Tathagata Banerjee

Horror

1.0  

Tathagata Banerjee

Horror

মুর্ছিত গোলাপ

মুর্ছিত গোলাপ

5 mins
1.5K


আমাদের জীবন, নানান ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চলে প্রতিনিয়ত। এমনি অনেক ঘটনার মাঝে, আজকের এই বিশেষ দিনে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগের কথা! তখন আমি কলেজ পাশ করে জীবন পরীক্ষার নাট্য মঞ্চে সবে সবে নাম লিখিয়েছি মাত্র। অর্থ সঞ্চয়ের আগ্রাসী খিদে নিবৃতির চেষ্টা, অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছি সরকারী - বেসরকারী কর্মস্থল গুলোতে। কিন্তু বিধি বাম! পড়াশুনায় অতি সাধারণ মানের ছেলে হওয়ায় এবং গোদের ওপর বিষ-ফোঁড়া আমার জেনারেল কাস্ট হওয়ায় "চাকরী" নামক বস্তুটা আমার কাছে আঙ্গুর ফল টক- এর মতই মনে হচ্ছিল সে সময়।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে, বেসরকারী সংস্থার নিতান্ত সামান্য কেরানি, আমার বাবা, ততদিনে রিটায়ার্ড পার্সন। প্রফিডেন্ড-ফাণ্ডের টাকা আর মায়ের গয়না বন্ধক দিয়ে; আমার কলেজ ও টিউশনের মাস মাইনের বেহিসেবি হিসেব, প্রায় প্রতি-নিয়তই উনি আউড়ে যেতেন দিনান্তে, অসফল - বেকার - বেরোজগেরে ছেলের কানে। আর সেই সাথে চলত, আমাকে নিয়ে মায়ের নানান নিরাশাজনিত স্বপ্নভঙ্গের ইতিবৃত্তি।

এরকমই চলছিল একরকম জীবন, আপন বেগে নিয়মের ফেরী-ঘাটে বাঁধা জোয়ার-ভাঁটায় ভর দিয়ে।

সেদিনটা ছিল শুক্র বার! জন্মদিন না হলেও জন্মবার তাই নানারকম বিধিনিষেধ ও মাতৃসুলভ সাবধান বাণী কর্ন-গোচর করে, অন্যান্য দিনের মত সকাল সকাল কয়েক গ্রাস আলু সেদ্ধ ভাত গলাদধকরন করে কপালে দইয়ের ফোঁটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম সেদিনের ভাগ্য অন্বেষণে। পার্ক স্ট্রিট অন্তর্গত দু-চারটি বেসরকারি কর্মস্থলে ইন্টারভিউ ছিল সেদিন। তার মধ্যে প্রথম দুটি ইন্টারভিউ লম্বা লাইন অতিক্রম করে, কিছুটা আশাব্যঞ্জক হওয়ায় মনটা ছিল কিছুটা ফুরফুরে। কেন জানিনা সেদিন আর ইচ্ছা করল না ইন্টারভিউ দিতে। তাই, শেষ শীতের - দুপুরের মিঠে রোদ গায়ে মেখে ক্লান্ত পায়ে নন্দনের ইতি উতি ঘুরে, উপস্থিত হলাম ময়দান চত্বরে। সবুজ ঘাসে ভরা ময়দান যেন ওই দুপুর রোদে স্নেহময়ী মায়ের মত তার সবুজ কোল পেতে বসে ছিল তার ক্লান্ত সন্তানদের কিছুটা শান্ত নিরিবিলিতে হালকা বিশ্রাম দেবার আশায়।

একটা মনমতো বট গাছের ঘন ছায়ার শূন্য তল বেছে নিয়ে, বসে পড়লাম সবুজ গালিচা সম ঘাসের ওপর। মন দিয়ে দেখতে থাকলাম অনতি দূরে কয়েকটা ছেলের ঘুড়ি ওড়ানো। আরো একটা জিনিষ চোখে পড়ায় বেশ অবাকই হলাম। দেখলাম একটু দূরে এক চা ওলা আমার দিকে কিছুটা সন্দেহ মাখানো চোখ মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। গলাটা শুকিয়ে এসেছিল তাই একরকম অনিচ্ছাকৃত ভাবেই তাকে ইশারায় ডাকলাম। সেও একটা পেন্নাম ঠুকে উঠে দাঁড়ালো আর আমার মনে হল যেন মনে মনে ইষ্ট দেবতার নাম নিতে নিতে উপস্থিত হল আমার সামনে। যাক গে! একটা চা নিয়ে পয়সা মিটিয়ে আবার ঘুড়িতে মনোনিবেশ করলাম। চা ওলাও অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে উশখুশ করছিল, কিছু বলতে চাইছিল বোধ হয়। কিন্তু আমি পাত্তা না দেওয়াতেই বোধ হয় কিছু না বলেই চলে গেল।

কখন যে চোখটা লেগে গেছিল, বুঝতেই পারিনি।

 

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং

রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।

পদ্মাসীনং সমন্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং বিশ্বাদ্যং

বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।

ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ

ওঁ।

 

ঘুম ভাঙল নারী কণ্ঠের শ্রুতিমধুর অনুচ্চ শিব ধ্যান স্তোত্র পাঠ ও ধুপ-ধুনার গন্ধে! গাঢ় অন্ধকার চারপাশ, কিছুই ঠাহর হয়না প্রায়। হাল্কা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সর্বত্র! খুব অবাক হয়ে কিছুক্ষন শুয়েই রইলাম, কোথায় গাছ, কোথায় ব্যস্ত শহর, কোথায় কি? আমি কোথায়?

হতবুদ্ধি আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা ভাঙাচোরা মন্দিরের সন্নিকটে। একি আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে উফঃ; একি অসহ্য যন্ত্রনা! পায় যেন কোন জোর নেই, অস্বাভাবিক ফুলে উঠেছে সেটা। শরীর যেন চলতে চায় না; গলা শুকিয়ে কাঠ, কোনোমতে কাদা-জল মাখা শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললাম মন্দির প্রাঙ্গণের দিকে। মন্দির প্রাঙ্গনে পৌঁছে যেটুকু বুদ্ধি ছিল তাও যেন লোপ পেল, দেখলাম মন্দির প্রাঙ্গনে শায়িত এক জোড়া শব আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা। শব দুটির চারপাশে অসংখ্য শুকনো গোলাপের ছড়াছড়ি। তবে, যে নারী কন্ঠ আমাকে সম্মোহিত করে টেনে এনেছে মন্দির চত্বরে, তার দেখা কোথাও পেলাম না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম মন্দির এর ভেতর চোখে পড়ল এক শিব লিঙ্গ আর তার সামনে প্রজ্জ্বলিত ধুপ-ধুনা ও অন্যান্য পূজা সামগ্রী যেন এখনি কেউ তা জ্বালিয়ে পুজো করছিল অভীষ্ট আশা পূরণের জন্য। কিন্তু আমার উপস্থিতি আর সেই রহস্যময়ী নারীর অনুপস্থিতী, সেই ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম।

হঠাৎই সামনে কোথাও বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো আর আমি ভয় বিহ্বল হয়ে চমকে উঠে, মন্দির থেকে বেরোতে গিয়ে, সজোরে কিছুতে আঘাত খেয়ে গড়িয়ে পড়লাম মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে। আর গিয়ে আছড়ে পড়লাম শব দুটোর ওপর! একটা তাৎক্ষণিক হাওয়ায় একটি শবের ওপর থেকে ঢাকা থাকা সাদা কাপড় সরে গেল। আর আমি বজ্রাহতর মত ছিটকে সরে গেলাম। দেখলাম শবটি একটি পুরুষের আর তার চেহারা-রঙ-রূপ একদম আমার মত হুবহু এক।

পেছনে দরাম করে ভাঙা মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল পরক্ষনেই, খলখলে হাসিতে কান মাথা ঝালাপালা হয়ে যেতে থাকল আমার, কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি ভয় বিহ্বল হয়ে পড়লাম। এবার দ্বিতীয় শবটিও যেন নড়ে উঠল, বিপদ যেন গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসতে থাকল আমার দিকে। শরীরটা মুন্ডুবিহীন, গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে! এক চুল ও নড়ার ক্ষমতা নেই আমার। বুঝতে পারছি জ্ঞান লোপ পাচ্ছে! সম্পূর্ণ জ্ঞান লোপ পাবার আগে দেখলাম মুন্ডুবিহীন লাশটা আমার বুকের ওপর চেপে বসেছে। কি বিকট লাশ পচা গন্ধ। অচেতন হয়ে পড়লাম।

কে? কারা যেন ডাকছে আমায়! অনেকগুল আলো আমায় ঘিরে। আমার অবচেতন মন সাড়া দিতে চাইলেও আমি পারছি না। খালি এটুকু বুঝতে পারছি, আমি কোন দোলায় চেপে চলেছি, আশেপাশে দুচার-জন মানুষ, হয়তো বা মহাপ্রস্থানের পথে নিয়ে চলেছে তারা আমায়, কি জানি। মা - বাবা কে কি আর তবে দেখতে পাবোনা কোনোদিন। হু হু করে উঠলো মন প্রাণ।


যখন চোখ মেলে তাকালাম!


তখন প্রথমেই চোখে পড়ল দুপুরের সেই চা ওয়ালা উদ্দিগ্ন মুখে আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে আর দেখলাম দুজন পুলিশ কর্মী ও গুটি কয়েক ফুটপাত-বাসী আমায় ঘিরে জটলা করছে। ধীরে ধীরে উঠে বসলাম এবার। চা ওয়ালা তখন বিস্তারিত জানাল, দুপুরে সে আমায় বলতে চেয়েছিল যে আমি যে গাছটির তলায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেখান থেকে যেন আমি উঠে যাই। গাছটির গায় কিছু বিষাক্ত লতা গুল্ম আছে যা মানুষকে সংজ্ঞাহীন করে দেয় ও সাময়িক ভাবে পক্ষাঘাতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় শরীর। কিন্তু আমি পাত্তা না দেওয়ায় সে বলতে পারেনি। আর ফিরতি পথে সে একবার আমার খোঁজে গাছটির কাছে এসে দেখতে পায় আমার অবচেতন শরীর। মুখ দিয়ে একটা গোঁ গোঁ শব্দ বেরছিল আমার। তখনি সে কিছু ফুটপাত বাসী আর পুলিশের সাহায্যে আমায় উদ্ধার করে।

অনেক ধন্যবাদান্তে, পুলিশের গাড়িতে অনেক রাতে বাড়ি ফিরে আমার বাবা-মায়ের সকল উদ্দিগ্ন অবসান করে যখন ঘরে ঢুকে জামা কাপড় ছাড়তে লাগলাম, কিছু একটা যেন পড়ল আমার পায়ের কাছে। কি পড়ল দেখতে গিয়ে চমকিত হলাম, একটা মুর্ছিত শুকনো গোলাপ। এ সেই গোলাপ যা আমি শব দুটির আশেপাশে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম!


Rate this content
Log in