Sumana Sinhababu

Drama


3  

Sumana Sinhababu

Drama


স্মৃতিপট

স্মৃতিপট

6 mins 1.2K 6 mins 1.2K

"কিরে শুভম মুখটা এখনো ধুস নি ! স্কুল যাবি না নাকি রে ?"

- এশা প্রায় চিৎকার করে ওঠে ।

"মাম্মাম , ও মাম্মাম আমার কালার বক্সটা কই স্কুলে তো ড্রইং ক্লাস আছে " রিমি ওর ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে।

" এশা , আমার টিফিনে কিন্তু একদম লঙ্কা দেবে না । কাল তুমি শুভমেরটায় লঙ্কা দিতে গিয়ে আমারটায় দিয়ে দিয়েছিলে । অফিসে সে কি ঝামেলা !" আহান সতর্কতার সুরে বলে ।

সপ্তাহের মাঝে দিনগুলোতে এইগুলোই এশার সঙ্গী । শুভম এর ঘুম না ভাঙ্গা মুখে স্কুল যাব না আবদার , রিমির নিজের জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়ার চিৎকার , আহান এর খাবারের ব্যাপারে সতর্কতা , এগুলো এখন এশার অভ্যাস হয়ে গেছে ।

এরপর এশা তাড়াতাড়ি হাত চালায় । সবাই ব্রেকফাস্টে বসে গেছে । তাড়াতাড়ি টোস্টগুলো ভেজে তুলে প্লেটে সাজিয়ে রাখে । এরপর টিফিন প্যাক করতে হবে , একেকজনের একেক রকম ।

এরই মাঝখানে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে ঘন মেঘ করেছে শ্রাবনের বেশিদিন হয়নি পাঁচ কি ছয় তারিখ বাংলা ক্যালেন্ডার টা এখন আবার কেউ মনে রাখে না।

" মা আমার টিফিন," শুভম এর গলা শুনে এশার হুঁশ ফেরে ।

তাড়াতাড়ি আহান এর কফি দিতে দিতে বলে-" আজকে ওই অ্যামাজনের লোকটার শাড়িটা ডেলিভারি দেওয়ার কথা। জানো তো ?"

"শেষ অব্দি তো ওই হালকা আকাশী ঐ রংটাই নিলে ?"

" হ্যাঁ , বাকি গুলো থেকে ওই টাই বেশি সুন্দর মনে হল"

" ঠিকই আছে , তোমাকে স্কাই ব্লু শাড়িটাতে বেশ মানাবে। " "টাকা আছে তো ?"

"হ্যাঁ" ।

প্রথমে শুভ আর রিমির স্কুল বাস আসে । এশা ফ্ল্যাটের নীচে ওদের বাসে তুলে দিয়ে আসতে আসতে দেখে আহান জুতোর ফিতে লাগাচ্ছে ।

ওকে দেখে , এক হাত দিয়ে ফ্লাইং কিস ছুড়ে বলে - গুড বাই জানু । তারপর তাড়াতাড়ি নিচে নেমে যায় । ওরএখন অনেক তাড়া । তাড়াতাড়ি অফিসে পৌঁছতে হবে ।


ইতিমধ্যে বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে এখন আর হাতে তেমন কোন কাজ নেই তাই ভাবে কি করবে ও হ্যাঁ একবার রিমির ঘরে গিয়ে ওর কালার বক্সটা খুঁজে দিতে হবে এখন শুভমেরটা দিয়ে কোন মতে এশা পাঠিয়ে দিয়েছে স্কুলে । কিন্তু বিকেলে এসে নিজেরটা না পেলে কেলেঙ্কারি করবে।

রিমির ঘরে এসে এদিক ওদিক খুজতেই পেয়ে গেল । বিছানার এক কোণে ঢাকা পড়ে আছে । মেয়েটা কি যে করে না ।সারাদিন বছর পাঁচেক বয়স , কিন্তু দুষ্টুমি করে যেন দু বছরের বাচ্চা ।

দূর কারেন্ট চলে গেল । এখন আর কোন কাজ নেই এশার ।বাইরে বৃষ্টি পড়ছে । আকাশটা দিকে তাকালো ঘন কালো মেঘ জমে আছে, মনে হয় বিকেলেও বৃষ্টি পড়বে । এশা কি করবে খুঁজে না পেয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল ।

বৃষ্টির সাথে বেশ একটু ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছে এশা ভাবল একটু ব্যালকনিতে বসে থাকা যায় কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যেরকম বৃষ্টি পড়ছে , বৃষ্টির ছাঁট ওকে ভিজিয়ে দেবে । তার থেকে বরং ব্যালকনির কাচের পাল্লা দুটো ভেজিয়ে দিয়ে ব্যালকনির ধারে বসে থাকা যাক । খুব একটা বৃষ্টির ছাঁট ও আসবে না , আবার স্পষ্ট দেখাও যাবে ।

এরকম একটা দিনে মনে পড়ে যায় ওর ছোট্ট বেলার সেই শহরটার কথা । সেই শহরটার বর্ষার কথা স্পষ্ট মনে আছে এশার । সেই যে ওদের ব্লক অফিস কোয়ার্টারের পিছনে ছোট্ট জল পড়লে পদ্মের পাতায় সে অনেকক্ষণ ধরে থাকতো ওদের কোয়ার্টারের সামনে ফুল গাছগুলো বৃষ্টি ছোঁয়া পেতেই অন্য রং ধরত । সবচেয়ে মনে আছে সেই যে বছর ও হাইস্কুলে ভর্তি হলো সে বছর বৃষ্টির কথা । ওদের স্কুলের পিছনে প্রাচীন দেওয়ালে শ্যাওলা জমা পাথরগুলো চুপচাপ বৃষ্টিতে ভিজত । ওদের স্কুলের মাঝে কৃষ্ণচূড়ার শাখায় দু একটা অসময়ের অতিথি ফুল নিজেদের মধ্যে মুক্তোর মত বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে রাখত । কৃষ্ণচূড়া গাছটার কথা ভাবলেই এশার অন্য একজনের কথা মনে পড়ে যায়।


একটা দীর্ঘশ্বাস যেন অজান্তেই ওর মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে । সেই বৃষ্টির দিন .......সেই ভেজা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি ......লাল কালিতে ভিজে যাওয়া লাভ লেটার.... কানের মধ্যে ফিসফিসানি.... লোকে ভুল বলে না প্রথম প্রেম ভোলা যায় না ।


এমন নয় যে এশা এখনো রনিতকে ভালবাসে । এশা বুঝে গেছে কিছু সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য গড়ে ওঠে ।আফসোস নেই তার জন্য । তবুও মনের কোনে কখনো যদি ওর নাম শ ভেসে ওঠে , কেমন একটা লাগে ।


এই মুহূর্তে আহান থাকলে ঠাট্টা করে কত কি বলে দিত । আহান অবশ্য রণিতের ব্যাপারটা জানে না । এশা ছোট বয়সের ভুল মনে করে ওকে আর কিছু বলেও নি ।বলার কিছু ছিল না অবশ্য ।

ডিং ডং , ডিং ডং ...... এশার চিন্তায় ছেদ পড়ে । এখন আবার কে এলো ! ও হ্যাঁ অ্যামাজনের ডেলিভারি ম্যান ....

ব্যালকনি ছেড়ে বেডরুমে যায় এশা । পার্স থেকে টাকাটা বার করে । তারপর দরজাটা খুলতে যায় । তার আগে অবশ্য দরজার ফুটো দিয়ে লোকটাকে দেখে নেয় । ওর কেন জানি চেনা লাগে চেহারাটা ।

দরজাটা খুলে একদম চমকে যায় এশা। সেই অবিকল চেহারা .....সেই চোখ .......সেই চুল .......সেই মুচকি হাসি....

" রনিত " বলতে গিয়ে থেমে যায় ও। ওপাশের মানুষটা তাকে চোখ দিয়ে যেন জরিপ করছে । এশা বুঝতে পারে এ জরিপের অন্য কোনো মানে নেই , এ জরিপ শুধুই সঠিক কাস্টমার কিনা যাচাই করা ।

"আপনি ...এশা মৈত্র ,... স্কাই ব্লু কালার শাড়ি ........অর্ডারটা দিয়েছিলেন 15 তারিখে ?"

কথা বলার শক্তিটুকুও নেই এশার । শুধুমাত্র একবার ঘাড় নাড়ায় ।

এসব ভাবতেও পারছি না রনিত ওকে চিনতেও পারল না । নাকি চিনতে পেরেও অচেনার ভান করছে ?

" ম্যাডাম , আপনার 1170 টাকা , " চোখ তুলে ওপারের মানুষটা ভাবলেশহীন ভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে ।

এশা কিচ্ছু শুনতে পায় না , শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । সেই চোখ ..... সেই ঠোঁট ..... যে কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে একদিন , কত আকাশ কুসুম স্বপ্ন , যেমনটা সব তরুণ-তরুণীই করে থাকে । তারপর একদিন নিজেরা পরিণত হওয়ার সাথে সাথে তাদের সম্পর্কটাও পরিণত হয় পরিণত হওয়ার পরিণতি হিসেবে আসে সম্পর্কের মৃত্যু ।


" ম্যাডাম ....." চমক ভাঙ্গে যেন এশার । টাকাটা তাড়াতাড়ি বাড়িয়ে দেয় । কি করবে কিছু খুঁজে পায় না । মুখটা তুলতেও পারে না কারণ ওর চোখ দুটো আষাঢ়ের আকাশের মতোই মেঘলা হয়ে আছে । তাড়াতাড়ি দ্রুততার ভান করে এক হাত দিয়ে শাড়ির প্যাকেটটা খুলে ফেলে , সেটা যেন নাড়াচাড়া করছে এই ভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ।

ইতিমধ্যে এশা বুঝতে পারে সামনের মানুষটা কিছু একটা বলার জন্য ইতস্তত করছে মুখ না তোলো সেটুকু বুঝতে পারে

। তবে কি..........

" ম্যাডাম একটা কথা বলবো , স্কাই ব্লু কালার টা থেকে আপনি যদি ডিপ ব্লু কালারটা নিতেন তাহলে সেটাই আপনাকে ভালো লাগতো ‌। "

এশা চুপ করে থাকে । কি বলবে বুঝতে পারে না , এ কথা সে অনেকবার আগেও শুনেছে । ভেজা কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় বসে ....…শীতের দিনে মিষ্টি রোদে ক্লাসের শেষ প্রান্তে বসে ......টুকরো টুকরো চিরকুটে পাঠানো বার্তা- " এই তুই একদম স্কাই ব্লু বা আকাশী রংয়ের চুরিদার টা পড়বি না তুই বরঞ্চ ঘন নীল রঙের বেশ মানাবে ।"

ইতিমধ্যে রনিত পিছন ফিরেছে । করিড়র বরাবর হেঁটে যাচ্ছে লিফটের দিকে ।

হঠাৎ করে এশার মাথায় কি যেন একটা খেলে যায় ।

"একটু শুনুন "

"হ্যাঁ বলুন " রনিক থেমে যায় ।

" আপনি কি এরকম উপদেশ সব কাস্টমারদেরই দেন না ?"


" না , তার দিই ইনা । তবে আপনি দেখতে অনেকটা আমার এক পুরনো বান্ধবীর মতো , নামটাও এক - এশা তাই বললাম । কেন আপনার কি খারাপ লাগলো ?"

" না , ঠিক আছে । আমি স্কাই ব্লু টাই পছন্দ করি , আমার হাজব্যান্ড বলে এই রংটা তাই আমাকে বেশি মানায় ।"

এশার মনের মধ্যে যে মেঘ জমেছিল , সেটা অনেকটা যেন কেটে যায় । গলার মধ্যে যে দলাপাকানো কষ্টটা কান্না হয়ে বেরিয়ে আসবে ভেবেছিল, সেটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল ।

ধীরে ধীরে নিজেকে দরজার ভেতর চালান করে দরজা দিয়ে দেয় এশা । তারপর বেড রুমে গিয়ে বসে । শাড়িটা ফেলে রাখে ওদের বাঁধানো বিয়ের ছবি পাশে ।

ফোনটা হাতে নিয়ে আহানকে একটা মেসেজ পাঠায় - শাড়িটা ডেলিভারি পেয়ে গেলাম । ঠিক যে রং টা অর্ডার দিয়েছিলাম সেই রংটাই এসেছে ।

ধীরে ধীরে উঠে বসে রান্না ঘরে যায় এশা । লঘু হাতে এক কাপ কফি বানায় । তারপর এসে বসে ব্যালকনিতে । এখনো বৃষ্টির ছাট আসছে । আসুক , এখন একটু ভিজতে ইচ্ছে করছে ওর । স্বপ্ন আর স্মৃতির মিশেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে । চুপচাপ চেয়ারটা ব্যালকনির ছাদের তলায় নিয়ে আসে । হাতে করে নিয়ে আসে " সানন্দা " খুব মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করে " দাম্পত্য সুখী করার 10 টি উপায় "। আর শাড়িটা পড়ে থাকে সেই টেবিলের উপর ।



Rate this content
Log in

More bengali story from Sumana Sinhababu

Similar bengali story from Drama