 “দেখে চলবি তো পড়ে যেতিস তো,চল ভিতরে”। অনিকেত কলিং বেল বাজালো,সাথে সাথে ওই বাড়ির মিনতি দি দরজা খুলে দিল। 


দেবদত্তা লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না সে কোনো রকমে সম্মতি জানিয়ে ভিতরে ঢুকলো। 


“পাপা” 

ঋষিতা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল অনিকেতকে। অনিকেত মেয়েকে কোলে তুলে নিল। 


ঋষিতা কোলে উঠতেই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দেবদত্তাকে দেখতে পায়।

 “ওও পাপা আমাকে নামাও”। 

অনিকেত মেয়েকে নামিয়ে দিতেই সে ছুটে যায় দেবদত্তার দিকে, 

“ আন্টি..”। 


দেবদত্তা ঋষিতাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসে “কাকু,কাকিমাকে দেখছি না”। 


অনুরাধা দেবী কলিং বেলের আওয়াজ শুনে মিনতিকে পাঠিয়েছিল দরজা খোলার জন্য,এখন বাইরে কথার্বাতার আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলেন “হ্যাঁরে মিনু কে এসেছে”?


 সামনে তাকাতেই দেখে দেবদত্তা ঋষিতাকে কোলে নিয়ে অনিকেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। 

অনুরাধা দেবীর তো ইচ্ছা ছিল দেবদত্তাকে অনিকেতের বৌ করে বাড়িতে আনার কিন্তু সেটা তো আর হলো না। 


“দেবু কেমন আছিস মা”? 

দেবদত্তা ঋষিতাকে কোল থেকে নামিয়ে এগিয়ে গিয়ে অনুরাধা দেবীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। 


“থাক থাক মা আর প্রণাম করতে হবে না।” 


“কাকুকে দেখছি না”। 


“ওও একটু বেরিয়েছে চলে আসবে। তুই বস আজ তোর জন্য তোর পছন্দের খাবার বানিয়েছি”। 


কি ব্যাপার বাড়িতে নতুন অতিথির গলা পাচ্ছি। 

পিছন থেকে একটা পুরুষালি কন্ঠস্বর শুনে দেবদত্তা পিছন ফিরে তাকায়। 


“কাকু কেমন আছো”

“এতক্ষণ খুব খারাপ ছিলাম তোকে দেখে ভালো হয়ে গেলাম।”


দেবদত্তা অজিতেশ বাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। 

 

“দেবু আজকে ডিনারটা এখানে করবি,আমি কিন্তু রান্না করেছি তোর জন্য”। 


“আজ নয় কাকিমা অন্য দিন সিওর ডিনার করব”। 


"ও আন্টি আজ থাকো না গো আমাদের বাড়ি আমি ড্রইং করেছি তোমাকে দেখাবো। "

 দেবদত্তা ঋষিতার সামনে বসে পড়ে 

“আজ নয় সোনা অন্য দিন আবার আসবো দেখবো।”


কাঁদো কাঁদো গলায় ঋষিতা অনিকেতের কাছে গিয়ে বলল

 “ও পাপা আন্টিকে আমাদের বাড়িতে থাকতে বলো না গো,। 


"আচ্ছা আচ্ছা আন্টি থাকবে,আমি বলব থাকতে আর কাঁদতে হবে না। "


*********


সবার জোড়াজুড়িতে দেবদত্তাকে এখানে থাকতেই হলো। 

দেবদত্তার জন্য অনিকেতের ঘরের পাশের ঘরটাই খুলে দেওয়া হল। 

সবাই যে যার ঘরে চলে গেছে,দেবদত্তার ঘরের ব্যালকনি আর অনিকেতের ঘরের ব্যালকনি পুরো পাশাপাশি। দেবদত্তা ব্যালকনির দরজাটা খুলে বাইরে গেল। বাইরে ঝড় উঠেছে বৃষ্টি নামতে পারে,আকাশেও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাইরে যেমন ঝড় উঠেছে তেমন দেবদত্তার মনেও উথাল পাথাল শুরু হয়েছে। 

“একটু আগে ঋষিতা যেটা বলল সেটা ঠিক না,অনিকেত দা আমাকে ভুল বুঝতে পারে”। 


ঝিমঝিম করে বৃষ্টি এসেছে,বৃষ্টির জলের ফোঁটা দেবদত্তার চোখে মুখে এসে লাগছে। সে চোখ দুটো বন্ধ করে হাত দুটো মেলে দিলো,বৃষ্টির জল ওকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। দেবদত্তা খেয়ালই করল না যে পাশের ব্যালকনিতে একজন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।  


"দেবুর সাথে তো আমার ছোটো থেকে আলাপ তাহলে কাল দেখা হবার পর থেকে আমার এই রকম কেন হচ্ছে! কেন মনে হচ্ছে ওই চোখে জমে রয়েছে অনেক অভিমান। যেটা ও কাউকে দেখাতে চায় না। 


ও তো কলকাতায় একা থাকে। ও যদি আমাদের বাড়িতে থাকে তাহলে সোনা মা খুব খুশি হবে। কিন্তু ওও কেন এখানে থাকবে? সোনা তখন কি বলল “আচ্ছা ঠাম্মি আন্টি যদি আমার মা হয় তাহলে আন্টি আমাদের সাথে থাকতে পারবে বলো”?


“দেবুর সাথে কি একবার কথা বলব,না না নিজের স্বার্থের জন্য ওর জীবনটা নষ্ট করতে পারবো না,ওরও তো কাউকে ভালো লাগতে পারে,। 


অনিকেত নিঃশব্দে ব্যালকনি ত্যাগ করল। দেবদত্তা তখনও নিজেকে বৃষ্টিতে ভেজাতে ব্যাস্ত। 



সকালে সবাই ড্রইংরুমে বসে চা খাচ্ছে। অনুরাধা দেবী বলে উঠলেন

“দেবু এখনও নামলো না কি ব্যাপার,”


অনিকেত কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।


কিছুক্ষণ পরে দেবদত্তাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে অজিতেশ বাবু বলে উঠলেন 

“কি রে মা এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস,” 

"কাকু আমি বাড়ি ফিরবো” । 


"এত সকালে,দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে যাস।”

পাশ থেকে অনুরাধা দেবী বললেন। 


"না গো কাকিমা ঋষিতা উঠে গেলে আর আমাকে যেতে দেবে না।”


"আচ্ছা তাহলে ব্রেকফাস্টটা করে যা,খালি মুখে যাবি”। 


সবার জোড়াজুড়িতে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতে যাবে এমন সময় অনিকেতের ডাকে দাঁড়িয়ে পরে। 


“দাঁড়া দেবু”। 


"বলো। "


“আমি ড্রপ করে দিই”। 


“তার কোনো দরকার নেই অনিকেত দা আমি এখান থেকে বাড়ি যাব না আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা করার আছে ওইখানেই যাব”। 


“কোথায় যাবি বল আমি ড্রপ করে দিচ্ছি”। 


“আচ্ছা এত করে বলছ যখন তাই দাও”। 


"তুই দাঁড়া এখানে আমি গাড়িটা নিয়ে আসছি। "


"হুম। "


অনিকেত চলে গেল,কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিকেত ফিরে এলো। 

“উঠে আয়”

 গাড়ির ভিতর থেকে অনিকেত ডাকলো দেবদত্তাকে। দেবদত্তা উঠে বসতেই গাড়ি এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে। 


রাতে বৃষ্টির পরেও আকাশের মুখ ভার হয়ে আছে। আবার বৃষ্টি আসতে পারে,দেবদত্তা গাড়ির জানালার উপর দুটো হাত রেখে তার উপর মুখ রেখে একভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। দেবদত্তার খোলা চুল হওয়ার উড়ছে। অনিকেত একবার করে আঁড় চোখে দেখছে আর গাড়ি চালাচ্ছে। 


“কিরে বললি না তো কোথায় যাবি”। 


“শতদ্রুর সাথে দেখা করব কলেজ স্ট্রিটে আমাকে নামিয়ে দিও।”


“কে শতদ্রু”। 


অনিকেতের এই কথাতে,দেবদত্তা চোখ তুলে তাকালো। দেবদত্তার চোখ ছলছল করছে। 

“না মানে কৌতুহল বসত জিজ্ঞাসা করে ফেলেছি সরি”। 


দেবদত্তা বাইরের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো

 “শতদ্রু আমার ফিয়োন্সে”। 


“কি..” 

অনিকেত চিৎকার করে উঠলো। 


দেবদত্তা চমকে তাকালো অনিকেতের দিকে 

“কি হলো এই রকম চিৎকার করলে কেন”। 


“না মানে সরি”। 


আবার কিছুক্ষণ নিরবতা 

“ একটা কথা জিজ্ঞাসা করব তোকে? যদি কিছু মনে না করিস তো”। 


“বলো না”। 


“তুই কি এই বিয়েতে রাজি নোস”। 


“হঠাৎ এই প্রশ্ন করছো যে”।


"না এমনি জিজ্ঞাসা করলাম,মনে হল তাই”। 


দেবদত্তার এখন ইচ্ছা করছে চিৎকার করে বলতে “অনিকেত দা আমি তোমাকে ভালোবাসি,তোমাকে ছাড়া আর কাউকে আমার জীবনে কল্পনা করতে পারি না”। 

“কি বলতো যখন চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষটা অন্য কাউকে ভালোবেসে বিয়ে করে নেয় তখন আমিই বা কেন নিজের জীবনটা নষ্ট করব বলতো,। 

হ্যা মানুষটা আমাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি,কিন্তু আমি ভালোবেসেছি নীরবে,এই যেটাকে বলে একতরফা ভালোবাসা। জানি না এই মানুষটাকে ভালোবাসতে পারবো কিনা,তাও চেষ্টা তো করতে পারি,তাই না”। 


অনিকেত মন দিয়ে কথা গুলো শুনলো ওর কেন মনে হচ্ছে দেবদত্তা কথা গুলো ওকেই উদ্দেশ্যে করে বলছে। 


“তুই যাকে ভালোবাসতিস তাকে কেন বলিসনি যে তুই তাকে ভালোবাসিস”। 


( মুচকি হেসে) “বলার সময় পেলাম কই,কলকাতা ছেড়ে দেবার কয়েক বছর পরেই জানতে পারলাম সে বিয়ে করছে,আর যখন কলকাতায় ছিলাম তখন ভালোবাসা কি বুঝিনি, ভালো লাগতো এই টুকুই”। 


“ভালো লাগতো যখন তখনি বা কেন বলিসনি”?


“ভালো লাগা আর ভালোবাসার মধ্যে অনেক র্পাথক্য আছে, সবাইকে ভালো লাগতে পারে কিন্তু ভালোবাসাটা একজনের প্রতি আসে। আর সেটা বুঝতে সময় লাগে।”


অনিকেত কিছু বলল না চুপ করে রইল। 


“ব্যাস অনিকেতদা এখানেই নামিয়ে দাও, ওই যে শতদ্রু দাড়িয়ে আছে,”

অনিকেত লক্ষ করলো ওরই বয়সী হবে ছেলেটা,নেবি ব্লু রঙের র্শাট আর কালো জিন্স পরে আছে ছেলেটা। 


অনিকেত চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে দুরে দাড়িয়ে থাকা শতদ্রুকে দেখছে। 

"অনিকেত দা চলো তোমার সাথে শতদ্রুর আলাপ করিয়ে দিই”। 

অনিকেত মুখ না ঘুরিয়ে উত্তর দিলো 

“আজ না অন্য দিন আলাপ করবো”। 


“আচ্ছা,আজ আসি তাহলে পরে আবার দেখা হবে।”


“দেবু বাড়ি কখন ফিরবি”? 


“কেন বলতো”?। 


“বৃষ্টি আসতে পারে তাই জিজ্ঞাসা করছি”। 


“বিকালের মধ্যে চলে যাব”,

 দেবদত্তা এবার অনিকেতের দিকে চোখ সরু করে তাকালো

 “তুমি এত কথা কেন জিজ্ঞাসা করছো বলোতো”?


“না এমনি,সাবধানে বাড়ি ফিরিস”। 


“ আচ্ছা”।


দেবদত্তা রাস্তা ক্রস করে এগিয়ে গেল শতদ্রুর দিকে। অনিকেত দুর থেকেই লক্ষ করল দেবদত্তা চাইছে না জড়িয়ে ধরতে,কিন্তু ছেলেটা জোড় করেই দেবদত্তাকে জড়িয়ে ধরল। এটা দেখার সাথে সাথে অনিকেতের হাত মুঠো শক্ত হয়ে গেল।,জিম করা পেশি বহুল হাত গুলো ফুলে উঠলো সেটা জামার উপর দিয়েই দেখে বোঝা যাচ্ছে। গলার পেশি ফুলে উঠেছে,রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে।ওরা চলে যেতেই অনিকেত গাড়ি ঘোরালো, গন্তব্য অফিস। 



অফিসে আজ কোনো কাজে মন বসছে না বার বার ওই দৃশ্যটা চোখের ভেসে উঠছে আর, প্রতিবারই রাগ হচ্ছে,কেন হচ্ছে নিজেও জানে না। 

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে এর মধ্যে অনিকেত চারবার ফোন করে ফেলেছে দেবদত্তাকে। আর প্রতিবারই একই উত্তর এসেছে

 “আপ্ জিস ব্যাক্তি কো কল কার রাহে হো উসকা ফোন আব সুইচড ওফ হে”। 

“ফোন সুইচ অফ করে করছেটা কি, একবার বাড়ি যাবো”। 

টেবিলের উপর থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। দ্রুত গাড়ি চালিয়ে দেবদত্তার বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো। দোতলা বাড়ির পুরোটাই আলো জ্বলছে খালি একটা ঘর ছাড়া। গাড়ি থেকে নেমে ছোটো লোহার গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকলো। 

কলিং বেল বাজানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। 

দেবদত্তা যখন দেড় বছরের তখন থেকেই মদন কাজ করছে এই বাড়িতে, সেই সুত্রে ও অনিকেতকেও চেনে। দরজা খুলেই মদন অবাক হয় অনিকেতকে দেখে, 

“অনি দাদাবাবু তুমি হঠাৎ এখানে,দিদিমণি তো কিছু বলল না তুমি আসবে”। 


“তোমার দিদিমণি জানে না আমি এখানে এসেছি, তোমার দিদিমণি কোথায়”? 


“দিদিমণি বলল শরীরটা ভালো না ঘরেই আছে, তুমি যাও আমি তোমার জন্য চা করে আনছি”। 


“না কাকা আমি আর চা খাব না , আমি তোমার দিদিমণির সাথে দেখা করতে এলাম”। 


“আচ্ছা তুমি তাহলে উপরে যাও”। 

অনিকেত কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলো। 

অনিকেত দেবদত্তার ঘর চেনে তাই কোনো অসুবিধা হলো না। 

দরজায় একবার টোকা মারতেই দরজা খুলে গেল, অনিকেত বুঝলো দরজা খোলাই ছিল। ঘর পুরো অন্ধকার খুব সাবধানে ঘরে ঢুকলো। 

“এই মেয়েটা কি করে, ঘরটা কিরকম অন্ধকার করে রেখেছে,”। 

ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে সুইচ র্বোড খুজে ঘরের আলো জ্বালালো। 

ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকালো অনিকেত দেবদত্তা ঘুমোচ্ছে

 “এই সময় দেবু ঘুমোচ্ছে”! 

অনিকেতের কি মনে হতে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে,গায়ে চাদর চাপা দিয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে,দেবদত্তার মুখের দিকে তাকাতেই অবাক হয় অনিকেত। 


মেয়েটার মুখটা একদম ফ্যাকাশে লাগছে…..গালে জলের দাগ! তাহলে কি মেয়েটা কান্নাকাটি করেছে?কৌতূহল বসত দেবদত্তা্র গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলো অনিকেত । ততক্ষণাৎ কপালে হাত দিলো!!


"এত জ্বর মেয়েটার! এখন কি করব?"


থার্মোমিটার আনার জন্য অনিকেত উঠতে যাবে তার আগেই অনিকেতের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল দেবদত্তা। এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে অনিকেত হাত ছাড়িয়ে উঠতে পারছে না। 

“দেবু তোর জ্বর এসেছে,”। 

অনিকেতের গলা পেয়ে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল দেবদত্তা। 

“আমাকে ছেড়ে যেও না অনিকেত দা,সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়,তুমি যেও না,আমি অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবো না,আমার খুব কষ্ট হচ্ছে অনিকেত দা”। 


দেবদত্তার এই কথা শুনে ধক্ করে উঠলো অনিকেতের বুক। এবার সে নিজে জড়িয়ে ধরল দেবদত্তাকে,মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল। 

“আমি কোথাও যায়নি এখানেই আছি”। 

দেবদত্তা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অনিকেতকে। 


অনিকেত যা হোক করে দেবদত্তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে র্থামোমিটার নিয়ে আসে……জ্বর একশো তিন । এইরকম সময়ে অনিকেত কি করবে ভেবে পায় না। বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে,এই সময় কোনো ডক্টরও আসবে না। দেবদত্তার ঘর থেকে একটা মেডিকেল বক্স খুঁজে পায়, সাময়িক কিছু ওষুধ আছে। কিন্তু দেবদত্তার যেরকম বেহুশ অবস্থা তাতে ওষুধ খাওয়াবে কি করে? আর খালি পেটে ওষুধ খেলে বিপদ হবে ,দুপুরে কিছু খেয়েছে কিনা তাও অনিকেতের জানা নেই…..ওকে কিছু একটা খাওয়াতে হবে। 


নিচে এসে মদনকে ডাকলো অনিকেত। 


“কাকা একটা সাহায্য করবে”?

“বলো না দাদাবাবু”। 


“একটু সুপ করে দেবে? তোমার দিদিমণির জ্বর এসেছে ওষুধ খাওয়াতে হবে, তার আগে কিছু খাওয়াতে হবে”। 


“আচ্ছা দাদাবাবু এক্ষুনি দিচ্ছি”। 


কিছুক্ষণের মধ্যেই মদন সুপ নিয়ে এলো

 “এই নাও দাদাবাবু”।

“হুম রাখো ওই টেবিলে”। 


“কোনো দরকার লাগলে আমাকে ডেকো দাদাবাবু আমি নিচেই আছি”। 


দেবদত্তা ততক্ষণে নিজেকে আরো ভালো ভাবে চাদরের মধ্যে মুড়িয়ে নিয়েছে। অনিকেতের ডাকে দেবদত্তা অস্ফুট স্বরে বলল

 “আমাকে ঘুমাতে দাও ভালো লাগছে না”। 


অনিকেত এবার জোর করে দেবদত্তার মুখের উপর থেকে চাদরটা সরিয়ে দিলো। এক হাতে দেবদত্তার মুখটা তুলে ধরল…..জ্বর মনে হয় বেড়েছে। গা আগের থেকে গরম হয়েছে,অনিকেত আর সময় নষ্ট করে না….এক হাতে দেবদত্তাকে জড়িয়ে ধরে চামচ দিয়ে সুপ খাওয়াতে থাকে। দেবদত্তা খাবে না বলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে, অনিকেত ধমক দিয়ে খাওয়ায়। দু -তিন চামচ খাওয়ার পর দেবদত্তা বাচ্ছাদের মতো কেঁদে ফেলে। 


এমনিতেও জ্বরের সময় খাওয়ার রুচি থাকে না তাই আর জোড় করলো না অনিকেত। জ্বরের ওষুধ গুলো খাইয়ে আবারো শুইয়ে দিলো দেবদত্তাকে। চাদরটা ভালো করে দেবদত্তার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে নিচে আসে। 

“কাকা একটা বাটি করে জল আর একটা পরিষ্কার কাপড় দাও তো”

“দিচ্ছি দাদাবাবু”। 


মদন রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যায় অনিকেত পকেট থেকে ফোন বার করে বাড়িতে ফোন করে। 


“হ্যালো মা”। 

“কি রে অনি কোথায় তুই ?বাইরে তো বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বাড়ি আসবি কখন”?

মা আজ রাতে হয়তো আর ফিরতে পারবো না তুমি মামমামকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও”। 


“কিছু হয়েছে তুই তো কোনোদিন রাতে বাড়ির বাইরে থাকিস না, আর তোর গলাটা এমন কেন শোনাচ্ছ”?


তারপর অনিকেত সবটা খুলে বলে 

“শোন না বাবু কাল সকালে তুই ওকে বাড়িতে নিয়ে আসিস,মেয়েটা ওখানে একা থাকে কি করে না করে কিছুই জানতে পারি না, যতদিন না দেবযানী আর দীনোলাল দা কলকাতায় আসছেন ততদিন দেবু আমাদের বাড়ি থাকবে”


“আচ্ছা”


“সাবধানে থাকিস আর কোনো অসুবিধা হলে ফোন করিস,রাখছি আমি”। 

এর মধ্যে মদনও এসে দাঁড়িয়েছে অনিকেতের পিছনে…. 

“ দাদাবাবু জল আর এই কাপড়”। 


“হুম দাও আমাকে”। 


অনিকেত জল আর কাপড় নিয়ে উপরে এলো। বিছানায় দেবদত্তার মাথার কাছে বসে জল পট্টি দিতে শুরু করল। জ্বরের জন্য দেবদত্তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। এই ভাবেই ঘন্টা দুয়েক কেটে যায়। এর মধ্যে দেবদত্তার জ্বরটা খানিকটা কমেছে। অনিকেত ঢুলতে শুরু করেছে দেবদত্তার মাথার কাছে বসেই। খাটের হেডর্বোডে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। দেবদত্তা অনিকেতের আরো গা ঘেঁষে শুয়ে অনিকেতের কোমড় জড়িয়ে ধরল। দেবদত্তার এই স্পর্শে অনিকেত শিহরিত হলো, বাঁধা দিতে গিয়েও দিতে পারলো না। একসময় ঘুম নেমে এলো দুচোখে। 


সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই….. রাতে মুষল ধারে বৃষ্টি হলেও সকালে আকাশ পুরো পরিষ্কার। জানালা দিয়ে র্সূযের আলো অনেকক্ষণ ধরে দেবদত্তার মুখের উপর পড়েছে….কোনোরকমে চোখ দুটোর জোড় খোলার চেষ্টা করল দেবদত্তা,চোখ দুটো জ্বালা করছে। মুখটাও তেতো হয়ে আছে, সাথে মাথাও ভারী হয়ে আছে। মুখের উপর কারোর গরম নিশ্বাস পড়তেই চোখ তুলে তাকালো দেবদত্তা, সাথে সাথে চমকে উঠলো। অনিকেত এখানে, তাও ওর এত কাছে ওও কল্পনাও করেনি। অনিকেত কখন ঘুমের মধ্যে দেবদত্তার পাশে শুয়ে পড়েছে নিজেরো মনে নেই। 


দেবদত্তা এবার মাথাটা দু হাত দিয়ে চেপে ধরে……তখনই মনে পড়ে শতদ্রুর সাথে দেখা করার পর থেকেই ওর শরীরটা খারাপ করে,মাথা যন্ত্রনা করছিল খুব, কোনো রকমে ক্যাব বুক করে বাড়ি ফিরে ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল সে। 

বিছানায় উঠে বসে দেখে অনিকেত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তারপর বেডসাইড টেবিলে জলের বাটি আর কাপড় দেখে সবটা আস্তে আস্তে মনে পড়ে। 


দেবদত্তা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতেই বুঝতে পারে ওর শরীরটা অনেকটা হালকা লাগছে। কোনোরকমে টলতে টলতে নীচে নেমে আসে, 

“কাকা একটু চা করে দাও না”

মদনের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে দেবদত্তা বাগানের দিকে যায়। সেখানে মদন গাছে জল দিচ্ছিল 

“ও কাকা”। 


“আরে দিদিমণি শরীর কেমন আছে”? 


“হুম মাথা খুব ভারী হয়ে আছে একটু কড়া করে চা করে দেবে।”


“হ্যাঁ দিদিমণি এখুনি দিচ্ছি, তুমি ঘরে গিয়ে বসো আমি চা করে নিয়ে যাচ্ছি। 

মদন চলে যাচ্ছিল দেবদত্তা পিছনে ডাকলো। 

“কাকা”

“বলো দিদিমণি”। 

“অনিকেত দা কখন এসেছে গো”?

“কাল রাতে দিদিমণি”। 


কখন যে অনিকেত উঠে এসে দেবদত্তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি

 “এখানে কি করছিস তুই”?

অনিকেতের গলা পেয়ে দেবদত্তা চমকে ওঠে পিছন ফিরে অনিকেতের দিকে তাকাতেই দেবদত্তা শুকনো ঢোক গিলে নিয়ে 

“ইয়ে মানে একটু চায়ের কথা বলতে এসেছিলাম”। 


অনিকেতের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেবদত্তার উপর স্থির…দেবদত্তা মাথা নিচু করেই সেটা বুঝতে পারছে। 

“ব্যাগ গুছিয়ে নে আমাদের বাড়ি যাবি ”। 

“কেন”?

“কারণ না হয় পরে বলব যা ব্যাগ গুছিয়ে নে”। 

“কিন্তু”। 


“একটা কথা আমি দ্বিতীয় বার বলতে ভালোবাসি না দেবু”। 

অনিকেতের ধমকে দেবদত্তা কেঁপে ওঠে…আর কোনো কথা না বলে সোজা নিজের ঘরে চলে যায়। 


********

 এক মাস হলো দেবদত্তা অনিকেতের বাড়িতে আছে।এই এক সপ্তাহে অনিকেতের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করছে দেবদত্তা। 

ওও কি করছে,কোথায় যাচ্ছে কি খাচ্ছে সব কিছুর খোঁজ নিচ্ছে, অফিসে গেলে সারাদিনে কম পক্ষে ছয় থেকে সাত বার ফোন করে,এত বার তো ওর বাবা মাও ফোন করে না। আর শতদ্রুর কথা শুনলেই অনিকেত রিয়াক্ট করে, কেন যাবে ওও শতদ্রুর সাথে দেখা করতে? দেবদত্তা যতবার বলে শতদ্রু ওর ফিয়োন্সে ততবারই ওও চুপ করে যায়,এর কারণ দেবদত্তা নিজেও জানে না।



দেবদত্তা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই অনিকেত রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরে,অনিকেতের কাছে একস্ট্রা চাবি থাকে তাই আর বেল বাজায় না নিজেই দরজা খুলে ভিতরে আসে আর দেবদত্তাকে ডিনার টেবিলে ঘুমন্ত অবস্থায় পায়, তখনই অনিকেতের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায় এটা ভেবে, দেবদত্তা না খেয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। 

আজ অনিকেত নিজে দরজা খোলার মতো অবস্থায় নেই সে বেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেবদত্তা ঘুম খুব পাতলা ,কলিং বেলের আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে যায়,ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১:৩০ বাজে, মনে মনে ভাবে

 “এতো রাত তো কোনোদিন করে না”। 


দেবদত্তা দরজা খুলে দিতেই অনিকেত ভিতরে ঢুকল। 

“তুই খেয়ে নে আমি খেয়ে এসেছি”। 

অনিকেতের কথায় দেবদত্তা অবাক হয় ওও অনুরাধা দেবীর কাছ থেকে শুনেছে অনিকেত কোনোদিন বাইরে ডিনার করে না। তাহলে আজ কি হলো?

দেবদত্তা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অনিকেতের দিকে। 


অনিকেত গিয়ে সোফায় বসল। দেবদত্তা চলেই যাচ্ছিল, দাঁড়িয়ে যায় অনিকেতের কথায়, 

“দাঁড়া..,তুই খাবি না”?

দেবদত্তা বেশ রাগ হচ্ছিল 


“আমি খেয়েছি কি খাইনি সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না, মামমাম ঘুমোচ্ছে উপরে যাও ফ্রেস হয়ে …..। 


কথাটা শেষ হবার আগেই দেবদত্তা নিজের হাতে একটা টান অনুভব করলো,অনিকেত এক ঝটকায় নিজের বুকের উপরে নিয়ে এসে ফেলল দেবদত্তাকে। 

দেবদত্তা অবাক চোখে তাকাতেই অনিকেতের শীতল দৃষ্টি ওর মনে শিহরণ জাগালো । কোমরে চাপ অনুভব করল দেবদত্তা। অনিকেত গম্ভীর কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল 

“শতদ্রুকে সত্যিই তুই ভালোবাসিস”? 


“অ অনিকেত দা ছা ছাড়ো”। 


“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে,”। 


দেবদত্তা এবার অনিকেতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় 

“ কেন এসব কথা জানতে চাইছো? আমি শতদ্রুকে ভালোবাসি কি বাসি না সেটা পুরোপুরি আমার ব্যাপার”


....কথা বলতে বলতে দেবদত্তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে….  

“তুমি শতদ্রুকে পছন্দ করো না সেটা তোমার ফল্ট। তুমিও তো মোহনাদিকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে, আমি কি জানতে চেয়েছি কেন তুমি বিয়ে করছো, যে মানুষগুলোকে আমি ভালোবেসেছি তারাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আমার কি মন বলে কিচ্ছু নেই? আমিও মানুষ অনিকেত দা,কষ্ট আমারও হয়েছিল যখন জানতে পেরেছিলাম তুমি বিয়ে করছো। খুব কষ্ট হয়েছিল…, নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যর হতে দেখতে কতটা কষ্ট হয় সেটা তুমি জানোনা” 


দেবদত্তা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পর। 


অনিকেত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেবদত্তার দিকে….মেয়েটা এত বছর ধরে ওকে নীরবে ভালোবেসেছে কোনোদিন প্রকাশ করেনি। সেদিন জ্বরের ঘোরে বলা কথাটা যে সত্যি সেটা অনিকেত নিশ্চিত হয়ে গেল। অনিকেত এগিয়ে গিয়ে দেবদত্তাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অনিকেত অনুভব করল বুকের কাছে জামাটা উষ্ণ তরলে ভিজছে। অনিকেত দেবদত্তার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল……


“শান্ত হ্। কাদিস না এমন ভাবে।”


দেবদত্তা কান্না জড়ানো গলায় বলল…..

“আমি আর পারছি না, আমি কি একটুও ভালোবাসা ডির্জাভ করি না বলো না অনিকেত দা? সবাই নিজের ভালোবাসার মানুষকে পায় আমি কেন পাই না বলো,একজনকেই তো ভালোবেসেছিলাম কিন্তু সে অন্য কাউকে ভালোবেসেছে।”


"তুইও তো শতদ্রুকে ভালোবাসিস, সেটা দেখে আমার কষ্ট হয় এটা তুই কেন বুঝিস না”। 


দেবদত্তা অবাক চোখে তাকালো। 


“ভালোবাসি তোকে, তুই পারবি তো শতদ্রুর সাথে জীবন কাটাতে”। 


“ভালোবাসি না আমি”। 

“কাকে আমাকে,নাকি শতদ্রুকে”। 

দেবদত্তা এবার বুঝতে পারলো অনিকেত ওর সাথে মজা করছে…… 


“ তোমাকে ভালোবাসি না আমি” । 

কথাটা বলে অনিকেতের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে গেলে আবার অনিকেত দেবদত্তাকে টেনে নিয়ে দেবদত্তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দেয়…… উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে শিহরিত হয়ে অনিকেতের কাঁধ খামচে ধরে। 


**********


"এবার মেয়েকে নিয়ে আসুন লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে যে। "


লাল বেনারসি পরিহিত দেবদত্তাকে অপূর্ব লাগছে। পিড়ি করে সাত পাক ঘুরে অনিকেতের সামনে এসে দাঁড়ায়। অনিকেত উদ্বিগ্ন হয়ে দেবদত্তার দিকে তাকিয়ে আছে।


 “এবার পান পাতাটা সরাও”। 

পুরোহিত মশাইয়ের কথায় দেবদত্তা পান পাতা সরিয়ে চোখ তুলে তাকালো অনিকেতের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলো দেবদত্তা। দেবদত্তার দিক থেকে অনিকেত চোখ ফেরাতেই পারছে না, কি মায়াবী লাগছে মুখটা। 

এই ভাবেই শুভ দৃষ্টি সম্পন্ন হলো ওদের। পরের সব রিচুয়ালস ভালো ভাবে মিটে গেল। 


সময় এলো সিদুঁর দানের, কুঙ্কে ভরা সিদুঁর পুরোহিত মশাই তুলে দিল অনিকেতের হাতে। অনিকেত কুঙ্কে ভরা সিদুঁর তুলে দিল দেবদত্তার সিঁথিতে। অনিকেতের নামের সিদুঁর দেবদত্তার সিঁথিতে,এই অনুভূতি একবারই হয়। আর দেবদত্তা চোখ বন্ধ করে সাদরে গ্ৰহণ করল জীবনের এই পরিবর্তনকে। পিছন থেকে লজ্জাবস্ত্র দিয়ে ঢেকে দিলো দেবদত্তার মাসতুতো বোন। কেউ লক্ষ্য করলো না কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরল দেবদত্তার চোখ থেকে, ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়ার ঠিক কতটা আনন্দ সেটা যে পায় সে ছাড়া কেউ জানে না। 



" উফ্ তোমরা সরো দেখি আমার পাপা আর মামমামের বিয়েটা দেখতেই পেলাম না.."

….ঋষিতা সবাইকে ঠেলে দিয়ে অনিকেত আর দেবদত্তার মাঝে এসে দাঁড়ালো। ওর কথা শুনে সবাই হোহো করে হেসে উঠলো।

 “এই তোমরা হাসছো কেন গো, আমি কি বললাম”। 


দেবদত্তা ঋষিতাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে বলল

 “ ঠিক তো তোমরা কেন হাসছো,”? 


“মামমাম তোমাকে কি সুন্দর লাগছে গো…..আজ থেকে তাহলে তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে তো”?


“হ্যাঁ সোনা আজ থেকে তোমার মামমাম আমাদের সাথে আমাদের বাড়িতে থাকবে।”

পাশ থেকে অনুরাধা দেবী বলে উঠলেন


"ইয়ে কি মজা মামমাম এবার থেকে আমাদের সাথে আমাদের বাড়িতে থাকবে। "


আবার সবাই হেসে ওঠে। 



               সমাপ্ত








Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract