Bhaswati Ghosh

Drama Tragedy


3  

Bhaswati Ghosh

Drama Tragedy


হঠাৎ দেখা

হঠাৎ দেখা

11 mins 9.7K 11 mins 9.7K

“শালা পেটের জ্বালায় রাস্তায় দাঁড়ানো মেয়েরা অচ্ছুৎ, প্রস্টিটিউট! আর তোদের ঘরে যে ছেলে দেখলেই ছোঁক-ছো‌ঁকানি মোমের পুতুলের সে খবর রাখিস গান্ডুগুলো?অবশ্য মালগুলো নিজেরাও তো সমান।বউএর সামনে আঁচল ধরা পেট-ডগ আর পেছনে এক একটা….”

নিলয়ের টেম্পার দেখেই অর্ক বুঝতে পারে আজকে পার্টির বাড়িতে বোধহয় কিছু হয়েছে।”আরে আরে কুল ব্রাদার, কি হল রে আবার?”-হেসে জিজ্ঞাসা করে ও।

মাফলারটা গলায় জড়িয়ে নিয়ে নিলয় মুখ দিয়ে একটা বিরক্তি সূচক শব্দ করে বলে-”আর বলিস কেন ভাই! মালটা তিন দিন ধরে যেতে বলছে৷ আমি ভাই সকালে টাইম দিলেই দুপুরে কর,দুপুরে কর ঘ‍্যানঘ‍্যান মারাচ্ছিল। নিয়মিত খরিদ্দার ,আজ দুপুরে তাই ছুটলাম।ও মা! মাল দেখি কাজের লোককে আউট করে নাইট ড্রেস পরে...

নিলয়কে কথা শেষ করতে না দিয়েই অর্ক শব্দ করে হেসে ওঠে। কিন্তু নিলয়ের বিরক্তিকর মুখটা দেখে কোন রকমে হাসিটা গিলে নিয়ে মজার গলায় জিজ্ঞাসা করলো -

''তারপর চাখলি নাকি বে?”

''হ্যাঁ রে তোদের মতো? নিলয় আরও রেগে গিয়ে বললো।

“তাহলে কি করে বৌদির বাহুডোর থেকে মুক্ত হলে চাঁদ?”

অর্কের বলার ধরনে নিলয় এবার হেসে ফেলে।-”কেন ভাই, চিরপরিচিত ট্রিক্স৷ জল আনবেন একটু প্লিজ।”-হালকা হেসে বলে নিলয়।

ওদের কথার মাঝেই নিলয়ের ট্রেন এসে পড়ে।

অর্ক হঠাৎ করেই ভারী গলায় বলে ওঠে -”আসলে সেলসে চাকরি করা আমাদের শালা সব দিকেই….এদিকে টার্গেট ফুলফিল না হলে বসের খিঁচুনি,ওরা মাল তো আর বোঝে না মার্কেটে কি ধরনের পাবলিক আমাদের হ্যান্ডেল করতে হয়?পাবলিকের চোখে আমরা হলাম শস্তা মাল।দূর দূর ঘেন্না ধরে গেল লাইফে।”নিলয় হাল্কা করে অর্কের পিঠে হাত রেখে ট্রেনের দিকে এগিয়ে যায়। 

সামনের রো'তে বসা ভদ্রলোককে তিনবার ডাকার পরেও চোখ না খোলায় নিলয় মনে মনে কাঁচা খিস্তি করে তিন নম্বর রো'এর দিকে এগিয়ে যায়। তিন নম্বর রো-এর জানালার ধারে বসা বয়স্ক ভদ্রলোকটি মুচকি হেসে জানালার পাশটা নিলয়কে ছেড়ে দিলেন।অনেকক্ষণ পর বিরক্তি-টা একটু কাটে নিলয়ের।এখন প্রায় এক ঘন্টা নিশ্চিন্ত।হেডফোনটা পকেট থেকে বার করার সাথে সাথেই পরের স্টেশন চলে আসে।

গেটের মুখে ফেডেড্ জিন্স,ব্ল্যক টপ আর পিঙ্ক সোয়েটারে হঠাৎই চোখটা আটকে যায় নিলয়ের।হাতে দামী মোবাইল, মাথায় পরে থাকা পিঙ্ক স্টাইলিশ ম‍াঙ্কি ক‍্যাপটা আরও মিষ্টি করে তুলেছে ধারালো লালচে মুখটাকে।স্ট্রেইট চুলটা কোনো রকম দুষ্টুমি ছাড়াই ছড়িয়ে পড়েছে ঘাড় ছাড়িয়ে।সাথে ঠোঁটে পুরু লিপস্টিক এর জাদু।কিন্তু চোখ! নিলয় এর অভিজ্ঞ দৃষ্টি আটকে যায় মেয়েটার চোখ দুটোয়।মৃদু হাসি খেলে যায় নিলয় -এর মুখে।হেডফোনটা কানে গুঁজে আরামের শব্দ করে মাথাটা হেলিয়ে দেয় সিটে।

এতক্ষণ ঘুমের জগৎ-এ সাঁতার কাটা ভদ্রলোকটি হঠাৎই ব্যস্ত ভাবে জায়গা করে দেয় মেয়েটিকে।

“শালা সুন্দরী মেয়ে দেখলেই চুলকানি বেড়ে যায়”-বিড়বিড় করে নিলয়।পাশে বসা বয়স্ক ভদ্রলোকটির কানে পৌঁছে যায় কথাটা।হা-হা করে হেসে উঠে নিলয়ের পিঠে হাল্কা চাপড় দিয়ে বলেন-”যা বলেছ দাদুভাই”।কিছু কিছু মানুষ থাকে কখন যেন মামুলি আলাপ করতে করতেই অজান্তেই হয়ে ওঠে আপন।বয়স্ক মানুষটিও তেমন ভাবে নিলয়কে বেঁধে ফেলে দাদু নাতির সম্পর্কে। কথা বলতে বলতে কখন যে আধঘন্টা কেটে গেছে নীলয়-এর খেয়ালই থাকেনা।হুঁশ ফেরে দাদু যখন গন্তব্য নামবার জন্য উঠে দাঁড়ায়। ”প্রফেসারি জীবন-এ অনেক তো ছাত্র ঠেঙালাম, চোখ আজও তাই জহর চিনতে ভুল করেনা ।জীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে৷ ফাইট, দাদুভাই ফাইট,ফাইট”।-দাদুর বলে যাওয়া কথাগুলো অনেক দিন পরে বুকে কেমন একটা চাপ দিয়ে যায় নিলয়কে।দুরন্ত জীবন, হাতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টের রেজাল্ট,পায়ে পায়ে দুরন্ত বলের শট, দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় তরুণ হৃদয় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া কবিতার রামধনু বৃষ্টি। ছিল,সব ছিল।আর এখন!এখন শুধুই ডাল ভাতের জোগাড়। একের পরে দুই, দুই এর পরে তিন শুধু জীবনের হিসাব কষা।একটা বেদনার হাসি ছেয়ে যায় নিলয়ের মুখে।

“বাজপাখির চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয় ফুলপরী।তোমার ঐ লাট্টুর মত ঘুরে যাওয়া চোখই আমায় বলে দিয়েছে তোমার মাল, ধান্দা অন‍্য।শুধু কয়েক সেকেন্ড একটু আনমনা হয়েছি শালা দাদুর পকেটটা মেরে দিলে!”-পিছন থেকে নিলয়ের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো শুনে একটু থমকে যায় মেয়েটি।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে হিসহিসে গলায় বলে ওঠে-”আমি কিন্তু চিৎকার করলে….”

মেয়েটির কথা শেষ করতে না দিয়েই নিলয় বলে ওঠে-”হুম করতেই পার চিৎকার,কিন্তু তোমার ব‍্যাগের মধ‍্যে লুকানো দাদুর ব‍্যাগটা যে অন‍্য কথা বলবে সুন্দরী।”

“দাদু”....-তুতলে ওঠে মেয়েটি। 

“হুম দাদু ফুলপরী,ওসব কথা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি ব‍্যাগটা দাও ওনাকে হয়তো এক্ষুনি পেয়ে যাব”-ধমকের সুরে বলে ওঠে এবার নিলয়। 

কিন্তু ছোট্ট স্টেশনের কোথাও দেখা যায় না মানুষটিকে।আপশোস্ হয় নিলয়ের।একটু আগে যদি খেয়াল করত।ট্রেনটা প্রায় ছাড়ার মুহূর্তে খেয়াল করেছে।ছুটে নামতে গিয়ে পায়েও হালকা চোট লেগেছে।কিন্তু এত কষ্ট করার পরে জিনিস-টাই ফেরৎ দিতে না পারলে….

চল আশেপাশে দাদুর নাম ধরে খোঁজ করি।যদিও ও জানে দাদুর নাম বললে ,এখানে কেউ বোধহয় চিনবে না।এখানে তো কোন বন্ধুর বাড়ি আসছিলেন বললেন।তবু একটা শেষ চেষ্টা।।

মেয়েটির চোখ দুটি হঠাৎ জলে ভরে আসে।কেমন একটা মায়া লাগে নিলয়ের।হয়তো নতুন এই লাইনে।”ভয় নেই, ভয় নেই, চল বলব তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ ব‍্যাগটা”-আশ্বাস দেয় নিলয়।

কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা চায়ের দোকানে খোঁজ নেয়, কিন্তু যথারীতি এ নাম অচেনা তাদের কাছে।

জায়গাটা গ্রাম ঘেঁসা ছোট্ট মফঃস্বল।রোজই এই স্টেশন পার হয়ে চলে যায় নিলয়।এই প্রথম নামা এখানে।টাইট জিন্স টপে মেয়েটি আশেপাশের লোকজন এর কৌতূহল জাগিয়েছে, তাদের বার বার ঘুরে ফিরে দেখা থেকে সহজেই বুঝতে পারে নিলয়।কিন্তু এই শীতের সন্ধ্যা তে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের আমেজ উপেক্ষা করতেও ইচ্ছা যায়না ওর।মেয়েটিকে ইশারায় বসতে বলে নিজেও পাশে বসে ।মিটমিট করে নিলয়কে হাসতে দেখে মেয়েটি চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে -”কি ব‍্যাপার হাসছেন কেন?”

“তোমাকে দেখে।”-হেসে বলে নিলয়।

মেয়েটি এবার বিরক্ত হয়ে বলে-”অপরের অসহায়ত্ব দেখে সকলের হাসিই পায়!”

নিলয় তাড়াতাড়ি বলে,-”না না সে ব্যাপার না আসলে নিখুঁত মেক-আপের ডাকসাইটে সুন্দরী ,এই চায়ের দোকানে আমার মত একটা মালের পাশে বসে আছে দেখে আশপাশের লোকজন বমকে গেছে।নিশ্চই ভাবছে সকলে, এমন একটা মালকে বাগালো কি করে….যাই বলো কার বাবার সাধ‍্যি বুঝবে তুমি পকেট কাটো!”....

“কেন আপনি তো বুঝলেন”-কিছুটা যেন দীর্ঘশ্বাসের সাথে কথাটা বলে মেয়েটি।নিলয় এতক্ষণে কিছুটা গভীর চোখে তাকায় মেয়েটির দিকে,কেমন একটা মন খারাপের বাতাস যেন ছেয়ে আছে মেয়েটিকে ঘিরে।নিলয় এবার কিছুটা হাল্কা স্বরে বলে,-”হ‍্যাঁ মানুষকে দেখে কিছুটা বোঝার ক্ষমতা এই অধমের আছে।”

মেয়েটি এবার কিছুটা ব‍্যঙ্গের স্বরে বলে,-”তাই নাকি!এত কনফিডেন্স?সকলকেই ঠিক ঠাক চিনেছেন ভেবে দেখুন তো।”এবার যেন কিছুটা থমকে যায় নিলয়।কয়েক মিনিট নীরব থেকে নিজেই বলে,-''একজন কে ভুল চিনেছিলাম।''

“কাকে?নিশ্চই এক্স এর ব‍্যাপার।যা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন…”-হেসে জিজ্ঞাসা করে মেয়েটি। 

দূরের দিকে তাকিয়ে নিলয় আনমনেই উত্তর দেয়-”না, সে আমার বর্তমান; আমার একমাত্র বাঁচার আকাশ , মেঘলা আকাশ শেষের একমুঠো সোনালী রোদ”। 

“গল্পটা তা হলে একটু শোনা যাক''-আগ্রহ নিয়ে বলে মেয়েটি।

হেসে ফেলে নিলয় মেয়েটির ছেলেমানুষের মত বলার ধরনে।না মেয়েটার মাঝে এখনও রয়েছে একটা সবুজ হৃদয়।হয়তো অভাবের তাড়না বেচারিকে এনে ফেলেছে এ-পথে।

নরম গলায় বলে নিলয়,-''শুনবে?কিন্তু রাত যে বাড়ছে ম‍্যাডাম।চল স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলা যাবে।”চায়ের দাম মিটিয়ে দুজনে হাঁটতে থাকে পাশাপাশি। 

রাস্তার স্ট্রিট লাইট তেরছা ভাবে এসে পড়েছে দুজনের মুখে।চোখের তারার মধ্যে যেন জোনাকির মিটমিট।শীতের কুয়াশার চাদর মফঃস্বল এর ছোট্ট রাস্তাটিকে অল্প অল্প ঘিরে ফেলেছে।মাঝে মাঝে দু'এক জন পথচারীর কৌতূহলী চাহনি অচেনা মুখ দেখে।দুজনেই হঠাৎ করে যেন নিজের নিজের জগৎ-এ হারিয়ে যায়।হঠাৎ রাস্তার কোনে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা নেড়ি কুকুরের ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়ে।মেয়েটিই আবার জিজ্ঞাসা করে-”কই বলুন?”

“কোথা থেকে শুরু করি বলো তো?”-মাফলারটা গলায় ভালো করে পেঁচিয়ে নিতে নিতে বলে নিলয়‌।

“আগে বলুন দেখতে কেমন ছিল, নিশ্চয়ই অসাধারণ সুন্দরী?”মেয়েটির বলার ধরণে শব্দ করে হেসে ওঠে নিলয়। হাসি থামলে যেন এক দূর থেকে ভেসে আসে নিলয়-এর কণ্ঠ”আমি তো তাকে দেখিনি।কথা ছিল একে অপরকে দেখবো সাক্ষাৎ এ দুচোখ দিয়ে।আসলে দেখার বাইরে যে না দেখা টুকু থাকে ,আমার চোখে সে ছিল তাই।”ক্কি ক্কি নাম ছিল তার?”-কিছুটা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে মেয়েটি। 

“দীপ্তি!নিলয়-এর দীপ্তি!” 

কিছুটা কেঁপে ওঠে মেয়েটি।অস্ফুটে দুবার উচ্চারণ করে -'দীপ্তি' নামটা।নিলয় তখন আনমনে বলে যেতে থাকে ওর দীপ্তির কথা৷ফেসবুকের এক কবির সাথে পাঠিকার কবিতার আলাপচারিতার মাঝে ধীরে ধীরে বাড়ে কথার পরিধি।কবি বুঝতে পারে পাঠিকার মনেও রয়েছে এক কবি মন।কবির উৎসাহে পাঠিকাও কলম ধরে।দুজনেই খুঁজে পায় একে অপরের মনের মাঝে বড্ড মিল।তবু কেউ ব্যক্তিগত পরিধিতে চায়না অকারনে উঁকি দিতে।দেখতে চায়না একে অপরকে ছবির মধ্যে।

কবি শুধু কল্পনার রঙে রাঙিয়েছে তার মানুষীর মূর্তি।সে কল্পনা বহুবার মিলে গিয়ে অবাক করেছে পাঠিকাকে।ডিভোর্সী মা এর ,বহু কষ্টের মাঝে তাদের ভাই বোনকে মানুষ করার সংগ্রাম পাঠিকার হৃদয়কে করে তুলেছিল প্রেমহীন ধূ ধূ মরুভূমি।তবু তিরতির করে কেঁপে উঠেছে পাঠিকার গোলাপী ঠোঁট, কবির কবিতার লাইনে-”আমার মৃত্যু ঘটুক মানুষী তোমার ওই চিবুকের কালো তিলে।”অকারণেই কেন লজ্জ্বায় দুগাল রেঙে উঠেছে আবির লালে বোঝেনি পাঠিকা।কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা করার, পাশে থাকার শপথ ভুলে পাঠিকা হারিয়ে গেছে কোন কিছু না বলে কবির জগৎ থেকে।ফেসবুকের অ্যাকাউন্ট ডিলিট হয়ে গেছে কবির অজান্তেই।তবুও বারবার তন্নতন্ন করে খুঁজে ফিরেছে কবি তার পাঠিকাকে।আর কোন মাধ্যমও  ছিলনা কবির কাছে যোগাযোগের ।তবে কি আর পাঁচটা ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডের সমগোত্রীয় সে? কবির হৃদয়কে বিদ্ধ করেছে সংশয়ের তীর।কিন্তু সে যে অন্য রকম।কিছুতেই কবি মেলাতে পারেনি তাকে আর পাঁচের দলে।ভুলতে পারেনি কবির হৃদয় সেই কালবৈশাখী ঝড়ে ওলট পালট হয়ে যাওয়া দিনে তার দৃঢ় হাতের বন্ধন।

চিট ফান্ডে মাসমাইনের কর্মচারী হয়ে চিটিংবাজ, জোচ্চর আরও বাছা বাছা বিশেষণে ভূষিত হয়েছে কবি অথাৎ নিলয়ের নির্বিবাদী বাবা।চিরদিন সকলের চোখে সৎ মানুষটি হঠাৎ ঘৃণিত হয়ে পারেনি সেই ধাক্কা সামলাতে।চিরকালের জন্য ব্রেইন হ‍্যামারেজে চলে গেছেন সমস্ত বোধ বুদ্ধির অন্তরালে।পড়াশোনা, খেলাধূলা আর নিজস্ব জগতে ব‍্যস্ত নিলয়ের জীবনে হঠাৎ নেমে এসেছে নিকষ কালো অন্ধকার।চেনা মুখগুলো হঠাৎ হয়ে উঠেছে মুখোশে ঢাকা এক একটা মুখ।এতদিন সকলের চোখে হিরো নিলয় এক নিমেষে হয়ে উঠেছে 'চোরের ছেলে চোর'।বন্ধু মহলে হয়ে উঠেছে অচ্ছুৎ।তার সাথে বাবার মৃতপ্রায় অবস্থায় অসহায় বোন আর মায়ের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে নিলয়।এতদিনের তিলতিল করে দেখা স্বপ্নগুলোকে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়তে দেখেছে নিলয়।প্রফেসর হবার স্বপ্ন গুমড়ে কেঁদে হারিয়েছে অন্ধকারে ।কবির তারা ফুলে ঘেরা জগৎ, বাস্তবের খটখটে গদ্যময় জগৎ-এ বারেবারে মাথা কুটে ফিরে গেছে কবিকে শূন্য করে।সব কিছুর জন্য নিলয় দায়ী করেছে বোধ-বুদ্ধিহীন শুধু ফ‍্যালফ‍্যাল করে ভাষাহীন ভাবে চেয়ে থাকা বাবার দেহটাকে।নিজেকে শেষ করে নিতে চেয়েছে প্রতিশোধ নইলয়ের অভিমানী মন।

কিন্তু সেই অন্ধকারে আচ্ছন্ন অভিমানী হৃদয়কে পাঠিকা অথাৎ দীপ্তি তার বন্ধুত্বের আলোয় ভরিয়ে তুলেছে।অবুঝ নিলয়কে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছে তাকে আজ কতটা প্রয়োজন তার অসহায় পরিবারের।কতটা অসহায় আজ তার নির্দোষী বাবা।নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচা সে তো স্বার্থপরতা।জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া সে তো কাপুরুষতা।সব কিছু শেষ হয়ে গেছে ভাবনায় তলিয়ে যাওয়া নিলয় আবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছে বাঁচার মানে।

সেই !সেই দীপ্তিকে কিছুতেই নিলয় বসাতে পারেনি দুদিনের আসা যাওয়া ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডের আসনে।নিলয়ের হৃদয় দীপ্তির জন্য রক্ষিত গোপন কুঠুরিতে বসাতে পারেনি আর কোন মেয়েকেই।নিলয়ের প্রেমিক মন আজও অপেক্ষায় তার জীবনের দীপ্তির।

কথা শেষ হয় অনেকক্ষণ।এক নিশ্ছিদ্র নীরবতা হঠাৎ করে ভীষণ ভাবে ঘিরে ধরে দুজনকেই।স্টেশনের একটা সিমেন্টের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে দুজনে।হঠাৎ এক মেলগাড়ি তীব্র শব্দতুলে স্টেশন পার হয়।নিলয় তখনি আবিষ্কার করে মেয়েটির আইলাইনারে আঁকা দুচোখ জলে টলমল।আর দেহ জুড়ে তীব্র কাঁপুনি।

“কি হল তোমার?এনি প্রবলেম?”-অবাক গলায় প্রশ্ন করে নিলয়।

“না আসলে শীতে”....কোন রকমে ভাঙা গলায় উত্তর দেয় মেয়েটি। 

নিলয় ব‍্যস্ত হয়ে একটু গরম চায়ের খোঁজে যায়।

“আমার ট্রেন এবার আসবে।এই নিন ব‍্যাগটা।”-মেয়েটা ব‍্যাগটা এগিয়ে ধরে নিলয়ের দিকে।  

“কি করবো আমি?”-নিলয় হাল্কা হেসে বলে। 

“যদি খুঁজে পান মানুষটাকে দিয়ে দেবেন।”-মেয়েটি বলে।

“কি হবে তাতে?আবার তো কাল অন্য কারো”...নিলয়ের কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই মেয়েটি হাল্কা স্বরে হুম্ বলে। 

নিলয় যেন একটু ব্যথিত গলায় বলে,-”আমার মন কিন্তু বলছে এ কাজ তোমার উপযুক্ত নয়”

“কি ভাবে বুঝলেন?না সুন্দরী মেয়ে দেখে মনে হলো?”-ব্যঙ্গের গলায় বলে ওঠে মেয়েটি।

নিলয় এবার যেন এক অচেনা গলায় বলে ওঠে,-”না আসলে আমি তোমার চুলে, দেহ জুড়ে পেয়েছি নদীর মতো পবিত্র এক আবেশ,যে আবেশে শরীরের বাইরে যে মানবী থাকে তার প্রতি করে তোলে নতজানু।এমন গন্ধ আমি শুধু পেতাম আমার দীপ্তির শরীরে।এরপর আজ কেন জানিনা আবারও পেলাম তোমাকে ঘিরে”৷

হঠাৎ ছটফট করে ওঠে মেয়েটি৷কাঁপা গলায় বলে ওঠে,-”আপনি তো দীপ্তিকে দেখেননি তবে কেমন করে পেলেন তার গায়ের গন্ধ?”

নিলয় এবার শব্দ করে হেসে ওঠে৷কয়েক সেকেন্ড বাদে হাসি থামিয়ে বলে, -''দীপ্তি আমার সমস্ত চেতনায়,না ছুঁয়ে ও তাকে ছুঁয়ে থাকে আমার বাহুপাশ,তার ভিজে চুলের গন্ধ এসে ঝাপটা মারে আমার চোখে মুখে।”

“এসব পাগলামি আপনার একটা দু-দিনের ভার্চুয়াল-ফ্রেন্ড এর প্রতি! এ ভালোবাসা শুধু সময়ের অপচয়, ভুলে গিয়ে তাকে নতুন ভাবে আবার শুরু করুন জীবনটাকে”।-কিছুটা চিৎকার করে মেয়েটা বলে ওঠে। 

নিলয় এবার সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করে, -”ভালোবেসেছেন কখনও কাউকে?”

মেয়েটা এবার শব্দ করে হেসে ওঠে-”যার ভাই এর চিকিৎসার জন্যে দু-লাখ টাকা চাই ছয় মাসের মধ্যে ,না হলে….সেই দিদির অন্তত ভালোবাসা নামক আদিখ্যেতায় গা ভাসালে চলবে না বুঝলেন?”.....

“কি হয়েছে ভাইয়ের?”-নরম গলায় জিজ্ঞাসা করে নিলয়৷

“এ্যাকসিডেন্ট! চোখ দুটো ছয় মাসের মধ্যে অপারেশন না করলে চিরদিনের জন্য আমার ছোট্ট ভাইটা হারিয়ে যাবে অন্ধকারে।আমি দিদি হয়ে পারিনি আমার ছোট্ট ভাইটাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে নিজের জীবন আলোয় ভরিয়ে রাখতে।”-একটু থেকে অনেক টা হাহাকার মেশানো গলায় মেয়েটা বলে৷

“জানেন অনেক চেষ্টা করেছিলাম সৎ ভাবে টাকাটা উপার্জনের, কিন্তু যা চাকরি জুটছিল তাতে কোনো মতেই সম্ভব ছিলনা এইটুকু সময়ে অত টাকা জোগাড় করা।আর একটা সুযোগও এসেছিল নিজেকে বিক্রি করার।পারিনি…

জানি এই কাজেও আমার মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু আমার ভাইটা তো বাঁচবে….''

কথা হারিয়ে ফেলে নিলয়।নিজেও তো জানে অসহায়ত্ব কি ভাবে গ্রাস করে মানুষকে।একটু ইতস্তত ভাবে জিজ্ঞাসা করে-“বাবা?”

“নেই”-কেমন এক বিরক্তি মেশানো গলায় বলে মেয়েটি। 

আবার চুপচাপ হয়ে যায় দুজনেই।নিলয় এর ইচ্ছে করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে।তবু এক সংকোচ….প্লাটফর্ম কাঁপিয়ে ট্রেন ঢোকে।মেয়েটি উঠে যায়।হামাগুড়ি দিয়ে গড়ায় ধাতব চাকা।

ডেলা করা একটা কাগজ এসে পরে নিলয়ের পায়ের কাছে।অবাক বিস্ময়ে কাগজটা মেলে ধরে নিলয়।-

“তোমার সবুজ গজিয়ে ওঠা এলোমেলো দাড়ির মাঝে লুকিয়ে থাকা সিগারেটের দাগ খুঁজে নেবে আমার লজ্জায় আরক্ত ঠোঁট।

বুকের প্রতিটা লোমকূপে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার ভাপে গলে যাবে আমার তৃষিত হৃদয়।

তোমার আমার প্রেমের বাষ্প, রাতজাগা তারা আর জোৎস্না মেখে ,লাল আবির রঙে রাঙাবে পলাশ-কৃষ্ণচূড়া।

দখিনা বাতাস আমাদের ঠোঁট ছোঁয়া ভালোবাসার মধু পান করে নামহীন কোনো পাহাড়ি ফুলকে ভরিয়ে দেবে আদরে আদরে।”-

শুধু কবির জন্যে পাঠিকার লেখা কবির গোপন ডাইরির বুকে লুকিয়ে রাখা কবিতাটি কবির নীরব চোখের জলে আবারও ভিজতে থাকে।

মেয়েটির দু'চোখের বরফ গলে এতক্ষণে নামতে থাকে ট্রেনের মধ্যে কিছু কৌতূহলী চোখকে উপেক্ষা করে।

'আমিও ভেবেছিলাম কবি উত্তাল সমুদ্রের পারে বসে তোমার কাঁধে মাথা রেখে জোৎস্না মাখা রাতে গিটারের বুকে তোলা তোমার আঙুলের প্রতিটা স্ট্রোকে পাগল হতে হতে ,সমুদ্রের ঢেউ গুনবো।তোমার বুকে মাথা রেখে আমার মরণ দেখবো।

যে মেয়েটা আজন্মকাল ভালবাসা নামক শব্দটাকে শুধু ঘৃণার চোখে দেখেছিল, সেই ধূ ধূ মরুভূমির বুকে তুমি ফুটিয়েছিলে পবিত্র ভালবাসার ফুল। তোমার সেই ভালবাসার বাগানে বলো কবি কেমন করে এই পাঁক মাখা হাতে তোমায় স্পর্শ করবো?হয়তো গড তোমার আমার জন্য এই সন্ধ্যাটুকুই রেখেছিল নির্দিষ্ট করে।তুমি ভুলে যাও কবি তোমার দীপ্তিকে ।হয়তো কিছু কিছু স্বপ্নের এভাবেই মৃত্যু ঘটে।'-হাহাকার করে যেন মেয়েটি অন্তরের নীরব ভাষা ভাসিয়ে দেয় দূরে বিন্দু হয়ে যাওয়া নিলয়ের উদ্দেশ্য।

ঠান্ডা বাতাস এসে এলোমেলো করে দিতে থাকে মেয়েটির স্ট্রেইট করা বাদামি চুল।ধীরে ধীরে নিলয় এর বিন্দুটুকুও চোখের আড়ালে চলে যায় মেয়েটির।

হঠাৎ একবিন্দু শিশির ঝরে পড়ে নিলয়ের চোখের পাতায়।মেয়েটির অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে ট্রেন এর গতির সাথে। 

“দীপ্তি ছাড়া অসম্পূর্ণ যে নিলয়।তোমাকে আমি আবারও খুঁজে নেব দেখে নিও দীপ্তি। ঠিক খুঁজে নেবই।”-বিড়বিড় করে নিলয়ের প্রত‍্যয়ী ঠোঁট। 

দূরের আকাশে বাঁকা চাঁদও যেন আর একটু জ্বলে উঠে সায় দেয় নিলয়ের সাথে।

#love


Rate this content
Log in

More bengali story from Bhaswati Ghosh

Similar bengali story from Drama