Gopa Ghosh

Romance


4.9  

Gopa Ghosh

Romance


কুৎসিত ভালোবাসা

কুৎসিত ভালোবাসা

7 mins 999 7 mins 999

কানা ছেলের নাম যেমন পদ্মলোচন হয়, সুন্দরের ও তাই। ওর আগুনে ঝলসানো কুৎসিত মুখটা যে প্রথম দেখে সে চমকে ওঠে। এক ভয়ানক দুর্ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আজও। সেই রাতের কথা কোনোদিনই ভুলতে পারবে না সুন্দর। আগুন তার বাবাকেও কেড়ে নিয়েছে তার জীবন থেকে। সেদিন গভীর ঘুমের মধ্যে কেউই টের পায়নি । যখন বুঝলো ,আগুন লেগেছে তখন ঘর থেকে বের হওয়া দুষ্কর হয়ে উঠলো। সুন্দরের বাবা দুজনকে প্রাণে বাঁচাতে পারলেও নিজে আর বেরোতে পারেনি। সুন্দরের বেশি পুড়েছিল মুখ। অনেক ডাক্তার প্লাস্টিক সার্জারি করার কথা বললেও আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় সম্ভব হয় নি। আর সুন্দরের মা মিনতি এই দুর্ঘটনার পর মানসিক দিক থেকে এতটাই ভেঙে পড়ে যে খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলাই বন্ধ করে দেয়।

সময় তার গতিতে এগিয়ে চলে। এখন সুন্দর এক বেসরকারি ফার্মে কম্পিউটার অপারেটর। যা উপায় করে,মা ছেলের যাহোক করে চলে যায়।

প্রায় তিন মাস এই ফার্মে কাজ করছে কিন্তু আজ ও যে মেয়েটিকে স্যারের ঘরে দেখলো, ওকে তো আগে কখনো দেখেনি। সুন্দর নিজের কুৎসিত রুপ সমন্ধে খুবই ওয়াকিবহল। ও জানে এই কুৎসিত মুখ দেখে কোনো মেয়েই ওকে ভালোবাসবে না। কিন্তু আজ ওর মনের মধ্যে যেনো একটা ভালোলাগার ঝড় উঠেছে। মেয়েটার নামও জানে না আর মেয়েটাও ওকে দেখেনি, মোবাইল এ ম্যাসেজ করতে ব্যস্ত ছিল। সুন্দরের অর্ধেক রাত কোন এক আবেশেই পার হয়ে গেলো। পরদিন অফিসে গিয়ে রোজকার মত কাজে মন বসাতে পারলো না। বারবার সেই মুখ ভেসে উঠছে ওর মনের পটে। সুন্দর খুব প্রয়োজন না হলে অফিসের কারও সাথে কথা বলে না কারণ ও জানে ওর কুৎসিত মুখ নিয়ে অনেকেই আলোচনা করে। সারাজীবনটাই ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েই কাটিয়ে দেবে ভেবেছিল| কিন্তু ওই নাম না জানা মেয়েটা ওকে কেন এত দুর্বল করে দিল ভেবে পাচ্ছে না। সেদিন লাঞ্চ এ বেরিয়ে অফিসের লন এ আবার দেখা অনামিকার সাথে। অনামিকাই ওর ঠিক নাম কারণ সুন্দর তো জানে না আসল নামটা কি। মনে মনে ঠিক করলো কথা নাইবা বলা গেলো, নাম জানা নাইবা গেলো, নাম তো একটা দেওয়া যেতেই পারে । তাই হলো, তবে পরেরদিন সুন্দর আসল নামটা জানতে পারলো কারণ প্রকৃতি ওর অফিসেই রিসেপশনিস্ট হয়ে এলো। এতদিন প্রকৃতি সুন্দরকে খেয়াল করেনি। সুন্দর আজ নিজের সিট এ গিয়েই রিসেপশন র দিকে তাকায়, ঠিক সেই সময় প্রকৃতিরও দৃষ্টি পড়ে সুন্দরের মুখের দিকে। পাশে দাঁড়ানো সুমিতাকে খুব নিচু স্বরে কিছু বলে দুজনে খুব হাসাহাসি করে। সুন্দর আগেই জানে তার এই কুৎসিত মুখ নিয়ে সে কারও মনের মানুষ হতে পারবে না। মানুষ বাইরের চটক দেখেই বিচার করে বসে, তার যে একটা সুন্দর মনও থাকতে পারে, তা আর কজনে বোঝে।

সুন্দর হয়ত সাময়িকভাবে প্রকৃতি কে দেখে দুর্বল হয়ে পড়েছিল কিন্তু এখন অনেকটা নিজেকে সামলে নিয়েছে। সত্যি তো এত রূপসী মেয়েটা ওর মতো কুৎসিত ছেলের সাথে কি সারাজীবন কাটাতে পারে।

সময় তার গতিতে এগিয়ে যায়। প্রকৃতি এখন সুন্দরের সাথে বেশ স্বাভাবিক । দুজনে একসাথে লাঞ্চ ও করতে যায় । সুন্দর তার ভালোবাসার কথা প্রকৃতিকে টের পেতে দেয় না বরং প্রকৃতির ভালোবাসার মানুষ মানস কে ওর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কত রকম প্ল্যান করে। প্রকৃতি মানস কে ভালোবাসে প্রায় বছর দুযেক কিন্তু বাড়িতে বলার সাহস হয় নি। সুন্দর রোজই ওকে আশ্বস্ত করে, যে ভাবে হোক মানসের সাথে প্রকৃতির দু হাত এক করবে।

সুন্দর প্রকৃতিকে বুঝতে না দিলেও মেয়েদের মন অনেকটা বুঝে যায় ছেলেদের চোখ দেখে। আরো পরিষ্কার হয়ে যায়, প্রকৃতির খুব শরীর খারাপ হওয়ায়। অফিসের মধ্যেই সেদিন খুব অসুস্থ বোধ করে প্রকৃতি। কাউকে না বলে কাজ চালিয়ে যেতে গিয়েই হয় বিপত্তি। মাথা ঘুরে পড়ে যায়। সেদিন প্রথম সুন্দর প্রকৃতিকে কোনো আদেশ করে। এতদিন প্রকৃতির প্রতিটা আদেশ ও পালন করে এসেছে। জোর করে প্রকৃতিকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যায়। কিছু না, ওটা লো প্রেসার থেকে হয়েছে শুনে একটু আশ্বস্ত হয় সুন্দর। প্রকৃতির চোখকে কিন্তু এবার ফাঁকি দিতে পারে নি সুন্দর।

প্রকৃতি ওর কুৎসিত মুখটা পেরিয়ে সুন্দরের সুন্দর মনের ভেতর পৌঁছে গেছে । ও জানে মানস আর সুন্দর র সাথে তুলনা চলে না। মানস উচ্চ বিতত পরিবারের একমাত্র সন্তান। সুদর্শন ও বটে। এক নামি আই টি কোম্পানিতে কর্মরত। স্বামী হিসেবে মানস কে যে কোনো মেয়েই পছন্দ করবে। তবু প্রকৃতি আর চায় না এখনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে। আরো কিছুদিন যাক তারপর ভাবা যাবে, এরকম কিছুটা। সুন্দর কিন্তু এবার মাঝে মাঝে শাসনও করে ফেলে প্রকৃতিকে। বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে বুঝেও মানস কে বিয়ে করে নেওয়ার জন্য জোর করে প্রকৃতিকে।

এর মধ্যেই প্রকৃতির মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। প্রকৃতির জগৎ অন্ধকার এ ভরে যায়,। মা ছাড়া ওর আর কেউ নেই। এত চিকিৎসার খরচা কোথা থেকে করবে।

মানস খবর পেয়েই প্রথম প্রকৃতিকে ফোন করে জানায় মায়ের চিকিৎসার সব খরচা ওর। প্রকৃতির মন কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। সত্যি মানস কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি করা ওর ঠিক হচ্ছিল না। সুন্দর ঠিকই বলে।

এখন অফিসে প্রকৃতি খুব মনমরা হয়ে থাকে। সুন্দর অনেক চেষ্টা করেও লাঞ্চ এ নিয়ে যেতে পারে না। কথা ও বলে খুব কম। সবাই জানে ওর মায়ের অসুখের কথা তাই ওকে ওর মতোই থাকতে দেয়। সুন্দরের মন কিন্তু বুঝে যায় প্রকৃতির এই অবস্থা শুধু মা র অসুখের জন্য নয়। সুন্দর প্রকৃতিকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে আর ভালোবাসার মানুষের হৃদয়টা মনের ডেস্কটপ এ সুন্দর সবসময় দেখতে পায়।

ক্রমশঃ প্রকৃতি আরো বেশি চুপচাপ হয়ে গেলো। সুন্দরের সাথেও আর খুব বেশি কথা বলে না।

সুন্দর ঠিকই করেছিল প্রকৃতিকে না জানিয়েই ওর মাকে দেখতে বাড়িতে যাবে। রবিবার মানসেরও অফিসে ছুটি, তাই মানস কে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন করলো। পরপর চারবার ফোন বেজে গেলেও রিসিভ করলো না। সুন্দর এবার একটু চিন্তায় পড়ল। কে জানে কোনো বিপদে আছে কিনা। প্রকৃতিকে কিছু জানালো না। ওর বাড়ি গিয়ে হাজির হলো। সেদিনের ঘটনা ওর হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিল। দরজা খুলে সুন্দরকে দেখে প্রকৃতি যে একটুও খুশি হয় নি তা টের পেতে দেরি হয় নি সুন্দরের। তবু বাড়ির ভেতরে যেতে বলার সৌজন্য টুকু আশা করেছিল প্রকৃতির কাছে| কিন্তু না, ওর আর ভেতরে যাওয়া হলো না। প্রকৃতি বারবার ওর কাছে জানতে চাইছিলো আসার কারণ। এটা সুন্দরকে খুব আঘাত দিয়েছিল। প্রকৃতি কিছুদিন ধরে ওর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করছে। কারণটা ঠিক ঠাওর করতে পারছে না সুন্দর। দিনে রাতে শুধু এই এক চিন্তাতেই কেটে যায় ওর। তবে কি প্রকৃতি ওর সম্বন্ধে অন্য কিছু ভাবছে। ভাবছে কি সুন্দর ওর সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য ওদের বাড়ি গিয়েছিল। হতে পারে। এমন কত এলোমেলো চিন্তায় সুন্দরে দিন রাত কেটে যায়। তবে সুন্দর নিজের কাছে স্বীকার করে সে সত্যি খুব খুব ভালোবাসে প্রকৃতিকে। কিন্তু বিনিময়ে কিছু চাওয়ার নেই ওর। দূর থেকে প্রকৃতিকে সুখী দেখলেই ওর সব পাওয়া। এই কুৎসিত রূপ নিয়ে সুন্দর কিছুতেই প্রকৃতির জীবন নষ্ট করতে চায় না।

প্রকৃতি এখন রোজ অফিসে আসে না। স্যার কে মায়ের অসুখের কথা জানিয়ে রেখেছে। সেদিন সুন্দর অফিসে নিজের সিট এ বসতে গিয়ে দেখে সামনে প্রকৃতি। মুখ চোখ দেখে মনেই হচ্ছে খুব বড়ো ঝড় বয়ে যাচ্ছে ওর উপর দিয়ে। সুন্দর ভেবেছিল ও না কথা বললে নিজে থেকে বলবে না কিন্তু প্রকৃতিকে এইরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কি হয়েছে জানতে চাইল, তার সাথে এটাও জানিয়ে দিল যে প্রকৃতির যে কোনো সমস্যায় সুন্দর সবসময় পাশেই থাকবে । কিন্তু সুন্দর যা শুনলো তা কখনোই ও আশা করে নি। প্রকৃতি প্রেগন্যান্ট। আর তার জন্য দায়ী মানস নয়, মানসের বন্ধু সৈকত। বেশ কয়ের সেকেন্ডের জন্য সুন্দর চোখ বুজে কিছু ভাবলো, কিন্তু আর কোনো প্রশ্ন করলো না । কেন সৈকতকে ওকে ব্যবহার করার অধিকার দিলো, বা মানস কে না জানিয়ে আজ ওকে কেনো জানাচ্ছে, এসব নিয়েও কোনো কথা হলো না। শুধু এখন প্রকৃতি কি করতে চায় সেটা জানতে চাইলো ওর কাছে।

প্রকৃতি সব বলার জন্য তৈরি হয়েও কিছুই বলা হলো না। সুন্দর জানে না মানস ওকে মা র অসুখের টাকা দেওয়ার নাম করে শান্তিনিকেতনের এক হোটেলে নিয়ে উঠেছিল। প্রকৃতির কাছে মানস ছিল অলিখিত স্বামী। তাই ওর সাথে যেতে দ্বিধা করে নি। কিন্তু মানস যে এত নোংরা মানসিকতার তা জানা ছিল না । সৈকত বেশ মোটা টাকা দিয়ে মানসের সাথে চুক্তি করেছিল প্রকৃতিকে পাওয়ার জন্য। প্রকৃতি কিছু বোঝার আগেই এই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। চিৎকার চেঁচামেচিতে যাতে কেউ বুঝে না যায় তাই ওর মুখ বেঁধে রেখেছিলেন ওরা। তবে সৈকত যাওয়ার সময় একটা খুব বড়ো সত্যি কথা ওকে জানিয়ে দিয়ে গেছে। মানস প্রকৃতি কে কোনোদিনই বিয়ে করবে না, কারণ মানস বিবাহিত।

এখন প্রকৃতি ভাবে মানুষের বাইরের রূপটাই সব নয়, কিন্তু সুন্দরের রূপ নিয়ে ও কত অপমান করেছে , সুন্দর সবকিছু মাথা নিচু করে শুনে গেছে। আবার প্রকৃতির যে কোনো বিপদে সবসময় পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ জলে ভরে যায়। এখন কি করবে কিছুই ভেবে পায় না প্রকৃতি। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন শেষ করে দিতে কিন্তু মা এর কি হবে, ও চলে গেলে চিকিৎসা কি করে হবে।

সুন্দর কিছু জানতে না চাইলেও কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। প্রকৃতি কে বিরক্ত করতে চায় নি| কিন্তু প্রকৃতি নিজে থেকে সব ঘটনা ওকে জানিয়ে মন কিছুটা হালকা করতে চাইলো। সব শুনে সুন্দর শুধু একবারের জন্য মানসের সাথে দেখা করার অনুমতি চাইলো। প্রকৃতি রাজি হলো না কারণ ওদের সব কিছু মোবাইল এ ভিডিও করা আছে, বেশি কিছু করলে সেটা অনলাইন এ দিয়ে দেবে, এমন হুমকি দিয়ে রেখেছে ওরা। সুন্দর এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। প্রকৃতির সামনেই কেঁদে ফেললো, যে ছেলে জীবনে এত অপমান, এত খারাপ অবস্থার মধ্যেও একফোঁটা চোখের জল ফেলে নি, তার দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। এটা কি শুধুই মায়ার, না এটাই ভালোবাসা, কে জানে। সুন্দর শুধু প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলো বিনিময়ে আর কিছু চায় নি। খাঁটি ভালোবাসা বোধহয় এটাই। যদি প্রকৃতি মানসের সাথে সংসার পাতত, সুন্দরের ভালোবাসা কমত না, আসলে ভালোবাসার মানুষ কি চায় সেটাই সুন্দরের কাছে বড়ো ছিল। তাই ও আজ ওর ভালোবাসার সাথে সারাজীবন থাকার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলো। বিয়ে করে প্রকৃতিকে নিজের করে পেলো সুন্দর। প্রকৃতি একসময় যে কুৎসিত রূপ নিয়ে কত ব্যঙ্গ করতো, সেই মুখটা আজ ওর কাছে কত সুন্দর লাগে, কারণ তখন ওর চোখে ভালোবাসার চশমাটা পড়া ছিল না। সুন্দর প্রথম দিন প্রকৃতি কে দেখেই ভালোবেসেছিলো কিন্তু প্রকৃতির ভালোবাসাটা এগিয়েছে ধীরে ধীরে। কুৎসিত মুখ আর সুন্দর মুখ, ভালো বাসার কাছে তফাৎ নেই, কারণ ভালোবাসা আসে হৃদয় থেকে।


Rate this content
Log in