Maheshwar Maji

Romance


2  

Maheshwar Maji

Romance


জোয়ার ভাটা

জোয়ার ভাটা

10 mins 875 10 mins 875

সৌর আজো তাকিয়ে আছে।নিষ্পলকভাবে। দূর ওই আকাশ পানে। আজ বসন্ত পূর্ণিমা। ধবধবে জোৎস্ন্যায় চান করছে রঙিন মনগুলো।

সৌরর মনে রুক্ষ্তা। মরুভূমির তপ্ত লু বইছে হৃদয়ের ঘরে।

সৌর তখন সবে ব্যাঙ্কের চাকরীতে ঢুকেছে। ট্রেনিংটা শেষ করেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। সরাকডিহি। ক্যাসিয়ারের পদে অনেক দায়িত্ব। সবথেকে বড় কথা,মাথা ঠান্ডা রাখা। কুলিং মেশিনে শরীর ঠান্ডা থাকে। মাথা না।

তবু লাইনের একজন মেয়ে তাকে শুনিয়ে বলে উঠল, এসির হাওয়াই বাবুর আঙুল জমে গেছে। তাই এত দেরি হচ্চে।আমাদের তো আর কাজ নেই। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি।

সৌর একবার আড়চোখে মেয়েটার দিকে চেয়ে নিল। সেটা মেয়েটা বুঝতে পারেনি।

মাত্র মিনিট দশেক পরেই মেয়েটি একটি উইদড্র স্লিপ ধরাল। একশো টাকার।

সৌর মনে,মনে হাসল। একটা জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল। তার কাজ পরিষেবা দেওয়া। তর্ক করা না।

আর একবার মুখটা দেখে নিল। এমনই।

সৌর এখনো বিয়ে করেনি।বয়স আঠাশ। বছর দুই হল বোনের বিয়ে হয়েছে।

এখন ওই তার দাদার জন্য একটি টুকটুকে বউ খোঁজার দায়িত্ব টি হাতে নিয়েছে। সৌরর বাড়ি কৃষ্ণনগরে। তার বোন থাকে গড়িয়াহাটে। হ্যাজব্যান্ডের একটি সোনার দোকান আছে রাসবিহারিতে।

এই প্রত্যন্ত গ্রামে সৌরর সবথেকে বড় সমস্যা দেখা দিল থাকার।

মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে একটা ছোট,খাটো শহর পড়ে। মেজিয়া। ওখানে একটা রুম পাওয়া যাবে। একমাস পরে। কয়েকজন ছাত্র থাকে। পরীক্ষাটা চুকে গেলেই রুমটা খালি করে দেবে।

শেষমেশ এক মাসের জন্য সরাকডিহিতেই থাকার ব্যবস্থা করতে হল।

এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান নিজে তদারকি করে সৌরর থাকার বাড়িটা করে দিলেন।

ভদ্রলোক একজন রিটায়ার মাষ্টারমশাই। বাড়িতে গিন্নী ছাড়া কেউ থাকে না। বাথরুমটা নিচে থাকাতে, একটু অসুবিধা হল। তবু একমাস এভাবে চালাতেই হবে।সবথেকে বোরিং ব্যাপার হল প্রতিবার পেচ্ছাব করার জন্যও উপর থেকে নিচে নামতে হয়। আর ততবার ভদ্রলোকের সঙ্গে সহাস্যে দৃষ্টি বিনিময় সারতে হয়।

এ যেন ঠিক সেই না বলা কথাটির ভাব বিশ্লেষণ। "এসো সখা..দেখা হবে...যতবার পাবে।"।

দিনটা ছিল রবিবার। আগের রবিবারটা ঘর গোছগাছ করতেই কাবার হয়ে গেছিল। তাই এবারের রবিবারে আয়েস করে পড়ে রইল।

বোধ হয় আটটা বাজবে, একটা মেয়ের লম্বা ডাক শুনে দ্বিতীয় ঘুম টা পট করে ভেঙে গেল। আচ্ছা শাঁকচুন্নি মেয়ে তো!

এত জোরে কেউ ডাকে নাকি?

"..কই হে দাদু। বলি আছো তো বেঁচে..নাকি শ্মশানে?"

--আরে পাগলি তুই? শুনলাম মেডিক্যালে চান্স পেয়েছিস?

--তা পেয়েছি। আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে,মনে ভাবছিলাম। চান্সটা না পেলে ব্যাঙ্কের পরীক্ষায় বসব। ঠান্ডা ঘরে বসে আরামে কাজ করব।...বুঝলে দাদু এই ব্যাঙ্কে একজন হাঁদা মতো ক্যাসিয়ার এসেছে। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের একজন। কম্পিউটারের কীবোর্ড খুঁজে পায় না। সে আর কাজ কী করবে?

সেদিন পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলতে গিয়ে কী অভিজ্ঞতাটাই না হল...

আপাতত সৌরর হিসি পেয়েছে খুব জোর। ওটা দেবে রেখে মেয়েটির কথা শোনা বড় বোকামি হবে। তাই বাথরুমে ঢুকে গেল।

ঠিক তখনি রতন মাষ্টার মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে চুপি,চুপি বলে উঠলেন, চুপ কর পুনি।

সেই ক্যাসিয়ার এখন আমাদের দোতলায় থাকেন। তোর কথাগুলো শুনেছেন মনে হয়।

নিজের অজান্তেই পূর্ণিমার জিভটা বেরিয়ে গেল।

তাড়াতাড়ি করে বলে উঠল, আমি আজ যাই। দাদু। অন্য একদিন আসব।

সৌর বেরিয়ে এসে মেয়েটির কোন চিন্হ দেখতে পেল না। ব্যাগ,চপ্পল,পারফিউম, এমন কী কথাবার্তাও না। আসামী ফেরারী। সৌর বুঝে গেল। যা বোঝার।

মাষ্টারমশাই-এর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আর একপ্রস্থ হাসি বিনিময় সারা হয়ে গেল।

হাবভাবে বলতে চাইলেন,বুঝলেন কিছু?

সৌর হাসি দিয়েই জবাব দিল,অনেক কিছু।

সেদিন ছিল পূর্ণিমা। চাঁদটা মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছিল। তাই জোসনা কখনো কমছিল,কখনো বাড়ছিল।

রাতের বেলায় আর মন চাইল না। নিচে নামতে। অথচ পেচ্ছাব তাকে করতেই হবে। সৌর উপরে উঠে গেল। একদম সহয উপায়।একটা ভালমত কোন চয়েস করে বসে পড়লেই হল।

সৌর তাই করল। হাল্কা হয়ে শুয়ে পড়ল।

পরের দিন ঘুম ভাঙল ঢোল আর করতালের আওয়াজে।

সৌর উঠে গিয়ে জানলা খুলে দেখল কয়েকজন লোকমিলে উঠোনে হরি বোল সুরে কীর্তন করছেন। গায়ের কিছু লোকজন জমা হয়েছে।

ব্যাপারটা সৌরর মাথায় কিছু ঢুকল না। তাই জামা পরে নিচে নামল।

মাষ্টারমশাই এবং তার স্ত্রী চান সেরে নতুন কাপড় পরে তুলসীথানে গলায় গামছা জড়িয়ে হাতজোড়ে বসে আছেন। এর,ওর মুখ থেকে জানা গেল। আগামীকাল পূর্ণিমা রাতে তুলসীমঞ্চে স্বয়ং চন্দ্ররাজ মধুবৃষ্টি সিঞ্চন করেছেন। তুলসী বৃক্ষের গোড়ায় এখনো মাটি ভিজে আছে।

সৌর একবার উপরের দিকে ভাল করে তাকাল। কোনের পাইপটার দুরত্ব আন্দাজে একবার মেপে নিল। পেচ্ছাবের প্রথম ধারাটায় লাফিয়ে তুলসীথান অব্দি চলে এসেছিল।

মনে,মনে ভীষন লজ্জা পেল। ভয়ও হচ্ছে। ব্যাপারটা এতদুর গড়িয়ে যাবে ভাবেনি।

সৌরর মা ডাকলেন, চল খাবি চল। নিচে আয়। কেন এভাবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস? আমি তোর মা। কী করে তোর এই কষ্টগুলো দেখি বলতো?

আজ সারা পাড়া রঙ খেলে বেড়াল। আর তুই চুপটি করে বিছানায় শুয়ে থাকলি। এসব করলে কী কেউ ফিরে আসে?...তুই বল। এসব কী তুই ঠিক করছিস?

সৌরর কথা বলতে ইচ্ছে যাচ্ছে না। অতীতের স্মৃতিগুলো তাকে বার,বার ঘিরে ফেলছে। কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। এ এক অলিখিত দাবি বলা চলে। কিছুতেই সে মনের এলোমেলো ঘরটাকে গোছাতে পারছে না। বার,বার অতীতের পাগলা হাওয়া এসে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। এটা একটা সাজাও বটে।

কাউকে অনেক,অনেক ভালবাসার কঠিন সাজা।স্বপ্ন দেখার শাস্তি।

পরের দিন মেয়েটা সোজা তার রুমে গিয়ে হাজির হল। গিয়েই বলতে শুরু করল,শুনুন মশাই আমি সব বুঝে গেছি। যতই হোক একজন বিজ্ঞানের স্টুডেন্ট তো।দাদু,দিদার ওই সব কুসংস্কার আমি পছন্দ করি না। তাই তুলসীথানের ভেজা মাটির গন্ধ শুকেই বমি চলে এসেছিল।অনেক ভেবে দেখলাম। কাজটা আপনি ছাড়া কেউ করতে পারে না। এখনো কাউকে কিছু জানাই নি।

সৌর এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল।মেয়েটার সামনে করজোড়ে বলে উঠল,আপনি আমায় বাঁচান।দয়া করে কাউকে কিচ্ছুটি বলবেন না। আমি এসব জেনেশুনে করিনি বিশ্বাস করুন।ব্যাপারটা এতদুর গড়িয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি।

মেয়েটি মনে, মনে খুশি হল।অব আয়া উট পাহাড় কে নিচে।

মুখে বলল,ঠিক আছে। বলব না। তবে ভবিষ্যতে এরকম ভুল যেন না হয়।আর হ্যাঁ, সেদিন আমি দাদুকে আপনার ব্যাপারে যেসব কথাগুলো বলেছিলাম।তা শুনে নাকি আপনি রাগে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।আমি আপনার সামনে।বলুন কী বলছিলেন?

সৌর হেসে বলে উঠল,আপনি তো সত্যি কথায় বলেছেন ম্যাডাম।এতে রাগ করার কী আছে?আমি আসলে আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য খূঁজছিলাম।

মেয়েটি বলে উঠল,ওকে।ইউ ওয়েল কাম।কী যেন নামটা আপনার?

--আগে বলুন থানায় যাবেন না?

--এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ইনারা আমার আপন দাদু,দিদা নন। বাবার বন্ধু। ছোটবেলা থেকে যাওয়া, আসা আছে। তাই।

--ও..বুঝেছি। আমার নাম সৌর সরকার। আর আপনার?

---পূর্ণিমা বাগচি। সবাই পুনি বলেই ডাকে। তবে আপনি কোনদিন সে নামে ডাকবেন না কিন্তু ।

নর্মদা ডাইনিং টেবিলে খাবারগুলো কিচেন থেকে এনে জড়ো করে বলে উঠল,দাদা এখনো নামেনি?

তার স্বামী পুলক বলে উঠলেন, দেবদাসবাবু একা, একা ছাদে বসে আছে। ওকে একমাত্র তুমিই পারবে বাঁচাতে।

ওর মা দুঃখ করে বলে উঠলেন, ছেলেটার দিকে তাকালেই আমার কান্না আসে। ওকে যে আমরা কতটা ভালবাসি সেটা কে বোঝায়?

নর্মদা তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, তোমরা শুরু করো। আমি গিয়ে দেখছি। যতই হোক দাদা তো আমার। হারতে দেব না।

সেবার রানীগঞ্জ স্টেশনে সৌরর সাথে পূর্ণিমার দেখা হয়ে গেল। দুজনের গন্তব্যস্থল কোলকাতা। সৌর দুদিনের ছুটিতে বোনের বাড়ি যাচ্ছে।

একটা মেয়ে নাকি পছন্দ হয়েছে। সৌরকে দেখার জন্য ডেকেছে। ওখান থেকে পরের দিন কৃষ্ণনগর যাবে।

আর পূর্ণিমা কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজে যাচ্ছিল। সঙ্গে অনেকগুলো ব্যাগ,পত্তর ছিল। ও যখনি বাড়ি আসে। যাওয়ার সময় প্রতিবার ওভারলোড বয়ে নিয়ে যায়। তারজন্য দায়ী সে নিজেই। খুব পেটুক। আর বাইরের খাবার সে খুব কম খায়। লুকিয়ে রাখতে হয়। না হলে রুমের মেয়েগুলো আরো বড়,বড় রাক্ষস।

মিনিটে আচারের ডিবে সাবাড় করে দেবে।

দেখা হতেই পূর্ণিমা গার্জেনের মত সৌরকে বলে উঠল,বড় ব্যাগটা সাথে রাখুন তো। হাতটা আমার মুক্তি পেল।

সৌর নিজে কখনো এসব লাগেজ পছন্দ করে না। এতদুর কাজে এসেছে তবু একটা ছোট মত পিঠ ব্যাগ ছাড়া কিচ্ছুটি আনেনি। বোঝা বয়ে নিজের এনার্জি লস করার সে বীরুদ্ধে।

কিন্তু এই মুহূর্তে পূর্ণিমার প্রস্তাব সে অগাহ্য করতে পারল না। পিছনে ছাদের কেসটা ঝুলে রয়েছে। উপায় নেই।

সেবার সারা রাস্তা পূর্ণিমা একা গল্প করে গেল সৌরর সাথে। সৌর শুধু হু,হ্যাঁ আর কখনো ঘাড় নেড়ে সায় দিচ্ছিল।

ট্রেনটা ব্যান্ডালের একটু আগে সিগন্যাল-এর কারণে এক সময় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে গেল।

প্রায় এক ঘন্টা। অনেক যাত্রী নেমে গিয়ে বিকল্প বাহনের ব্যবস্থা করে বেরিয়ে পড়লেন।

বিরক্ত এক সময় সৌরর এসেছিল। ততক্ষণে তার আর যাওয়ার উপায় ছিল না।

কারণ তার ডান কাঁধের উপর ভর করে পুর্ণিমা নামক মেডিক্যালের বাচাল ছাত্রটি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেই প্রথম সৌর ভাল করে প্রথম কোন মেয়েকে খুঁটিয়ে দেখল।

কী সুন্দর লাবন্যমাখা মুখ!..গালের কাছটাই হাসলে টোল পড়ে। তার চিন্হ স্পষ্ট বোঝা গেল। একগুচ্ছ অবাধ্য রেশমি চুল তার নরম গালে অল্প ঘামের সাথে লেগে আছে। ঠোঁটদুটো অল্প শুকিয়ে যাওয়াতে সৌরর বুকে একটা অবৈধ খেয়াল তড়িতের মত এসে আর মিলিয়ে গেল। মুখটা ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে।

ততক্ষণে পূর্ণিমার ঘুম ভেঙে গেছে। সাইরেনের শব্দ পেয়ে।

ঘাড়টা সোজা করতে গিয়ে উু.. করে চেঁচিয়ে উঠল। কানের দুলটা ফেঁসে গেছে সৌরর টি-শার্টের সুতোয়।

পূর্ণিমার তো কান্না আসার জোগাড়। আর এদিকে সৌরর অনভ্যস্ত হাত। এই সব ঝামেলা সৌর কোনদিন পোহায়নি। জানবে কী করে?..কোনদিকে ঘোরালে মুক্ত পাবে ঘোর আসামীটি?

শেষে একজন মহিলা সহযাত্রীর প্রচেষ্টায় সে যাত্রায় বাঁচা গেল।

তারপরেই এক নাগাড়ে সৌরকে অনেকক্ষণ পুর্ণিমা শুধু বকে গেল। এ যেন তার অধিকার। কীসের অধিকার আর কেন সে সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে এত কথা?

সে প্রশ্নের উত্তর তো তারা দুজন জানে। বাকিরা তো সবথেকে সহজটাই ভেবে নিলেন।

যাই হোক সে বার সৌর মেয়ে দেখেও এল। সাথে নর্মদা আর পুলকও গেছিল।

সৌর এক সময় সবার কথামত মেয়েটির সাথে ব্যালকনিতে গেল আলাপ করতে।

দুজনের মধ্যে অনেক রকম কথা হল। কিন্তু সৌরর মনের পর্দায় শুধু পূর্ণিমার ছবিটাই ঢেউ খেলছিল। ওর কথাগুলোই ঝন ঝন করে দুকানে বাঁজছিল।

সামনের মেয়েটি কী বলল তার মনে নেই।

এক সময় মেয়ে দেখা শেষ করে বোনের বাড়িতে ফিরে এল।

নর্মদা রাতে খাবার টেবিলে সৌরকে জিজ্ঞাসা করল, কীরে দাদা...কিছু বল।ভদ্রলোক একটু আগেই ফোন করে জানতে চাইছিলেন। আসলে উনাদের তাড়া আছে।

সৌর সংক্ষেপে বলে উঠল,এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি নারে। কয়েকদিন পর জানাব।

নর্মদা শুধু একটা কথায় বলল,মেয়েটা কিন্তু যথেষ্ঠ সুন্দরী। তার উপর এম.বি.এ করে রেখেছে।দুদিক দিয়েই সাপোর্ট পাবি।

সৌরর চিন্তা সে সব নিয়ে না। আসলে তার মনের ভিতরে একটা প্রজাপতি ডানা মেলেছে। সেদিকেই সে আনমোনা তাকিয়ে আছে।

খুব শীঘ্রই পূর্ণিমার সঙ্গে তার দেখা হওয়া দরকার। মনের ভিতরে এই কয়েক ঘন্টা ব্যবধানেই তাকে না দেখতে পাওয়ার একটা তৃষ্ণা চাগাড় দিয়ে উঠেছে।

কেন?..এর উত্তর সে নিজেও জানে না।

দু দিনের ছুটিটা বেড়ে সে বার চার দিনে গিয়ে ঠেকল। একটা দিন তো পুরো গিয়েছিল। শুধুমাত্র মেডিক্যাল কলেজে পূর্ণিমা বাগচি নামের স্টুডেন্টটিকে পাকড়াও করতে।কত জায়গা ঘুরে কত জনকে যে মিথ্যে কথা বলে শেষ পর্যন্ত তার মনের তৃষ্ণাটা মিটেছিল। একমাত্র সেই জানে।

তবু বেশিক্ষণ কথা হয়নি। মিনিট পাঁচেক। তারপরেই পুর্ণিমার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ছিল ।বাই,বাই জানাতে হয়েছিল।

  তারপরদিন দেখা হল। তাও সেই বিকেল পাঁচটাই। গঙ্গার ধারে।হাওয়া খেতে,খেতে ।

পূর্ণিমা কথা বেশি বলে আর পরিস্কার ভাবে বলতে পছন্দ করে।

তাই কোন রকম ভুমিকা না টেনেই বলে উঠল, সোজা কথা হল। আপনি আমায় ভালবেসে ফেলেছেন এই তো?

সৌর ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

পূর্ণিমা হেসে উঠে বলল, আচ্ছা আমার কী দেখে, আপনার পছন্দ হল সত্যি করে বলুন তো?

সৌর দুষ্টু চোখজোড়া তুলে হাতের ইশারাই পূর্ণিমার কানটা দেখিয়ে বলল,ওটা দেখে। পূর্ণিমার হাসি আর থামে না।

তবু কোনরকমে সংবরণ করে বলে উঠল,কান দেখে?

সৌর বলে উঠল, দুল।

পূর্ণিমা আবার এক চোট হেসে বলে উঠল,হাঁদাবাবু এটা সোনার নয়। সিটি গোল্ডের।

সৌর বলল,তা হোক না। কিন্তু ও আমার শার্টের সুতো ধরে মনটাকে আপনার সাথে গেঁথে দিয়েছে। তাই ওকে আমার খুব পছন্দ।

এবার কিন্তু পূর্ণিমা আর বিন্দুমাত্র হাসল না। অপলকভাবে চেয়ে থাকল সৌরর দিকে।

একটু পর সৌর বলে উঠল, চিন্তা করো না। তোমায় কোন দুঃখ দেব না। সবটুকু সুখ আমি তোমার পায়ের নিচে সাজিয়ে দেব। তুমি শুধু হাতটা কোনদিন আলগা করো না।

পূর্ণিমা সিরিয়াসভাবে বলে উঠল, এখনো সময় আছে। ভেবে দেখো। এটা ক্ষণিকের মোহ নয় তো?...আসলে কোন, কোন সময় আমাদের শরীরে কিছু অচেনা হরমোন বড় ধোকা দিয়ে বসে। রিয়েল আর ইলুশনের পার্থক্যটা ধরা পড়ে কয়েকদিন যাওয়ার পর।

সে রকম কিছু হলে, সময় নিয়ে দেখতে পার।

সৌর জবাবে বলেছিল, তুমি ভুল ভাবছ পূর্ণিমা। আমি কিন্তু আঠাশ প্লাস। এই বয়েসে ওই সব হরমোনের সিক্রুয়েশন একদম অল্প থাকে।

এরপর পূর্ণিমা আর সৌরর থেকে আলাদা থাকল না।

মিশে গেল একটা মেয়ে একটা ছেলের মধ্যে। মনে, প্রাণে। বলতে পারো রক্তে।

নর্মদা পিছন থেকে ডাক দিল, এই সৌর চল খাবি চল। আর কতক্ষণ চাঁদটার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকবি দাদা?

সৌর চোখদুটো মুছে বলে উঠল, আমি যে পারছি না ছুটকি।

ওকে ভুলতে পারছি না। কী করে ভুলব বল?..ও একদিন বলেছিল। পূর্ণিমাতে আমার জন্ম তাই মা,বাবা আমার নাম রেখেছিল পূর্ণিমা। আমার বিশ্বাস, আমি যেদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেব। সেদিনও পুর্ণিমা হবে। সেদিন আমি বাঁধা দিয়ে আর কোন কথা বলতে দিইনি।

তা দেখে বোধ হয় ঈশ্বর সেদিন খুব হেসেছিলেন!

তাই আমি পূর্ণিমার চাঁদটাকে কেঁদে, কেঁদে শুধাই ,...কোথায় লুকিয়ে রেখেছ আমার পূর্ণিমাকে?

তাকে আর একটি বার আমার কাছে পাঠাও। কথা দিলাম এবার বুকের মাঝে চব্বিশ ঘন্টা আগলে রাখব। আর একটা মিনিটও একা ছাড়ব না।

নর্মদার দু চোখ ভরে উঠল। তার দাদার আর্তি দেখে সেও ভেঙে পড়ল। ভাঙা দেওয়ালের মত।

সৌরর পিঠে হাত ঠেকিয়ে বলে উঠল, শান্ত হ দাদা, একটু শান্ত হ। তুই এভাবে ভেঙে পড়লে, তোকে যারা মন, প্রাণ দিয়ে ভালবাসে তারা যে বেঁচে থেকেও মরে যাবে দাদা। একবার মা,বাবা আমাদের কথা চিন্তা কর। আমরা যে তোকে সুখি দেখার জন্য বেঁচে আছি।

...যে পূর্ণিমা জীবন থেকে বিদায় নিয়ে চিরদিনের মত অন্য জগতে হারিয়ে গেছে। তাকে আর খুঁজে লাভ কী বল?

...অন্য কোন মেয়েকে নিজের পূর্ণিমা করে জীবনটা সাজিয়ে তোল দাদা।

সৌর কাপা গলায় বলে উঠল, পারছি না ছুটকি। কিছুতেই পারছি না। শত চেষ্টা করছি তবু ওর স্মৃতির ঘ্রাণ আমার সমস্ত বোধ বুদ্ধিগুলোকে দমিয়ে দিচ্ছে।

...জানিস ছুটকি!

সেদিন কিন্তু হাসপাতালে ওর নাইট শিফ্ট ছিল না। নাইট শিফ্টের সবাই দোলের ছুটি নিয়েছিল। কয়েকটা পেসেন্টের সিরিয়াস কন্ডিশন দেখে পূর্ণিমা অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

বিবেকে বেঁধেছিল। তাই রাতটা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ও কিন্তু নাইট শিফ্টে কোনদিন ঘুমতো না। সেবার দিনে, রাতে ডিউটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বোধ হয়। তাও আবার ভোরবেলা। ভোর সাড়ে তিনটে।

কোথা থেকে আগুনটা লেগে ছিল। আজ অব্দি ফরেন্সিক টিম উদ্ধার করতে পারল না। এতগুলো পেসেন্টের সাথে পূর্ণিমাও আর ফিরল না। ইউনিটের একজনকেও উদ্ধার করা যায়নি।

...এর পিছনে ঈশ্বরের নির্মম হাত ছাড়া আর কাকেই বা দোষ দেওয়া যায়?

বার্ণ ইউনিটে গিয়ে আমি সেদিন আমার ভালবাসাকে চিনতেই পারতাম না। যদি না আমার দেওয়া আংটিটা ওর আঙুলে পরা থাকত।

ভালবাসার মানুষটিকে কোনদিন এমন রূপে দেখতে হবে, কল্পনা করিনি রে বোন। তুই বিশ্বাস কর ছুটকি।

আমি এখনো ঘুুমের মাঝে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠি।

নর্মদা নিজেকে শক্ত করে বলল,দ্যাখ দাদা। আমরা কেউ তো পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নই। সবাইকে একদিন,কালের নিয়মে চলে যেতে হবে। কেউ আগে,কেউ পরে।তারজন্য দুঃখ সবাই পায়। কিন্তু কেউ তো আর বাঁচা ছেড়ে দেয় না। সেটা করাও অন্যায়। ঈশ্বরও রাগ করেন।

তোকেও বাঁচতে হবে দাদা।

এভাবে নিজেকে কষ্ট দিলে পূর্ণিমার আত্মাও কোনদিন শান্তি পাবে না। কারণ সে তোকে আজও ভালবাসে।

তাই সে উপর থেকে তোকে সুখী দেখতে চায়।

যে মেয়েটাকে প্রথমবার দেখতে গেছিলি। ওরা কালকেও একবার ফোন করেছিলেন। আমরা কোন উত্তর দিইনি। আমি বলছি। মনটাকে বোঝা।

পূর্ণিমার চলে যাওয়া আজ এক বছর হয়ে গেল।

আর কতগুলো বসন্ত এভাবে বেরঙিন যন্ত্রনায় কাটাবি বল?

...হয়ত কাকতালীয়। ওই মেয়েটির নামও পূর্ণিমা। কী অদ্ভুত ঈশ্বরের লীলা দ্যাখ!!

সৌর হঠাৎ করে উঠে পড়ে বলল, পূর্ণিমা?

নর্মদা বলে উঠল, কী জানি হয়ত তোর সেই হারিয়ে যাওয়া পূর্ণিমাই অন্য রূপে তোকে ধরা দিতে চাইছে!!

সৌর চোখদুটো ভাল করে মুছল।

নর্মদা বলে উঠল, অনেক রাত হল।খাবি চল।


Rate this content
Log in