কাঁটাতার
কাঁটাতার
সন্ধ্যা হয়ে এসছে, রুচিকাদের বাড়ি আলোয় আলোয় ভরে উঠেছে । রুচিকাদের আত্মীয়-স্বজনেরা আগের দিনেই বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে।আত্মীয়-স্বজনের পরিমাণ নেহাতই কম নয় , তাই রুচিকার বাবা পাশে দুটো বড় বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন । জলের মতো টাকা বয়ে চলেছে রুচিকার অপছন্দের বিয়েতে , এই বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না রুচিকা । বাবার মুখের ওপর কিছু বলার সাহসও নেই তার , কিন্তু একবার যদি বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তার ওই ফেসবুক বয়ফ্রেন্ডের সাথে আর দেখা করা হবে না । কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলনা সে , বিয়ের লগ্ন রাত বারোটা, হাতে এখনো বেশ কিছুটা সময় আছে , একবার ভাবে পালিয়ে যাব কিন্তু কিভাবে পালাবে সে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পানানোটা খুব কঠিন ব্যাপার । রুচিকার সাজগোজ প্রায় শেষ , ঘড়িতে বাজে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা , বিউটি পার্লারের ম্যাডাম বেরিয়ে যেতে রুচিকার কাকাতো - মামাতো বোনেরা এসে জড় হয় তার ঘরে । একেক জন একেক রকমের মতবাদ জানাচ্ছে , তাদের কথাগুলো রুচিকার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না । এই কথাগুলো রুচিকার তখনই ভালো লাগতো যদি সে তার পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে করত , রুচিকা মনে মনে ভেবেই চলেছে কি করা যায় ?
ঘড়িতে এখন রাত্রি আটটা , বাইরে উত্তেজনা শুনে বোনেরা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।রুচিকার পাশে বসে থাকে একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে । বাচ্চাটির নাম রুপা, তার মেজো মামার বড় মেয়ের মেয়ে । রুচিকার সঙ্গে বেশ আলাপ তার , বাইরের উত্তেজনার কারণ হলো বরের গাড়ি ঢুকেছে , বাড়ির সকলে তখন ব্যস্ত বরকে বরণ করে ঘরে ঢোকাতে , এদিকে যত সময় এগোচ্ছে রুচিকার হৃদয়ের স্পন্দন ততোই বেড়ে চলেছে । বেশ কিছুটা সময় পর বোনেরা ফিরে এসে রুচিকাকে জানায় তার হবু বরকে তার পাশের ঘরেই রাখা হয়েছে । রুচিকা তার বোনদের বলে আমার না কেমন একটা নার্ভাসনেস লাগছে তোরা অল্প কিছু সময় আমায় একা থাকতে দিবি ? রুচিকার কাকার ছোট মেয়ে বলে বিয়ের আগে এরকম লাগে , ফুলশয্যার রাতে আবার অন্যরকম লাগবে । রুচিকা কাকার মেয়ের এক বছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে , তার কথাবার্তায় একটা অভিজ্ঞতা ছাপ , রুচিকা মনে মনে বলে এমন ভাবে বলছে আমি যেন কিছু জানি না কচি খুকি আরকি । বোন জিজ্ঞাসা করে কিছু বললি আমায়? রুচিকা বলে না কিছু না বলছি দশটা মিনিট অন্তত ছাড়া আমায় । ছোট কাকা দুই মেয়ে তারা অবিবাহিত , এই দিদি চল না আমরা একটু বাইরে যাই , জামাইবাবুর তরফে বেশ সুন্দর সুন্দর ছেলে এসেছে দেখ না একটাকে পটিয়ে দেওয়া যায় কিনা ? রুচিকা তার মেজ কাকার ছোট মেয়েকে বলে এই তোদের এখনো ছেলে পটাবার বয়স হয়নি পড়াশুনা করছিস মন দিয়ে সেটাই কর । ছোট কাকা ছোট মেয়ে বলে, আজ নয়তো কাল কারো না কারো গলায় তো ঝুলতেই হবে , আগের থেকে যদি কাউকে পাওয়া যায় তাতে ক্ষতি কি ? রুচিকা তাদের আবার রিকোয়েস্ট করে বলে প্লিজ দশটা মিনিট আমার সময় দে । মেজ কাকার ছোট মেয়ে বলে আচ্ছা বাবা দিলাম , সে রুপাকে নিয়ে যেতে চায় । রুচিকা বলে ওকে আবার কোথায় নিয়েছিস ও থাক না এখানে । ওরা রুপাকে রেখে বেরিয়ে যাই যেতে যেতে বলে মেয়ে লজ্জা পাচ্ছে, লজ্জা ভাঙতে একটু সময় লাগবে । ওদের কথা শুনতে পেয়েও না শোনার ভান করা রুচিকা । ওরা বেরিয়ে যেতেই রুচিকা রুপা কে বলে দেখতো রুপা পাশের ঘরে কজন আছে ? রুপা ছুটে গিয়ে উঁকি মেরে ফিরে এসে বলে পিসি একটা লোক না সাজুগুজু করে বসে আছে । রুচিকা ঝটপট বিছানা থেকে নেমে পড়ে , ড্রয়ার থেকে কাগজ আর পেন বের করে নিয়ে এসে কাগজে তার নাম্বারটা লিখে রুপাকে দিয়ে বলে পাশের ঘরে যে লোকটা বসে আছে তাকে দিয়ে বল এক্ষুনি ফোন করতে । রুপা ছুটে যায় রিসবের হাতে কাগজের টুকরোটা দিয়ে বলে আঙ্কেল আন্টি এক্ষুনি ফোন করতে বলেছে তোমায় । ঋষভ কিছু বলার আগেই রূপ আবার ছুটে চলে যায় , ঋষভ কাগজটা হাতে নিয়ে সেটা খুলে নাম্বারটা দেখে , বিড়বিড় করে বলে এখানে আবার কে চেনে আমায় ? যাইহোক নাম্বার যখন পাঠিয়েছি একটা ফোন করেই দেখি । রুচিকার সেলফোনটা হাতে নিয়ে ঋষভের ফোনের অপেক্ষা করতে থাকে ……।
ঋষভ বিষয়টা না বুঝেই ফোন নম্বরটা ডায়াল করে। সাথে সাথে রুচিকা ফোনটা রিসিভ করে ঋষভকে কোন কথা বলতে না দিয়েই কথা বলতে শুরু করে দেয় —-------- আপনি কি ধরনের ব্যাটাছেলে মশাই কোন মেয়েকে একবার দেখে আপনি পছন্দ করে ফেললেন ? আজকালকার ছেলে -মেয়েরা দেখাশোনার পরে তো একটা ডেটিংয়ে যায়, কথাবার্তা বলে ,একে অপরকে একটু বোঝে তারপরে বিয়ের দিকে এগোয় , ধরুন সেদিন আপনি যে মেয়েটাকে দেখে বিয়ে করতে এসেছেন ,সেই মেয়েটাকে তখন যতটা সুন্দর লাগছিল আদেও সে ততটা সুন্দর নয় । সেদিনের সৌন্দর্যটা সম্পূর্ণটাই বিউটি পার্লারে ছিল । আজও আপনি যে মেয়েটাকে দেখবেন সেটাও সম্পূর্ণ বিউটি পার্লারের কেরামতি । এরপরে যদি দেখেন মেকাপ ওঠার পরে আপনি যে মেয়ে দেখছেন আর সামনে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সেটা সম্পূর্ণ আলাদা তখন কি করবেন বলুন ? ঋষভ বলে কি আর করব বলুন , বিয়ে যখন করেছি, অগত্যা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় কি ? আপনি না আমার সব প্লানে জল ঢেলে দিয়েছেন, দেখুন আমি কিন্তু এভাবে বিয়ে করতে পারব না । ঋষভ বলে আপনি কি বলছেন আরতো মাত্র দু ঘন্টা পরে আমাদের বিয়ে । রুচিকা বলে জানিতো আর তাই জন্যই যা করতে হবে আপনাকেই করতে হবে দু'ঘণ্টার মধ্যে । আমি আবার কি করবো ? রুচিকা বলে দেখুন আমার অনেক স্বপ্ন ছিল আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে যাব ! এখান দিয়ে ছুটতে ছুটতে গোয়ায় পৌছাবো তারপরে সেখানে গিয়ে একটা সাসপেন্স এর সাথে আমরা বিয়ে করবো।ঋসভ বলে তার মানে আপনি এখান থেকে ছুটতে ছুটতে গোয়া যাবেন ? রুচিকা বলে আপনি তো বড্ড মাথামোটা , ওটা তো কথার কথা তবে পালাতে আমাদের হবেই । বাইরে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায় রুচিকা , ঋসভকে বলে ফোনটা একটু রাখুন আমি একটু পরে আপনাকে ফোন করছি । ঋষভ বলে ফোনটা রাখবো ? রুচিকা বলে আরে এটা কিরে বাবা ? আচ্ছা আপনাকে রাখতে হবে না আমি রাখছি। একটু পরে ফোন করছি ধরবেন কিন্তু , রুচিকা ফোনটা কাটতেই বাইরে থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পায় —---- রুচিকা , রুচিকা ,
রুচিকা দরজাটা খুলে বলে হ্যাঁ মা কিছু বলছো ? তোর বোন রা বলে তোর নাকি শরীর খারাপ লাগছে ? রুচিকা বলে না তেমন কিছু নয় কেমন যেন একটু লাগছিল এখন মোটামুটি ঠিক আছি । একটু শরবত খাবি? পাঠিয়ে দেবো । না মামা আসলে একটু নার্ভাস লাগছিল এখন অনেকটা ঠিক আছি। আমাকে আরেকটু একা থাকতে দাও আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাব । মা বলেন বিয়ে বলে কথা সে তো একটু নার্ভাস লাগবেই , ঠিক আছে তুই ততক্ষণ রেস্ট নে, আমরা নিচেই আছি , আধাঘন্টা পরে কিন্তু বোনেরা এখানে আসবে । রুচিকা বিরবির করে বলে ওই মাথা মোটাটা যদি হেল্প করে তাহলে আধা ঘন্টাই অনেক , মা বলে কিছু বললি ? রুচিকা বলে না না আধা ঘন্টা পরে তুমি ওদের পাঠিয়ে দিও । মা বেরিয়ে যেতেই রুচিকা ভেতর দিয়ে দরজাটা আটকে দেয় ………..।
( কি করতে চাইছে রুচিকা ? রুচিকা কি পারবে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে ? রুচিকার পাশে থাকবে কি ঋষব ?
সবকিছু জানতে চোখ রাখুন পরের পর্বে । )
চলতে থাকবে…………..

