Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sonali Basu

Romance


2.8  

Sonali Basu

Romance


হৃদমাঝারে

হৃদমাঝারে

10 mins 808 10 mins 808

কলেজে পুজোর ছুটি পড়তেই পিজি ফাঁকা হতে শুরু করলো। পৌষালীও ফিরে যাচ্ছে বর্ধমানে, ওর বাড়িতে। এবার ওদের দেশের বাড়িতে পুজোর পালি পড়েছে, তাই বর্ধমান থেকে ওরা কাটোয়া যাবে। মৌবনী ওর ব্যাগ গোছানো দেখছিল আর বকবক শুনছিল। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এই পৌষালীর সাথেই যা ওর একটুআধটু ভাব হয়েছে নাহলে বাকিদের সাথে ওই হাই হ্যালোর চেয়ে বেশি দূর এগোয়না। একমাত্র পৌষালীই জানে ওকে কেন ছোট থেকেই হোস্টেলে থেকে মানুষ হতে হয়েছে। মৌয়ের মা মারা যাওয়ার পর ওর বাবা আবার বিয়ে করতে দেরী করেননি কারণ মেয়েকে কে দেখবে কে মানুষ করবে কিন্তু যে ওর মা হতে পারতো তার কোন ইচ্ছেই ছিলনা মৌয়ের মা হওয়ার। বাড়িতে প্রচুর অশান্তি কান্নাকাটির পর ওর বাবা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভালো বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দেন। দেদার খরচ করেছেন কিন্তু মেয়ের মন পাননি, সে দূর থেকে দূরেই সরে গেছে। শুধু পরিবার থেকে ও দূরে সরে গেছে তা নয় অন্য মানুষকেও ও কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কিভাবে যে পৌষালীকে মৌ ভালো বান্ধবী হিসেবে মেনে নিয়েছে তা শুধু ও’ই জানে। ব্যাগ গোছাতে গোছাতে পৌষালী মৌকে বলল “দে তোর ব্যাগটা গুছিয়ে দিই”

মৌ বলল “আরে বললাম তো আমি কোথাও যাবো না। আমার ভালো লাগে না”

“হ্যাঁ জানি তো। তুই মুখ হাঁড়ি করে ঘরে বসে থাকবি আর আমি ওদিকে আনন্দ করবো ভালোমন্দ খাবো। তারপর তোর দীর্ঘশ্বাসের কারণে আমার হজমে গণ্ডগোল হোক আর কি। সেটি হচ্ছে না বস্, তোমাকে যেতেই হবে”

মৌয়ের কোন অজুহাত খাটলো না। চতুর্থীর সকালে ওরা দুই বান্ধবী হাওড়া থেকে লোকালে চেপে বসলো বর্ধমানের উদ্দেশ্যে। সারা রাস্তা পৌষালী একাই কথা বলে গেলো তা নয়। মনের জানলা খুলে বাইরে তাকাতে মৌয়ের মনটাও বেশ খুশি খুশি হয়ে গিয়েছিল তাই ও বান্ধবীর গল্পে মাঝেমধ্যেই যোগদান করছিল। সময়ের মধ্যেই ওরা বর্ধমানে এসে নামলো। স্টেশন থেকে টোটো চেপে গোলাপবাগের কাছে ওদের বাড়ির উদ্দেশ্যে ওরা রওনা দিলো। এখানেই পৌষালীদের বাড়ি। বাজারে ওর বাবার বইয়ের দোকান। মৌকে দেখে ওর বাবা মা আর ছোট বোন গীতাঞ্জলী খুব খুশি। সারাদিন খুব আনন্দ করে কেটে গেলো ওদের। পরেরদিন ওরা কাটোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবে তাই বিকেলে ওরা তিনজন বেরোলো একটু বাজার ঘুরে আসতে। চারদিকেই পুজোর মেজাজ। ছোট বড় নানা প্যান্ডেল চারদিকে। তবে ঠাকুর এসে এখনো প্যান্ডেল আলো করে বসেনি। পৌষালী বলল “পঞ্চমীর সন্ধ্যের মধ্যে সব চলে আসবে”

গীতাঞ্জলী বলল “দিদি এবার এখানকার ঠাকুর দেখা হবে না”

“কেন হবে না রে, আমরা তো দশমীর সন্ধ্যের পর চলে আসবো। দু চারটে ঠাকুর ঠিক দেখতে পেয়ে যাবো, চিন্তা করিস না। তাছাড়া মৌকে গোলাপবাগও তো দেখাতে হবে”

পরেরদিন আবার বর্ধমান থেকে কাটোয়া। অশোকবাবু, পৌষালীর বাবা, প্রচুর জিনিস নিয়ে এসেছেন বর্ধমান থেকে। অটো ভাড়া করে যখন বাড়ি পৌঁছালো ওরা তখন বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেলো। মৌ তো গাড়ি থেকে নেমেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। পৌষালীদের দেশের বাড়ি এতো বড় হবে, ও ভাবেনি। যেন জমিদার বাড়ি। অনেকেই বেরিয়ে এসেছে সদর দরজার কাছে ওদের ভেতরে নিয়ে যেতে। মৌ অবাক হয়ে ভাবছিল এতো লোকজন! ও আর কতক্ষণ হাঁ করে দেখতো কে জানে পৌষালী ওকে টেনে নিয়ে গেলো ভেতরে। সবাই সাদরে ওদের বুকে টেনে নিলো। ও যে এ বাড়ির কেউ নয় তা ওদের আপ্যায়নের বহর দেখে বোঝা গেলো না। হাতমুখ ধুয়ে বসতে বসতেই জলখাবার চলে এলো। খাওয়া শেষ হলে পৌষালী বলল “চল মৌ তকে আমাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি”

এতক্ষণে মৌ বলল “তোদের পূর্বপুরুষরা কি জমিদার ছিলেন?”

“না রে জমিদার নয়, জমিদারের নায়েব। আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন জমিদারের নায়েব। এই বাড়ি তারই বানানো তবে সম্পত্তি বাড়ানো থেকে রক্ষা করা সব ঠাকুরদা আর তার ভাইয়েরা মিলে করেছেন। ঠাকুরদা তখনকার দিনে রেলে চাকরি করতেন। তার ভায়েরাও কেউ চাকরি কেউ ব্যবসা কেউ সম্পত্তির দেখাশোনা। আমাদের দুর্গাপুজাও সেই নায়েবদাদুর আমল থেকেই হয়ে আসছে। চল মন্দিরে ঠাকুর দেখে বাড়িটা ঘুরে দেখাব”

নীচে নেমে বাইরে দুর্গা মণ্ডপে চলে এলো ওরা। ঘরোয়া দুর্গাঠাকুর, কি সুন্দর। শহরের জাঁকজমক নেই কিন্তু কি ভালো লাগলো মৌয়ের। ঠাকুর দেখে ওরা বাইরে বেরোতে যাবে, পৌষালীর এক দূর সম্পর্কের ঠাকুমা বললেন “দিদিভাই, কাল ভোরবেলা মন্দিরে দালানে আলপনা দেওয়ার ভার তোমাকে নিতে হবে”

পৌষালী খুশি মনেই বলল “হ্যাঁ ঠাম্মি তোমায় বলতেই হবে না। আমি করবো”

মৌ অবাক হল। ও জানতো না ওর বান্ধবী এতো কাজ জানে। ও বলল “তুই আলপনা দিতে পারিস?”

“হ্যাঁ পারি। তুই দেখলে তুইও পারবি। এখন চল পুকুর পাড় দিয়ে ঘুরে আসি”

দুজনে খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো পেছনের বাগানে। বাগান পেরিয়ে বড় পুকুর। পুরোটা ভর্তি হয়ে আছে পদ্মে পাতাও কম দেখা যাচ্ছে। পুকুর যেন উজ্জ্বল হয়ে আছে পদ্মের গোলাপি রঙে। মৌএর মন ভরে উঠলো। ওর ইচ্ছে হল একটা পদ্ম তুলতে কিন্তু জলের কিনারায় কোন পদ্ম নেই, নিতে হলে কিছুটা গভীরে যেতে হবে। মৌ এক পা এক পা করে নামছে দেখে পৌষালী বলল “আরে নামিস না। জল কিন্তু খুব গভীর”

মৌ বলল “কিছু হবে না, ওই সামনেরটা তুলে নিয়েই চলে আসবো”

পেছন থেকে এক গম্ভীর পুরুষালি আওয়াজ পাওয়া গেলো “তোর বান্ধবীকে মানা কর। শহর থেকে এসেছেন পুজো দেখতে বিপদে পড়লে কেলেঙ্কারি, তার ওপর ওনার বাবা মাকে কি কৈফিয়ত দেবো, কি বলবো মেয়ে জলে পড়ে গেলো কি করে”

মৌ পেছন ঘুরে দেখলো এক যুবক হেঁটে আসছে পুকুরের পাড় দিয়ে। পৌষালী বলল “আমিও ওই কারণে আগেই বারণ করেছিলাম”

যুবক কাছে এসে পৌঁছাতে পৌষালী বলল “তুই কোথা থেকে আসছিস দাদা?”

“ওই ঢাকিদের দেখতে গিয়েছিলাম, কেন দেরী হচ্ছে আসতে সেটা জানতে” তারপর মৌএর দিকে তাকিয়ে বলল “একটু দাঁড়ান, আমিই ফুল তুলে দিচ্ছি”

যুবকের পরনে ধুতি কিন্তু অবলীলা ক্রমে পুকুরে নেমে ফুল নিয়ে এলো, তারপর মৌএর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল “এই নিন” আর একটা বোনের হাতে দিলো। এবার পৌষালী বলল “এ আমার জেঠতুতো দাদা অভি। ও বাইরে চাকরি করে, পুজোয় আমাদের মতো দেশে আসে কদিনের জন্য”

মৌ কিছু বলল না, ওর মনে অন্য কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর মনে হল পৌষালী কি ভাগ্যবতী! কি সুন্দর জমজমাট পরিবার ওদের, সবাই সবার জন্য কত ভাবে কত করে। ঝগড়া হলেও ভাবও হয়। ওর মতো এরকম ছন্নছাড়া অবস্থা তো নয় ওদের। অভি হয়তো ওর চুপ করে থাকাকে অন্যকিছু ভেবে নিয়েছিল তাই বলল “তোর বান্ধবীর বোধহয় আমার বলাটা ঠিক পছন্দ হয়নি” তারপর ওর দিকে ঘুরে বলল “আমি কিন্তু তোমার ভালো ভেবেই ওই কথা বলেছি পছন্দ না হলেও আমার কিছু করার নেই”

মৌ একবার অভির দিকে তাকালো তারপর পৌষালীকে বলল “ঘরে চল আমার ভালো লাগছে না”

পৌষালী কি বুঝলো কে জানে মুখে বলল “চল্”

ঘরে এসে পৌষালী বলল “ঘরে কি বসবি, চল তোকে আমাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাই”

বেশ লাগলো মৌয়ের পৌষালীদের দেশের বাড়ি, খোলামেলা দোতলা বাড়িটা, তবে সব থেকে ভালো লাগলো চওড়া ছাদটা। চারপাশে কত দূর পর্যন্ত দেখা যায়। অনেকক্ষণ ছাদে ঘুরে ওরা নেমে এলো নীচে।

পরেরদিন ভোরে পৌষালী ওকে জাগিয়ে দিলো। বলল “তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নে, দুর্গা মণ্ডপে যাবো, আলপনা দিতে হবে তো”

পৌষালী আলপনা দিচ্ছে আর মৌ দেখছে। খুব ভালো লাগছে ওর। ও বলল “আমি একবার চেষ্টা করি পৌষালী, আমার ইচ্ছে করছে দিতে”

“কর না, এই নে কাপড়ের টুকরো, এই গোলায় ডুবিয়ে এইভাবে কর আমার মতো”

মৌ চেষ্টা করছিলো, পৌষালী মাঝে মাঝে দেখে ওকে উৎসাহ দিচ্ছিল “হ্যাঁ কর, ভালো হচ্ছে”

হঠাৎ কেউ বলল “এই নাতনি এ কাকে নিয়েছিস সাথে আলপনা আঁকার জন্য। এতো কিছুই পারে না। এটা আলপনা হচ্ছে নাকি? মা কি কিছুই শেখায়নি”

মৌ মুখ ঘোরাতেই দেখলো এক বয়স্কা মহিলা, তবে আগেরদিনের দেখা মহিলা নয়। মহিলার মুখ বেঁকানো দেখে মৌ আর কিছু না বলে উঠে পড়লো তারপর পায়ে পায়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে দৌড়ে চলে গেলো ঘরে। অভি মন্দিরের দিকে আসছিল মৌকে ছুটে চলে যেতে দেখে অবাক হল তারপর মন্দিরে গিয়ে বোনকে জিজ্ঞেস করলো “তোর বান্ধবীর কি হয়েছে রে, কেমন গোমড়া মুখ দেখলাম, দৌড়ে চলে গেলো” পৌষালী সব বলল। অভি কিছু না বলে চলে এলো। পায়ে পায়ে ওপরে উঠে এসে উঁকি মেরে দেখলো মৌ ঘরে আছে কি না, কিন্তু নেই। অবাক হল, কি হল, গেলো কোথায় মেয়েটা। এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে শেষে এলো ছাদে। এসে দেখে ও যা সন্দেহ করেছিল তাই ঠিক। মৌ চুপচাপ এক জায়গায় বসে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। অভি খোঁচা দেওয়ার লোভ সামলাতে পারে না “কি ব্যাপার ওখান থেকে পালিয়ে এখানে মুখ লুকিয়ে বসে আছেন?”

মৌ ঘুরে তাকাতে অভি খেয়াল করলো ওর চোখে জল। ও অবাক হল কি হল মেয়েটার, কাঁদে কেন? কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মৌ ওখান থেকে চলে গেলো তাড়াতাড়ি। পৌষালীই খুঁজে বার করলো তার বান্ধবীকে জলখাবার জন্য ডাকতে গিয়ে। ওর মা মৌকে খুঁজে না পেয়ে মেয়েকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন ওর বান্ধবীর কথা। ঘরে ওর বান্ধবীকে পেয়ে ওকে বলল “তুই এখানে আর আমি সব জায়গায় তকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। চল খেতে। তুই আলপনা দিতে দিতে চলে এলি কেন?”

মৌ বলল “আমি কোন কাজের নয় রে। যে দেখবে সেই বলবে”

“ওটা কোন কথার কথা নয়। খুঁত ধরার লোক জগতে কম নেই, তুই সব জানলেও দেখবি কেউ না কেউ কোন না কোন খুঁত ধরবেই। লোকের কথায় কান দিবি না। এখন চল” বলে ওকে টেনে নিয়ে গেলো নীচে।

সেদিনটা ওদের দারুণ কেটে গেলো এদিকওদিক ঘুরে গল্প করে মন্দিরে বসে কাজ দেখে। সন্ধ্যায় ওরা দুই বান্ধবী ছাদে বসে আছে এমন সময় পৌষালী বলল “নীচে এতক্ষণে চায়ের আসর বসার কথা। তুই বস, আমি আমাদের চা নিয়ে আসি”

মৌ মাথা নাড়তে ও নেমে গেলো। মৌ আনমনে আকাশ দেখছিল আর মাকে খুঁজচ্ছিল এমন সময় কেউ পাশ থেকে বলে উঠলো “কি ব্যাপার আকাশে কি খুঁজচ্ছেন, তারা?”

খানিক চমকে উঠলেও তাড়াতাড়িই সামলে নিয়ে মৌ ওর পাশে তাকিয়ে দেখলো। অভি কখন এসে কার্নিশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে ও টের পায়নি। অভির প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াতে ও আবার প্রশ্ন করলো “কি ব্যাপার, আপনি কি অচেনা মানুষের সাথে কথা বলেন না?”

এবার ও উত্তর দিলো “বলি”

“তাহলে আপনি উত্তর দিলেন না কেন আমার প্রশ্নের?”

“কি বলবো, আকাশে মাকে খুঁজচ্ছিলাম? আপনার কি মনে হবে না আমার মাথায় গণ্ডগোল আছে?”

অভি ওর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে বলল “এতে মাথায় গণ্ডগোল ভাবার কোন কারণ নেই। আর আপনার মা নেই শুনে খারাপ লাগলো”

“আমার জন্মদাত্রী মা নেই, তবে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী বর্তমান”

অভি বুঝতে পারলো মৌয়ের মনের কষ্টটা। এতো মিষ্টি মেয়ের মনে এতো দুঃখ! ও ওই বিষয়ে কোন কথা না তুলে অন্য প্রসঙ্গে গল্প শুরু করলো। ওদের গল্পের মাঝেই পৌষালী এসে উপস্থিত দু কাপ চা নিয়ে। অভিকে দেখে বলল “দাদা তুই এখানে! কিন্তু আমি তো মাত্র দু কাপ চা নিয়ে এলাম”

অভি উত্তর দিলো “আমি খেয়েছি তাই আমার চায়ের জন্য তোকে ভাবতে হবে না”

আবার গল্প শুরু হল তবে কিছুক্ষণ পরেই নিচ থেকে অভির ডাক পড়াতে ও নীচে নেমে চলে গেলো।

পরেরদিন সপ্তমী। ভোরে উঠে স্নান সেরে শাড়ি পড়ে দুই বান্ধবী পুকুর ঘাটে গেলো কলাবৌয়ের স্নান দেখতে। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে কলাবৌ স্নান সারলো আর ঘট ভরা হল। ওখান থেকে ফিরে আসার পর শুরু হল সপ্তমীর পুজো। অষ্টমীতে পুরো বাড়ির লোকেদের সাথে ওরা অঞ্জলি দিল। দুই বান্ধবী এ দিনও শাড়ি পড়েছিল তবে এর মধ্যেই পৌষালী খেয়াল করলো ওর দাদার দৃষ্টি মাঝেমাঝেই ওর বান্ধবীর মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে। একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতেই ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো দুপুরে খাবার পরিবেশনের সময়। অভি বারেবারেই মৌয়ের কাছে ঘুরেফিরে এলো খাবার দিতে। ব্যাপারটা বুঝলেও পৌষালী ওর বান্ধবীকে কিছু জানালো না।

নবমীর দিন ও দাদাকে ধরে বসলো কাটোয়ার বাকি ঠাকুরগুলো ঘুরিয়ে দেখাতে। অভি বলল “সেটা কি ভাবে সম্ভব পৌষালী। জানিস তো আজ সন্ধ্যায় বাড়িতেই গানবাজনার আসর। তোদেরই তো করতে হবে”

পৌষালী বলল “ঠিক আছে তাহলে এবেলাতেই দেখিয়ে দে”

আব্দার ফেলতে না পেরে অভি নিয়ে চলল গাড়িতে ওদের ঠাকুর দেখাতে। বাড়ির বাকি কচিকাঁচারাও যোগ দিলো কিন্তু তাতে ওদের ঘোরাতে আনন্দ কম হল না।

সন্ধ্যায় বাড়ির সদস্যদের নিয়েই গানবাজনার আসর বসলো। সবাই কিছু না কিছু করলো গাইল বা আবৃত্তি করলো। তবে এবারও পৌষালী খেয়াল করলো মৌ যখন কবিতা আবৃত্তি করছে অভি ওর মুখের দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অন্য কোনদিকে ওর খেয়াল নেই।

পরেরদিন দশমীর পুজা হয়ে যেতেই দুর্গাপূজার সমাপ্তি। ঠাকুর যখন দোলায় চলে গেলো তখন মৌ ঘরের এক কোণে গিয়ে প্রাণ ভরে কাঁদলো। এতটাই একাত্ম হয়ে গিয়েছিল ও এই পুজোর সময় মা দুর্গার সাথে যে মায়ের চলে যাওয়ার সাথেসাথেই ওর মনে হল ওর মাও এভাবেই চলে গিয়েছিল ওকে ছেড়ে। বিকেলে নদীর পাড়ে মায়ের বিসর্জন ও দেখতে গেলো না, চুপ করে শুয়ে রইলো ঘরে।

শুয়ে শুয়ে মায়ের কথাই ভাবছিল ও এমন সময় অভির আওয়াজ পেলো “তোমার শরীর খারাপ নাকি?”  

ও উঠে বসে বলল “না, ভালো লাগছিলো না তাই শুয়ে ছিলাম। ঠাকুর বিসর্জন হয়ে গেলো?”

“হ্যাঁ এই ফিরলাম পুকুরঘাট থেকে”

“পুজো শেষ, এবার ফেরার পালা”

“হ্যাঁ কিন্তু এবার যে ফিরে গেলেও মন এখানেই থেকে যাবে”

“কেন?”

“এমন একজনের জন্য যে সহজে নিজের মনের কথা বলে না আর তাই অন্যের মনের কথাও বোঝে না”

মৌ অবাক হয়ে তাকালো অভির দিকে। কি বলতে চাইছে ও? ও ওকে ভালোবাসে? এটা কি সম্ভব? ওর মন বলল কোন মতেই সম্ভব না। ওকে কেউ ভালোবাসতে পারে ও বিশ্বাস করতে পারে না। ও কোন উত্তর দিতে পারলো না, জিজ্ঞেসও করতে পারলো না অভির ভালোবাসার মেয়েটি কে।

একাদশীর সকালে ওরা ফিরে এলো বর্ধমানে। বিকেলে গোলাপবাগ ঘুরতে গিয়ে সুযোগ পেতে কথায় কথায় পৌষালী মৌকে জিজ্ঞেস করলো “হ্যাঁ রে আমার দাদাকে তোর কেমন লাগলো?”

মৌ বলল “ভালোই”

“শুধুই ভালো, ওর বেশি কিছু নয়”

“ওর বেশি কি হবে?”

“সে কি তুই কি কিছুই বুঝিসনি?”

“কি বুঝবো”

“দাদা তোকে ভালোবেসে ফেলেছে”

“একবার বলতে চেয়েছিল অভি তবে আমার বিশ্বাস হয়নি”

“কেন?”

“কেউ আমায় ভালবাসতে পারেনা পৌষালী, আমার অতীত জেনে তো নয়ই”

“না রে তুই ভুল ভাবছিস। তোর অতীত দাদা সব আমার কাছে জেনে নিয়েছে। তবু ও তোকেই ভালবেসেছে”

মৌয়ের গলায় আকুলতা প্রকাশ পেলো “কিন্তু আমি যে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি”  

“তুই চাইলে আমি দাদাকে আসতে বলতে পারি”

পরেরদিন অভি এসে উপস্থিত পৌষালীর বাড়িতে। ও মুম্বাই চলে যাবে কাজের জায়গায় তার আগে কাকাদের সাথে দেখা করতে এসেছে। ওকে দেখে মৌয়ের মন ছটফটিয়ে ওঠে না বলা কথা বলার জন্য কিন্তু সুযোগ পায় না। সবাই অভির সাথে গল্প করতে ব্যস্ত। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে এমন সময় পৌষালী মৌকে টেনে ছাদে নিয়ে এলো। অভি আগে থেকেই ওখানে ছিল। মৌকে ওর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল “নে তোরা কথা বল, আমি নীচে আছি”

পৌষালী চলে যেতে অভি মৌয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো, বলল “কাল আমি চলে যাচ্ছি, শুনেছ নিশ্চই”

মৌ উত্তর দিলো “হ্যাঁ জানি”

“আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো পেলাম না যার কারণে আমার রাতের ঘুম উড়ে গেছে”

“কি বলবো?”

“হ্যাঁ অথবা না, তবে না বললে এখানে খুব কষ্ট হবে” বলে নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করলো ও। মৌ উত্তর দিলো “হ্যাঁ”

“সত্যি!” অভি মৌয়ের মুখটা তুলে ধরলো। দেখলো মৌয়ের লজ্জারাঙা মুখটা সদ্য বিকেলের আলোয় কি মিষ্টি লাগছে দেখতে।     


Rate this content
Log in

More bengali story from Sonali Basu

Similar bengali story from Romance