Sumana Sinhababu

Abstract Inspirational


3.9  

Sumana Sinhababu

Abstract Inspirational


মৌমাছি আর প্রজাপতির গল্প

মৌমাছি আর প্রজাপতির গল্প

6 mins 494 6 mins 494

মেয়েগুলো আজকেও তার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে । মৌ আড়চোখে না তাকিয়েও বুঝতে পারল । কিছু বলল না । কোনদিনই কিছু বলে না । আসলে এই সময়টা তার এত তাড়া থাকে । পাঁচটা বাজতে আর ঠিক 30 মিনিট দেরি । পরের বাসটা না ধরলে আর পৌঁছানো যাবে না । আজকে না গেলে স্যার ট্রায়ালে যেতে দেবেন না । যদিও মেয়ের নিজের শক্তির ওপর কোনো সন্দেহ নেই , স্যারের ও নেই , তাও সত্যি, তবু আজ ফাইনাল প্র্যাকটিস করতে হবে ।

তাই আর ওদের দিকে মন না দিয়ে বাসটা আসতেই তাতে চেপে বসল মৌ । দু'ঘণ্টা পর যখন ক্লান্তিতে আর ঘামে ভিজে ক্রিকেট ক্লাব থেকে বেরোলো তখন শরীরে এনার্জি না থাকলেও মনে ভরপুর আনন্দ । স্যার ওর ব্যাটিং দেখে ওকে আশ্বাস দিয়েছেন কালকের ট্রায়ালে ওর সিলেকশন হবেই । এই ট্রায়াল টা পেরোতে পারলেই স্টেট ক্রিকেট। তারপর ন্যাশনাল তারপর ইন্টারন্যাশনাল তারপর আরো আরো অনেক দূরে ...সব স্বপ্ন গুলো সত্যি হবে মৌএর । গলায় সোনার পদক পড়ে দাঁড়িয়ে আছে সে কাপটা তার হাতের মুঠোয় ।

স্বপ্নের রাজপথ গুলোকে আপাতত বিদায় দিয়ে পাড়ার কানা গলিতে ঢুকে যায় মৌ । বাড়িতে দরজায় ধাক্কা দিতেই মা বেরিয়ে আসলো । মুখে চোখে একটা অপছন্দের ছাপ । নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে তার আবার ক্রিকেটের শখ কোন মা-বাবা ই বা হাসিমুখে মেনে নেবে । মায়ের মুখের অপছন্দের ছাপটা মৌ এর খুশি মনটাকে কেমন যেন রঙহীন করে দিল । ব্যাপারটা খুব একটা গা করল না মৌ । ও জানে শরীরের এনার্জি টা চলে গেছে এখন যদি মনের টাও চলে যায় তাহলে আর বাকি কাজগুলো করতে পারবেনা সে‌ । তাই তাড়াতাড়ি মুখ হাত ধুয়ে মায়ের অনাদরে , অযত্নেকরা রুটি তরকারি টা উদরস্থ করল। তারপরে বেরিয়ে পরলো বাড়ি থেকে । তিনটে বাড়ি পরে বাবলিদের বাড়ি । কাছে বলেই এত রাতে পড়াতে আসতে । আজ পড়াতে বসে দেখলো বাবলিদের ক্লাসে নতুন বই দিয়েছে । কভার টায় আঁকা একটা বড় রঙিন প্রজাপতি সুন্দর করে নেচে নেচে মধু খাচ্ছে । কেমন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ওর জীবনটাও যদি প্রজাপতির মতো হতো ! কি আনন্দ সারাদিন কোনো তাড়া নেই ব্যস্ততা নেই শুধু আনন্দে ঘুরে বেড়ানো । তার উপর প্রজাপতির এত রং এত সৌন্দর্য.... চমৎকার না !


বাবলিদের বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় সাড়ে নটা বেজে গেল । দরজা খুললো বাবা যথারীতি গম্ভীর মুখ । তাতে মৌ এর খুব একটা কিছু চিন্তা হয় না । রোজই গম্ভীর বাবার মুখ । ভাইকে দেখলাম টেবিলে বসে খাচ্ছে । হাতমুখ ধুয়ে সেও খেতে বসে গেল । সবার মুখ গম্ভীর কোন কথা নেই প্রথমে মায়ের শুরু করল - " হ্যাঁরে মৌ আর কতদিন এসব চালাবি ? "

"এসব মানে ? "

" মানে এই ওই খেলাধুলো। কলেজ টা না হয় থাকুক ওটা বন্ধ করতে বলছিনা । অনেক তো বড় হলি মা এরপর বন্ধ কর ওই ক্রিকেট । একে আমাদের টাকা কড়ি নেই । তারপর তোর গায়ের রংটা ও চাপা । বিয়ে তো করতে হবে তোকে ! "


"সেই জন্যই তো ক্রিকেটটা খেলছি মা যাতে আমার ব্যাটিং দেখে কোন বড়লোক বাড়ি আমাকে বৌমা নিয়ে যায় । " একগাল হেসে মৌ বলে ।


"সব সময় ফাইজলামি করবি না "মায়ের গলার স্বর এর সাথে মিশে আছে রাগ আর বিরক্তি । মৌ আর কথা বাড়ায় না উঠে চলে যায় নিজের ছোট্ট খুপরি তে । নিজের পড়ার বইয়ের মধ্যে পড়তে পড়তে কখন যে বাইরের রাত আধার কালো হয় টের পায় না । পড়ার বই ছেড়ে যখন উঠল তখন রাত দুটো । আজ আর না ‌ । ঘুমাতে যাওয়ার আগে বেসিনের আয়নায় দেখে ওর চোখের তলায় কালো রেখা । শ্যামলা মুখে সেটা যেন আরো প্রকট হয়ে উঠেছে । হঠাৎ সেই প্রজাপতিটার কথা মনে পড়ে যায় । কি সুন্দর না !.....


অবশ্য ঘুম থেকে পরের দিন সকালে ওঠার পর তাড়াহুড়োয় তার মাথায় থাকে না । ঘন্টা দুয়েক পড়াশোনার পর স্নান করে ভাত খেয়ে বেরিয়ে যায় । একটা টিউশন পড়িয়ে তাকে কলেজ যেতে হয় । মৌ বাবার কাছ থেকে পড়ার খরচ নেয় না । দু'চারটা টিউশন করে নিজেই কলেজের আর ক্রিকেট কোচিং এর খরচা সামলায় ।


আজকেও কলেজ থেকে বেরোবার সময় প্রজ্ঞা , এশা , মুন , কোয়েল ওদের মুখোমুখি হতে হলো মৌ কে । এদেরকে মৌ ভালো করে চেনে ওর সাথে একই ডিপার্টমেন্টের এক ক্লাসে পড়ে । প্রত্যকেই ধনী ঘরের আদরের দুলালী । নিত্য নতুন রঙ্গিন জামা তার সাথে ম্যাচিং লিপস্টিক , কাজল , চুরি কানের দুল ----- সাজগোজে যতটা মন ক্লাসে ততটা নেই । মৌ জানেনা ওকে নিয়ে এদের অসুবিধা ঠিক কি । ওর নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির সস্তা কুর্তি নাকি ওর শ্যামলা গায়ের রং নাকি প্রতি সেমেস্টারে ওদের থেকে বেশি নাম্বার পেয়ে পাস করা । এদেরকে দেখে আরো একবার মৌ এর সেই প্রজাপতি টার কথা মনে পড়ে গেল । ঠিক একরকম না.......


মুখে বেশি ভাবতে না দিয়ে ওরা ওদের রোজকার বিদ্রূপ টিটকিরি শুরু করলো ।

"এই দেখ দেখ মৌমাছি যাচ্ছে ।"

"যেমন নাম তেমন চেহারা । মৌমাছির মত গায়ের রং .... হ্যাঁ হ্যাঁ তা যা বলেছিস নামটা যে রেখেছিল তাকে বুদ্ধিমান বলতে হয় "

" অ্যাই না না থাক । কিছু বলিস না ভালো নাম্বার পাওয়া মেয়ে তো "

মৌএর অভ্যাস হয়ে গেছে এগুলো শুনতে শুনতে । রোজই বলে । কথাটা একপ্রকার ঠিক ও যা দেখতে , মৌমাছির সাথেই তুলনা করা চলে । সেই রকমই বাদামি কালচে গায়র রং । আর ওরা .......ওরা তো সেই হাওয়ায় ভেসে থাকা সুন্দর প্রজাপতিটা , কত রং......

বাস আসতে এখনো মিনিট পনেরো দেরি । চুপ করে দাঁড়িয়ে ওদের টিটকিরিগুলো শুনতে লাগলো । ঠিক সে সময় একটা কান্ড হলো । একটা বাইক তিনটে অসভ্য ছেলে এসে প্রজ্ঞা দের সামনে দাঁড়ালো ।

" ওহ্ কি সুন্দর , কি সুন্দর দেখাচ্ছে ঠিক যেন রঙিন প্রজাপতি । চলো প্রজাপতি , আজ একটু মধু খাইয়ে আনি । "

ওদের মধ্যে থেকে একটা ছেলে প্রজ্ঞার হাতটা জাপটে ধরে । প্রজ্ঞা ভয় পেয়ে ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় । ততক্ষণে একটা ছেলে বাইক থেকে নেমে পড়েছে । সে প্রজ্ঞার ওড়নাটা টেনে ধরে ‌। আরে চলো চলো । লজ্জা কিসের প্রজাপতি ?


এতক্ষণ মৌ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল । এবার ও বুঝতে পারি ওকে কিছু একটা করতে হবে মনে পড়ে ব্যাগে রাখা ক্রিকেট ব্যাটটার কথা । এক মুহূর্তের মধ্যে ব্যাগ থেকে বের করে হাতে ধরে ।

তারপর এক দৌড়ে ছেলেটার দিকে তেড়ে যায় দুমদুম মারতে থাকে । ছেলেটার হাতে জোরে মারতেই ছেলেটা প্রজ্ঞার ওড়নাটা ছেড়ে দেয় । বাকি দুটো ছেলে তখন ছুটে এসেছে । ভয়ডরহীন ভাবে ওদের ব্যাটের ঘা মারতে থাকে ।

ততক্ষণে অবশ্য রাস্তার বাকি লোকজন , ট্রাফিক পুলিশ সবাই ছুটে এসেছে। কর্তব্যরত পুলিশটাও ছুটে এসেছে । ইভটিজিংয়ের দায়ে ছেলে তিনটেকে পুলিশ কাস্টডিতে নেয় ।

পুলিশ অফিসার মৌ এর দিকে এগিয়ে আসে ।

" ধন্যবাদ । আপনি যেভাবে সাহসিকতার সাথে ওদেরকে মারলেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার । এভাবে সাহস করে সব সময় এগিয়ে আসবেন ‌ । আপনার নামটা কি ...?

বুক ভরে নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে " মৌ ..... আই মিন মৌমাছি কর । "

বাসটা আসার আগে একবার প্রজ্ঞাদের দিকে তাকায় । একবার ভাবে কিছু বলবে না থাক । কিন্তু পরক্ষনেই মনে হয় আজ না বললে কবে বলবে ?

" ঠিকই বলছিলে গো তোমরা । আমি মৌমাছি । মৌমাছির মতোই গায়ের রঙ আমার । তোমাদের মত প্রজাপতি না । অত রূপ , সৌন্দর্য কোন কিছুই নেই । যদি কিছু আছে তা হল হুল । নিজেকে বাঁচাতে সেইটা ব্যবহার করতে পারি । আর শোনো আমি না তোমাদের মতো ফুলের উপর ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে বেড়াই না । সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে নিজের খাদ্য টুকু অর্জন করি । তোমাদের মত এত সুন্দর হতেও চাই না । আমি মৌমাছি , মৌমাছিই থাকতে চাই ।"

বাসটা আসতেই সেটাই ওঠে । ওর মনে তখন আর কোন সুন্দর হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো প্রজাপতির ছবি নেই । ওর মনের কোণায় কোণায় তখন একটাই ছবি ফুটে উঠেছে , কালচে বাদামী রঙের মৌমাছির ছবি ।



Rate this content
Log in